বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ।
সংস্থাটির তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় প্রতি দুজন মেয়ের একজনের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়ে যায়। এ তথ্য মেয়েদের নিরাপদ শৈশব, শিক্ষার অধিকার, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ জীবন গঠনের সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জের বিষয়টি সামনে এনেছে।
বাল্যবিবাহ শুধু একটি মেয়ের ব্যক্তিগত জীবনের পরিবর্তন নয়; এর প্রভাব পড়ে তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর। অল্প বয়সে বিয়ের কারণে অনেক মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় বা শিক্ষাজীবনে দীর্ঘ বিরতি তৈরি হয়। ফলে পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, দক্ষতা অর্জন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হতে পারে। শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথও অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে ওঠে।
অল্প বয়সে বিয়ের পর মেয়েদের ওপর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের অল্প সময়ের মধ্যেই মাতৃত্বের দায়িত্ব নিতে হয়, যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কৈশোরে শরীরের পূর্ণ বিকাশের আগেই গর্ভধারণ করলে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত জটিলতার আশঙ্কা বাড়তে পারে। এ ছাড়া অল্প বয়সে সংসার ও সন্তান পালনের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে মেয়েদের ব্যক্তিগত বিকাশ, সামাজিক যোগাযোগ এবং শিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাল্যবিবাহের পেছনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা কারণ কাজ করতে পারে। দরিদ্র পরিবারে মেয়ের বিয়ে দিয়ে আর্থিক দায়িত্ব কমানোর ধারণা, সামাজিক প্রথা, পরিবারের সম্মান নিয়ে উদ্বেগ এবং মেয়েদের নিরাপত্তা সম্পর্কে অভিভাবকদের আশঙ্কা অনেক সময় বিয়ের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কোথাও কোথাও মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কিংবা উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশের অভাবও পরিবারকে অল্প বয়সে বিয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এসব কারণ মোকাবিলা করতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করে আইন রয়েছে। কিন্তু আইন থাকা সত্ত্বেও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা এবং ঝুঁকিতে থাকা মেয়েদের সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এলাকায় বাল্যবিবাহের আয়োজনের তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি জন্মনিবন্ধন ও বয়স যাচাইয়ের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে ঠেকানোর ক্ষেত্রে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখাও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া প্রয়োজন। কোনো মেয়ে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে তার কারণ অনুসন্ধান এবং পরিবারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ বাড়লে তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরিবারের আস্থাও বাড়তে পারে।
এ ক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অধিকার ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কিশোরীদের নিজেদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং সহায়তা পাওয়ার উপায় সম্পর্কে জানার সুযোগ দিতে হবে। কোনো মেয়ে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকলে তার কথা শোনা, নিরাপদে সহায়তা চাওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো জরুরি।
বাল্যবিবাহ কমানোর উদ্যোগে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য সামাজিক সহায়তা বাড়ানোও প্রয়োজন। পরিবারের আর্থিক সংকট, শিক্ষার ব্যয় কিংবা মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ যদি বিয়ের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে, তাহলে এসব সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে হবে। মেয়েদের দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষার ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে পরিবারকে বোঝানো সম্ভব যে মেয়েদের বিকাশ ও স্বাবলম্বিতা তাদের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইউনিসেফের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এ প্রতিবেদন বাংলাদেশের মেয়েদের অধিকার ও সুরক্ষার প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রতিটি মেয়ের শৈশব নিরাপদ রাখা, নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং শিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগ নিশ্চিত করা শুধু পরিবার বা সমাজের দায়িত্ব নয়; এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামগ্রিক অগ্রগতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।