সূদ : আল কোরআনের কঠোর সতর্কবার্তা!
মানবসভ্যতার ইতিহাসে অর্থনীতি যেমন মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি অর্থনৈতিক শোষণও বহু সমাজকে ধ্বংস করেছে। মানুষের শ্রম, সম্পদ ও উৎপাদনের উপর অন্যায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার নানা পদ্ধতির মধ্যে সূদ বা রিবা (Riba) অন্যতম। ইসলাম সূদকে কেবল একটি অর্থনৈতিক অন্যায় হিসেবে বিবেচনা করেনি; বরং এটিকে নৈতিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক অপরাধ হিসেবেও চিহ্নিত করেছে। পবিত্র আল কোরআনে খুব কম সংখ্যক গুনাহ আছে যেগুলোর বিরুদ্ধে এত কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। শিরক, জুলুম এবং সূদ—এই কয়েকটি বিষয়ের মধ্যে সূদ এমন একটি অপরাধ, যার বিরুদ্ধে মহান আল্লাহ সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার সতর্কতা দিয়েছেন।
আজকের পৃথিবীতে সূদভিত্তিক অর্থনীতি এতটাই বিস্তৃত যে অনেক মানুষ না বুঝেই এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ঋণ, ক্রেডিট কার্ড, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং বিনিয়োগের বহু ক্ষেত্রে সূদের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে একজন মুসলমানের জন্য সূদের প্রকৃতি, কোরআনের নির্দেশনা এবং এর নৈতিক পরিণতি সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরি। আল কোরআনে সূদের বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এসেছে সূরা আল-বাকারাহতে। মহান আল্লাহ বলেন: “যারা সূদ খায়, তারা কিয়ামতের দিন এমনভাবে দাঁড়াবে, যেমন দাঁড়ায় সে ব্যক্তি, যাকে শয়তান স্পর্শ করে উন্মাদ করে দিয়েছে।”…(সূরা আল-বাকারাহ ২:২৭৫)
এই আয়াতে সূদখোরের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক অবস্থাকে অত্যন্ত ভয়াবহ ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে শুধু অর্থনৈতিক অপরাধের কথা বলা হয়নি; বরং মানুষের বিবেক, ন্যায়বোধ ও মানবিকতাকে বিকৃত করে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এরপর মহান আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সূদকে হারাম করেছেন।”…(সূরা আল-বাকারাহ ২:২৭৫)
এই আয়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে নয়। বরং বৈধ ব্যবসা, বিনিয়োগ, অংশীদারিত্ব, মুনাফা এবং উৎপাদনশীল অর্থনীতিকে উৎসাহিত করে। কিন্তু এমন আয়, যেখানে একজন ব্যক্তি কোনো ঝুঁকি ছাড়াই অন্যের প্রয়োজনকে পুঁজি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে, সেটিকে ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। আবার মহান আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ সূদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-সদকাকে বৃদ্ধি করেন।”…(সূরা আল-বাকারাহ ২:২৭৬)
এখানে একটি গভীর অর্থনৈতিক দর্শন রয়েছে। বাহ্যিকভাবে সূদ সম্পদ বৃদ্ধি করে বলে মনে হতে পারে, কিন্তু কোরআনের ভাষায় এটি বরকতহীন সম্পদ। অন্যদিকে সদকা ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি সমাজে কল্যাণ, আস্থা ও স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। সূরা আল-বাকারাহর আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে: “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সূদের যা অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা ঈমানদার হও।”…(সূরা আল-বাকারাহ ২:২৭৮)
এর পরের আয়াতটি ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তায় সবচেয়ে কঠোর সতর্কবার্তাগুলোর একটি: “যদি তোমরা তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।”…(সূরা আল-বাকারাহ ২:২৭৯)
কোরআনে খুব কম ক্ষেত্রেই এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝা যায় যে সূদ কেবল ব্যক্তিগত গুনাহ নয়; এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যা সমাজে অন্যায়, বৈষম্য ও শোষণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। মহান আল্লাহ আরও বলেন: “তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সূদ খেও না এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।”…(সূরা আলে ইমরান ৩:১৩০)
জাহেলি যুগে ঋণগ্রহীতা সময়মতো ঋণ শোধ করতে না পারলে তার উপর বারবার অতিরিক্ত অর্থ আরোপ করা হতো। ফলে একটি ছোট ঋণ কয়েকগুণ বড় হয়ে যেত এবং দরিদ্র ব্যক্তি চিরস্থায়ী ঋণদাসে পরিণত হতো। ইসলাম এই শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সূরা আন-নিসায় মহান আল্লাহ বনী ইসরাঈলের কিছু অপরাধের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন: “তাদের সূদ গ্রহণের কারণে, যদিও তা তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।”…(সূরা আন-নিসা ৪:১৬১)
এ থেকে বোঝা যায় যে সূদের নিষেধাজ্ঞা শুধু ইসলামেই নয়; পূর্ববর্তী ঐশী ধর্মীয় ধারাতেও ছিল।
পবিত্র কোরআনের আলোকে সূদের মূল সমস্যা হচ্ছে এটি সম্পদের স্বাভাবিক প্রবাহকে বিকৃত করে। ধনী আরও ধনী হয়, আর দরিদ্র আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। একজন ব্যক্তি উৎপাদন বা ঝুঁকি ছাড়া কেবল অর্থের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে। ফলে অর্থনীতি বাস্তব উৎপাদন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সূদের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে: “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সূদগ্রহণকারী, সূদদাতা, সূদের হিসাব লেখক এবং এর সাক্ষীদ্বয়কে অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান।”…(সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৯৮)
এই হাদিসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে শুধু সূদখোর নয়, বরং সূদভিত্তিক লেনদেনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত অন্যদেরও দায়ী করা হয়েছে। এই হাদিস অনুযায়ী সূদের সঙ্গে জড়িত চার শ্রেণির ব্যক্তি হলো:
১. সূদ গ্রহণকারী (যে সূদ খায়)
২. সূদ প্রদানকারী (যে সূদ দেয়)
৩. সূদের চুক্তি বা হিসাব লিখে দেয় যে
৪. সূদ লেনদেনের সাক্ষী
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: “তারা সবাই সমান।”
অর্থাৎ গুনাহের দায় কেবল একজনের উপর সীমাবদ্ধ নয়; পুরো শোষণমূলক ব্যবস্থার অংশীদারদের উপরও বর্তায়।
আরেকটি হাদিসে এসেছে: “সূদের সত্তরটিরও অধিক স্তর রয়েছে; এর সর্বনিম্ন স্তর হলো নিজের মায়ের সঙ্গে ব্যভিচার করার সমতুল্য।”…(সুনান ইবনে মাজাহ)
হাদিসের ভাষা অত্যন্ত কঠোর। এর উদ্দেশ্য হলো সূদের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষের মনে গভীর সতর্কতা সৃষ্টি করা। বিদায় হজের ভাষণে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ঘোষণা করেছিলেন: “জাহেলি যুগের সমস্ত সূদ রহিত করা হলো।” …(সহিহ মুসলিম)
এবং তিনি সর্বপ্রথম তাঁর চাচা হযরত আব্বাস (রাঃ)-এর পাওনা সূদ বাতিল করে উদাহরণ স্থাপন করেন। অর্থাৎ ইসলামে ন্যায় প্রতিষ্ঠা নিজের পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে।
ইসলামী অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো অংশীদারিত্ব, ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং বাস্তব সম্পদের উপর ভিত্তি করে লেনদেন। মুদারাবা, মুশারাকা, ইজারা এবং বৈধ বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
সূদের আরেকটি বড় ক্ষতি হলো এটি সমাজে সম্পদের কেন্দ্রীকরণ ঘটায়। ইতিহাসে দেখা যায়, বহু অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে ঋণনির্ভর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যখন ঋণ বৃদ্ধি পায়, তখন ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপে পড়ে। কোরআন মানুষকে ঋণগ্রহীতার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন: “যদি ঋণগ্রহীতা সংকটে থাকে, তবে সচ্ছলতা না আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দাও। আর যদি তা সদকা করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম।”…(সূরা আল-বাকারাহ ২:২৮০)
এই আয়াত ইসলামের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের একটি অসাধারণ উদাহরণ। এখানে ঋণগ্রহীতার দুর্বল অবস্থাকে শোষণের সুযোগ হিসেবে নয়, বরং সহমর্মিতার ক্ষেত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে।
আজকের পৃথিবীতে সূদভিত্তিক অর্থনীতি নিয়ে বহু বিতর্ক রয়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদও ঋণনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। যদিও আধুনিক অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে ইসলামী অর্থনৈতিক কাঠামো অনুসরণ করে না, তবুও ঋণ, বৈষম্য এবং সম্পদের কেন্দ্রীকরণ নিয়ে উদ্বেগ বিশ্বব্যাপী রয়েছে। একজন মুসলমানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আল্লাহর নির্দেশের প্রতি আনুগত্য। কোরআন সূদকে হারাম ঘোষণা করেছে, তাই এর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
ইসলামের শিক্ষা হলো—সম্পদ উপার্জন করো, ব্যবসা করো, বিনিয়োগ করো, কিন্তু মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অন্যায় লাভ করো না। অর্থনীতি হবে ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক এবং উৎপাদনমুখী।
সবশেষে বলা যায়, পবিত্র আল কোরআনে সূদকে শুধু একটি আর্থিক লেনদেন হিসেবে দেখা হয়নি; বরং এটি একটি নৈতিক ও সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সূদ মানুষের মধ্যে বৈষম্য বৃদ্ধি করে, সমাজে অন্যায়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় এবং মানবিক সম্পর্ককে দুর্বল করে। এই কারণেই আল্লাহ সূদের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন এবং ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের উপার্জন, লেনদেন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে যতটা সম্ভব হালাল ও ন্যায়সঙ্গত রাখা। কারণ সম্পদের পরিমাণ নয়, বরং তার বৈধতা ও বরকতই একজন মানুষের প্রকৃত সফলতার ভিত্তি। কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী, সাময়িক লাভের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং ন্যায়ভিত্তিক জীবনই প্রকৃত কল্যাণের পথ।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।