পারিবারিক শিক্ষা, মাদকাসক্তি, পরকীয়া, পারিবারিক বিরোধ ও জমি-জমা সংক্রান্ত বিবাদের জেরে মতলব উত্তরে সন্তানদের হাতে বাবা-মা নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে একাধিক নৃশংস ঘটনার পর এলাকাবাসী ও সুশীল সমাজ এটিকে “সামাজিক অবক্ষয়” হিসেবে আখ্যায়িত করে কঠোর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে ১২ আগস্ট ছেংগারচর পৌরসভার জোরখালী গ্রামে। মাদক কেনার জন্য টাকা না পেয়ে বাবা-মাকে পিটিয়ে জখম করেছে মো. আকাশ (২২)।
এ ঘটনায় বড় বোন ফাতেমা আক্তার বাদী হয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
এর আগে, ১০ আগস্ট ফরাজীকান্দি ইউনিয়নের দক্ষিণ রামদাসপুরে পারিবারিক বিরোধের জেরে পুত্রবধূর লাঠিসোটা ও ইটের আঘাতে গুরুতর আহত হন শ্বশুর আব্দুল বারেক বেপারী (৬৫)। আহত শ্বশুর নিজেই বাদী হয়ে পুত্রবধূর বিরুদ্ধে মামলা করেন।
একই দিনে সুলতানাবাদ ইউনিয়নের বিনন্দপুর গ্রামে ছেলে শাহ আলম ও তার স্ত্রী শরিয়ত বেগম মিলে মা আয়েশা বেগমকে মারধর করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। মা আয়েশা বেগম বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
এছাড়া, বাগানবাড়ি ইউনিয়নের গালীম খা গ্রামে ছেলে ইউছুফ রাকিব খান (২৫) হামলা চালায় তার বাবা লিটন খান (৫৫)-এর উপর। এ ঘটনায় পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ইউছুফ রাকিব খানকে আটক করে।
স্থানীয়রা বলছেন, মাদকাসক্তি, মোবাইলে অবৈধ সম্পর্ক, জমি-বাড়ি সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব ও পারিবারিক কলহই এসব ঘটনার প্রধান কারণ। এসব অপরাধ এখন কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সামাজিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
এলাকাবাসী মনে করছেন, সময় থাকতে যদি এসব অপরাধ দমন না করা যায়, তবে পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক শান্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জীবগাঁও জেনারেল হক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আলী হোসেন বলেন, পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক বন্ধনের অবক্ষয়ের কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম চালু করতে হবে।
মতলব উত্তর প্রেসক্লাবের সভাপতি বোরহান উদ্দিন ডালিম বলেন, এখন সময় এসেছে অভিভাবক, শিক্ষক, ইমাম ও জনপ্রতিনিধিদের একসাথে মাঠে নামার। সামাজিক আন্দোলন ছাড়া এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব।
মতলব উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রবিউল হক হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বাবা-মা বা বয়োজ্যেষ্ঠদের নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কঠোর অবস্থানে আছে। কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে আইনগত ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি সামাজিক পুনর্বাসন ও পারিবারিক কাউন্সেলিং কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।
চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব পিপিএম বলেন, গত দুই দিনে মতলব উত্তর উপজেলায় বাবা-মা বা অভিভাবকদের উপর সন্তানের হামলার চারটি নিন্দনীয় ঘটনা ঘটেছে। বিষয়গুলো আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছি এবং প্রতিটি ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সমাজে এ ধরনের অমানবিক আচরণ বন্ধে পুলিশ সর্বোচ্চ কঠোরতা অবলম্বন করবে।