চট্টগ্রাম নগরীতে খাদ্যপণ্যের মান যাচাই, ভেজাল শনাক্ত এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্য পরীক্ষাগার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরীক্ষাগারটি কার্যকর হলে বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের গুণগত মান পরীক্ষা এবং ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত বাজার তদারকির পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক নগরী। নগরীর বাজার, সুপারশপ, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং বিভিন্ন খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায়। এসব খাদ্যপণ্যের মান যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মাছ, মাংস, দুধ, মসলা, ভোজ্যতেল, ফলমূল ও প্রক্রিয়াজাত খাবারে ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভেজাল কিংবা জীবাণুর উপস্থিতি শনাক্ত করা জরুরি।
খাদ্যে ভেজাল বা অনিরাপদ উপাদান ব্যবহারের কারণে মানুষের শরীরে তাৎক্ষণিক অসুস্থতা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যের বাহ্যিক রং, গন্ধ কিংবা স্বাভাবিক চেহারা দেখে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি বোঝা সম্ভব হয় না। এ কারণে পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে খাদ্যের প্রকৃত মান নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে পরীক্ষা করা গেলে অনিয়ম শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
তবে পরীক্ষাগার চালুর উদ্যোগ বাস্তব সুফল দিতে হলে এর কার্যক্রম নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হবে। পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নিয়োগ, আধুনিক পরীক্ষার সরঞ্জাম স্থাপন, মানসম্মত রাসায়নিক উপকরণ সরবরাহ এবং যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ এবং পরীক্ষার ফল নির্ভরযোগ্য রাখতে মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বাজার তদারকির সঙ্গে পরীক্ষাগারের সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর উপাদান বা ভেজাল শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করা হলে ভোক্তারা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে পরীক্ষার ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা ও যথাযথ যাচাই নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে ভুল তথ্যের কারণে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রির প্রতিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি এবং অনুমোদনহীন রাসায়নিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিদর্শন এবং ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, চট্টগ্রামে নিরাপদ খাদ্য পরীক্ষাগার চালুর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব। তবে শুধু পরীক্ষাগার স্থাপন করলেই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না; এর নিয়মিত কার্যক্রম, স্বচ্ছতা, দ্রুত পরীক্ষার ফল প্রকাশ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়িত হলে ভোক্তাদের আস্থা বাড়বে এবং নগরীতে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের পরিবেশ আরও শক্তিশালী হতে পারে।