সাপে কাটা রোগীদের জীবন বাঁচাতে অ্যান্টিভেনম কেনার জন্য চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল সরকারি ৩ লাখ টাকা। কিন্তু প্রায় এক বছর পর সেই টাকার ব্যবহার নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।
হাসপাতালের হিসাব অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদ থেকে বরাদ্দ দেওয়া ৩ লাখ টাকা হাসপাতালের হিসাবে জমা হয়নি। এমনকি ওই অর্থ দিয়ে অ্যান্টিভেনম কেনারও স্পষ্ট তথ্য নেই।
তবে অ্যান্টিভেনম কেনার দাবির পক্ষে একটি রশিদ থাকার কথা জানা গেছে। হাসপাতালের হিসাবরক্ষকের দাবি, তৎকালীন স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নির্দেশে হাসপাতালের রানিং ক্যাশ থেকে টাকা নিয়ে ৩০ ভায়াল অ্যান্টিভেনম কেনা হয়েছিল। কেনাকাটার হিসাব অফিসিয়াল রেকর্ডেও রয়েছে বলে দাবি তার। ফলে প্রশ্ন উঠেছে যদি ৩ লাখ টাকা দিয়ে অ্যান্টিভেনম কেনা হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্থ হাসপাতালের হিসাবে নেই কেন? আর যদি হাসপাতালের রানিং ক্যাশ থেকে অ্যান্টিভেনম কেনা হয়ে থাকে, তাহলে উপজেলা পরিষদের বরাদ্দের ৩ লাখ টাকার কী হয়েছে?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নদী ও চরাঞ্চলঘেরা মতলব উত্তর উপজেলায় বর্ষা মৌসুমে সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। প্রতি মাসে গড়ে ২০ জনের বেশি সাপে কাটা রোগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসেন। পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অনেক রোগী পার্শ্ববর্তী চারটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এসব হাসপাতালে প্রতি মাসে গড়ে আরও ১৪ জনের বেশি সাপে কাটা রোগী চিকিৎসা নিতে যান। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সব মিলিয়ে বছরে চার শতাধিক মানুষ সাপে কাটার শিকার হন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম না থাকার বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নজরে আসে। সাপে কাটা রোগীদের জন্য অ্যান্টিভেনম কেনার লক্ষ্যে উপজেলা পরিষদ থেকে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দ্রুত অর্থ ছাড়ের জন্য তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমানের নামে চেক দেওয়া হয়। নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর চেকটি গ্রহণ করা হয়। চেক নম্বর ৮৬২৫৮৩৯১২১০২৫।
কিন্তু বরাদ্দের ওই অর্থের ব্যবহার নিয়ে এখন তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ক্যাশিয়ার মনজুরুল ইসলাম জানান, উপজেলা পরিষদের বরাদ্দের ৩ লাখ টাকা দিয়ে কোনো অ্যান্টিভেনম কেনা হয়নি। তার দাবি, বরাদ্দের অর্থ হাসপাতালের ব্যাংক হিসাবেও জমা হয়নি। অন্যদিকে হাসপাতালের হিসাবরক্ষকের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার দাবি, তৎকালীন স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নির্দেশে হাসপাতালের রানিং ক্যাশ থেকে অর্থ নিয়ে ৩০ ভায়াল অ্যান্টিভেনম কেনা হয়েছিল। ওই কেনাকাটার হিসাব অফিসিয়াল রেকর্ডে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এখানেই তৈরি হয়েছে মূল প্রশ্ন উপজেলা পরিষদের বরাদ্দ করা ৩ লাখ টাকা যদি অ্যান্টিভেনম কেনার কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে হাসপাতালের হিসাবে তার প্রতিফলন নেই কেন? আর হাসপাতালের রানিং ক্যাশ থেকেই যদি ৩০ ভায়াল অ্যান্টিভেনম কেনা হয়ে থাকে, তাহলে উপজেলা পরিষদের ৩ লাখ টাকা কোথায় গেল?
এদিকে অ্যান্টিভেনম কেনার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে হাসপাতালে নিয়ে ফটোসেশন করা হয়েছিল বলেও জানা গেছে। তবে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাজন কুমার দাসের কাছে উপজেলা পরিষদের ওই ৩ লাখ টাকা কিংবা সমপরিমাণ অর্থের অ্যান্টিভেনম কেনার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।
ডা. রাজন কুমার দাস বলেন, বরাদ্দের অর্থ ও অ্যান্টিভেনম কেনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করলে বিষয়টি জানা যাবে।
অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, অ্যান্টিভেনম কেনার জন্য বরাদ্দ দেওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।