ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শাবওয়া প্রদেশে সরকারি বাহিনীর একটি নিরাপত্তা প্রশিক্ষণশিবিরে হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩ হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে স্থানীয় এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। হামলায় আরও দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন এবং ১৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দেওয়া তরুণ সদস্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশিক্ষণশিবিরটিতে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়। শাবওয়া প্রদেশের এই স্থাপনাটি ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত। হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, শিবিরটি সৌদি বাহিনী পরিচালনা করত। তবে এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কোনো মন্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। হামলার পর হতাহতদের উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
ইয়েমেনে ২০১৪ সালে হুথি আন্দোলন সানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে দেশটিতে রাজনৈতিক সংঘাত ক্রমে জটিল আকার ধারণ করে। পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততায় সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। অন্যদিকে হুথিরা দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। দীর্ঘদিনের এই সংঘাতে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন, অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং দেশটির অর্থনীতি ও জনসেবা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাম্প্রতিক হামলা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির নতুন অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি হুথি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল পুনর্দখলের চেষ্টা করছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইয়েমেনের সংঘাত শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর প্রভাব আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক যোগাযোগের ওপরও পড়তে পারে।
এদিকে ইয়েমেনের তায়েজ শহরেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই কিশোরী নিহত এবং ছয়জন আহত হওয়ার খবর স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাতে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। শহরটিতে দীর্ঘদিনের অবরোধ ও সরবরাহ সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। খাদ্য, ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি এবং চিকিৎসাসেবার ঘাটতি সংঘাতের মানবিক প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
জাতিসংঘ ও মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। যুদ্ধের কারণে বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং শিশুসহ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নতুন করে সংঘাত তীব্র হলে ত্রাণ সরবরাহ, চিকিৎসা কার্যক্রম এবং নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
শাবওয়ার প্রশিক্ষণশিবিরে হামলায় বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ইয়েমেনের সংঘাতের ভয়াবহতা আবারও সামনে এনেছে। সামরিক স্থাপনায় হামলার পাশাপাশি বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আহতদের চিকিৎসা, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তা এখন জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনের সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের জন্য সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপ ও আঞ্চলিক সমঝোতা প্রয়োজন। সংঘাতের পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা, মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত করা এবং বেসামরিক মানুষকে হামলা থেকে রক্ষা করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অবসান না হলে দেশটির মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।