এবার নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন ‘বই উৎসব’ করে শিক্ষার্থীদের নতুন পাঠ্যবই দেয়া হয়নি, আবার সব শ্রেণির শিক্ষার্থী বই পাচ্ছেও না।
আজ যারা বই পেয়েছে তারাও সর্বোচ্চ তিনটি বই পেতে পারে। কারণ, ৪০ কোটির বেশি বই দরকার হলেও গতকাল মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত প্রস্তুত হয়েছে মাত্র সাড়ে ৬ কোটি বই। আবার অন্যদিকে সব উপজেলায় বই পাঠানোও হয়নি।
পাঠ্যবই ছাপানো ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) বলছে, অর্থের অপচয় রোধে এবার বই উৎসব হচ্ছে না। প্রথম দিনে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে অন্তত তিনটি বই এবং জানুয়ারির মধ্যে সব বই তুলে দেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী তাঁরা। বইয়ের চাহিদা পূরণে প্রথম দিনই সব পাঠ্যবইয়ের সফট কপি অনলাইনে প্রকাশ করা হবে।
এনসিটিবি সূত্র বলছে, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং ক্ষমতার পটপরিবর্তনের কারণে পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্র, পুনঃদরপত্র প্রক্রিয়ায় এবার অনেক দেরি হয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল, বইয়ে সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জন হয়েছে। এতে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে অক্টোবরে। কয়েকটি বইয়ের দরপত্র প্রক্রিয়া এখনো চলছে। অন্যান্য বছর দরপত্র প্রক্রিয়া জুনে শেষ হয়েছিলো। এ ছাড়া এবার মানসম্মত কাগজ ও কালির ব্যাপক সংকট ছিলো। সব মিলিয়ে সময়মতো বই ছাপানো শুরু করা যায়নি।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান একটি দৈনিক গণমাধ্যমকে জানান, ‘শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে সব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দিতে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, সব শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রথম দিনই অন্তত তিনটি বই পাবে। জানুয়ারি মাসেই সব বই হাতে পাবে শিক্ষার্থীরা। তবে প্রথম দিন সব বইয়ের সফট কপি অনলাইনে উন্মুক্ত করা হবে।’
তিনি বলেন, অর্থের অপচয় রোধ করতেই এবার বই উৎসব হচ্ছে না।
বিগত সরকার ২০১০ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই দিচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ১ জানুয়ারি ‘বই উৎসব’ করে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া হয়েছে।
এ বছরের জন্য প্রাক্-প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর মিলিয়ে মোট ৪০ কোটি ১৫ লাখ ৬৭ হাজার ২০২টি পাঠ্যবই ছাপানো হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের জন্য ৩০ কোটি ৯৫ লাখ ৪১ হাজার ৪৮৬টি এবং প্রাথমিক স্তরের জন্য ৯ কোটি ১৯ লাখ ৫৪ হাজার ৩৫৫টি বই রয়েছে। এসব বই ছাপানো ও বিতরণে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা।
এনসিটিবি সূত্র বলছে, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বই ছাপানোর কাজ মোটামুটি শেষ। দশম শ্রেণির এক কোটি বই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ছাপানো হচ্ছে। তাই এই শ্রেণির বই ১০ জানুয়ারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো সম্ভব হবে। বাকি বইগুলো ছাপানোর কাজ শেষ করে মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে আগামী মার্চ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সূত্রটি জানায়, গতকাল দুপুর পর্যন্ত ছাপানোর কাজ শেষ হয়েছে মাত্র সাড়ে ৬ কোটি পাঠ্যবই। এর মধ্যে সাড়ে ৫ কোটি বইয়ের পোস্ট ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) শেষ হয়েছে। অর্থাৎ এসব বই উপজেলা পর্যায়ে বিতরণের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
এনসিটিবির উৎপাদন দপ্তরের সূত্র জানায়, গতকাল পর্যন্ত প্রাক্-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ের ছাড়পত্র হয়েছে ৩ কোটি ৯৮ লাখ ৯ হাজারটির। তবে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির ২৭টি লটের বইয়ের পুনঃদরপত্র হয়েছে। এতে এসব লটের জন্য নির্ধারিত ১০৫টি উপজেলায় আজ বছরের প্রথম দিন বই না যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বই ছাপানোর কাজ চলছে। গতকাল পর্যন্ত এই দুই শ্রেণির সাড়ে ১৩ শতাংশ বই ছাপানোসহ সব কাজ শেষ হয়েছে। পিডিআই বাকি। এদিকে মাধ্যমিক (মাদ্রাসার ইবতেদায়িসহ) স্তরের মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখের মতো বইয়ের পিডিআই হয়েছে। বেশ কয়েকটি লটের দরপত্রপ্রক্রিয়া এখনো চলছে।
গতকাল দেশের অন্তত ১৫টি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোনো কোনো উপজেলায় মাধ্যমিক স্তরের একটি, কোনোটিতে দুটি বই পৌঁছেছে। কোনো কোনো উপজেলায় গতকাল পর্যন্ত একটি বইও পৌঁছায়নি। যেসব উপজেলায় বই গেছে, সেগুলো শিক্ষার্থীদের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে সব শিক্ষার্থী বই পাবে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী বলেন, বেশ কয়েকটি কারণে বই ছাপানোয় দেরি হচ্ছে। শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করে বইগুলো পরিমার্জন, পুনরায় দরপত্র, কার্যাদেশ দেরিতে দেওয়াসহ আনুষঙ্গিক কাজে দেরি করেছে এনসিটিবি। এরপর আছে কাগজ ও কালির সংকট। ফলে সব শিক্ষার্থীর হাতে সব বই তুলে দিতে মার্চ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, এবার বছরের প্রথম দিন মাধ্যমিকের সব বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হবে না—এমন চিন্তা থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাংলা, গণিত ও ইংরেজি বইয়ের ছাপানোসহ সব কাজ শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই তিন বইও সব শিক্ষার্থীর জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ৪৫ লটের বই ছাপানোর পুনঃদরপত্র করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে এই দরপত্রগুলো সম্পন্ন হবে। এ ছাড়া মুদ্রণের কাজ পাওয়া কিছু মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান এখনো বই ছাপানোর জন্য এনসিটিবির সঙ্গে এখনো চুক্তি করেনি। অনেক দরপত্রের বই সরবরাহের জন্য ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বই ছাপানোর কাজ শুরু করতে কিছুটা দেরি হয়েছে। এ ক্ষতি পোষাতে দিনরাত কাজ চলছে।
তথ্যসূত্র : আজকের কাগজ।