October 29, 2026, 8:33 pm
শিরোনামঃ
জিনা, ব্যভিচার ও সমকামিতা সম্পর্কে পবিত্র কোরআন কী বলে? আজম-মামুন-সুজন : এক বাল্য বন্ধনের গল্প প্রথম টেস্টে মুশফিকুর রহিমকে ছাড়াই ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে লাঞ্চে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৯৬/২ চট্টগ্রামে বাসে তল্লাশি, বিপুল ইয়াবাসহ একজন গ্রেপ্তার চাঁদপুরে নৌ পুলিশের অভিযানে ৪০ জেলে আটক, ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা ঘূর্ণিঝড় ‘আর্নব’ ভারতের অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম, বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত ইন্দোনেশিয়ায় বনাঞ্চলের আগুন নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ইরানের কাছে যুদ্ধ অবসানের নতুন প্রস্তাব, তেহরানের বক্তব্য—ধারণাগুলো গ্রহণযোগ্য নয় ইসরায়েলের নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, সরকার গঠনে অনিশ্চয়তা

আজম-মামুন-সুজন : এক বাল্য বন্ধনের গল্প

Reporter Name

একটা সময় ছিল, যখন জীবনের সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল সকালে ঘুম থেকে উঠে কখন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে। দুপুরের রোদ, বিকেলের মাঠ, পুকুরের ঠান্ডা পানি, গাছের ডাল, কাঁচা রাস্তা, বৃষ্টিভেজা বিকেল কিংবা শীতের কুয়াশা—সবকিছুই তখন আনন্দের অংশ ছিল। তখন ছিল না মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ব্যস্ততার অজুহাত। ছিল শুধু মানুষ, সম্পর্ক আর অগণিত স্মৃতি। সেই স্মৃতিগুলোর মধ্যে কিছু মানুষ এমনভাবে হৃদয়ের ভেতর জায়গা করে নেয়, যাদের সঙ্গে সময়ের দূরত্ব তৈরি হলেও হৃদয়ের দূরত্ব কখনো তৈরি হয় না।

আমার জীবনেও এমন দুটি নাম আছে—মামুন এবং সুজন। তারা শুধু আমার বন্ধু নয়; তারা আমার শৈশবের সবচেয়ে উজ্জ্বল দুটি অধ্যায়। সম্পর্কে তারা আমার চাচা হলেও বয়সের কাছাকাছি হওয়ার কারণে কখনো সেই সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়নি। বরং আমরা ছিলাম তিনজন তিন বন্ধুর মতো। আজও যখন অতীতের জানালাটা খুলে বসি, তখন অসংখ্য স্মৃতির ভিড়ে সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে আমাদের তিনজনের ছুটে বেড়ানো দিনগুলোর। আজ আমরা তিনজন তিন জায়গায়। জীবন আমাদের তিনটি ভিন্ন পথে নিয়ে গেছে। কিন্তু শৈশবের সেই পথটি এখনো একই রয়ে গেছে। সেখানে এখনো তিনটি ছোট্ট ছেলের হাসি ভেসে আসে।

আমাদের সকাল শুরু হতো একে অপরকে ডাকাডাকি দিয়ে। সূর্য ওঠার কিছুক্ষণ পরই হয়তো একজন আরেকজনের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতাম—”চল, বের হই।” সেই ডাকেই দিনের শুরু। কোনো দিন খেলতে, কোনো দিন স্কুলে, কোনো দিন আবার কোনো কারণ ছাড়াই গ্রামের এপাড়া-ওপাড়া ঘুরে বেড়ানো। সেই সময় পৃথিবীটা যেন অনেক ছোট ছিল, কিন্তু আনন্দটা ছিল অনেক বড়। তখন একটি বল, একটি লাঠি, কয়েকটি ইট কিংবা একটি গাছই আমাদের কাছে ছিল সবচেয়ে বড় বিনোদন। আধুনিক খেলনা ছিল না, কিন্তু কল্পনার অভাবও ছিল না।

স্কুলে যাওয়ার স্মৃতিগুলো আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। আমরা একসঙ্গে স্কুলে যেতাম, একসঙ্গে ফিরতাম। পথে কত গল্প, কত হাসাহাসি, কত পরিকল্পনা! কোনো দিন বই হাতে হাঁটছি, আবার কোনো দিন স্কুলে পৌঁছানোর আগেই ঠিক করে ফেলেছি বিকেলে কোন মাঠে খেলব। ক্লাসে শিক্ষক যখন পড়াতেন, তখনও আমাদের চোখে-মুখে থাকত বিকেলের খেলার স্বপ্ন। ছুটির ঘণ্টা বাজতেই মনে হতো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা পেয়ে গেছি। আমাদের গ্রামের পুকুরগুলো ছিল আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি। গরমের দুপুরে কিংবা ছুটির দিনে আমরা তিনজন একসঙ্গে পুকুরে নেমে যেতাম। কতবার যে ডুব দিয়েছি, তার হিসাব নেই। কে বেশি সময় পানির নিচে থাকতে পারে, কে আগে ওপারে পৌঁছাবে—এসব নিয়ে ছোট্ট ছোট্ট প্রতিযোগিতা চলত।

আজ ভাবলে অবাক লাগে, তখন ভয় বলতে কিছুই ছিল না। গভীর পানি, উঁচু গাছ কিংবা ঝড়ো বাতাস—কিছুই আমাদের থামাতে পারত না। কারণ তখন আমরা বিশ্বাস করতাম, আমরা একসঙ্গে আছি।

গাছে ওঠা ছিল আমাদের আরেকটি প্রিয় কাজ। গ্রামের বড় বড় আমগাছ, কাঁঠালগাছ, জামগাছ কিংবা অন্য যেকোনো গাছই আমাদের কাছে ছিল খেলার জায়গা। কখনো ডাল থেকে ডালে ঝুলে থাকা, কখনো ফল পাড়া, কখনো আবার শুধু ওপরে উঠে চারপাশ দেখা—এসবই ছিল আনন্দের অংশ। কখনো কোনো দুষ্টুমি করে ধরা পড়েছি, কখনো বকা খেয়েছি, কখনো আবার একে অপরকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যাও বলেছি। সেই ছোট্ট বয়সে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা আমরা বই পড়ে শিখিনি; শিখেছি একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে।

শৈশবের বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সেখানে কোনো স্বার্থ থাকে না। কে ধনী, কে গরিব, কে বড়, কে ছোট—এসব কোনো বিষয়ই ছিল না। ছিল শুধু একসঙ্গে থাকা। আজকের মতো তখন কেউ ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিত না। অথচ সবচেয়ে সুন্দর ছবিগুলো ঠিকই তৈরি হয়েছিল—ক্যামেরায় নয়, স্মৃতির ভেতরে। সময়ের সঙ্গে মানুষের নামও বদলে যায়। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। পরে সার্টিফিকেট অনুযায়ী মামুন ও সুজনের নাম পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে তারা এখনো সেই আগের মানুষ। নাম বদলেছে, কিন্তু পরিচয় বদলায়নি। সময়ের নিয়মেই মানুষ বড় হয়। পড়াশোনা শেষ হয়। দায়িত্ব বাড়ে। জীবনের গন্তব্য বদলে যায়।

আজ সুজন ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ব্যস্ত শহরের কোলাহলের মধ্যে সে নিজের দায়িত্ব পালন করছে।

মামুন অনেক দূরে, সৌদি আরবে। বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। দেশের বাইরে থেকেও সে হয়তো মাঝেমধ্যে গ্রামের সেই ছোট্ট দিনগুলোর কথা মনে করে।

আর আমি, আজম—কলমকে সঙ্গী করে লেখালেখির জগতে পথ চলছি। গল্প লিখি, উপন্যাস লিখি, প্রবন্ধ লিখি। কিন্তু যত গল্পই লিখি না কেন, নিজের জীবনের এই গল্পটির মতো নির্মল গল্প আর খুব কমই পাওয়া যায়।

জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যগুলোর একটি হলো—সময় কখনো থেমে থাকে না। যে তিনটি ছেলে একসময় সারাদিন একসঙ্গে কাটাত, আজ তারা তিনটি ভিন্ন জায়গায়, ভিন্ন দায়িত্বে, ভিন্ন বাস্তবতায়। তবুও দূরত্ব বন্ধুত্বকে মুছে দিতে পারেনি।

আজও যখন কোনো পুরোনো জায়গায় যাই, মনে হয় এখানেই তো আমরা দৌড়াতাম। এই পুকুরেই তো ডুব দিতাম। এই গাছেই তো উঠতাম। এই মাঠেই তো বিকেল কাটত। কখনো কখনো মনে হয়, যদি একদিন আবার সেই বয়সে ফিরে যাওয়া যেত! মানুষ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু অর্জন করে—ডিগ্রি, চাকরি, অর্থ, পরিচিতি। কিন্তু শৈশবের যে সরলতা হারিয়ে যায়, সেটি আর কখনো ফিরে আসে না।

আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ সম্পর্কগুলোর একটি হলো শৈশবের বন্ধুত্ব। কারণ সেখানে অভিনয় নেই, প্রতিযোগিতা নেই, হিসাব নেই, অহংকার নেই। আজ আমরা তিনজন তিন পেশায়।

একজন প্রকৌশলী। একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী। আর একজন লেখক। পেশা আলাদা, পথ আলাদা, জীবন আলাদা—কিন্তু শিকড় একটাই। শৈশব। অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় কোনটি?

আমি কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলি—আমার শৈশব। কারণ সেই সময়ের প্রতিটি দিন ছিল মুক্ত। প্রতিটি বিকেল ছিল উৎসব। প্রতিটি বন্ধুত্ব ছিল নিঃস্বার্থ। আজকের পৃথিবীতে মানুষ সম্পর্কের আগে লাভ-লোকসানের হিসাব করে। কিন্তু আমরা তখন জানতামই না লাভ কী, লোকসান কী।

আমরা শুধু জানতাম, একসঙ্গে থাকলেই আনন্দ। জীবনে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। অনেকেই এসেছে, অনেকেই চলে গেছে। কিন্তু শৈশবের বন্ধুদের জায়গা কেউ নিতে পারেনি। আমি আজও মনে করি, মানুষ যদি জীবনে শতবার প্রতারিতও হয়, শৈশবের স্মৃতি তাকে আবারও মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়। মামুন আর সুজনের সঙ্গে আমার সম্পর্কও ঠিক তেমনই। তারা যদি শত ভুলও করে, আমার পক্ষে তাদের অপরাধী ভাবা কঠিন। কারণ আমি তাদের বিচার করি না বর্তমান দিয়ে; আমি তাদের দেখি সেই ছোট্ট ছেলেদের চোখ দিয়ে, যারা আমার সঙ্গে একই মাঠে খেলেছে, একই পুকুরে সাঁতার কেটেছে, একই রাস্তায় হেঁটেছে, একই স্বপ্ন দেখেছে। বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—বিচারের আগে স্মৃতিগুলো সামনে চলে আসে। হয়তো এ কারণেই কিছু সম্পর্ক কখনো পুরোনো হয় না। আমরা সবাই জীবনের ব্যস্ততায় আটকে যাই। ফোন করার সময় পাই না, দেখা করার সুযোগ হয় না, একসঙ্গে বসে গল্প করার অবকাশও মেলে না। তবুও কোনো একদিন যদি হঠাৎ দেখা হয়ে যায়, মনে হয় যেন গতকালই শেষবার কথা হয়েছিল। এটাই প্রকৃত বন্ধুত্ব। শৈশবের বন্ধুত্বে ক্ষমা আছে। অভিমান আছে। আবার ফিরে আসাও আছে। সময়ের কাছে হার না মানা এই সম্পর্কগুলোই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আজ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আমার জীবনের সবচেয়ে দামি স্মৃতি কী?

আমি কোনো পুরস্কারের কথা বলব না। কোনো অর্জনের কথাও বলব না। আমি বলব—মামুন আর সুজনকে নিয়ে কাটানো সেই শৈশবের দিনগুলোর কথা। সেই দিনগুলো, যখন সুখের সংজ্ঞা ছিল একটি বিকেল। বন্ধুত্বের সংজ্ঞা ছিল পাশাপাশি হাঁটা। আর জীবনের সংজ্ঞা ছিল আগামীকাল আবার দেখা হবে। হয়তো আমাদের সন্তানরা এমন শৈশব আর পাবে না। তারা প্রযুক্তির পৃথিবীতে বড় হবে। কিন্তু আমরা সৌভাগ্যবান, কারণ আমরা এমন এক সময়ে বড় হয়েছি, যখন বন্ধুত্ব ছিল মুখোমুখি, হাসি ছিল সত্যিকারের, আর সম্পর্ক ছিল নিঃস্বার্থ।

আজও আমি বিশ্বাস করি, মানুষ যত বড়ই হোক, যত দূরেই যাক, শৈশব কখনো তাকে ছেড়ে যায় না। স্মৃতির অ্যালবামের সবচেয়ে উজ্জ্বল পাতায় আজও লেখা আছে তিনটি নাম—

আজম পাটোয়ারী।

মামুন-ইমাম হোসেন।

সুজন- হাবিব উল্লাহ।

সময় আমাদের ভৌগোলিকভাবে আলাদা করেছে, পেশাগতভাবে ভিন্ন করেছে, দায়িত্বে ব্যস্ত করেছে; কিন্তু আমাদের শৈশবের বন্ধনকে ভাঙতে পারেনি। হয়তো একদিন আবার আমরা তিনজন কোনো বিকেলে গ্রামের সেই পুরোনো পথ ধরে হাঁটব। পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে হাসব। গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে বলব—”মনে আছে?” তারপর বুঝতে পারব, মানুষ আসলে বয়সে বড় হয়, কিন্তু শৈশবের বন্ধুত্ব কখনো বৃদ্ধ হয় না। এই কারণেই আমার বিশ্বাস, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো লেখা হয় না কোনো উপন্যাসে; সেগুলো লেখা থাকে মানুষের শৈশবের স্মৃতিতে। আর আমার জীবনের সেই সবচেয়ে সুন্দর গল্পের নাম—“আজম-মামুন-সুজন : এক বাল্য বন্ধনের গল্প।”

 

লেখক :

আজম পাটোয়ারী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা