এই উত্তরটি বুঝতে হলে আল্লাহর অধিকারসংক্রান্ত গুনাহ এবং মানুষের অধিকার লঙ্ঘন—এই দুই বিষয়কে আলাদা করতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত গুনাহের চূড়ান্ত বিচার ও প্রতিদান দেওয়ার মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। কোনো মানুষ নিজের ইচ্ছায় আল্লাহর পক্ষ থেকে কাউকে শাস্তি দিতে পারে না, কিংবা কারও ওপর আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করার দাবি করতে পারে না। তবে কোনো কাজ যদি মানুষের অধিকার নষ্ট করে, সমাজে অপরাধ ঘটায় বা অন্যের ক্ষতি করে, তাহলে সেই কাজের মানবিক ও আইনগত দিকটি ন্যায়সংগত বিচারব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে। অর্থাৎ, আল্লাহর কাছে গুনাহের চূড়ান্ত বিচার এক বিষয়; মানুষের সমাজে সংঘটিত অপরাধের বিচার আরেক বিষয়।
১. চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আনআমের ৫৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “বিচার করার অধিকার একমাত্র আল্লাহর।” আয়াতটির প্রেক্ষাপটে আল্লাহর ফয়সালা ও সত্য প্রকাশের কর্তৃত্বের কথা এসেছে। এর শিক্ষা হলো, আল্লাহর অধিকারসংক্রান্ত গুনাহের চূড়ান্ত বিচার কোনো মানুষ নিজের হাতে নিতে পারে না।
সূরা আয-যুমারের ৪৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহকে আসমানসমূহ ও জমিনের স্রষ্টা, অদৃশ্য ও দৃশ্যের জ্ঞানী এবং বান্দাদের মধ্যে বিরোধের বিষয়ে ফয়সালাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মানুষ অনেক সময় বাহ্যিক আচরণ দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু আল্লাহ মানুষের প্রকাশ্য কাজের পাশাপাশি তার অন্তরের অবস্থা, নিয়ত এবং অজানা পরিস্থিতিও জানেন।
সূরা আল-আম্বিয়ার ৪৭ নম্বর আয়াতে কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। সেখানে কারও প্রতি সামান্যতম জুলুম করা হবে না। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের চূড়ান্ত হিসাব আল্লাহর কাছেই হবে। সুতরাং কোনো ব্যক্তি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত ক্ষোভ কিংবা সামাজিক ক্ষমতার ভিত্তিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার দাবি করতে পারে না।
২. ধর্মীয় বিশ্বাসে ভুল করলেই কি মানুষ শাস্তি দিতে পারে?
কেউ আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করল, আল্লাহর কোনো বিধান অস্বীকার করল কিংবা ধর্মীয় বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করল—এমন পরিস্থিতিতে কোনো ব্যক্তি নিজে শাস্তি দেওয়ার অধিকারী হয়ে যায় না।
সূরা আল-বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” আয়াতটির মূল শিক্ষা ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে জবরদস্তি না করার নীতি তুলে ধরে। এই আয়াতের আলোকে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে নিজে শাস্তি দেওয়া, মারধর করা, ভয় দেখানো, আটকে রাখা বা জনতার হাতে শাস্তি তুলে দেওয়া বৈধ বলে ধরে নেওয়া যায় না। ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়ে মতভেদ থাকলেও মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
৩. শিরক বা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করার গুনাহের বিচার কে করবেন?
সূরা আন-নিসার ৪৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না—এমন অবস্থায় যদি কেউ শিরক নিয়েই তাঁর কাছে উপস্থিত হয়; তবে এর বাইরে অন্য পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। একই বক্তব্য সূরা আন-নিসার ১১৬ নম্বর আয়াতেও এসেছে। এই আয়াতগুলোকে বুঝতে হবে কোরআনের তওবা ও ক্ষমাসংক্রান্ত অন্যান্য আয়াতের সঙ্গে মিলিয়ে। জীবিত অবস্থায় আন্তরিকভাবে তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার দরজা বন্ধ—এমন কথা এই আয়াতগুলো বলে না। সূরা আয-যুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়ার নির্দেশ রয়েছে। এখানে মূল বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তির অন্তরের বিশ্বাস, তার তওবা এবং আল্লাহর কাছে তার চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে মানুষ সর্বজ্ঞ নয়। তাই কেউ শিরক করেছে বলে অভিযোগ উঠলেই অন্য কোনো ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে তার শাস্তি কার্যকর করতে পারে না। বিশ্বাসের বিচার ও পরকালের চূড়ান্ত প্রতিদান আল্লাহর হাতে।
৪. আল্লাহর অধিকারসংক্রান্ত গুনাহের সঙ্গে মানুষের অধিকার জড়িত হলে কী হবে?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি রয়েছে।
– কেউ ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর কাছে গুনাহ করলে তার চূড়ান্ত হিসাব আল্লাহর কাছে।
– কেউ মানুষের সম্পদ চুরি করলে, প্রতারণা করলে, কাউকে হত্যা করলে কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করলে সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকারও জড়িত।
– এমন অপরাধের ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষ আইন ও প্রমাণ অনুসারে বিচার করতে পারে।
– কিন্তু কেউ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত পেয়েছে—এই অজুহাতে নিজে আইন হাতে তুলে নিতে পারে না।
সূরা আন-নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে মানুষের মধ্যে বিচার করার সময় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সূরা আন-নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে নিজের বা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার শিক্ষা রয়েছে। আর সূরা আল-মায়িদার ৮ নম্বর আয়াতে শত্রুতাও যেন ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না করে, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এসব আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের দায়িত্ব হলো ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা—নিজের হাতে প্রতিশোধ নেওয়া নয়।
৫. তাহলে সংক্ষিপ্ত উত্তর কী?
আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত গুনাহের চূড়ান্ত বিচার ও পরকালের শাস্তি দেওয়ার মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। কোনো সাধারণ ব্যক্তি নিজের সিদ্ধান্তে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি দিতে পারে না। তবে কোনো কাজের সঙ্গে মানুষের অধিকার লঙ্ঘন বা সমাজে সংঘটিত অপরাধ যুক্ত থাকলে, তার বিচার যথাযথ আইন ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ায় হতে পারে। ধর্মীয় অপরাধের অভিযোগ তুলে কাউকে মারধর করা, হত্যা করা, নির্যাতন করা কিংবা জনতার হাতে শাস্তি তুলে দেওয়া—এগুলোকে আল্লাহর বিচার বলে চালিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। কোরআন ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, প্রমাণ এবং আল্লাহর কাছে চূড়ান্ত হিসাবের শিক্ষা দেয়।
শেষ কথা হলো: আল্লাহর নামে কাউকে শাস্তি দেওয়ার দাবি করার আগে মনে রাখতে হবে—আল্লাহর বিচারক হওয়া মানুষের দায়িত্ব নয়; মানুষের দায়িত্ব হলো নিজের কাজের জন্য জবাবদিহি করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
লেখক :
মোঃ আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।