সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি সমাজের দর্পণ, রাষ্ট্রের বিবেক এবং জনগণের কণ্ঠস্বর। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকতার ভূমিকা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এটি প্রায়ই “চতুর্থ স্তম্ভ” হিসেবে পরিচিত। কারণ রাষ্ট্রের তিনটি প্রচলিত স্তম্ভ—বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা—যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের কার্যক্রমকে জনগণের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করে গণমাধ্যম। এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন সততা, দক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং সর্বোপরি পেশাদারিত্ব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, এই গুরুত্বপূর্ণ পেশাটি নানা সংকটের মুখে পড়েছে, যার অন্যতম কারণ হলো অপসাংবাদিকতা, অদক্ষতা এবং নিয়ন্ত্রণহীনতা।
একজন ডাক্তার হতে হলে যেমন নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করতে হয়, একজন প্রকৌশলী হতে হলে যেমন নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রির প্রয়োজন হয়, তেমনি একজন সাংবাদিকের ক্ষেত্রেও ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ সাংবাদিকতা কোনো সাধারণ পেশা নয় যেখানে কেবল তথ্য সংগ্রহ করে প্রচার করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। বরং এটি এমন একটি পেশা যেখানে তথ্যের সত্যতা যাচাই, বিশ্লেষণ, উপস্থাপন এবং প্রভাব মূল্যায়নের মতো জটিল কাজগুলো করতে হয়। এই কাজগুলো সঠিকভাবে করতে হলে একজন সাংবাদিকের বোধশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা আবশ্যক, যা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো—যত্রতত্র “কার্ডধারী সাংবাদিক” এর বিস্তার। কোনো নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ বা শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই অনেকেই নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন। ফলে এই পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অসংখ্য অনলাইন পোর্টাল এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব পোর্টালের কোনো নির্দিষ্ট সম্পাদকীয় নীতি নেই, নেই তথ্য যাচাইয়ের কোনো নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। ফলে ভুল তথ্য, গুজব এবং বিভ্রান্তিকর সংবাদ খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি শুধু সাংবাদিকতার জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই বিপজ্জনক। কারণ ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা সৃষ্টি করে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায় এবং কখনো কখনো রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলে। তাই তথ্যের নিরাপত্তা ও সঠিক উপস্থাপনার জন্য সাংবাদিকদের একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডের মধ্যে আনা সময়ের দাবি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা উচিত কি না। অনেকেই মনে করেন, সাংবাদিকতা একটি মুক্ত পেশা হওয়া উচিত যেখানে যে কেউ অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু এই যুক্তির একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ যখন একটি পেশার সঙ্গে সরাসরি জনস্বার্থ জড়িত থাকে, তখন সেই পেশায় একটি নির্দিষ্ট মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। যেমন—চিকিৎসা বা প্রকৌশলের ক্ষেত্রে যেমন নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তেমনি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও একটি ন্যূনতম মানদণ্ড থাকা উচিত।
স্নাতক ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবটি এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত যৌক্তিক। একটি স্নাতক ডিগ্রি কেবল একটি সনদ নয়; এটি একজন মানুষের চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং জ্ঞানার্জনের একটি প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করে। একজন স্নাতক ব্যক্তি সাধারণত তথ্য যাচাই, যুক্তি বিশ্লেষণ এবং সমালোচনামূলক চিন্তায় বেশি দক্ষ হয়ে থাকেন। ফলে তিনি সাংবাদিকতার মতো একটি দায়িত্বপূর্ণ পেশায় আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারেন।
এছাড়া একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। এই আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক নিয়ম নির্ধারণ করা যেতে পারে, যেমন—ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, নৈতিক আচরণবিধি এবং জবাবদিহিতার ব্যবস্থা। এই ধরনের আইন অপসাংবাদিকতা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এটি যেন সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন না করে। কারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। তাই আইন এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে যাতে এটি পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করে, কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ না করে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে তথ্যপ্রবাহ অনেক দ্রুত হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে যে কেউ সহজেই তথ্য প্রচার করতে পারে। এটি একদিকে যেমন তথ্যের গণতন্ত্রায়ন ঘটিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি অপব্যবহারের সুযোগও তৈরি করেছে। এই বাস্তবতায় পেশাদার সাংবাদিকদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একজন প্রকৃত সাংবাদিক কেবল খবর সংগ্রহ করেন না; তিনি তথ্য যাচাই করেন, প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেন এবং একটি দায়িত্বশীল উপস্থাপনার মাধ্যমে জনগণের সামনে তুলে ধরেন। এই কাজটি করতে হলে তাকে নিরপেক্ষ থাকতে হয়, নৈতিকতার প্রতি অটল থাকতে হয় এবং পেশাগত দক্ষতা অর্জন করতে হয়। এই গুণগুলো অর্জনের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।
অপসাংবাদিকতা কেবল একটি পেশাগত সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক সমস্যা। যখন ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে এবং কখনো কখনো সহিংসতার কারণও হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই সমস্যা সমাধানের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একটি শক্তিশালী আইন প্রণয়ন এই সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে। এই আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যেতে পারে যে, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া কেউ সাংবাদিক পরিচয় দিতে পারবে না। একই সঙ্গে একটি নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে, যেখানে প্রত্যেক সাংবাদিককে একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বীকৃতি নিতে হবে। এতে করে পেশাটির মান বজায় রাখা সহজ হবে। তবে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এর পাশাপাশি প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং নৈতিকতার চর্চা। সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যেও একটি আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তাদের বুঝতে হবে যে এই পেশার সঙ্গে একটি বড় দায়িত্ব জড়িত।
গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে হলে পেশাদারিত্বের কোনো বিকল্প নেই। একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার বিশ্বাসযোগ্যতা। যদি সেই বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তার কাজের কোনো মূল্য থাকে না। তাই প্রত্যেক সাংবাদিকের উচিত নিজের পেশাগত মান উন্নত করা এবং নৈতিকতার প্রতি অটল থাকা।
সবশেষে বলা যায়, সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা, যার সঙ্গে সমাজের প্রতিটি মানুষের স্বার্থ জড়িত। এই পেশার মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। তাই অপসাংবাদিকতা রোধে এবং পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা সময়ের দাবি। ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা—এই তিনটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে সাংবাদিকতার মান অনেকাংশে উন্নত করা সম্ভব। আমাদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি একটি দায়িত্বশীল, পেশাদার এবং বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম চাই, নাকি অনিয়ন্ত্রিত ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের স্রোতে ভেসে যেতে চাই। যদি আমরা প্রথমটিকে বেছে নিতে চাই, তাহলে এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার। কারণ সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়—এটি সমাজের প্রতিচ্ছবি, এবং সেই প্রতিচ্ছবি যেন স্বচ্ছ ও সত্যনিষ্ঠ হয়, তা নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।