“২০২৪ সালে প্রমাণ হয়েছে বাংলাদেশের শিক্ষকরা কখনও মানুষ গড়তে পারেনি” — এই তীর্যক মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে আমরা দাঁড়াচ্ছি। সত্যিই কি অবস্থা এতো সংকটময়? কী কারণে আজকের শিক্ষক সংগ্রহশীল সত্যিকারের “মোরাল গাইড” হতে ব্যর্থ? দায়িত্ব কার — সমাজ, শিক্ষক, নীতিনির্ধারক, পলিসি, সংস্কৃতি? এই প্রশ্নগুলোর জবাব খোঁজার চেষ্টা করবো এই কলামে।
দাবি ও তর্কের প্রেক্ষাপট
বর্তমানে অনেক কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে, “শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর” — একটি প্রতিপাদ্য যা প্রথাগতভাবে স্বীকৃত। কিন্তু আপনার প্রদত্ত বক্তব্যে আহ্বান করা হচ্ছে — সেই পুরাতন বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য। মন্তব্যে বলা হয়েছে — কেবল সনদ ও কাগজের যোগ্যতা থাকলেই কেউ “শিক্ষক” বলা হয়; কিন্তু বাস্তব জীবনে শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব, দমানো, কোণঠাসা ছাত্র–শিক্ষক সম্পর্ক, শারীরিক ও মানসিক হানিসহ উপদ্রব — এসব প্রমাণ করে যে শিক্ষকরা মানুষ গড়তে ব্যর্থ হয়েছে। এই দাবি সহজভাবে অবহেলা করা যাবে না। কারণ, যদি শিক্ষকের আচার-আচরণ ও পনিতপথ আজ বিকৃত হয়, তাহলে শুধু শিক্ষাক্ষেত্র নয়, সমাজ-রূপান্তর, নৈতিক কাঠামো — সবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাহলে চলুন দেখি — কেন এই হতাশা? কি প্রমাণ এই দাবি? প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত?
প্রমাণ এবং বাস্তবতা: কোন তথ্য আমাদের সহায়ক?
আপনার বক্তব্যে অনেক গুরুতর ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে — গলায় জুতার মালা, গায়ে হাত তোলা, অপমান ও প্ররোচনায় ছাত্রদের উত্ত্যক্তি করা — এসব আজও অনেক স্কুল-কলেজে ঘটে বলে শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়। এই ঘটনার কিছু প্রমাণ কিংবা গবেষণা-সহ দৃশ্যমান উপাত্ত আছে, যা আমাদের আলোচনায় কাজে লাগতে পারে:
- শারীরিক ও মানসিক শাস্তি (Corporal Punishment) আজও বাস্তব
— ২০১১ সালে বাংলাদেশের হাইকোর্ট (উচ্চ আদালত) স্কুল-কলেজে শারীরিক শাসন ধ্বংস করার নির্দেশ দেয়।
— কিন্তু বাস্তবতায়, অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনও ছাত্রীছাত্রীরা শাসনমূলক শাস্তির শিকার হচ্ছে। GAGE–এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশে প্রায় ৮৩% কিশোর শারীরিক শাস্তি পেয়েছেন স্কুলজীবনে।”
— একটি সাম্প্রতিক গবেষণা (২০২৪) দেখেছে, প্রাথমিক স্তরের বিদ্যালয়ে শাস্তির প্রভাব শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও জ্ঞানগত বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
- শাস্তি ও ভয়-ভীতির পেডাগোজি (শিক্ষণদানের ভীতি-ভিত্তিক পদ্ধতি)
— অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা ভয়ের ও ভয়-গোপন করি-ভিত্তিক আচরণ নিয়েছেন — “ভাই, যদি আজ কাজ না করো, পরে তো হবে…” — এমন হুমকি বা ডানাদারী শিমূলক কথাবার্তা।
— এই পন্থা শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ক্ষুণ্ন করে, শেখার আগ্রহ কমায়, ক্রিয়াশীল চিন্তা বিকাশে বাধা দেয়।
- বিভিন্ন সামাজিক ও অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক প্রমাণ
— সামাজিক মিডিয়া, অভিভাবক-শিক্ষার্থী প্রতিক্রিয়া ইত্যাদিতে শিক্ষকের অপমান বা নেতিবাচক আচরণের কথা অনেকবার উঠে আসে।
— “কোন ছাত্র যার হাত ধরে অ-আ শিখলো, তার গলায় জুতার মালা দেওয়া” — এমন ঘটনা সামাজিক শ্রোতায় প্রচলিত।
— এছাড়া কিছু শিক্ষকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রভাব বা ক্ষমতার অপব্যবহার — যেমন জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো — এসব অভিজ্ঞতাও বিভিন্ন সংবাদ বা সামাজিক আলোচনায় উঠে এসেছে।
- নীতিগত ও কাঠামোগত ব্যর্থতা
— যদিও শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ, এখনও তা আইন বা নীতি হিসেবে দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
— শিক্ষকদের প্রক্রিয়াগত মূল্যায়ন, মনিটরিং ও জবাবদিহি ব্যবস্থা অপ্রতুল।
— শিক্ষক দলে পেশাদারিত্ব কম, প্রশিক্ষণ-অপর্যাপ্ততা, শিক্ষকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বীকৃতি কম — এসব কারণ শিক্ষকের আত্মমর্যাদা ও দায়বোধের সংকটে ভূমিকা রাখে।
— শিক্ষার্থী–শিক্ষক অনুপযুক্ত অনুপাত, বড় শ্রেণি, সীমিত রিসোর্স — এসব কারণে গুণগত শিক্ষাদান ও ব্যক্তিগত মনোযোগ দেওয়া কঠিন।
এই প্রমাণ ও তথ্যগুলি — পুরোপুরি “শিক্ষকরা মানুষ গড়তে পারেনি” — এমন সরলসার দাবি প্রমাণ করতে বেশিক্ষণ যথেষ্ট না, কিন্তু তারা দেখায় যে, বর্তমান শিক্ষা ও সামাজিক অবস্থা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং অনেক বড় অবহেলা ও বিকৃতি বিদ্যমান।
কারণ ও বিশ্লেষণ : কীভাবে পতন ঘটেছে?
শিক্ষকের “মানুষ গড়ার কারিগর” ভূমিকা ক্ষয়াপন্ন হওয়ার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতি বা বেসরকারি অপরাধ নয় — অনেক গভীর কারণ কাজ করে। নিচে কিছু সম্ভাব্য কারণ ও বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. প্রশিক্ষণ ও পেশাদার উন্নয়ন (Professional Development) ঘাটতি
একজন শিক্ষক শুধু বিষয়বিষয়ক দক্ষতা (বিজ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি ইত্যাদি) জেনে থাকলেই কাজ হবে না; তাকে নৈতিকতা, শিক্ষা মনস্তত্ত্ব, শিক্ষণ-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, ক্লাসরুম ব্যবস্থাপনা ইত্যাদিতেও প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। কিন্তু বাস্তবে,
- অনেক শিক্ষক মৌলিক প্রশিক্ষণ পায় না বা প্রশিক্ষণ গঠনমূলক নয়।
- আপডেটেড পেডাগজি পদ্ধতি, মানসিক দিক, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে উন্নত কর্মশালা বা ফলো-আপ নেই।
- শিক্ষকের জন্য গবেষণাসহ পেশাগত বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত।
এইসব কারণে শিক্ষক হয় “গুণী শুধুই বিষয়বিজ্ঞানী” — কিন্তু মানবিক গুণাবলি রূপায়ণ বা ছাত্র-মন গড়ার পথে ফেল হন।
২. সামাজিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির রাজদণ্ড
শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক ও শ্রদ্ধার আদি কাঠামো আজ সংকুচিত:
- সমাজে অর্জন ও পদ-বল বেশি মূল্যায়িত — শিক্ষক পদের মর্যাদা সামাজিকভাবে অনেকটা “জব মিডলমর্যাদা পেশা” হিসেবে নিন্য করা হয়।
- শিক্ষককেও পারস্পরিক সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহারে প্ররোচিত হতে দেখা যায়।
- শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠান — মাঝে মাঝেই শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা কম, চাহিদা বেশি; ফলশ্রুতিতে শিক্ষকও “কর্তৃপক্ষ পন্থা” অবলম্বন করে থাকেন।
- অভিভাবক-সামাজিক চাপে শিক্ষক “নট রেপ্রেজেন্টেটিভ” হয়ে ওঠে, তারা প্রচলিত মূল্যবোধ (শৃঙ্খলা, ভয়, বাধ্যতা) ব্যবহার করে শিক্ষার্থীর উপর নিয়ন্ত্রণ জরুরি মনে করতে পারেন।
এই সামাজিক গড়ন ও সংস্কৃতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাহীনতার ও কর্তৃত্বপূর্ণ মানসিকতা শিক্ষাকে বিকৃত করেছে।
৩. নৈতিক বিপর্যয়, ব্যক্তিতত্ত্ব ও দায়িত্বহীনতা
কিছু ক্ষেত্রে, ব্যক্তিগত চাহিদা, অর্থনৈতিক প্রলোভন, ক্ষমতার অপব্যবহার, অধ্যক্ষ–শিক্ষক–শিক্ষার্থী মধ্যকার রাজনীতি — এসব মিশ্রিত হয়ে একটি নৈতিক বিপর্যয় তৈরি করেছে।
- শিক্ষক সেড়িয়াসভাবে দায়িত্ব নেন না — সময়মতো ক্লাস পড়ানো, মনোগ্রাহী পড়াশোনা দেখাশোনা, ছাত্র অনুপ্রেরণা দেওয়া — এগুলো অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ।
- কিছু শিক্ষক কেবল “চাকরি করতে” আসেন — কাজকর্ম চালিয়ে যান, ছাত্রীছাত্রীর মনস্তাত্ত্বিক দিক বিবেচনায় কম।
- বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্ষমতার অপব্যবহার (শিক্ষার্থীকে নির্যাতন, হুমকি, প্ররোচনা) — শুধু একটি অল্পাংশ, কিন্তু ছড়িয়ে পড়লে সংস্কারকে দম্ভিত করে।
এই সমস্ত অনুপ্রবেশকারী দুর্বলতা শিক্ষকের মানুষের গড়ার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
৪. নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা
- আইন ও নীতির অভাব বা কার্যকর বাস্তবায়ন ঘাটতি — শারীরিক শাসন নিষিদ্ধ হলেও বাস্তব কার্যকর নিয়ম নেই।
- প্রধানমন্ত্রীর বা শিক্ষাবোর্ডের মনিটরিং, অভিযোজন ও জবাবদিহি ব্যবস্থা দুর্বল।
- শিক্ষক নিয়োগ, মূল্যায়ন ও প্রশিক্ষণে কুশলতা কম — নন-প্রফেশনাল নিয়োগ, রাজনৈতিক সংখ্যা প্রবণতা, অনিয়ম প্রবণতা — এসব পেশাদারিত্বের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
- স্কুল-শিক্ষক সংস্থা, শিক্ষাবোর্ড ও সমাজ—এই তিন স্তরে সমন্বয় ও মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল।
- বাজেট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা — বড় ক্লাস, অনুকূল শিক্ষণ পরিবেশের অভাব, ইন্টারনেট ও শিক্ষাসামগ্রী সীমিত — এসব শিক্ষকের কাজকে ক্লান্ত ও সীমাবদ্ধ করে।
৫. শিক্ষার্থী-পারিভাষিক পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জ
- আজকের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি তথ্যপ্রবণ, প্রযুক্তিবিদ, স্বাধীনচেতা — “শুধু মোরাল বক্তৃতা” তাদের ওপর কাজ করে না।
- সামাজিক মাধ্যম, মিডিয়া, পার্শ্ববস্তু, পিয়ার গোষ্ঠীর প্রভাব — শিক্ষকের নির্দেশ প্রভাবিত হয়।
- শিক্ষার্থীর নিজস্ব স্বপ্ন, অনুভূতি, মানসিক সমস্যা — যেগুলো শিক্ষক যদি জানতে না পান বা মোকাবেলা করতে না পারেন, তাহলে “মানব গড়ার” কাজ বিফল হয়।
তাহলে সত্যিই শিক্ষকরা “মানুষ গড়তে পারছে না” — কি এটা একপক্ষীয় দৃষ্টিভঙ্গি?
আপনার দাবি অত্যন্ত নাটকীয়, কিন্তু আমরা কিছুটা ন্যায়বিচার করে দেখতে পারি:
- “মানুষ গড়ার” দায়িত্ব একক শিক্ষককে দেওয়া অত্যধিক দৃষ্টিভ্রমি — সমাজ, পরিবার, সংস্কৃতি, মিডিয়া, রাষ্ট্র — সব মিলে বিকাশ ঘটায়।
- অনেক শিক্ষক আজও জীবনে আদর্শ, নৈতিক চরিত্র, মানবিক গুণবিকাশে অবদান রাখছেন; হয়তো তার আলো ছাপ কম, বা প্রতিবাদে নিমগ্ন অবস্থায় তারা নমনশীলতা বজায় রাখছেন।
- “মানুষ গড়ার” মানদণ্ডও পরিবর্তনশীল — আজকের যুগে শুধু ধর্মীয় বা নৈতিক গুণগোষ্ঠী গঠন নয় — মানবাধিকার সচেতনতা, বৈচিত্র্য গ্রহণ, সহমর্মিতা, সৃজনশীলতা — এসব গুণবিকাশও মানুষের গড়ার অংশ।
- যদি শিক্ষকের সুযোগ-সুবিধা, আস্থা ও মর্যাদা গড়ে দেওয়া হয়, তারা অনেক বেশি সক্ষম হবে।
অর্থাৎ, “শিক্ষকরা মানুষের গড়ার কারিগর” এই ধারণা অপ্রচলিত বা অবাস্তব নয় — বরং আজকের চ্যালেঞ্জ সেই ধারণাকে প্রেক্ষাপটে ফিরিয়ে আনা।
প্রস্তাব ও আহ্বান : কীভাবে “মানুষ গড়ার শিক্ষক” ফিরে পাবো?
অবস্থা বদলাতে হলে শুধু অভিযোগ করা নয় — সুদৃঢ় কর্মসূচি ও সংস্কার দরকার। নিচে কিছু প্রস্তাব:
- শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন
- নৈতিক শিক্ষা, শিক্ষণ মনস্তত্ত্ব, ক্লাসরুম ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক দিক ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত, গুণগত কর্মশালা ও রিফ্রেশার কোর্স।
- শিক্ষকদের গবেষণা ও উদ্ভাবনী কাজের উৎসাহ — ছোট ছোট অ্যাকশন রিসার্চ, পেডাগজি এক্সপেরিমেন্ট।
- শিক্ষক মেন্টরশিপ ও কোচিং সিস্টেম — অভিজ্ঞ শিক্ষক থেকে নতুনদের গাইডেন্স।
- নীতিমালা ও আইনগত কঠোরতা
- শারীরিক ও মানসিক শাস্তি প্রতিহত করার জন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয় “শিক্ষার্থী অধিকার কমিশন” গঠন।
- শাস্তি ও অপমানমূলক আচরণ করলে কঠোর ব্যবস্থা — কারণ শাস্তি ও অপমান মানে শিক্ষার্থী অধিকার লঙ্ঘন।
- নিয়োগ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় নৈতিক ও আচরণগত দিককে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া।
- শিক্ষক মর্যাদা ও সামাজিক স্বীকৃতি
- শিক্ষা বেতন, সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা সঠিকভাবে নির্ধারণ।
- শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি — যাতে তারা পারস্পরিক বাধ্যবাধকতা বোধ করে।
- সমাজে শিক্ষক সম্মান ফিরে আনা — প্রচার, মূল্যায়ন ও উদযাপন।
- মনিটরিং, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা
- শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ, শিক্ষার্থী-প্রতিক্রিয়া (ফিডব্যাক) — গোপন, নিরপেক্ষ।
- শিক্ষার্থীর অধিকার রক্ষা ও অভিযোগ ব্যবস্থা — শিক্ষকও সে সম্পর্কে বিপর্যয়বোধ না করবে।
- শিক্ষা বোর্ড ও জেলা প্রশাসন নিয়মিত “শিক্ষক মনিটরিং” করবে।
- শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষাদান পন্থা
- ভেতর থেকে উদ্ভাবিত, প্রশ্নমুখী, অংশগ্রহণমূলক শিক্ষাদান — ছাত্রকে আপনার শিক্ষকের সহকর্মী হিসেবে গ্রহণ।
- শিক্ষার্থীর অনুভূতি, সমস্যা বোঝার মনোভাব — শিক্ষকের সহমর্মী দৃষ্টিভঙ্গি।
- নৈতিক শিক্ষা, চরিত্র গঠন পাঠ্যপুস্তক ও পাঠক্রমে যুক্ত করা — শুধু তথ্যমূলক না, মানবিক গুণানোয়ক।
- সম্প্রদায়, পরিবার ও সমাজকে যুক্ত করা
- অভিভাবক-শিক্ষক সমন্বয় সভা, মানসিক ও নৈতিক দক্ষতা বিষয়ক ওয়ার্কশপ।
- সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি — মিডিয়া, ধর্মীয়, সামাজিক নেতৃবৃন্দকে “শিক্ষক-মানব গড়ার” গুরুত্ব প্রচার করতে হবে।
- শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি (গৃহপরিস্থিতি, মানসিক চাপ) জানতে হলে সহযোগী সামাজিক/পরামর্শ সেবা প্রতিষ্ঠা করা।
- দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার ও মনোভাব বদল
- “শিক্ষক = দাই” চিন্তা থেকে “শিক্ষক = গাইড, সহযাত্রী” ধারণায় পরিবর্তন।
- শ্রদ্ধা, আস্থা ও পারস্পরিক মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।
- শিক্ষা সংস্কৃতি পরিবর্তন: প্রতিযোগিতা, রেজাল্ট-মুখী শিক্ষা থেকে সুষম ও মানববান্ধব শিক্ষা।
নতুন রূপালী আশার আহ্বান
আপনি যে তীর্যক অভিযোগ করেছেন — “শিক্ষকরা মানুষ গড়তে পারেনি, তারা কেবল স্মার্ট মাংসপিণ্ড তৈরি করেছে” — তা অত্যন্ত প্ররোচক। তবে এই অভিযোগকে আমরা একদম খারিজও করতে পারি না। অনেক নিম্নমান, অবিচার, অপব্যবহার শিক্ষাক্ষেত্রে আছে — যা অগ্রণীয়, ব্যর্থতা ও ব্যাথার চিহ্ন। তবে সম্পূর্ণভাবে “শিক্ষকরা ব্যর্থ” — এমন দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো একপাশে অতিরঞ্জিত। সত্যি কথা হলো — শিক্ষকের কর্তব্য, সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ একসাথে। বিকৃত পরিবেশ, সামাজিক অবমূল্যায়ন, প্রশাসনিক দুর্বলতা — এসব সব মিলেই আজকের চ্যালেঞ্জ। আমাদের দায়িত্ব হলো — সেই বিশ্বাস পুনরুজ্জীবিত করা; শিক্ষকের দিকে শুধু অভিযোগ ছুঁড়ে না দিয়ে, সক্রিয়ভাবে সমর্থন ও সংস্কার উদ্যোগ চালিয়ে দেওয়া। আমরা যদি একসাথে — রাজনীতিবিদ, প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক, ছাত্র — এই সিদ্ধান্ত নই যে “শিক্ষকরা ফেলেছে, তাই সব শিক্ষা ব্যর্থ” — বরং বলি, “আসুন শিক্ষাকে ফেরি সুন্দর, মানবিক ও আদর্শমুখী পথে” — তাহলে ভবিষ্যতে “শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর” এই স্বপ্নটি আবার শোষণ করা সম্ভব।
লেখক
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।