October 30, 2026, 10:51 pm
শিরোনামঃ
সামাজিক কাজে রাজনীতির বিভাজন নয়, চাই সম্প্রীতি ও অংশগ্রহণ জিনা, ব্যভিচার ও সমকামিতা সম্পর্কে পবিত্র কোরআন কী বলে? আজম-মামুন-সুজন : এক বাল্য বন্ধনের গল্প প্রথম টেস্টে মুশফিকুর রহিমকে ছাড়াই ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে লাঞ্চে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৯৬/২ চট্টগ্রামে বাসে তল্লাশি, বিপুল ইয়াবাসহ একজন গ্রেপ্তার চাঁদপুরে নৌ পুলিশের অভিযানে ৪০ জেলে আটক, ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা ঘূর্ণিঝড় ‘আর্নব’ ভারতের অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম, বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত ইন্দোনেশিয়ায় বনাঞ্চলের আগুন নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ইরানের কাছে যুদ্ধ অবসানের নতুন প্রস্তাব, তেহরানের বক্তব্য—ধারণাগুলো গ্রহণযোগ্য নয়

সামাজিক কাজে রাজনীতির বিভাজন নয়, চাই সম্প্রীতি ও অংশগ্রহণ

Reporter Name

একটি সমাজে নানা রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ, ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণির মানুষ বসবাস করবে—এটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস, ধর্মীয় পরিচয় ও ব্যক্তিগত মতামত থাকতে পারে। কেউ আওয়ামী লীগের সমর্থক, কেউ বিএনপির, কেউ জামায়াতে ইসলামীর, আবার কেউ অন্য কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। এই ভিন্নতা গণতান্ত্রিক সমাজের বাস্তবতা। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যদি মানুষের সামাজিক সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা, মানবিক দায়িত্ব ও সম্প্রীতি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি সত্যিই একটি সভ্য, দায়িত্বশীল ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারছি?

রাজনীতি মানুষের জীবন ও রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ, জনস্বার্থ রক্ষা, ক্ষমতার জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হয়। কিন্তু রাজনীতির অর্থ কখনোই এমন নয় যে, রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের সব পরিচয়কে গ্রাস করবে। একজন মানুষ একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সমর্থক, পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মী এবং সমাজের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও এসব পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অটুট থাকতে পারে, বরং থাকা উচিত।

সমাজের কল্যাণে পরিচালিত কাজগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার হাতিয়ার বানানো হলে সামাজিক ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ে। অথচ সামাজিক কাজের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের উপকার করা, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা, স্থানীয় সমস্যা সমাধান করা এবং সবার জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা। সেখানে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের প্রয়োজন, যোগ্যতা, দায়িত্ববোধ ও জনকল্যাণের বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা।

মৃত্যুতে শোক, জানাজায় অংশগ্রহণ ও মানবিকতার প্রশ্ন

কোনো রাজনৈতিক দলের একজন কর্মী বা সমর্থক মারা গেলে অন্য রাজনৈতিক দলের মানুষ তাঁর জানাজায় অংশ নিতে পারবেন না—এমন ধারণা মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একজন মানুষ রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও কারও বাবা, মা, ভাই, বোন, সন্তান, বন্ধু কিংবা প্রতিবেশী। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো, শোক প্রকাশ করা এবং ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী পাশে দাঁড়ানো মানবিক দায়িত্বের অংশ।

একজন বিএনপির সমর্থক মারা গেলে আওয়ামী লীগের কোনো সমর্থক তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে পারেন। জামায়াতে ইসলামীর কোনো সমর্থকের মৃত্যুতে অন্য রাজনৈতিক মতের মানুষও মানবিক সহমর্মিতা প্রকাশ করতে পারেন। একইভাবে আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো দলের সমর্থকের মৃত্যুতেও রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারেন। এতে কারও রাজনৈতিক বিশ্বাস নষ্ট হয় না, মতাদর্শের পরিবর্তনও ঘটে না। বরং প্রমাণিত হয় যে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মানুষ মানুষকে সম্মান করতে জানে।

অবশ্য জানাজা ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ধর্মের বিধান ও ব্যক্তির বিশ্বাসের বিষয়টি বিবেচ্য। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে স্বাভাবিক মানবিক সহমর্মিতা থেকে দূরে রাখা বা শোকের মুহূর্তকে দলীয় বিরোধের উপলক্ষ বানানো কোনো সুস্থ সামাজিক সংস্কৃতির পরিচয় নয়।

মৃত্যু মানুষকে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। শোকের সময়ে মানুষের প্রয়োজন সহমর্মিতা, সান্ত্বনা ও সহযোগিতা। সেখানে রাজনৈতিক বিরোধ সামনে এনে বিভাজন সৃষ্টি করা হলে মৃত ব্যক্তির পরিবারের কষ্ট আরও বাড়তে পারে। তাই মতাদর্শের পার্থক্য থাকলেও শোকের মুহূর্তে মানবিক আচরণ বজায় রাখা প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।

সামাজিক প্রতিষ্ঠান কি দলীয় বিভাজনের জায়গা?

খেলাধুলার ক্লাব, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, পাড়া-মহল্লার উন্নয়ন কমিটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সামাজিক সংগঠন এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য সাধারণত মানুষের মধ্যে সহযোগিতা, সৌহার্দ্য, নেতৃত্বের বিকাশ, সুস্থ বিনোদন ও সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এগুলোকে যদি দলীয় বিরোধের ক্ষেত্র বানানো হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

একটি ক্রীড়া ক্লাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থক থাকতে পারেন। কেউ বিএনপি করেন, কেউ আওয়ামী লীগ করেন, কেউ জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক, আবার কেউ রাজনীতিতে আগ্রহী নন। তাঁদের সবার মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ, এলাকার তরুণদের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বিকাশের মতো সাধারণ লক্ষ্য থাকতে পারে। ক্লাব পরিচালনায় যদি যোগ্যতা, স্বচ্ছতা, নিয়মনীতি ও সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও সবাই একসঙ্গে কাজ করতে পারবেন।

কিন্তু ক্লাবের সদস্য নির্বাচন, খেলাধুলার আয়োজন, মাঠ ব্যবহারের সুযোগ, অর্থ ব্যয় কিংবা পুরস্কার বিতরণের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়কে প্রধান বিবেচনা করা হলে বিরোধ তৈরি হতে পারে। কোনো খেলোয়াড়কে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা, কোনো দলের সমর্থকদের ক্লাবে প্রবেশে বাধা দেওয়া কিংবা সামাজিক সম্পদকে একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।

একই কথা সাংস্কৃতিক সংগঠন, পাঠাগার ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এসব জায়গায় রাজনৈতিক মতের বৈচিত্র্য থাকতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া উচিত নির্ধারিত নিয়ম, সদস্যদের অধিকার এবং জনকল্যাণের লক্ষ্য অনুসারে। কেউ রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে চাইলে তারও উপযুক্ত পরিসর থাকতে পারে; তবে কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মূল কার্যক্রমকে জোর করে দলীয় প্রচারের মঞ্চে পরিণত করা উচিত নয়।

এর অর্থ এই নয় যে, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে পারবেন না বা তাঁদের রাজনৈতিক মতামত থাকবে না। বরং মূল কথা হলো, প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও দায়িত্ব যেন দলীয় স্বার্থের কাছে পরাজিত না হয়। সামাজিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে, কিন্তু সেই পরিচয় যেন মানুষের ন্যায্য অধিকার ও অংশগ্রহণের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।

মসজিদ ও কবরস্থান পরিচালনায় ন্যায়নীতি ও ঐক্যের প্রয়োজন

মসজিদ ও কবরস্থান সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। মসজিদ মুসলমানদের ইবাদত, ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক চর্চার কেন্দ্র। আর কবরস্থান মানুষের জীবনের শেষ পর্বের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রয়োজনীয় সামাজিক ব্যবস্থা। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, সামাজিক দায়িত্ব এবং পারস্পরিক সহযোগিতা গভীরভাবে জড়িত।

তাই মসজিদ বা কবরস্থানের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে একমাত্র যোগ্যতার মাপকাঠি করা উচিত নয়। কমিটির সদস্যদের সততা, দায়িত্বশীলতা, আমানতদারি, কাজ করার সক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মানসিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় মানুষের মতামত, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম এবং প্রযোজ্য আইন মেনে কমিটি গঠিত হলে পরিচালনায় গ্রহণযোগ্যতা ও জবাবদিহি বাড়ে।

মসজিদের উন্নয়ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ইমাম ও মুয়াজ্জিনের যথাযথ সম্মান, ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশ এবং দানের অর্থের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একইভাবে কবরস্থানের সীমানা রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, চলাচলের পথ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং দাফনসংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করাও জরুরি। এসব কাজের জন্য প্রয়োজন সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক আস্থা—দলীয় প্রতিযোগিতা নয়।

কোনো এলাকায় মসজিদ বা কবরস্থানের উন্নয়নে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ অর্থ, শ্রম ও সময় দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন। তাঁদের অবদানকে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন না করে কাজের বাস্তব প্রয়োজন ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিবেচনা করা উচিত। কেউ একটি রাজনৈতিক দল করেন বলে তাঁর সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান করা কিংবা অন্য দলের সমর্থক বলে তাঁকে কমিটি থেকে দূরে রাখা সামাজিক বিভাজন বাড়াতে পারে।

তবে মসজিদ বা কবরস্থানের কমিটি যেন কোনো ব্যক্তির একক কর্তৃত্বের জায়গা হয়ে না ওঠে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরামর্শ, দায়িত্বের স্পষ্ট বণ্টন এবং অভিযোগ জানানোর ন্যায্য ব্যবস্থা থাকা উচিত। কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা প্রমাণ ও নিয়মের ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে; রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কাউকে অভিযুক্ত করা যেমন অন্যায়, তেমনি দলীয় পরিচয়ের কারণে প্রকৃত অনিয়ম উপেক্ষা করাও অনুচিত।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কবরস্থানের মতো সংবেদনশীল জায়গায় মানুষের মধ্যে ঐক্য, শালীনতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা বিশেষভাবে প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এগুলোর পরিচালনা হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় বিধান, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম, স্থানীয় মানুষের বৈধ অংশগ্রহণ এবং প্রযোজ্য আইনের আলোকে।

রাজনীতি ও সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে

রাজনীতি এবং সামাজিক কাজের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু দুটিকে এক করে দেখা ঠিক নয়। রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো জনস্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রাষ্ট্র পরিচালনা, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নীতি নির্ধারণে অংশ নেওয়া। অন্যদিকে সামাজিক কাজের পরিসর আরও বিস্তৃত। প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া, দরিদ্র পরিবারের সহায়তায় এগিয়ে আসা, রাস্তা পরিষ্কার করা, জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া, রক্তদানে সহযোগিতা করা, দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণ করা কিংবা এলাকার শিশুদের জন্য খেলাধুলার ব্যবস্থা করা—এসবই সামাজিক দায়িত্বের অংশ।

এসব কাজের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মীরাও যুক্ত হতে পারেন। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোও জনকল্যাণমূলক কাজ করতে পারে। কিন্তু কোনো কাজের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা থাকলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারাপ হয়ে যায় না; আবার কোনো কাজকে সামাজিক কাজ বলে দাবি করলেই তা দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে যায় না। আসল বিবেচ্য হলো কাজটির উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, স্বচ্ছতা, মানুষের অংশগ্রহণ এবং এর সুফল কারা পাচ্ছেন।

ধরা যাক, কোনো এলাকায় বন্যায় বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে রাজনৈতিক দলের পরিচয় বিবেচনা না করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। ত্রাণ বিতরণে দলীয় আনুগত্যকে শর্ত করা হলে সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষও বঞ্চিত হতে পারেন। মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ও ন্যায্যতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।

একইভাবে কোনো এলাকায় রাস্তা মেরামত, ড্রেন পরিষ্কার, শিক্ষার্থীদের সহায়তা কিংবা শীতার্ত মানুষের মধ্যে কম্বল বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অংশ নিতে পারেন। কারও রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন বলে তাঁর শ্রম বা সহযোগিতাকে অগ্রাহ্য করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সামাজিক কাজের সাফল্য নির্ভর করে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর, রাজনৈতিক পরিচয়ের একরূপতার ওপর নয়।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন: সামাজিক কাজের সঙ্গে রাজনীতি কখনোই কোনোভাবে যুক্ত হতে পারবে না—এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়। স্থানীয় উন্নয়ন, নাগরিক অধিকার, বাজেট, সরকারি সেবা ও জননীতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে রাজনীতি আসতেই পারে। কিন্তু রাজনৈতিক আলোচনা এবং রাজনৈতিক বিদ্বেষ এক বিষয় নয়। জনস্বার্থের প্রশ্নে মতভেদ থাকলেও যুক্তি, তথ্য ও নিয়মের ভিত্তিতে আলোচনা করা যায়। বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে দেখার পরিবর্তে তাকে গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন।

মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু শত্রুতা কেন?

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সবাই একই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করবেন—এমন প্রত্যাশা অযৌক্তিক। মানুষের অভিজ্ঞতা, চিন্তাভাবনা, শিক্ষা, সামাজিক অবস্থান ও রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা ভিন্ন হতে পারে। সে কারণে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই। কেউ একটি দলের নীতি সমর্থন করবেন, কেউ তার সমালোচনা করবেন। কেউ সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে থাকবেন, কেউ বিরোধিতা করবেন। এই মতভিন্নতা প্রকাশের অধিকার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন মতপার্থক্যকে ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে অপমান করা, তাঁর পরিবারকে আক্রমণ করা, সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য অন্যদের চাপ দেওয়া কিংবা তাঁর স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার বাধাগ্রস্ত করা সুস্থ রাজনৈতিক আচরণ নয়। রাজনৈতিক বক্তব্যের সমালোচনা করা যায়, নীতির বিরোধিতা করা যায়, কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করা যায়; কিন্তু ব্যক্তির মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করা উচিত নয়।

একজন মানুষের রাজনৈতিক মতামত তাঁর পরিচয়ের একটি অংশমাত্র। সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁর সততা, মানবিকতা কিংবা সামাজিক অবদান সম্পর্কে আগাম সিদ্ধান্ত নেওয়া অন্যায্য। কোনো ব্যক্তি একটি দলের সমর্থক হয়েও সৎ, পরোপকারী ও দায়িত্বশীল হতে পারেন; আবার অন্য কোনো দলের সদস্য হয়েও কেউ অনৈতিক আচরণ করতে পারেন। তাই মানুষের কাজ ও আচরণ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে প্রমাণ, ন্যায়বোধ ও বাস্তব কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

রাজনৈতিক বিরোধের কারণে দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী সম্পর্ক নষ্ট হলে তার প্রভাব শুধু দুজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবার, সন্তান, আত্মীয়স্বজন এবং পুরো পাড়া-মহল্লার পরিবেশে তার প্রভাব পড়তে পারে। একসময় একই মাঠে খেলাধুলা করা তরুণেরা পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে, সামাজিক অনুষ্ঠানে মানুষ একে অপরকে এড়িয়ে চলে, এমনকি অসুস্থতা বা বিপদের সময় সাহায্য করতেও দ্বিধা করে। এভাবে রাজনৈতিক বিভাজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সংকুচিত করে ফেলে।

অথচ মতভেদ থাকা সত্ত্বেও মানুষ একসঙ্গে বসবাস করতে পারে। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে একই রাজনৈতিক মতের প্রয়োজন নেই। বিপদের সময় পাশে দাঁড়াতে একই দলের সদস্য হওয়া জরুরি নয়। সমাজের উন্নয়নে কাজ করতে একই মতাদর্শের অনুসারী হওয়াও বাধ্যতামূলক নয়। প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ।

সামাজিক ঐক্য মানে মতভেদ মুছে ফেলা নয়

সামাজিক ঐক্যের অর্থ এই নয় যে, সবাইকে নিজের মতামত ত্যাগ করতে হবে কিংবা সব বিষয়ে একমত হতে হবে। বরং ঐক্য হলো ভিন্নতা বজায় রেখেও যৌথ স্বার্থে কাজ করার সক্ষমতা। একটি এলাকায় বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মানুষ থাকতে পারেন। তাঁরা নিজ নিজ বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেও এলাকার পানি, রাস্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতার সমস্যা সমাধানে একসঙ্গে কাজ করতে পারেন।

এই ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা জরুরি। কোনো ক্লাব, সমিতি বা কমিটির সিদ্ধান্ত যেন অল্প কয়েকজনের ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভর না করে। সদস্যদের মতামত শোনার সুযোগ থাকতে হবে, দায়িত্ব বণ্টনে ন্যায্যতা বজায় রাখতে হবে এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। মতভেদ দেখা দিলে আলোচনা, মধ্যস্থতা ও প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুসরণ করে সমাধান খোঁজা উচিত।

সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগও সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা প্রয়োজন, যদি সংশ্লিষ্ট কাজের নিয়ম ও যোগ্যতার শর্ত পূরণ করা হয়। কেউ কোনো উদ্যোগের সমালোচনা করলে তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা না করে তার বক্তব্যের যৌক্তিকতা যাচাই করা উচিত। সমালোচনা যদি তথ্যভিত্তিক হয়, তাহলে তা ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। আর সমালোচনা যদি অসংগত হয়, তবে যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে তার জবাব দেওয়া সম্ভব।

এখানে নেতৃত্বের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাঁদের আচরণে পক্ষপাত দেখা দিলে সদস্যদের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়তে পারে। বিপরীতে নেতৃত্ব যদি ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সবার কথা শোনে এবং নিজের দায়িত্বের হিসাব দিতে প্রস্তুত থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পায়।

মানবিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি

মানবিকতা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক সম্পদ নয়। সহমর্মিতা, সততা, ন্যায়বিচার, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো মূল্যবোধ সব সুস্থ সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় শিক্ষাও মানুষের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা, দয়া, দায়িত্ববোধ ও উত্তম আচরণের গুরুত্ব তুলে ধরে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন; আর অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০)। এই আয়াত ন্যায়বিচার ও সদাচরণের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। সামাজিক জীবনে এই নীতিগুলো অনুসরণ করতে হলে মানুষের অধিকার রক্ষা, অন্যের প্রতি সুবিচার এবং দায়িত্বশীল আচরণকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে, “হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো।” (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩)। এই আয়াত মানুষের পারস্পরিক পরিচয় ও বৈচিত্র্যের কথা তুলে ধরে। ভিন্ন পরিচয়কে কেবল বিরোধের কারণ হিসেবে না দেখে পারস্পরিক পরিচিতি ও বোঝাপড়ার সুযোগ হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।

সামাজিক জীবনে ন্যায়বিচার বজায় রাখার নির্দেশও কোরআনে স্পষ্টভাবে এসেছে। সূরা আন-নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে ন্যায়বিচারে দৃঢ় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এমনকি তা নিজের বা নিকটাত্মীয়দের স্বার্থের বিরুদ্ধেও গেলেও। এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা দলীয় আনুগত্যের কারণে ন্যায়বিচার থেকে সরে আসা উচিত নয়।

ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রকৃত প্রয়োগ কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মানুষের সঙ্গে আচরণ, দুর্বল ও অসহায় ব্যক্তির প্রতি দায়িত্ব, আমানত রক্ষা, অন্যের অধিকার সম্মান করা এবং বিরোধের সময় সংযম প্রদর্শনের মধ্যেও তার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। ধর্মীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক বিশ্বাসকে অন্যকে অপমান করার হাতিয়ার বানালে মানবিক মূল্যবোধই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সুস্থ সমাজ গঠনে আমাদের করণীয়

একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য রাজনৈতিক দল, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব, পরিবার এবং সাধারণ নাগরিক—সবারই ভূমিকা রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সহনশীলতা, আইন মানার সংস্কৃতি এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মানবোধ জোরদার করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সামাজিক সম্পর্ক ধ্বংসের কারণ হতে না দিয়ে নীতি, কর্মসূচি ও জনসেবার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ রাখা প্রয়োজন।

সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার অর্থ রাজনৈতিক মতামত নিষিদ্ধ করা নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত উদ্দেশ্য, নিয়ম ও সবার ন্যায্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ক্লাবের দায়িত্ব হবে খেলাধুলা ও তরুণদের বিকাশে কাজ করা, পাঠাগারের দায়িত্ব জ্ঞানচর্চার সুযোগ তৈরি করা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের দায়িত্ব মানুষের প্রয়োজনের পাশে দাঁড়ানো, আর মসজিদ ও কবরস্থান কমিটির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিধি আলাদা হলেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়সংগত আচরণ সবার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবারেও শিশুদের শেখানো প্রয়োজন যে, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেই কাউকে ঘৃণা করতে হয় না। অন্যের মতামত শোনা, যুক্তি দিয়ে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করা, ভুল হলে তা স্বীকার করা এবং ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে সৌজন্য বজায় রাখা সভ্য নাগরিক হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই দায়িত্ব প্রযোজ্য। যাচাই না করে কোনো তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে অপমান করা কিংবা উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচার করা সমাজে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্বশীলতার চর্চাও প্রয়োজন।

স্থানীয় পর্যায়ে যৌথ উদ্যোগ সামাজিক সম্প্রীতি বাড়াতে পারে। এলাকার রাস্তা পরিষ্কার, বৃক্ষরোপণ, রক্তদান কর্মসূচি, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা, দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণ কিংবা খেলাধুলার আয়োজনের মতো কাজে বিভিন্ন মতের মানুষকে একত্র করা যেতে পারে। এসব উদ্যোগে সবার দায়িত্ব ও অবদান স্বচ্ছভাবে নির্ধারিত হলে পারস্পরিক আস্থা বাড়ে। মানুষ যখন একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তখন ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষকেও সহযোগী হিসেবে দেখতে শেখে।

শেষ কথা

রাজনীতি সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু সমাজের সবকিছু রাজনীতি দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষের পারিবারিক সম্পর্ক, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব, শোকের মুহূর্তে সহমর্মিতা, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের নিজস্ব মানবিক মূল্য রয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু সেই পার্থক্যকে ঘৃণা, বর্জন ও প্রতিহিংসায় রূপ দেওয়া কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।

একটি সভ্য সমাজে মানুষ নিজের দল, মত ও বিশ্বাসের প্রতি অনুগত থাকতে পারে, একই সঙ্গে অন্যের অধিকার ও মর্যাদার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হতে পারে। কেউ যে রাজনৈতিক দলই সমর্থন করুন না কেন, তাঁর ন্যায্য অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগকে সম্মান করা প্রয়োজন। সামাজিক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হবে নিয়ম, স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে; মসজিদ ও কবরস্থান পরিচালিত হবে দায়িত্বশীলতা, ন্যায়নীতি এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান মেনে; আর জনকল্যাণমূলক কাজের ক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজন ও অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

মনে রাখা দরকার, মতের অমিল থাকা মানেই সম্পর্কের অবসান নয়। রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এলাকার উন্নয়ন, মানুষের কল্যাণ, দুর্যোগে সহযোগিতা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো সবার যৌথ দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের জন্য সবাইকে একই রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে হবে না; প্রয়োজন শুধু ন্যায়বোধ, সহনশীলতা, সহযোগিতার মানসিকতা এবং মানুষের প্রতি সম্মান।

আমরা যদি সত্যিই একটি মানবিক, সভ্য ও উন্নত সমাজ চাই, তাহলে দলীয় পরিচয়ের দেয়াল উঁচু করার পরিবর্তে পারস্পরিক আস্থার সেতু নির্মাণ করতে হবে। রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকুক রাজনীতির জায়গায়, আর সামাজিক সম্পর্ক ও জনকল্যাণ পরিচালিত হোক ন্যায়, মানবিকতা ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে। কারণ সমাজের শক্তি একরূপতায় নয়, বরং ভিন্নতা সত্ত্বেও একসঙ্গে কাজ করার সামর্থ্যে।

 

লেখক :

মোঃ আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা