বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। ইলিশ মাছ বেশি লবণাক্ত পানি সহ্য করতে পারে না। এই মাছ বড় বড় নদী এবং তৎসংলগ্ন সাগর মোহনায় বসবাস করে।
এশিয়ার পারস্য সাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর, বঙ্গোপসাগর এবং চীনসাগরে এদের পাওয়া যায়। নদ-নদীর ভিতরে মধ্যপ্রাচ্যের দজলা, ফোরাত, পাকিস্তানের সিন্ধু, বাংলাদেশের মেঘনা, পদ্মা, যমুনা, মায়ানমারের ইরাবতী নদীতে এই মাছ পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে প্রধান এই তিন নদী ছাড়াও এদের শাখা নদীগুলোতেও ইলিশ মাছ পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে অন্যান্য যে সকল নদীতে ইলিশ মাছ পাওয়া যায়,সুমুদ্রের নিকটবর্তী নিচের অংশে, রূপসা, শিবসা, বিশখালী, তেতুলিয়া, আড়িয়ালখাঁ, গলাচিপা ও পায়রা নদী এবং উপকূলীয় কিছু নদীতে প্রচুর ইলিশ মাছ পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের ইলিশ
বাংলাদেশের মেঘনা নদীর মোহনা বরাবর বঙ্গোপসাগরে এরা বসবাস করে। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু প্রবাহের সময় (জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি) এদের প্রজনন কাল। ডিম ছাড়ার জন্য এরা মেঘনা নদীতে প্রবেশ করে এবং ডিম ছাড়তে ছাড়তে উজানের দিকে অগ্রসর হয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন নদীতে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে মেঘনা ছাড়িয়ে পদ্মা এবং যমুনা নদীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত অগ্রসর হয়। এই মাছের পরিণত ডিমের ব্যাস ০.৭ থেকে ০.৯ মিমি পর্যন্ত হয়। এরা নদীর গভীরে তলদেশে প্রায় স্থির পানিতে ডিমপাড়ে এবং সেখানেই নিষেক ঘটে। একটি পূর্ণ বয়স্ক স্ত্রী-ইলিশ প্রায় ২০ লক্ষ ডিম ধারণ করে থাকে। ডিম থেকে ফোটা পোনা এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক মাছ নদীতে বৃদ্ধি প্রাপ্ত পায়। ইলিশ মাছের পোনা দৈর্ঘ্য যখন ৬-১০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, তখন এদেরকে বলা হয় জাটকা। এরপরে এরা আরও কিছুটা বড় হলে সাগরে ফিরে যায়।
পূর্ণবয়স্ক ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য ৪০ সেন্টিমিটার। দৈর্ঘ্যে সর্ব্বোচ্চ ৫৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। ইলিশ মাছের মাথার দৈর্ঘ্য এবং দেহের মোট দৈর্ঘ্যের এক চতুর্থাংশ। এদের দেহের পৃষ্ঠীয় এবং অঙ্কীয় দেশ সমান চাপা। উর্ধ্বচোয়াল মাঝখানে সুস্পষ্ট খাঁজ দেখা যায় এবং মুখ দৃঢ়ভাবে বন্ধ থাকা অবস্থায় নিম্নচোয়াল ঊর্ধ্বচোয়ালের ভিতরে ঢুকে থাকে। অনাবৃত অংশ ত্বকে ঢাকা। মাথার পৃষ্ঠতল ত্বকে আবৃত এবং কোনো পশ্চাৎ কপাল অস্থির রেখা (frontoparietal striae) নেই। ফুলকা বহু সংখ্যক, প্রথম খিলানের নিচের অংশে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি ফুলকা লক্ষ্য করা যায়। এদের কোনো দাঁত থাকে না।
চোখের ব্যাস বয়সের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। কম বয়সী মাছের চোখ অপেক্ষাকৃত বড় হয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে চোখের আকার তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি কম হয়।
এদের বক্ষপাখনা, শ্রেণীপাখনা অপেক্ষা অনেকটা ক্ষুদ্রতর। এদের আঁইশ উজ্জ্বল রূপালি বর্ণের। অঙ্গের পার্শ্বরেখার মধ্য সারিতে ৪৫ থেকে ৪৭টি আঁইশ এবং অনুপ্রস্থ সারিতে ১৭ থেকে ১৯ সারি আঁইশ থাকে। দেহের মাঝ বরাবর আঁইশগুলো বেশ বড় বড়, সেই তুলনায় লেজের আঁইশ বেশ ছোটো ছোটো হয়ে থাকে। বক্ষপাখনা এবং শ্রোণী পাখনায় কাক্ষিক (axillary) আঁইশ লক্ষ্য করা যায়। এর পুচ্ছ দু্ই ভাগে বিভক্ত।
ইলিশ খুব দ্রুত সাঁতরাতে পারে। একটি ইলিশ মাছ একদিনে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কিমি. পর্যন্ত সাঁতরাতে পারে। নদীতে স্রোতের বিপরীতে এদের গতি থাকে ৫০ থেকে ১০০ কিমি।
ইলিশের প্রধান খাদ্য প্লাংকটন। এছাড়া নীলাভ-সবুজ শৈবাল, ডায়াটম, ডেসমিড, কোপিপোড, ক্লাডোসের, রোটিফার ইত্যাদি আহার করে।
বাংলাদেশে জনপ্রিয় মাছ ইলিশ। এই মাছের বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু খাবার তৈরি করা হয়। এই কারণে বাংলাদেশে এই মাছের চাহিদাও ব্যাপক। সমুদ্র উপকূলীয় অংশে প্রায় ৪,৫০,০০০ জেলে ইলিশ মাছ ধরে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস, জলপ্রবাহের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে উজানের বড় বড় নদীতে এই মাছের পরিমাণ কমে গেছে। এই কারণে সমুদ্র উপকূলীয় অংশে ইলিশ মাছ বেশি ধরা পড়ে।প্রতি ১০০ গ্রাম ইলিশে ১০২০ কিলো জুল (শক্তির একক) শক্তি থাকে। তাতে ১৮ থেকে ২২ গ্রাম চর্বি, ২২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ১৪.৪ গ্রাম প্রোটিন, ২.৪ মিলিগ্রাম আয়রন, সামগ্রিক ফ্যাটি অ্যাসিডের ১০.৮৩ শতাংশ ওমেগা–৩ থাকে। ওয়ার্ল্ড ফিশের হিসাবে ওমেগা–৩ পুষ্টিগুণের দিক থেকে স্যামন মাছের পরই ইলিশের অবস্থান।
বিশ্বের মোট ইলিশের ৬৫ শতাংশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। ভারতে ১৫ শতাংশ, মিয়ানমারে ১০ শতাংশ, আরব সাগর তীরবর্তী দেশগুলো এবং প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগর তীরবর্তী দেশগুলোতেও বাকি ইলিশ ধরা পড়ে। ইলিশ আছে, বিশ্বের এমন ১১টি দেশের মধ্যে ১০টিতেই ইলিশের উৎপাদন দিন দিন কমছে।
ইলিশ মাছ বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং পৃথিবীর বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনাকারী একটি উপাদান। ফলে এই মাছ আমাদের একান্তই নিজস্ব পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেতে আর কোনো বাধা নেই।
ইলিশের বাড়ি চাদঁপুর কেন?
চাঁদপুরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, প্রজননের সময় মা ইলিশগুলো এই চাঁদপুরের আশেপাশের নদীতেই আসে। এ কারণেই এই জেলাকে ইলিশের বাড়ি বলা হয়।
আমরাও জানি, “ইলিশ বিচরণ করে লোনা পানিতে, কিন্তু ডিম পাড়ার সময় তারা মিঠা পানির মোহনায় আসে। চাঁদপুরের পদ্মা নদীতে প্রচুর পরিমাণে প্ল্যাঙ্কটন আছে, যেটা মা ইলিশের প্রধান খাবার। এই প্ল্যাঙ্কটন আর অন্য কোন জেলায় নেই। পানির মান আর খাবার থাকায় মা ইলিশ এখানে ডিম ছাড়তে আসে। তার মানে এটা তাদের বাড়ি।”
মা ইলিশের ডিম ছাড়ার সময় ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় চাঁদপুরে ইলিশের আহরণ কম হয়।
অন্যদিকে ডিম ছাড়ার মৌসুম শেষে যখন আবার ইলিশ ধরা শুরু হয় ততদিনে এই ইলিশগুলো উপকূলীয় জেলাগুলোর দিকে চলে যাওয়ায় সেখানে স্বাভাবিকভাবে ইলিশ বেশি ধরা পড়ে বলে মৎস্য কর্মকর্তা জানান।
এদিকে, চাঁদপুরে ইলিশ আহরণ তুলনামূলক কম হলেও ইলিশের সবচেয়ে বড় বাজার চাঁদপুর।