রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান এবং কিয়েভের প্রতিরক্ষা সহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে মতপার্থক্যের মধ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনায় বসছেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
আজ মঙ্গলবার নরওয়ের রাজধানী অসলোতে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আলোচনায় নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের নেতারাও অংশ নিচ্ছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার দূর থেকে আলোচনায় যুক্ত হবেন বলে জানানো হয়েছে। খবর আল জাজিরা ও নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের।
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরের কার্যালয় জানিয়েছে, ইউক্রেনের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূতদের আলোচনায় যুক্ত করা হচ্ছে। নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের উদ্যোগে আয়োজিত বৈঠকের লক্ষ্য ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগকে আরও গঠনমূলক পথে এগিয়ে নেওয়া। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নেতাদের এ আলোচনা যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি, সামরিক সহায়তা এবং ভবিষ্যৎ শান্তি উদ্যোগ নিয়ে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করবে।
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সামরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সহায়তা কিয়েভের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব সহায়তার গতি ও পরিমাণ নিয়ে ইউক্রেনের উদ্বেগ প্রকাশিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে যাওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।
ইউক্রেনের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সম্পর্কে আগাম সতর্কতা, সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর অর্থায়নে কেনা আকাশ প্রতিরক্ষাসামগ্রী সরবরাহের বিষয়। কিয়েভের আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহায়তা বিলম্বিত হলে রাশিয়ার বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় দেশটির সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের বক্তব্য ও কিয়েভের অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য থাকায় আলোচনায় এসব বিষয়ে স্পষ্টতা আনার প্রয়োজন রয়েছে।
অসলো বৈঠকের সময় ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার সামরিক চাপও অব্যাহত রয়েছে। ২০ অক্টোবর প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার নতুন বিমান হামলায় ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানো কিয়েভের অগ্রাধিকার হিসেবে রয়েছে।
আলোচনায় জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সহায়তার ধারাবাহিকতা এবং রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। তবে বৈঠকে কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি হবে কি না, কিংবা সামরিক সহায়তা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত আসবে কি না, তা আগে থেকে নিশ্চিত নয়। যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনায় ইউক্রেনের নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের প্রশ্ন, ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তা এবং ইউরোপের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের অবস্থান সমন্বয় করতে চাইছে। নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের অংশগ্রহণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও ইউরোপীয় অংশীদারদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। ইউরোপীয় নেতাদের কাছে যুদ্ধের অবসান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কোনো সমঝোতার পর ইউক্রেনের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, অসলো বৈঠকের গুরুত্ব শুধু তাৎক্ষণিক সামরিক সহায়তা নিয়ে আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে আস্থা বজায় রাখা, ইউরোপীয় মিত্রদের অবস্থান সমন্বয় এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ ও রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন।