October 1, 2026, 7:01 pm
শিরোনামঃ
আল-কোরআন ও হাদিসের আলোকে শহীদ কে? মা ইলিশ রক্ষা : নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি জেলেদের বাঁচানোর দায়িত্বও চাঁদপুরে মা ইলিশ ধরলে ৬ মাসের কারাদণ্ড, বাতিল হবে জেলে কার্ড মতলব উত্তরে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত দ্রব্যমূল্য : বাজার নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান কি যথেষ্ট? চাঁদপুরে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ৩৩ আ.লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা চাঁদপুরে কারেন্ট জালের বিরুদ্ধে অভিযান, ১১ জনের কারাদণ্ড পুলিশ পরিচয়ে চালককে ফ্ল্যাটে আটকে টাকা আদায়ের অভিযোগ, আটক ৪ নারী মতলব উত্তরে প্রান্তিক পেশাজীবীদের ১০ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে অনুদান ও সনদ বিতরণ বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ৬ বছর ধরে নেই চক্ষু বিশেষজ্ঞ ; দুটি পদই শূন্য, চোখের চিকিৎসায় বেসরকারি হাসপাতাল বা খুলনায় ছুটছেন রোগীরা

আল-কোরআন ও হাদিসের আলোকে শহীদ কে?

Reporter Name

শহীদ—ইসলামের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি শব্দ। একজন মুমিনের জন্য শাহাদাতের মর্যাদা এতই মহান যে, কোরআন শহীদদের সম্পর্কে বলেছে, তাদের মৃত মনে করতে নিষেধ করেছে; বরং তারা আল্লাহর কাছে জীবিত এবং রিজিকপ্রাপ্ত। কিন্তু এই মর্যাদাপূর্ণ শব্দটি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ইসলামের নিজস্ব কিছু শর্ত, নীতি ও সীমারেখা রয়েছে। কাউকে ভালোবেসে, কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক আবেগ থেকে, কোনো আন্দোলন বা সংঘাতে নিহত হলেই তাকে নিশ্চিতভাবে ‘শহীদ’ ঘোষণা করা ইসলামী দৃষ্টিতে সহজ বিষয় নয়। আবার অন্যদিকে, শহীদ বলতে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তিকেই বোঝানো হয়—এ ধারণাটিও পূর্ণাঙ্গ নয়। কোরআন ও সহীহ হাদিসে শাহাদাতের বিভিন্ন ক্ষেত্রের কথা এসেছে।

আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করি, যেখানে ধর্মীয় বিষয়ে মতামত দেওয়া অনেক সময় অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। কেউ হয়তো কোনো আলেমের ব্যাখ্যা শুনে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো লেখা পড়ে, আবার কেউ রাজনৈতিক বা দলীয় আবেগের কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে বসেন। ‘শহীদ’, ‘কাফির’, ‘মুনাফিক’, ‘জাহান্নামী’—এ ধরনের শব্দ ইসলামে অত্যন্ত গুরুতর। এগুলো কেবল আবেগের ভাষা নয়; এগুলোর সঙ্গে আকিদা, আখিরাত এবং আল্লাহর বিচারের বিষয় জড়িত।

তাই কোনো ব্যক্তি নিহত হলেই তাকে নিজের পক্ষ থেকে নিশ্চিতভাবে শহীদ ঘোষণা করার আগে আমাদের কোরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। বিশেষ করে কোনো রাজনৈতিক সংঘর্ষ, যুদ্ধ, আন্দোলন, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, সাম্প্রদায়িক সংঘাত কিংবা সামাজিক বিরোধে কেউ নিহত হলে তার মৃত্যুর কারণ, তার উদ্দেশ্য, তার নিয়ত এবং সে কোন অবস্থায় নিহত হয়েছে—এসব বিষয় বিবেচনা না করে শুধু ‘শহীদ’ শব্দটি ব্যবহার করা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আমি ইসলামের পরিপূর্ণ জ্ঞানের মানুষ নই। একজন সাধারণ মুসলমান হিসেবে কোরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের আলোকে ইসলামকে জানা, বোঝা এবং নিজের জীবনকে তার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। সেই জায়গা থেকেই এই আলোচনার উদ্দেশ্য কাউকে আঘাত করা নয়; বরং ‘শহীদ’ শব্দটির প্রকৃত ইসলামী অর্থটি বোঝার চেষ্টা করা। কারণ সত্যিকার অর্থে একজন মানুষ শহীদ হলে তার মর্যাদা মানুষের দেওয়া কোনো সনদে নির্ভর করে না; তার মর্যাদা আল্লাহর কাছে নির্ধারিত হয়।

শহীদ শব্দের ইসলামী অর্থ কী?

‘শহীদ’ শব্দটি আরবি ‘শাহাদাহ’ শব্দমূল থেকে এসেছে। সাধারণ অর্থে এর সঙ্গে সাক্ষ্য, প্রত্যক্ষ করা বা উপস্থিত থাকার ধারণা যুক্ত। ইসলামী পরিভাষায় ‘শহীদ’ বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যিনি আল্লাহর পথে বা হাদিসে বর্ণিত নির্দিষ্ট কোনো অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এবং যার জন্য শরিয়তে শাহাদাতের মর্যাদার কথা বলা হয়েছে।

কোরআনে আল্লাহ বলেন—“আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো না।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৪)

অন্য আয়াতে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—“আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের মৃত মনে করো না। বরং তারা তাদের রবের কাছে জীবিত, তাদের রিজিক দেওয়া হচ্ছে।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৬৯)

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো—কোরআন ‘আল্লাহর পথে নিহত’ হওয়ার কথা বলেছে। অর্থাৎ শুধু নিহত হওয়াই যথেষ্ট নয়; কোন পথে, কোন উদ্দেশ্যে এবং কোন অবস্থায় মৃত্যু ঘটেছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণেই ‘মৃত্যু’ এবং ‘শাহাদাত’ এক কথা নয়। প্রত্যেক শহীদ মারা যান, কিন্তু প্রত্যেক মৃত ব্যক্তি শহীদ নন। এই পার্থক্যটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

শুধু যুদ্ধে নিহত হলেই কি শহীদ?

না। কোরআন ও হাদিস একত্রে দেখলে বিষয়টি অনেক বিস্তৃত।

কোরআনে আল্লাহ বলেন—“অতএব যারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের বিনিময়ে বিক্রি করে, তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করুক। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে নিহত হয় অথবা বিজয়ী হয়, তাকে আমি মহাপুরস্কার দান করব।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৭৪)

এই আয়াতের আলোকে বোঝা যায়, আল্লাহর পথে সংগ্রাম ও যুদ্ধের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হাদিস এই বিষয়টিকে আরও পরিষ্কার করেছে। আবু মূসা আল-আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, একজন ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন—একজন যুদ্ধ করে গনিমতের জন্য, একজন নিজের খ্যাতির জন্য এবং একজন নিজের বীরত্ব দেখানোর জন্য; তাদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছে?

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন—“যে ব্যক্তি আল্লাহর কালেমা সর্বোচ্চ করার জন্য যুদ্ধ করে, সেই আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে।” (সহীহ আল-বুখারি, হাদিস ২৮১০; সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৯০৪a)

অর্থাৎ একজন ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করলেই তার যুদ্ধকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ফি সাবিলিল্লাহ’ বলা যাবে না। তার উদ্দেশ্য যদি গনিমত, খ্যাতি, বীরত্ব প্রদর্শন, গোত্রীয় অহংকার বা ব্যক্তিগত প্রতিশোধ হয়, তাহলে সেটি আল্লাহর পথে যুদ্ধের সংজ্ঞায় পড়ে না। আর এখানেই ‘নিয়ত’-এর গুরুত্ব সামনে আসে।

নিয়ত কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ইসলামে কোনো কাজের বাহ্যিক রূপের পাশাপাশি তার অন্তরের উদ্দেশ্যও গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ নামাজ পড়তে পারে, কিন্তু মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নামাজ পড়লে তার আমলের প্রকৃতি বদলে যায়। একজন মানুষ কোরআন তিলাওয়াত করতে পারে, কিন্তু মানুষের কাছে ‘কারি’ বা ‘আলেম’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা যদি তার মূল উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সেই আমলও বিপদের কারণ হতে পারে। শহীদ হওয়ার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি বিখ্যাত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন প্রথম যাদের বিচার হবে তাদের মধ্যে এমন একজনও থাকবে, যে বাহ্যিকভাবে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হয়েছিল। আল্লাহ তাকে নিজের নিয়ামত স্মরণ করিয়ে জিজ্ঞেস করবেন, সে কী করেছে। সে বলবে, আল্লাহর জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে সে শহীদ হয়েছে। তখন তাকে বলা হবে—সে সত্য বলেনি; বরং সে যুদ্ধ করেছিল যাতে তাকে বীর বলা হয়, এবং দুনিয়ায় তাকে সেই নামে ডাকা হয়েছে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হবে।

(সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৯০৫a)

এ হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। একজন মানুষ মানুষের চোখে ‘শহীদ’ হিসেবে পরিচিত হতে পারে, তার নামে স্লোগান হতে পারে, তার ছবি ব্যানারে উঠতে পারে, তার নামে প্রতিষ্ঠান হতে পারে—কিন্তু আল্লাহর কাছে তার প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হবে তার ঈমান, আমল, নিয়ত এবং কাজের সত্যতার ভিত্তিতে। মানুষ বাহ্যিক দৃশ্য দেখে; আল্লাহ অন্তর দেখেন।

কুযমানের ঘটনা আমাদের কী শিক্ষা দেয়?

উহুদের যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত কুযমানের ঘটনা ইসলামী ইতিহাসে নিয়তের গুরুত্ব বোঝাতে আলোচিত হয়। সে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল এবং সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছিল। বাহ্যিকভাবে তাকে দেখে অনেকে মনে করতে পারে, সে নিশ্চয়ই বড় মুজাহিদ। কিন্তু বর্ণনাগুলোতে তার নিজের বক্তব্যে বোঝা যায়, তার উদ্দেশ্যের মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি ছিল না; সে নিজের সম্প্রদায়ের মর্যাদা ও স্বার্থের জন্য যুদ্ধ করেছিল। পরবর্তীতে সে আত্মহত্যা করে।

সহীহ বুখারিতে খায়বারের একটি ঘটনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে একজন ব্যক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে অসাধারণ সাহস দেখাচ্ছিল। সাহাবিরা তার প্রশংসা করছিলেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সাঃ) জানিয়ে দেন যে সে জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত। পরে দেখা যায়, গুরুতর আহত হওয়ার পর সে আত্মহত্যা করে। (সহীহ আল-বুখারি, হাদিস ৪২০২)

এখানে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—বাহ্যিক বীরত্ব এবং আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য শাহাদাত এক বিষয় নয়।

শহীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর একটি—আল্লাহর জন্য হওয়া

রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার—“যে ব্যক্তি আল্লাহর কালেমা সর্বোচ্চ করার জন্য যুদ্ধ করে, সেই আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে।” (সহীহ আল-বুখারি, ২৮১০; সহীহ মুসলিম, ১৯০৪a)

আরেক বর্ণনায় যখন রাগ, গোত্রীয় অহংকার বা পক্ষপাতিত্বের কারণে যুদ্ধ করার কথা জিজ্ঞেস করা হয়, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) একই মূলনীতি জানিয়েছেন—আল্লাহর কালেমা সর্বোচ্চ করার উদ্দেশ্যই আল্লাহর পথে যুদ্ধের মানদণ্ড। (সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৯০৪d)

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে। ইসলামে ‘আল্লাহর পথে’ কথাটিকে কোনো ব্যক্তি, দল বা রাজনৈতিক সংগঠনের নিজস্ব স্লোগানের সঙ্গে এক করে ফেলা ঠিক নয়। কোনো দল নিজেদের উদ্দেশ্যকে ‘ইসলামের উদ্দেশ্য’ বলে ঘোষণা করলেই তাদের প্রত্যেক যুদ্ধ বা সংঘাত শরিয়তসম্মত হয়ে যায় না। একইভাবে কোনো রাষ্ট্রীয় পতাকা, জাতীয় পরিচয় বা দেশের প্রতিরক্ষায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শহীদ বলা যাবে না—আবার শুধু জাতীয় পরিচয় বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল বলে তার শাহাদাতের সম্ভাবনাকেও এক কথায় অস্বীকার করা যাবে না। কারণ ইসলামী হাদিসে জীবন, পরিবার, সম্পদ ও ধর্ম রক্ষায় নিহত ব্যক্তিকেও শহীদ বলা হয়েছে। এই জায়গায় আবেগের পরিবর্তে কোরআন-সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ নীতিকে দেখতে হবে। নিজের জীবন, পরিবার ও সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হলে?

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন—“যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহীদ। যে ব্যক্তি নিজের পরিবার রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহীদ। যে ব্যক্তি নিজের রক্ত বা জীবন রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহীদ। যে ব্যক্তি নিজের দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহীদ।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৭৭২)

এই হাদিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি আমাদের প্রচলিত ধারণাকে অনেক বিস্তৃত করে দেয়। অর্থাৎ শহীদ হওয়া শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো ব্যক্তি নিজের জীবন, পরিবার, সম্পদ কিংবা দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে অন্যায়ের হাতে নিহত হলেও হাদিসে তার জন্য শহীদের মর্যাদার কথা এসেছে। সুতরাং ‘জাতীয় পতাকার নিচে ছিল কি না’, ‘সামরিক পোশাক পরেছিল কি না’, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে ছিল কি না’—শুধু এসব বাহ্যিক প্রশ্ন দিয়ে শহীদ হওয়ার পুরো বিষয়টি নির্ধারণ করা যায় না।

রোগ, দুর্ঘটনা ও অন্যান্য মৃত্যুতেও শহীদের মর্যাদা আছে

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) শহীদের শ্রেণি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। একাধিক হাদিসে এসেছে—প্লেগে মৃত ব্যক্তি, পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি, পেটের বিশেষ রোগে মৃত ব্যক্তি, আগুনে পুড়ে মৃত ব্যক্তি, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি এবং গর্ভাবস্থা বা প্রসবজনিত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী নারী শহীদের মর্যাদা লাভ করতে পারেন। (সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিমে বিভিন্ন বর্ণনা; উদাহরণ: মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস ১৫৬১-এ সংকলিত বর্ণনা)

অতএব, ‘শহীদ মানেই যুদ্ধে নিহত’—এ ধারণা কোরআন-সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। শহীদের মর্যাদা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। তাহলে কি প্রত্যেক নিহত মানুষকে শহীদ বলা যাবে? এখানে অত্যন্ত সতর্ক হওয়া দরকার। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে ‘তিনি আল্লাহর কাছে অবশ্যই শহীদ’—এ কথা বলা সহজ নয়, যদি কোরআন বা সহীহ সুন্নাহতে তার ব্যাপারে নির্দিষ্ট সাক্ষ্য না থাকে। কারণ মানুষের বাহ্যিক অবস্থা আমরা জানি; অন্তরের প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ জানেন। কেউ সাহসী ছিল কি না আমরা দেখতে পারি। কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল কি না আমরা জানতে পারি। কেউ নিরপরাধ অবস্থায় নিহত হয়েছে কি না আমরা জানতে পারি। কিন্তু তার অন্তরের চূড়ান্ত নিয়ত, ঈমানের প্রকৃতি এবং আল্লাহর কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর। এই কারণে ইসলামী ভাষায় কোনো ব্যক্তির জন্য ‘শহীদ’ শব্দ ব্যবহারে অনেক আলেম সতর্কতা অবলম্বন করেন। বলা যেতে পারে—‘আমরা আশা করি আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদা দান করুন’, অথবা ‘হাদিসের বর্ণিত অমুক শ্রেণির মধ্যে তার মৃত্যু পড়তে পারে।’ কিন্তু নিজের পক্ষ থেকে আল্লাহর চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করার মতো নিশ্চয়তা প্রকাশ করা উচিত নয়। এটি শুধু ভাষার সতর্কতা নয়; এটি আকিদাগত বিনয়ও। জালেমের বিরুদ্ধে সত্য বলা কি ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ? অবশ্যই।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে এসেছে—“জালেম শাসকের সামনে ন্যায়সঙ্গত কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদের অন্তর্ভুক্ত।” (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ২১৭৪; সুনান আবু দাউদ, ৪৩৪৪)

অন্য বর্ণনায় ‘জালেম শাসকের সামনে সত্য কথা’ বলাকে সর্বোত্তম জিহাদ বলা হয়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য বলা এবং অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা এক বিষয় নয়। ইসলামে জুলুমের প্রতিবাদ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রতিবাদের পদ্ধতি, ন্যায়বিচার, সীমা এবং নিরপরাধ মানুষের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কোনো জালেমের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলতে গিয়ে নিহত হলে তার জন্য মহান প্রতিদানের আশা করা যায়। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিশ্চিতভাবে ‘শহীদ’ ঘোষণা করার আগে তার অবস্থা ও নিয়ত সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত।

মুসলমানদের পারস্পরিক সংঘর্ষের ক্ষেত্রে কী হবে?

এখানে আপনার দেওয়া সূরা আল-হুজুরাতের ৯ নম্বর আয়াতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহ বলেন—“আর যদি মুমিনদের দুই দল পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর বাড়াবাড়ি করে, তবে যে দল বাড়াবাড়ি করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। অতঃপর যদি তারা ফিরে আসে, তবে তাদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে মীমাংসা করে দাও এবং ইনসাফ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন।” (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:৯)

এ আয়াত থেকে একটি মৌলিক নীতি পাওয়া যায়—মুমিনদের মধ্যে সংঘর্ষ হলে প্রথম দায়িত্ব হলো মীমাংসা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ মুসলমান বনাম মুসলমান সংঘর্ষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘দ্বীনের যুদ্ধ’ বলে দেওয়া যায় না। বরং কোরআন এমন সংঘর্ষের ক্ষেত্রেও ন্যায়, মীমাংসা এবং সীমালঙ্ঘনকারী পক্ষকে থামানোর নির্দেশ দিয়েছে। তাই কোনো রাজনৈতিক সংঘর্ষে কেউ মারা গেলেই তাকে ‘ইসলামের জন্য শহীদ’ বলে ঘোষণা করা কোরআনের এই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—তা আলাদাভাবে বিচার করতে হবে।

জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম এবং শাহাদাত—বিষয়টি কীভাবে বুঝব?

এখানে খুব সূক্ষ্ম একটি বিষয় আছে। বলা হয়েছে—যারা ইসলামের পতাকা ও আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে তারাই প্রকৃত শহীদ, আর যারা জাতীয় পতাকা বা মানব-প্রণীত সংবিধানের জন্য লড়াই করে তারা কীভাবে শহীদ হবে? এই বক্তব্যটি সরলীকৃত। কোরআন ও হাদিসের সামগ্রিক আলোকে বিষয়টি আরও সতর্কভাবে বলা প্রয়োজন।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—কেউ রাগের কারণে, কেউ গোত্রীয় অহংকারের কারণে এবং কেউ অন্য উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করলে কোনটি আল্লাহর পথে?—তিনি উদ্দেশ্যকে আল্লাহর জন্য হওয়া দিয়ে বিচার করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি নিজের জীবন, পরিবার, সম্পদ ও দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে নিহত ব্যক্তিকে শহীদ বলেছেন। অতএব একজন মুসলমান তার দেশ, পরিবার, জীবন ও সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে অন্যায়ের হাতে নিহত হলে কেবল সে ‘জাতীয় পরিচয়’ বহন করেছিল বলে তাকে শহীদ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। আবার অন্যদিকে, শুধু ‘দেশের জন্য’ বা ‘জাতীয় গৌরবের জন্য’ যুদ্ধ করেছি বললেই আল্লাহর পথে যুদ্ধের মর্যাদা নিশ্চিত হয়ে যায় না। এখানে নিয়ত, কাজের বৈধতা এবং পরিস্থিতি—সবকিছু বিবেচ্য। কেউ যদি মানুষের প্রশংসা, ক্ষমতা, প্রতিশোধ, দলীয় স্বার্থ বা ব্যক্তিগত খ্যাতির জন্য জীবন দেয়, তাহলে তার বাহ্যিক বীরত্ব তাকে আল্লাহর কাছে শহীদ বানিয়ে দেবে—এমন কোনো সাধারণ নীতি হাদিসে নেই। আবার কেউ যদি নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষা, নিজের পরিবার রক্ষা, নিজের জীবন রক্ষা কিংবা দ্বীনের ওপর জুলুম প্রতিহত করতে গিয়ে নিহত হয়, তাহলে তার জন্য হাদিসে শহীদের মর্যাদার সুসংবাদ রয়েছে। সুতরাং ইসলামী সিদ্ধান্তকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক স্লোগান বা পতাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা ঠিক হবে না।

‘শহীদ’ এবং ‘শহীদের মর্যাদা’—দুটি বিষয় বুঝতে হবে

ইসলামী ফিকহে শহীদের আলোচনা করতে গিয়ে আলেমরা সাধারণত বিভিন্ন শ্রেণির কথা উল্লেখ করেন। যেমন—যিনি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হন, তার একটি বিশেষ বিধান রয়েছে। আবার যারা রোগ, দুর্ঘটনা বা অন্য নির্দিষ্ট কারণে মৃত্যুবরণ করেন এবং হাদিসে যাদের শহীদ বলা হয়েছে, তাদের মর্যাদা আখিরাতের দিক থেকে শহীদের হলেও দাফন-কাফনের বিধান যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত শহীদের মতো একই নয়—ফিকহের আলোচনায় এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ‘শহীদ’ শব্দটির ব্যবহার শুধু একটি আবেগীয় সম্মানসূচক শব্দ নয়; এর সঙ্গে শরিয়তের বিধানও সম্পর্কিত। তাই একজন মানুষ মারা গেলেই তার পরিবার বা রাজনৈতিক পক্ষ তাকে শহীদ ঘোষণা করল—এতে ইসলামী অর্থে তার অবস্থান চূড়ান্ত হয়ে যায় না।

শহীদ হওয়ার ক্ষেত্রে ইখলাসের গুরুত্ব

আল্লাহর জন্য কাজ করা ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর সেই হাদিস—যেখানে যুদ্ধকারী ব্যক্তি, আলেম ও কোরআন পাঠকারী ব্যক্তি এবং দানশীল ব্যক্তির নিয়ত পরীক্ষা করা হবে—আমাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা। একজন মানুষ যুদ্ধ করতে পারে, কিন্তু খ্যাতির জন্য। একজন মানুষ কোরআন শিখতে পারে, কিন্তু মানুষের কাছে আলেম হওয়ার জন্য। একজন মানুষ দান করতে পারে, কিন্তু মানুষ তাকে দানশীল বলুক—এই আকাঙ্ক্ষায়। বাহ্যিকভাবে তিনজনের কাজই ভালো মনে হতে পারে। কিন্তু আল্লাহর কাছে নিয়তই তাদের পরিণতি বদলে দিতে পারে। এ কারণেই শাহাদাতের আলোচনা করতে গিয়ে শুধু ‘সে কীভাবে মারা গেল’ প্রশ্ন করলে হবে না; বরং ‘সে কেন সেই অবস্থায় ছিল’, ‘তার উদ্দেশ্য কী ছিল’, ‘সে কী রক্ষা করতে চেয়েছিল’, ‘সে কী করছিল’, ‘তার অবস্থান কি ন্যায়সঙ্গত ছিল’—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

‘আল্লাহর পথে’ মানে কি শুধু যুদ্ধ?

না।

কোরআন-হাদিসের বৃহত্তর শিক্ষা হলো—আল্লাহর আনুগত্য, ন্যায়, সত্য, জুলুম প্রতিরোধ, দ্বীন রক্ষা, জীবন রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বৈধ পথে চেষ্টা করা। কোনো অন্যায় কাজকে ‘জিহাদ’ নাম দিলেই তা জিহাদ হয়ে যায় না। কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনকে ‘ইসলামী আন্দোলন’ বলা হলেই তার প্রতিটি কর্মকাণ্ড শরিয়তসম্মত হয়ে যায় না। আবার কোনো রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হলেই একজন মুসলমানের ন্যায়সঙ্গত আত্মরক্ষা ইসলামের বাইরে চলে যায় না। ইসলামের বিচারনীতি কোনো দলের পরিচয়ের ওপর নয়; ন্যায় ও অন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

আল্লাহ বলেন—“কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।” (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৮)

এই আয়াতটি ‘শহীদ’ প্রসঙ্গেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা যদি কোনো ব্যক্তিকে পছন্দ করি, তাহলে তাকে শহীদ বলব; আর অপছন্দ করি, তাহলে তার শাহাদাত অস্বীকার করব—এটা ইসলামের ন্যায়বিচারের নীতি নয়।

কারও রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে তার শাহাদাত নির্ধারণ করা ঠিক নয়

একজন ব্যক্তি কোনো দলের সমর্থক হতে পারেন, কোনো দলের কর্মী হতে পারেন, আবার কোনো দলবিরোধীও হতে পারেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর ‘তিনি শহীদ কি না’—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু তার রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে দেওয়া যাবে না। একইভাবে কোনো ব্যক্তি কোনো জাতীয় আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন বলে তিনি নিশ্চিত শহীদ—এমন সিদ্ধান্তও শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে দেওয়া যাবে না। ইসলামী বিচার আরও গভীর।

তার ঈমান কেমন ছিল?

তার উদ্দেশ্য কী ছিল?

সে কোন কাজ করছিল?

কাকে প্রতিহত করছিল?

সে কি নিজের জীবন, পরিবার, সম্পদ বা দ্বীন রক্ষা করছিল?

তার মৃত্যু কি হাদিসে বর্ণিত কোনো শহীদের শ্রেণির সঙ্গে মিলে?

সে কি অন্যায় আক্রমণের শিকার হয়েছিল?

তার মৃত্যুর সঙ্গে কি কোনো বৈধ আত্মরক্ষা বা ন্যায়সঙ্গত প্রতিরোধ যুক্ত ছিল?

এসব বিষয় বিবেচনা করতে হয়।

শহীদ ঘোষণা করার ক্ষেত্রে মানুষের সীমাবদ্ধতা

মানুষের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো—আমরা অন্তর দেখতে পাই না। একজন মানুষ সারা জীবন ভালো কাজ করেছে—তবুও তার শেষ মুহূর্তের নিয়ত সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ জানি না। আবার একজন মানুষকে আমরা খুব সাধারণ বলে মনে করেছি—আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে আল্লাহর চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করার ভাষা থেকে বিরত থাকা উত্তম। বরং বলা যেতে পারে—“আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদা দান করুন।”

অথবা—“আমরা আশা করি, আল্লাহ তাকে শহীদদের অন্তর্ভুক্ত করবেন।”

এতে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া হয়, আবার আল্লাহর বিচারের জায়গায় মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় না।

শহীদ হওয়ার দাবির সঙ্গে আত্মহত্যার কোনো সম্পর্ক নেই

কোনো ব্যক্তি যুদ্ধ বা সংঘর্ষে অংশ নিয়ে পরে নিজের হাতে নিজের জীবন শেষ করলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শাহাদাত নয়। বরং আত্মহত্যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। খায়বারের ঘটনায় আমরা দেখেছি, একজন ব্যক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে অসাধারণ সাহস দেখালেও শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছিল এবং রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাকে জাহান্নামের লোক বলে উল্লেখ করেছিলেন। (সহীহ আল-বুখারি, ৪২০২)

এখানে বাহ্যিক সাহসের চেয়ে আল্লাহর বিধান ও নিয়তের গুরুত্ব আবারও স্পষ্ট হয়।

শহীদ হওয়ার দাবিতে আবেগ নয়, দলিল প্রয়োজন

আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়—কোনো ব্যক্তি সংঘর্ষে মারা গেলে তার অনুসারীরা তাকে শহীদ বলে ঘোষণা করে। অন্য পক্ষ আবার তাকে অপরাধী বা জাহান্নামী বলে ঘোষণা করে। দুটিই বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ একটি পক্ষ হয়তো আবেগের কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাতের সনদ দিয়ে দিচ্ছে, আর অন্য পক্ষ হয়তো বিদ্বেষের কারণে জাহান্নামের সনদ দিয়ে দিচ্ছে। মুমিনের দায়িত্ব হলো ন্যায়বিচার করা। আল্লাহ বলেছেন—“তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।” (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৮)

অতএব কোনো নিহত মানুষের ব্যাপারে সত্য অনুসন্ধান করতে হলে আমাদের আবেগ নয়, কোরআন-সুন্নাহর নীতিই সামনে রাখতে হবে।

শহীদের মর্যাদা অত্যন্ত মহান

এত সতর্কতার কথা বলার অর্থ এই নয় যে শহীদের মর্যাদা ছোট। বরং এর বিপরীতটাই সত্য।

আল্লাহর পথে নিহত ব্যক্তির মর্যাদা কোরআনে অত্যন্ত উচ্চভাবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাদের মৃত বলতে নিষেধ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে তারা তাঁর কাছে জীবিত ও রিজিকপ্রাপ্ত। (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৪; সূরা আলে ইমরান, ৩:১৬৯)

সুতরাং ‘শহীদ’ শব্দটি এমন একটি মর্যাদার প্রতীক, যা হেলাফেলা করে ব্যবহার করা উচিত নয়। যে শব্দ আল্লাহ কোরআনে এত সম্মানের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন, সেটিকে দলীয় প্রচারণা, রাজনৈতিক আবেগ, সামাজিক প্রতিযোগিতা কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের হাতিয়ার বানানো উচিত নয়।

তাহলে ইসলামী নিয়মে শহীদ কে?

কোরআন ও সহীহ হাদিস একত্রে বিবেচনা করলে সংক্ষেপে বলা যায়—শহীদ হলেন সেই মুমিন, যিনি আল্লাহর পথে বৈধভাবে সংগ্রাম করতে গিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিহত হন; এবং হাদিসে যাদের নির্দিষ্ট মৃত্যুকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে—যেমন নিজের দ্বীন, জীবন, পরিবার বা সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত ব্যক্তি, অথবা নির্দিষ্ট কিছু রোগ ও দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি—তারাও শহীদের মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিশ্চিতভাবে ‘আল্লাহর কাছে শহীদ’ ঘোষণা করার অধিকার মানুষের সীমিত। কোরআন-হাদিসে যাদের ব্যাপারে নির্দিষ্ট সাক্ষ্য আছে, তাদের বিষয় আলাদা। অন্যদের ক্ষেত্রে দোয়া ও আশা প্রকাশের ভাষা অধিক সতর্ক। আর যুদ্ধের ক্ষেত্রে নিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) স্পষ্ট করেছেন—খ্যাতি, গনিমত, বীরত্ব বা গোত্রীয় অহংকারের জন্য যুদ্ধ করা আল্লাহর পথে যুদ্ধ নয়; আল্লাহর কালেমাকে সর্বোচ্চ করার উদ্দেশ্যই আল্লাহর পথে যুদ্ধের মানদণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত। (সহীহ আল-বুখারি, ২৮১০; সহীহ মুসলিম, ১৯০৪a, ১৯০৪d)

আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা

আমাদের সমাজে ‘শহীদ’ শব্দটি যেন কোনো পক্ষের সম্পত্তি না হয়ে যায়।

কেউ রাজনৈতিক দলের কর্মী বলে তিনি শহীদ—এমন নয়।

কেউ রাজনৈতিক দলের বিরোধী বলে তিনি শহীদ নন—এমনও নয়।

কেউ রাষ্ট্রের পক্ষে ছিল বলে তিনি শহীদ—এমন নয়।

কেউ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ছিল বলে তিনি শহীদ—এমনও নয়।

কেউ জাতীয় পতাকা হাতে ছিল বলে তার শাহাদাত নিশ্চিত নয়। আবার কেউ জাতীয় পতাকার অধীনে দাঁড়িয়েছিল বলে তার মৃত্যুর ক্ষেত্রে ইসলামী শহীদের সম্ভাবনা একেবারে অস্বীকারও করা যায় না। ইসলাম ব্যক্তির বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে ঈমান, নিয়ত, কাজ, ন্যায়-অন্যায় এবং মৃত্যুর পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেয়। কোনো ব্যক্তি নিজের জীবন, পরিবার, সম্পদ কিংবা দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হলে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তার জন্য শহীদের মর্যাদা ঘোষণা করেছেন। কোনো ব্যক্তি আল্লাহর পথে সত্যিকার অর্থে সংগ্রাম করতে গিয়ে নিহত হলে কোরআন তার জন্য মহাপুরস্কারের কথা বলেছে।  কোনো ব্যক্তি কেবল মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য যুদ্ধ করে নিহত হলে তার বাহ্যিক মৃত্যু তাকে আল্লাহর কাছে শহীদ বানাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং সহীহ হাদিসে এর ভয়াবহ পরিণতির কথা এসেছে। এবং কোনো মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলতে গিয়ে জীবন হারালে তার জন্য ইসলামে বিরাট মর্যাদার আশা রয়েছে; জালেম শাসকের সামনে ন্যায়সঙ্গত কথা বলাকে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মহান জিহাদের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন।

তাই ‘শহীদ’ শব্দটি উচ্চারণের আগে আমাদের একটু থামা উচিত। আমাদের জিজ্ঞেস করা উচিত—আমি কি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী কথা বলছি, নাকি নিজের পক্ষের মানুষকে সম্মানিত করার জন্য এই শব্দ ব্যবহার করছি? আমি কি সত্য বলছি, নাকি রাজনৈতিক আবেগকে ধর্মীয় সত্যের জায়গায় বসিয়ে দিচ্ছি? আমি কি একজন মৃত মানুষের জন্য দোয়া করছি, নাকি তার ব্যাপারে আল্লাহর চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করছি? এই প্রশ্নগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ একজন মৃত ব্যক্তিকে শহীদ বলতে পারে, কিন্তু তার প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারণ করেন আল্লাহ। মানুষ কোনো মৃত ব্যক্তিকে অপমান করতে পারে, কিন্তু আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা মানুষের কথায় কমে যায় না। মানুষের দায়িত্ব হলো সত্য বলা, ন্যায়বিচার করা এবং মৃতের জন্য দোয়া করা। আর আল্লাহর দায়িত্ব নয়—বরং তাঁরই অধিকার—চূড়ান্ত বিচার করা। আমরা তাই কারও মৃত্যুকে নিয়ে মিথ্যা প্রচার না করি, আবার কাউকে অযথা শহীদের সনদও না দিই। কোরআন ও সুন্নাহকে নিজেদের আবেগের অনুগত না করে নিজেদের আবেগকে কোরআন ও সুন্নাহর অনুগত করার চেষ্টা করি।

আল্লাহ আমাদের সত্যকে সত্য হিসেবে বোঝার এবং তা অনুসরণ করার তৌফিক দিন। মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে বোঝার এবং তা থেকে দূরে থাকার তৌফিক দিন। অন্যায়, জুলুম, মিথ্যা অপপ্রচার, বিদ্বেষ এবং অন্ধ দলীয় পক্ষপাত থেকে আমাদের হেফাজত করুন। যারা সত্য ও ন্যায়ের পথে জীবন দিয়েছেন, তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করার তৌফিক দিন এবং যাদের জন্য শহীদের মর্যাদা প্রযোজ্য, তাদের শহীদের মর্যাদা দান করুন। আমাদের সকল মৃত মুসলমানকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু দান করুন। আমিন।

 

তথ্যসূত্র

১. আল-কোরআন, সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৪ — আল্লাহর পথে নিহতদের মৃত না বলতে নির্দেশ এবং তাদের জীবিত থাকার ঘোষণা। (Quran)

২. আল-কোরআন, সূরা আলে ইমরান, ৩:১৬৯ — আল্লাহর পথে নিহতদের আল্লাহর কাছে জীবিত ও রিজিকপ্রাপ্ত হওয়ার ঘোষণা। (Quranic Arabic Corpus)

৩. আল-কোরআন, সূরা আন-নিসা, ৪:৭৪ — আল্লাহর পথে যুদ্ধ এবং নিহত বা বিজয়ী উভয়ের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা। (Quran)

৪. আল-কোরআন, সূরা আন-নিসা, ৪:৭৫–৭৬ — নিপীড়িতদের পক্ষে দাঁড়ানো এবং আল্লাহর পথে যুদ্ধের আলোচনা। (Quran)

৫. আল-কোরআন, সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:৯ — মুমিনদের দুই দলের সংঘর্ষে মীমাংসা, সীমালঙ্ঘনকারী পক্ষকে প্রতিহত করা এবং ন্যায়বিচারের নির্দেশ। (Quran.com)

৬. আল-কোরআন, সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৮ — কোনো পক্ষের প্রতি বিদ্বেষ যেন ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে—এই নির্দেশ। (Quran.com)

৭. সহীহ আল-বুখারি, হাদিস ২৮১০ — আল্লাহর কালেমা সর্বোচ্চ করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করাই আল্লাহর পথে যুদ্ধ। (Sunnah.com)

৮. সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৯০৪a ও ১৯০৪d — গনিমত, খ্যাতি, রাগ বা গোত্রীয় অহংকারের পরিবর্তে আল্লাহর উদ্দেশ্যে যুদ্ধের মানদণ্ড। (Sunnah.com)

৯. সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৯০৫a — লোকদেখানো উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে নিহত ব্যক্তির ভয়াবহ পরিণতি। (Sunnah.com)

১০. সহীহ আল-বুখারি, হাদিস ৪২০২ — খায়বারের ঘটনায় বাহ্যিক বীরত্ব থাকা সত্ত্বেও আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির পরিণতি। (Sunnah.com)

১১. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৭৭২ — সম্পদ, পরিবার, জীবন ও দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে নিহত ব্যক্তিকে শহীদ বলা হয়েছে। (Sunnah.com)

১২. সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৫৮০–২৫৮১ — সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত ব্যক্তির শহীদের মর্যাদা। (Sunnah.com)

১৩. জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ২১৭৪ — জালেম শাসকের সামনে ন্যায়সঙ্গত কথা বলাকে মহান জিহাদের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে। (Sunnah.com)

১৪. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৩৪৪ — জালেম শাসকের সামনে ন্যায়সঙ্গত কথা বলার মর্যাদা। (Sunnah.com)

১৫. শহীদের বিভিন্ন শ্রেণি সম্পর্কিত হাদিস — প্লেগ, পানিতে ডোবা, নির্দিষ্ট রোগ, আগুন, ধ্বংসস্তূপ এবং প্রসবজনিত মৃত্যুসহ বিভিন্ন মৃত্যুকে শহীদের মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। (Sunnah.com)

 

 

লেখক :

আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা