বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ কী—প্রাকৃতিক গ্যাস, কৃষিজমি, নদী, সমুদ্রবন্দর, নাকি এ দেশের মানুষ? উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি হিসাব বিবেচনায় নিলে মানুষের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষমতাই একটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠী একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক পরিবর্তন ও প্রযুক্তিগত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষা, দক্ষতা অর্জনের সুযোগ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরিবেশ। বাংলাদেশের সামনে তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—তরুণ জনগোষ্ঠীকে আমরা কীভাবে দেখছি? তারা কি শুধু কর্মসংস্থানের জন্য অপেক্ষা করা বিপুলসংখ্যক মানুষ, নাকি তাদের জ্ঞান, শ্রম, মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জনসংখ্যা যখন সম্ভাবনা, তখন কর্মসংস্থান কেন চ্যালেঞ্জ?
একটি দেশের জনসংখ্যা বেশি হলেই তা অর্থনৈতিক অগ্রগতির নিশ্চয়তা দেয় না। জনসংখ্যার বড় অংশ যদি কর্মক্ষম বয়সে থাকে, পর্যাপ্ত শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায় এবং উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হতে পারে, তাহলে সেই পরিস্থিতি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি করে। অর্থনীতিতে এ ধরনের সুবিধাকে জনমিতিক লভ্যাংশ বলা হয়। তবে এই সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্জিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি ব্যবহারের আগ্রহ, নতুন কিছু শেখার আকাঙ্ক্ষা, উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন এবং দেশ-বিদেশের শ্রমবাজারে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা। কেউ উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করছেন, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করছেন, আবার কেউ অনলাইনভিত্তিক কাজের মাধ্যমে আয় করার চেষ্টা করছেন। তাঁদের প্রত্যেকের সামনে সুযোগের ধরন আলাদা, কিন্তু একটি প্রত্যাশা প্রায় একই—নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ পাওয়া এবং সেই কাজের মাধ্যমে সম্মানজনক জীবন গড়ে তোলা। সমস্যা তৈরি হয় যখন শিক্ষা শেষ করার পরও একজন তরুণ দীর্ঘদিন কাজ পান না, অথবা কাজ পেলেও তাঁর যোগ্যতা ও কাজের প্রকৃতির মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকে। কেউ বছরের পর বছর চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেন, কেউ প্রশিক্ষণ নিয়েও কাজ খুঁজে পান না, আবার কেউ জীবিকার তাগিদে এমন পেশায় যুক্ত হন, যেখানে তাঁর অর্জিত শিক্ষার যথাযথ ব্যবহার হয় না। এ অবস্থায় তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে না। তাঁরা সম্ভাব্য উদ্যোক্তা, দক্ষ কর্মী, গবেষক, কৃষি উদ্ভাবক, প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষক, শিল্পী ও সেবাদানকারীও হতে পারেন। রাষ্ট্র ও অর্থনীতির নীতিনির্ধারণে এই বহুমাত্রিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষার সঙ্গে কর্মবাজারের দূরত্ব কমাতে হবে
কর্মসংস্থানের আলোচনায় শিক্ষাব্যবস্থার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষা মানুষের জ্ঞান, চিন্তাশক্তি ও ব্যক্তিত্ব গঠনের ভিত্তি। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতার সংযোগ দুর্বল হলে তরুণদের কর্মজীবনে প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করে সনদ অর্জন করলেন, কিন্তু তাঁর যোগাযোগের দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান কিংবা হাতে-কলমে কাজের অভিজ্ঞতা প্রয়োজনীয় পর্যায়ে পৌঁছাল না—এমন পরিস্থিতি তাঁর চাকরি পাওয়ার পথে বাধা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে নিয়োগদাতারাও উপযুক্ত দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন। ফলে একদিকে কাজের সুযোগ থাকলেও অন্যদিকে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। এই ব্যবধান কমাতে শিক্ষার প্রতিটি স্তরে বাস্তবমুখী দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই ভাষাগত দক্ষতা, গণিত, বিজ্ঞানমনস্কতা, ডিজিটাল জ্ঞান, যোগাযোগ, দলগত কাজ এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি গবেষণা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতার সুযোগ বাড়ানো দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নিয়োগদাতাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে কর্মবাজারের পরিবর্তিত চাহিদা সম্পর্কে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধারণা পেতে পারে। কোন খাতে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, কোন পেশায় নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং কোন দক্ষতা দ্রুত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে—এসব তথ্য পাঠ্যক্রম ও প্রশিক্ষণ পরিকল্পনায় কাজে লাগানো সম্ভব। তবে শিক্ষাকে কেবল চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। শিক্ষার বিস্তৃত সামাজিক ও মানবিক মূল্য রয়েছে। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে জ্ঞানার্জন ও ব্যক্তিত্ব গঠনের পাশাপাশি শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনে কাজ করার উপযোগী দক্ষতাও অর্জন করবেন।