বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
পবিত্র কোরআন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য নাজিলকৃত সর্বশেষ হিদায়াতের কিতাব। আল কোরআন মানুষের ঈমান, চরিত্র, ইবাদত, নৈতিকতা, পারিবারিক জীবন, সামাজিক দায়িত্ব এবং পরকালীন মুক্তির পথনির্দেশ দিয়েছে। কোরআন মুখস্থ করা নিঃসন্দেহে সম্মানের ও সওয়াবের কাজ। মুসলিম সমাজে যারা কোরআন সম্পূর্ণ মুখস্থ করেন, তাঁদের ‘হাফেজে কোরআন’ বলা হয় এবং তাঁদের প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করা হয়। এটি আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এর পাশাপাশি একটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ—কেউ কোরআনের হাফেজ হলেই কি তাঁর জান্নাত নিশ্চিত? একজন হাফেজ কি নিজের ক্ষমতায় অন্য কোনো মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবেন? প্রচলিত সমাজে এ ধরনের কিছু কথা শোনা যায়। কখনো বলা হয়, একজন হাফেজ নিশ্চিত জান্নাতি; কখনো বলা হয়, একজন হাফেজ তাঁর পরিবারের নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্যকে জান্নাতে নিয়ে যেতে পারবেন। আবার কোনো কোনো বক্তব্যে নির্দিষ্ট সংখ্যার কথাও বলা হয়। এখন প্রশ্ন হলো, এসব কথার ভিত্তি কী? পবিত্র কোরআন কি সত্যিই এমন কোনো নিশ্চয়তা দিয়েছে?
কোরআনকে যদি কোনো ধারণার চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে উত্তরটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দিতে হবে। কারণ কোরআনে কোথাও এমন সরাসরি ঘোষণা নেই যে, ‘যে ব্যক্তি কোরআন মুখস্থ করবে, সে নিশ্চিত জান্নাতে যাবে।’ একইভাবে কোরআনে এমন কোনো আয়াতও নেই যেখানে বলা হয়েছে, ‘একজন হাফেজ নিজের ইচ্ছায় নির্দিষ্ট সংখ্যক জাহান্নাম-নির্ধারিত মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যেতে পারবে।’
এর অর্থ এই নয় যে কোরআন মুখস্থ করার কোনো মর্যাদা নেই। বরং কোরআন সংরক্ষণ, শিক্ষা, তিলাওয়াত, অনুধাবন ও আমল—সবই অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বিষয়। কিন্তু কোরআনের কোনো একটি কাজের মর্যাদাকে এমন একটি নিশ্চয়তায় রূপ দেওয়া, যা কোরআন নিজে দেয়নি, তা সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানদার হয়ে সৎকর্ম করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তার প্রতি সামান্যও জুলুম করা হবে না।’—সূরা আন-নিসা, ৪:১২৪। এখানে জান্নাতের সঙ্গে ঈমান ও সৎকর্মের সম্পর্ক স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু কোনো একটি আমল সম্পাদন করাই মানুষের চূড়ান্ত মুক্তির একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি।
কোরআনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে তার অন্তরের ঈমান ও কর্মের মূল্য রয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হও। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াবান।’—সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩।
এই আয়াত আমাদের একটি মৌলিক নীতি শেখায়—আল্লাহর কাছে মর্যাদার ভিত্তি তাকওয়া। তাই কেউ কোরআন মুখস্থ করেছেন—এটি নিঃসন্দেহে একটি মহান অর্জন; কিন্তু সেই অর্জনের সঙ্গে তাঁর ঈমান, আমল, চরিত্র ও তাকওয়া কী অবস্থায় রয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কোরআন মুখস্থ করার বিষয়টি কোরআনের সংরক্ষণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমিই এই উপদেশ নাজিল করেছি এবং অবশ্যই আমিই এর সংরক্ষক।’—সূরা আল-হিজর, ১৫:৯। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের অন্তরে কোরআনের আয়াত সংরক্ষিত থাকা আল্লাহর সেই সংরক্ষণব্যবস্থার একটি বিস্ময়কর প্রকাশ। একজন মানুষ যখন কোরআন মুখস্থ করেন, তখন তিনি কোরআনের আয়াত নিজের স্মৃতিতে ধারণ করেন। এটি অবশ্যই মর্যাদাপূর্ণ কাজ। কিন্তু কোরআনের উদ্দেশ্য শুধু মানুষের স্মৃতিতে আয়াত সংরক্ষণ করা নয়। কোরআন মানুষকে চিন্তা করতে, বুঝতে এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে আহ্বান করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরা উপদেশ গ্রহণ করে।’—সূরা সোয়াদ, ৩৮:২৯।
এই আয়াতের আলোকে বোঝা যায়, কোরআনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোরআন মুখস্থ করা এক মহান আমল হতে পারে, কিন্তু কোরআনের শিক্ষা বোঝা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করাও তার উদ্দেশ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কেউ যদি পুরো কোরআন মুখস্থ করেন, কিন্তু কোরআনের ন্যায়বিচার, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দয়া, সংযম ও মানুষের অধিকার সম্পর্কে দেওয়া নির্দেশনা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন না করেন, তাহলে শুধু মুখস্থ করার বিষয়টিকে তাঁর সম্পূর্ণ সফলতার নিশ্চয়তা হিসেবে ঘোষণা করার সুযোগ কোরআন আমাদের দেয় না।
আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা কেন এমন কথা বল যা তোমরা কর না? তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অসন্তোষজনক।’—সূরা আস-সফ, ৬১:২-৩। এই আয়াত মানুষের কথা ও কাজের সামঞ্জস্যের গুরুত্ব তুলে ধরে। কোরআন মুখস্থ করার পাশাপাশি কোরআনের নির্দেশিত জীবনযাপনও তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোরআনে সফল মানুষের পরিচয় দিতে গিয়ে শুধু জ্ঞান বা মুখস্থ করার কথা বলা হয়নি। সূরা আল-মুমিনুনের শুরুতে আল্লাহ মুমিনদের বিভিন্ন গুণ বর্ণনা করেছেন—তারা নামাজে বিনয়ী, অনর্থক বিষয় থেকে বিরত থাকে, পবিত্রতা রক্ষা করে, আমানত ও অঙ্গীকার সংরক্ষণ করে এবং নামাজসমূহের যত্ন নেয়। এরপর বলা হয়েছে, ‘তারাই উত্তরাধিকারী, যারা ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী হবে; তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।’—সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:১০-১১।
এখানে জান্নাতের সঙ্গে একটি সামগ্রিক ঈমানি ও নৈতিক জীবনব্যবস্থার সম্পর্ক দেখা যায়। এখন আসা যাক দ্বিতীয় প্রশ্নে—একজন হাফেজ কি অন্য মানুষকে নিজের ক্ষমতায় জান্নাতে নিয়ে যেতে পারবেন?
কোরআন এ ব্যাপারে অত্যন্ত পরিষ্কার। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, সমস্ত সুপারিশই আল্লাহর জন্য।’—সূরা আয-যুমার, ৩৯:৪৪। অর্থাৎ সুপারিশের চূড়ান্ত মালিক আল্লাহ। কোনো নবী, ফেরেশতা, নেককার ব্যক্তি, আলেম কিংবা হাফেজ নিজের স্বাধীন ক্ষমতায় কাউকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারেন না।
আল্লাহ আরও বলেন, ‘কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করতে পারে?’—সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৫।
এই আয়াতটি শাফাআত বা সুপারিশের ব্যাপারে একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে। যদি কোনো সুপারিশ সংঘটিত হয়ও, সেটি আল্লাহর অনুমতি ও সন্তুষ্টির অধীন। অতএব কোনো মানুষকে এমন ক্ষমতার অধিকারী মনে করা যে তিনি নিজস্ব অধিকারবলে জাহান্নাম থেকে কাউকে মুক্ত করে জান্নাতে পাঠাতে পারবেন—এটি কোরআনের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘সেদিন কোনো সুপারিশ উপকারে আসবে না, তবে যাকে পরম দয়াময় অনুমতি দেবেন এবং যার কথায় তিনি সন্তুষ্ট হবেন।’—সূরা ত্বহা, ২০:১০৯।
অর্থাৎ শাফাআত থাকলেও সেটি আল্লাহর অনুমোদনাধীন। তাই কোনো ব্যক্তির মর্যাদা যত বড়ই হোক, তাকে আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার অংশীদার করা যাবে না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোরআন মানুষের ব্যক্তিগত দায়িত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার অর্জনের বিনিময়ে দায়বদ্ধ।’—সূরা আল-মুদ্দাসসির, ৭৪:৩৮।
আবার আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের জন্য তা-ই রয়েছে, যার জন্য সে চেষ্টা করেছে।’—সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩৯।
এই আয়াতগুলো মানুষের ব্যক্তিগত জবাবদিহিতার বিষয়টি সামনে আনে। একজন মানুষের ঈমান ও আমলের জায়গায় অন্য কেউ তার হয়ে পুরো দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবে—এমন ধারণা কোরআনের সাধারণ নীতির সঙ্গে মেলে না। এখানে অবশ্যই একটি ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। হাফেজে কোরআনের মর্যাদা কমিয়ে দেখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি তাঁর মর্যাদাকে কোরআনের দেওয়া সীমার বাইরে নিয়ে যাওয়াও ঠিক নয়। একজন মানুষ কোরআন মুখস্থ করেছেন—এটি তাঁর জন্য আল্লাহর একটি বড় অনুগ্রহ এবং সম্মানের বিষয়। কিন্তু সেই মর্যাদা তাঁর জন্য স্বয়ংক্রিয় জান্নাতের সনদ নয়। কোরআন আমাদের বারবার আমলের প্রতি আহ্বান করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘যে অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে এবং যে অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সে তাও দেখতে পাবে।’—সূরা আয-যিলযাল, ৯৯:৭-৮।
এই আয়াত মানুষের জীবনের প্রতিটি কাজের গুরুত্ব বোঝায়। একজন হাফেজের ক্ষেত্রেও তাঁর ভালো কাজের মূল্য রয়েছে, আবার অন্যায় কাজের জন্য জবাবদিহিও রয়েছে। কোরআন মুখস্থ করা মানুষের জবাবদিহিতা বাতিল করে দেয়—এমন কথা কোরআনে নেই।
কোরআনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন মুখস্থ করা আয়াত মানুষের চরিত্রে প্রতিফলিত হয়। কোরআন যদি মুখে থাকে কিন্তু আচরণে না থাকে, তাহলে কোরআনের উদ্দেশ্য পূর্ণতা পায় না। কোরআন মানুষকে সত্য বলতে শেখায়, অন্যায় থেকে বিরত থাকতে শেখায়, এতিমের অধিকার রক্ষা করতে শেখায়, মাপে-ওজনে কম না দিতে শেখায়, অহংকার থেকে দূরে থাকতে শেখায়, মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করতে শেখায় এবং আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার অনুভূতি তৈরি করে।
আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সৎকর্ম ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকর্ম ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।’—সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০।
তাই একজন প্রকৃত কোরআনধারীর পরিচয় শুধু তাঁর স্মৃতিশক্তিতে নয়; তাঁর চরিত্র, আচরণ, ন্যায়বোধ, আমানতদারি ও আল্লাহভীতির মধ্যেও প্রকাশ পাওয়ার কথা। এখানে আরও একটি বিষয় বিবেচ্য। আল্লাহর রহমত ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। সহিহ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আল্লাহর রহমতের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন। তবে সেই রহমত পাওয়ার অর্থ এই নয় যে মানুষ নিজের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। বরং আল্লাহর রহমতের আশায় ঈমান, সৎকর্ম ও আনুগত্যের পথে চলাই মুমিনের দায়িত্ব।
কোরআন মানুষকে একদিকে আল্লাহর রহমতের আশা করতে বলেছে, অন্যদিকে তাঁর শাস্তিকে ভয় করতেও বলেছে। আল্লাহ বলেন, ‘আমার রহমত সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করে আছে।’—সূরা আল-আ’রাফ, ৭:১৫৬। আবার আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কেও কোরআনে অসংখ্য সতর্কবার্তা রয়েছে। এই আশা ও ভয় মানুষের জীবনকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে।
সুতরাং ‘আমি হাফেজ, তাই আমার জান্নাত নিশ্চিত’—এই ধরনের আত্মতুষ্টি কোরআনের আত্মিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং একজন হাফেজের দায়িত্ব আরও গভীর হতে পারে, কারণ তাঁর অন্তরে আল্লাহর কিতাব সংরক্ষিত রয়েছে। সেই কিতাব তাঁর আচরণে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একইভাবে ‘আমার সন্তান হাফেজ, তাই সে আমাকে অবশ্যই জান্নাতে নিয়ে যাবে’—এমন নিশ্চয়তাও কোরআনের ভিত্তিতে বলা যায় না। সন্তান, পিতা-মাতা কিংবা অন্য কোনো আত্মীয়ের সৎকর্ম একজন মানুষের জন্য দোয়া, ভালোবাসা ও পারিবারিক কল্যাণের কারণ হতে পারে; কিন্তু প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত জবাবদিহিতার বিষয় কোরআন স্পষ্ট করেছে।
আল্লাহ বলেন, ‘কেউ অন্যের বোঝা বহন করবে না।’—সূরা আল-আনআম, ৬:১৬৪। একই বক্তব্য সূরা ফাতির, ৩৫:১৮ এবং সূরা আয-যুমার, ৩৯:৭-এও এসেছে।
এখানে কোরআনের একটি গভীর ন্যায়বিচারের নীতি প্রকাশ পায়—কেউ অন্যায় করলে তার দায় অন্যের ওপর চাপানো হবে না। তাই একজন হাফেজের মর্যাদাকে সম্মান করা এক বিষয়, আর তাঁর ওপর এমন পরকালীন ক্ষমতা আরোপ করা আরেক বিষয়।
কোরআন আমাদের শেখায়, জান্নাতের পথ কোনো বিশেষ সামাজিক পরিচয়ের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।’ কোরআনের বিভিন্ন স্থানে এই নীতি বারবার এসেছে। ফলে একজন মানুষের মুক্তির প্রশ্নে তাঁর ঈমান, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, সৎকর্ম, তওবা, তাকওয়া ও আল্লাহর রহমত—সবকিছু বিবেচনার বিষয়।
অন্যদিকে কোরআন মুখস্থ করা যদি মানুষকে আল্লাহর আরও কাছে নিয়ে যায়, নামাজে মনোযোগী করে, চরিত্রকে সুন্দর করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেয়, মানুষের অধিকার রক্ষা করতে শেখায় এবং নিজের ভুলের জন্য তওবা করতে উদ্বুদ্ধ করে—তাহলে সেই হিফজ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত মহৎ অর্জন।
কোরআনের প্রকৃত সম্মান কেবল তাকে বুকের মধ্যে ধারণ করা নয়; বরং তার আলোয় জীবনকে পরিচালিত করা। যে ব্যক্তি কোরআন মুখস্থ করেছেন এবং একই সঙ্গে কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজের জীবন গড়ে তুলেছেন, তাঁর মর্যাদা নিঃসন্দেহে গভীর। তবে তাঁর চূড়ান্ত পরিণতির ফয়সালা মানুষের হাতে নয়—আল্লাহর হাতে।
এ কারণেই কোরআনের আলোকে আমাদের ভাষা হওয়া উচিত সতর্ক, ভারসাম্যপূর্ণ ও দলিলনির্ভর। আমরা বলতে পারি—কোরআন হিফজ করা মহান আমল; কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক একজন মুমিনের জন্য বড় সৌভাগ্য; কোরআনের শিক্ষা অনুসরণ করা মুক্তির পথে সহায়ক; আল্লাহ চাইলে তাঁর বান্দাদের জন্য সুপারিশ কবুল করতে পারেন। কিন্তু আমরা এমন কোনো বিষয়কে আল্লাহর নিশ্চিত ঘোষণা হিসেবে প্রচার করতে পারি না, যা আল্লাহ কোরআনে ঘোষণা করেননি।
বিশেষ করে ‘প্রত্যেক হাফেজ নিশ্চিত জান্নাতি’ কিংবা ‘প্রত্যেক হাফেজ নির্দিষ্ট সংখ্যক জাহান্নাম-নির্ধারিত মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যাবে’—এই কথাগুলোকে কোরআনের আয়াত হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়। কোনো হাদিসে এ ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেলে সেটির সনদ, বক্তব্যের অর্থ এবং মুহাদ্দিসদের মূল্যায়ন পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ কোরআন ও রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর নামে কোনো কথা প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য।
কোরআন আমাদের অন্ধ অনুসরণ নয়, যাচাই ও চিন্তার শিক্ষা দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও।’—সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:৬। ধর্মীয় বক্তব্যের ক্ষেত্রেও সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের এই নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোরআন মুখস্থকারীদের প্রতি সম্মান থাকবে, কোরআন শিক্ষার প্রতি উৎসাহ থাকবে, হিফজখানার প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে, কোরআন তিলাওয়াতের প্রতি ভালোবাসা থাকবে—কিন্তু একই সঙ্গে কোরআনের প্রকৃত শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। হিফজ যেন শুধু স্মৃতির অর্জন না হয়ে চরিত্রের পরিবর্তনের কারণ হয়, কণ্ঠের তিলাওয়াত যেন জীবনের আমলে পরিণত হয়, মুখস্থ আয়াত যেন মানুষের অধিকার রক্ষার শক্তি হয়ে ওঠে—কোরআনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই।
জান্নাতের মালিক আল্লাহ। শাফাআতের মালিকও আল্লাহ। মানুষের চূড়ান্ত বিচারকও আল্লাহ। তাই কোনো মানুষকে সম্মান করতে গিয়ে এমন ক্ষমতা তাঁর ওপর আরোপ করা উচিত নয়, যা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত। কোরআনের আলোকে একজন হাফেজকে সম্মান করার সবচেয়ে সুন্দর পদ্ধতি হলো তাঁর হিফজকে কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়ার দায়িত্বের সঙ্গে দেখা।
আল্লাহ আমাদের কোরআন পড়ার, বোঝার, মুখস্থ করার, মানার এবং মানুষের কাছে তার ন্যায় ও কল্যাণের শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার তাওফিক দান করুন। কোরআন যেন শুধু আমাদের জিহ্বায় নয়, আমাদের হৃদয়ে, চরিত্রে এবং জীবনের প্রতিটি কাজে প্রতিফলিত হয়। জান্নাতের জন্য আমরা যেন কোনো পরিচয় বা অর্জনের ওপর অহংকার না করি; বরং ঈমান, আমল, তওবা, তাকওয়া এবং আল্লাহর রহমতের ওপর নির্ভর করে তাঁর সন্তুষ্টির পথে চলি। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।