October 19, 2026, 10:09 pm
শিরোনামঃ
আল-কোরআনের আলোকে : আল্লাহর সঙ্গে করা পাপ বা গুনাহের শাস্তি কি মানুষ দিতে পারে? কবিতা, প্রেম ও জীবনের দর্শন ; ‎কবি রবি ডাকুয়ার ভাবনায় মানুষের হৃদয়, অনুভূতি ও জীবনের বহুমাত্রিকতা মৎস্য চাষের ট্রেড লাইসেন্সের আড়ালে ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের অভিযোগ চট্টগ্রামে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শিগগির চালু হচ্ছে ফুড ল্যাবরেটরি সাতক্ষীরার দুই গ্রামে লবণাক্ততা দূর করে সুপেয় পানি সরবরাহ শুরু দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তে প্রচারযন্ত্র চালু ও অস্ত্র মোতায়েনের হুমকি উত্তর কোরিয়ার ফ্রান্সে দাঙ্গা ও লুটপাট ঠেকাতে নির্দিষ্ট এলাকায় কারফিউয়ের উদ্যোগ নয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭৩ জন নিহতের তথ্য মানবাধিকার সংস্থার অন্যের পাপ নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার আগে নিজের হিসাব করা জরুরি সৌদি আরবে ২ নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ

অন্যের পাপ নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার আগে নিজের হিসাব করা জরুরি

Reporter Name
Lonely dead tree. Art nature.

মানুষের একটি বড় দুর্বলতা হলো, সে অন্যের ভুল সহজেই দেখতে পায়, অথচ নিজের ভুলের সামনে দাঁড়াতে অনেক সময় দ্বিধা করে। অন্যের সামান্য ত্রুটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করে, কিন্তু নিজের বড় ভুলকে নানা যুক্তিতে আড়াল করে। অন্যের চরিত্র বিচার করতে গিয়ে সে কখনো কঠোর হয়ে ওঠে, অথচ নিজের ক্ষেত্রে ক্ষমা, সহানুভূতি ও পরিস্থিতির বিবেচনা প্রত্যাশা করে। অথচ পবিত্র আল-কোরআন মানুষকে অন্যের বিচার করার আগে নিজের দায়িত্ব, নিজের আমল এবং নিজের জবাবদিহির কথা স্মরণ করতে শিক্ষা দেয়।

আল্লাহ তাআলা সূরা আল-হাশরের ১৮ নম্বর আয়াতে বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, সে আগামীকালের জন্য কী পাঠিয়েছে, তা ভেবে দেখা।” এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। মানুষ সাধারণত আগামী দিনের জীবিকা, সম্মান, নিরাপত্তা ও সাফল্যের কথা ভাবে; কিন্তু মৃত্যুর পরের জবাবদিহির জন্য সে কী প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা নিয়ে কতটা চিন্তা করে? নিজের কথা, কাজ, আচরণ, দায়িত্ব ও অন্যের প্রতি নিজের ব্যবহারের হিসাব নেওয়াই একজন সচেতন মানুষের কর্তব্য।

অন্যের পাপ নিয়ে আলোচনা করার আগে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন। আমি কি কখনো মিথ্যা বলেছি? কারও অধিকার নষ্ট করেছি? কারও সম্মানহানি করেছি? অন্যের দোষ প্রকাশ করে তাকে অপমান করেছি? নিজের স্বার্থে সত্য গোপন করেছি? কারও প্রতি অন্যায় করেও নিজেকে নির্দোষ মনে করেছি? আমার কথায় বা কাজে কেউ কষ্ট পেয়েছে কি? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আত্মসমালোচনার অংশ। আর আত্মসমালোচনা মানে নিজেকে ঘৃণা করা নয়; বরং নিজের ভুল শনাক্ত করে সংশোধনের পথে এগিয়ে যাওয়া। পবিত্র কোরআনের সূরা আল-বাকারার ৪৪ নম্বর আয়াতে অন্যদের সৎকাজের নির্দেশ দিয়ে নিজেদের কথা ভুলে যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এর মাধ্যমে এমন দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে, যেখানে মানুষ অন্যকে নৈতিকতার শিক্ষা দেয়, অথচ নিজের আচরণে সেই শিক্ষা অনুসরণ করে না। ধর্মীয় উপদেশ তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা নিজের জীবনেও প্রয়োগ করার চেষ্টা থাকে। অন্যকে সত্য বলার পরামর্শ দিয়ে নিজে মিথ্যা বলা, অন্যকে ন্যায়বিচারের কথা বলে নিজে অন্যায় করা কিংবা অন্যকে পাপ থেকে বিরত থাকতে বলে নিজের পাপকে তুচ্ছ মনে করা—এসব আচরণ মানুষের নৈতিক বিশ্বাসকে দুর্বল করে। তবে নিজের হিসাব নেওয়া মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা নয়। কেউ অন্যায় করলে তার প্রতিবাদ করা, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার রক্ষা করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিবাদের নামে অপবাদ দেওয়া, গুজব ছড়ানো, কাউকে অপমান করা কিংবা নিজের হাতে শাস্তি দেওয়ার অধিকার দাবি করা ন্যায়সংগত নয়। সূরা আল-মায়িদার ৮ নম্বর আয়াত শিক্ষা দেয়, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন মানুষকে ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করতে প্ররোচিত না করে। অর্থাৎ, কাউকে অপছন্দ করলেও তার ব্যাপারে ন্যায় বজায় রাখতে হবে।

আল্লাহর কাছে মানুষের চূড়ান্ত হিসাব হবে। সূরা আয-যিলযালের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কেউ অণু পরিমাণ ভালো কাজ করলে তা দেখতে পাবে, আর কেউ অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করলে তাও দেখতে পাবে। তাই মানুষের চোখে নিজের ভুল আড়াল করতে পারলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আবার অন্যের ভুল প্রকাশ করতে পারলেই নিজের দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। প্রত্যেক মানুষকেই নিজের কাজের জবাবদিহি করতে হবে। আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—মানুষের ভুল হতে পারে, কিন্তু আন্তরিক তওবা ও সংশোধনের মাধ্যমে ফিরে আসার পথও রয়েছে। সূরা আয-যুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই নিজের ভুল বুঝতে পারলে অহংকার না করে ক্ষমা চাইতে হবে, অন্যের অধিকার নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে একই অন্যায় না করার চেষ্টা করতে হবে। একইভাবে অন্য কেউ আন্তরিকভাবে সংশোধনের পথে ফিরলে তার পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে একেবারে অস্বীকার করাও উচিত নয়। অন্যের দোষ দেখা সহজ, নিজের দোষ স্বীকার করা কঠিন। অন্যকে উপদেশ দেওয়া সহজ, নিজের জীবনকে সেই উপদেশ অনুযায়ী গড়ে তোলা কঠিন। কিন্তু প্রকৃত আত্মশুদ্ধি শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ অন্যের আমলনামা নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার আগে নিজের আমলনামার কথা ভাবে। সে বুঝতে শেখে, তারও ভুল আছে, তারও সংশোধন প্রয়োজন এবং আল্লাহর সামনে তাকেও দাঁড়াতে হবে। অতএব, অন্যের পাপ নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার আগে নিজের হিসাব করা জরুরি। অন্যায়কে অন্যায় বলতে হবে, কিন্তু বিদ্বেষ থেকে নয়; ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য। অন্যকে সংশোধনের আহ্বান জানাতে হবে, কিন্তু নিজের সংশোধনের দরজাও খোলা রেখে। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক মানুষকে নিজের কাজের হিসাব দিতে হবে, আর সেই চূড়ান্ত বিচারের মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা