October 18, 2026, 10:05 pm
শিরোনামঃ
আল কোরআনের আলোকে পাপের চূড়ান্ত বিচারক একমাত্র আল্লাহ! কক্সবাজারের রিসোর্টে আগুনে নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ সুন্দরবনের আশপাশে অনুমোদনহীন রিসোর্ট, পরিবেশ ও পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ দুর্নীতির মামলায় সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান গ্রেপ্তার কক্সবাজারের রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মালিক ও ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে মামলা লিওনেল মেসির জোড়া গোল, আটলান্টা ইউনাইটেডকে হারাল ইন্টার মায়ামি সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত, রাতে সামান্য কমতে পারে মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রী, রাজনৈতিক ও জননিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ঘিরে পরিবহন, প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আশা ইয়েমেনে বিমান হামলায় অন্তত ৯ জন নিহত, নিহতদের মধ্যে পাঁচ শিশু

আল কোরআনের আলোকে পাপের চূড়ান্ত বিচারক একমাত্র আল্লাহ!

Reporter Name

মানুষের জীবনে পাপ, পুণ্য, ন্যায়, অন্যায়, অপরাধ ও ক্ষমার প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ প্রতিদিন নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং নিজের বিবেক, সামাজিক নিয়ম, ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের আলোকে সেসব কাজের ভালো-মন্দ বিচার করার চেষ্টা করে। কিন্তু কোনো মানুষের কাজকে পাপ বলে চিহ্নিত করার অধিকার কার, কারও অন্তরের গোপন উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা কার, কে মানুষের অপরাধের প্রকৃত মাত্রা জানেন এবং কে শেষ পর্যন্ত তার পাপের প্রতিদান কিংবা ক্ষমার সিদ্ধান্ত দেবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে পবিত্র আল-কোরআনের শিক্ষা গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। ইসলামের দৃষ্টিতে পাপের চূড়ান্ত বিচারক একমাত্র মহান আল্লাহ। তিনি মানুষের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান এবং ন্যায়বিচারের অধিকারী। মানুষের প্রকাশ্য কাজ যেমন তাঁর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত, তেমনি মানুষের অন্তরের চিন্তা, গোপন উদ্দেশ্য, অনুশোচনা, দুর্বলতা ও সংশোধনের প্রচেষ্টাও তাঁর অজানা নয়। মানুষ বাইরের আচরণ দেখে কোনো কাজ সম্পর্কে ধারণা করতে পারে, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করতে পারে এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আইন প্রয়োগ করতে পারে; কিন্তু কারও অন্তরের পূর্ণ অবস্থা, তার চূড়ান্ত পরিণতি এবং আল্লাহর কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার মানুষের নেই। এই বিষয়টি বুঝতে হলে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখতে হবে: আল্লাহর কাছে পাপের চূড়ান্ত বিচার এবং মানুষের দায়িত্বের মধ্যে থাকা ন্যায়সংগত বিচার এক বিষয় নয়। আল্লাহ মানুষের সব কাজের চূড়ান্ত হিসাব গ্রহণ করবেন। অন্যদিকে, মানুষের সমাজে সংঘটিত অপরাধ, অধিকার লঙ্ঘন, জুলুম ও ক্ষতির ক্ষেত্রে যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ, ন্যায়নীতি এবং প্রযোজ্য বিধান অনুসারে বিচার প্রতিষ্ঠা করা মানুষের সামাজিক ও আইনগত দায়িত্বের অংশ। তাই ‘পাপের বিচার করার মালিক কে’—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আল্লাহর একচ্ছত্র চূড়ান্ত বিচারক্ষমতার পাশাপাশি মানুষের সীমিত দায়িত্ব, ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তা, ক্ষমার গুরুত্ব এবং তওবার সুযোগও বুঝতে হবে।

পবিত্র আল-কোরআন মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সতর্ক করে, নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখায়, অন্যের প্রতি অবিচার থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয় এবং একই সঙ্গে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়ার শিক্ষা দেয়। কোরআনের এই সামগ্রিক শিক্ষা অনুসারে কোনো মানুষ নিজেকে পাপমুক্ত ঘোষণা করতে পারে না, আবার অন্য কাউকে নিজের ইচ্ছায় আল্লাহর রহমত থেকে চিরতরে বঞ্চিত বলেও ঘোষণা করতে পারে না। মানুষের দায়িত্ব হলো সত্য অনুসন্ধান করা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, নিজের ভুল সংশোধন করা এবং অন্যের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম না করা।

 

# পাপের চূড়ান্ত বিচারক একমাত্র আল্লাহ

পবিত্র আল-কোরআনের বহু আয়াতে মহান আল্লাহর বিচারক্ষমতা, সর্বজ্ঞতা এবং মানুষের কর্মের হিসাব গ্রহণের কথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়ার অর্থ কেবল বিপদের সময় সাহায্য চাওয়া নয়; বরং বিশ্বাস করা যে মানুষের জীবনে ন্যায় ও অন্যায়ের প্রকৃত মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছেই হবে। পৃথিবীতে কেউ ক্ষমতার জোরে অপরাধ আড়াল করতে পারে, অর্থের বিনিময়ে সাক্ষ্য পরিবর্তন করাতে পারে, সামাজিক মর্যাদা ব্যবহার করে অন্যায়কে বৈধ বলে প্রতিষ্ঠা করতে পারে কিংবা মানুষের চোখে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞানের সামনে এসব কৌশলের কোনো মূল্য নেই।

সূরা আল-আনআমের ৫৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “বিচার করার অধিকার একমাত্র আল্লাহর।” আয়াতটির বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও প্রকৃত কর্তৃত্ব আল্লাহরই। তিনি সত্য প্রকাশ করেন এবং তিনিই সর্বোত্তম ফয়সালাকারী। এই শিক্ষা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে কোনো ব্যক্তি, পরিবার, দল, গোষ্ঠী কিংবা ক্ষমতাবান শ্রেণি নিজেদের ইচ্ছাকে আল্লাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সমতুল্য মনে করতে পারে না। মানুষের তৈরি নিয়ম ও আদালত সামাজিক জীবনে প্রয়োজনীয় হলেও সেগুলো আল্লাহর সর্বজ্ঞ বিচারক্ষমতার বিকল্প নয়।

সূরা আল-গাফিরের ১২ নম্বর আয়াতে আল্লাহর বিচার ও কর্তৃত্বের প্রসঙ্গ এসেছে। সূরা আল-আম্বিয়ার ৪৭ নম্বর আয়াতে কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা স্থাপনের কথা বলা হয়েছে; কারও প্রতি সামান্যতম জুলুম করা হবে না, এমনকি সরিষার দানা পরিমাণ কাজও সামনে আনা হবে। এ আয়াতের শিক্ষা হলো, আল্লাহর বিচার কোনো পক্ষপাত, ভুল তথ্য, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ কিংবা ক্ষমতাবানের প্রভাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। মানুষ অনেক সময় বড় অপরাধকে ছোট করে দেখে, আবার সামান্য ভুলকে অতিরঞ্জিত করে অন্যকে অপমান করে। কিন্তু আল্লাহর বিচার মানুষের এই অসমতা ও সীমাবদ্ধতার অধীন নয়।

সূরা আল-জাসিয়ার ২১ ও ২২ নম্বর আয়াতে মন্দ কাজকারীদের জীবন ও মৃত্যু সৎকর্মশীলদের মতো হবে—এমন ধারণার অসারতা তুলে ধরা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে, যাতে প্রত্যেক প্রাণ তার উপার্জিত কাজের প্রতিফল পায় এবং কারও প্রতি জুলুম না হয়। এখানে ‘উপার্জিত কাজ’ বলতে মানুষের দায়িত্বপূর্ণ কাজ ও তার পরিণতির কথা বোঝানো হয়েছে। মানুষের কাজের হিসাব গ্রহণের এই নীতি জানিয়ে দেয় যে নৈতিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কেউ যদি মনে করে, সমাজে তার অপরাধ প্রকাশ পায়নি বলে সে দায়মুক্ত, তবে সে কোরআনের শিক্ষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। কোনো অপরাধের প্রমাণ মানুষের কাছে না থাকলেও আল্লাহর কাছে তা অজানা নয়। আবার কেউ যদি মনে করে, মানুষ তাকে অপরাধী বলেছে বলেই আল্লাহর কাছে তার অপরাধ প্রমাণিত হয়ে গেছে, সেটিও ভুল। মানুষের বক্তব্য, গুজব, অভিযোগ কিংবা জনমত আল্লাহর চূড়ান্ত বিচারের সমান নয়। আল্লাহই জানেন প্রকৃত ঘটনা কী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা কী ছিল এবং কোন পরিস্থিতিতে কাজটি সংঘটিত হয়েছে।

 

# আল্লাহ মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছু জানেন

মানুষের বিচারক্ষমতা সীমিত। আমরা চোখে যা দেখি, কানে যা শুনি, সাক্ষীদের কাছ থেকে যা জানতে পারি এবং যুক্তি দিয়ে যা অনুমান করি, তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আমাদের জ্ঞান কখনোই পূর্ণাঙ্গ নয়। একটি ঘটনার কিছু অংশ জানার অর্থ পুরো ঘটনা জানা নয়। একজন মানুষের আচরণের একটি দিক দেখে তার সমগ্র চরিত্রের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করাও যুক্তিসংগত নয়। মানুষের মন, উদ্দেশ্য, অজানা পরিস্থিতি ও অনুশোচনার গভীরতা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান কেবল আল্লাহরই রয়েছে।

সূরা আল-বাকারা ২৮৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর; মানুষের অন্তরে যা রয়েছে, তা প্রকাশ করুক বা গোপন রাখুক, আল্লাহ তার হিসাব নেবেন। এই আয়াত মানুষকে নিজের অন্তরের ব্যাপারে সতর্ক করে। কারণ পাপ কেবল প্রকাশ্য আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের নিয়ত, গোপন ষড়যন্ত্র, বিদ্বেষ, প্রতারণার পরিকল্পনা এবং অন্যের ক্ষতি করার ইচ্ছাও নৈতিক জবাবদিহির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে কোনো চিন্তা মনে আসা, অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো কল্পনা তৈরি হওয়া এবং সেই চিন্তাকে সচেতনভাবে কাজে রূপ দেওয়া এক বিষয় নয়। এসবের সূক্ষ্ম পার্থক্য ও মানুষের ওপর প্রকৃত দায় কতটুকু, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আল্লাহর জ্ঞান ও ন্যায়বিচারই পূর্ণাঙ্গ।

সূরা আত-তাগাবুনের ৪ নম্বর আয়াতে আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন এবং মানুষ যা গোপন করে ও যা প্রকাশ করে তাও তিনি জানেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আল-মুলকের ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতেও মানুষের কথা গোপন রাখা কিংবা প্রকাশ করার বিষয় এবং আল্লাহর অন্তরের খবর জানার ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। এসব আয়াতের আলোকে বোঝা যায়, মানুষের পক্ষে অন্যের গোপন অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত দাবি করা অনুচিত। যে ব্যক্তি নিজের অন্তরের সব অবস্থাও সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারে না, তার পক্ষে অন্যের অন্তর সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার দাবি আরও দুর্বল। ধরা যাক, একজন মানুষ কোনো ভুল করেছেন। বাইরে থেকে দেখা গেল, তিনি একটি অন্যায় কাজ করেছেন। কিন্তু ঘটনাটির পেছনে কী পরিস্থিতি ছিল, তিনি বিষয়টি বুঝে করেছিলেন কি না, তার ওপর জবরদস্তি ছিল কি না, পরে তিনি অনুতপ্ত হয়েছেন কি না কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন কি না—এসব বিষয় জানা ছাড়া তার সমগ্র জীবন ও চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। এর অর্থ এই নয় যে ভুলকে ভুল বলা যাবে না। বরং এর অর্থ হলো, কাজের নৈতিক মূল্যায়ন করতে হবে, কিন্তু নিজের সীমিত জ্ঞানকে আল্লাহর সর্বজ্ঞতার আসনে বসানো যাবে না।

সূরা আল-ইসরা ৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যে বিষয়ে মানুষের জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ না করতে; কারণ কান, চোখ ও অন্তর—এসবের প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে পাপী বলার আগে প্রশ্ন করতে হবে, অভিযোগের ভিত্তি কী? তথ্য নির্ভরযোগ্য কি না? প্রত্যক্ষ প্রমাণ আছে কি? নাকি ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, অনুমান, গুজব কিংবা অন্যের মুখে শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হচ্ছে? কোরআনের নির্দেশ হলো, জ্ঞানহীন বক্তব্য ও অনুসরণ থেকে বিরত থাকা। সুতরাং কাউকে অপমান করার জন্য ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করা, ভিত্তিহীনভাবে তার চরিত্রে দাগ লাগানো কিংবা আল্লাহর নামে নিজের অনুমানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ঘোষণা করা কোরআনের সতর্কতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

 

# পাপ কী, তা নির্ধারণের ভিত্তি কী?

পাপের বিচার করার মালিক কে—এ প্রশ্নের সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন যুক্ত: পাপ কী, তা নির্ধারণ করা হবে কোন ভিত্তিতে? ইসলামের দৃষ্টিতে পাপের ধারণা ব্যক্তিগত পছন্দ, সামাজিক প্রচলন কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নয়। আল্লাহর নির্দেশ, নিষেধ, নৈতিক বিধান এবং মানুষের প্রতি দায়িত্বের আলোকে কাজের ভালো-মন্দ বিচার করা হয়। মানুষের ইচ্ছা কোনো কাজকে বৈধ করে দিতে পারে না, যদি তা আল্লাহর নির্দেশের বিরোধী হয়; আবার কোনো সমাজে কোনো কাজ প্রচলিত হলেই তা ন্যায়সংগত হয়ে যায় না।

সূরা আল-আ’রাফের ৩৩ নম্বর আয়াতে প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, পাপ, অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন, আল্লাহর সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করা যার পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ নাজিল করেননি এবং আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা বলাকে নিষিদ্ধ বিষয়ের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াত দেখায়, পাপের ধারণা শুধু ব্যক্তিগত আচার-আচরণে সীমাবদ্ধ নয়। অন্যের ওপর জুলুম, সীমা লঙ্ঘন, অনৈতিকতা এবং আল্লাহ সম্পর্কে ভিত্তিহীন বক্তব্যও গুরুতর বিষয়।

সূরা আন-নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেছেন। এই আয়াতের আলোকে বোঝা যায়, ধর্মীয় জীবন শুধু নিষিদ্ধ কাজ এড়িয়ে চলার নাম নয়; ন্যায় প্রতিষ্ঠা, মানুষের সঙ্গে সদাচরণ এবং দায়িত্ব পালনও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কেউ যদি নিজেকে ধর্মপরায়ণ বলে দাবি করে, অথচ অন্যের অধিকার নষ্ট করে, দুর্বলকে অত্যাচার করে কিংবা অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করে, তাহলে তার দাবির সঙ্গে তার কাজের বিরোধ দেখা দেয়।

সূরা আল-বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে অন্যায়ভাবে পরস্পরের সম্পদ ভক্ষণ করতে এবং জেনেশুনে মানুষের সম্পদের কোনো অংশ অন্যায় উপায়ে গ্রাস করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে তা পেশ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এ নির্দেশ প্রমাণ করে, পাপের বিচার শুধু ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নয়; মানুষের সম্পদ, অধিকার, সামাজিক ন্যায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গেও সম্পর্কিত। কেউ অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ আত্মসাৎ করলে বিষয়টি শুধু তার ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক দুর্বলতা নয়; ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকারও সেখানে জড়িত। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখা দরকার: আল্লাহর বিধানকে নিজের ব্যক্তিগত রাগ, প্রতিহিংসা বা স্বার্থের হাতিয়ার বানানো যাবে না। ধর্মীয় বিধানের ব্যাখ্যা দিতে হলে জ্ঞান, সততা, প্রাসঙ্গিকতা এবং দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি নিজের অপছন্দের মানুষকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো কাজকে পাপ বলে ঘোষণা করতে পারেন না। আবার নিজের পছন্দের মানুষ অন্যায় করলে তাকে রক্ষা করার জন্য অন্যায়কে ন্যায় বলে চালিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। কোরআন মানুষকে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে এবং নিজের পক্ষের লোকের ক্ষেত্রেও ন্যায় বজায় রাখতে শিক্ষা দেয়।

 

# মানুষ কি অন্য মানুষের পাপের বিচার করতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে ‘বিচার’ শব্দটির বিভিন্ন অর্থ আলাদা করে বুঝতে হবে। যদি বিচার বলতে বোঝানো হয়—কে আল্লাহর কাছে চূড়ান্তভাবে ক্ষমা পাবে, কার অন্তরের অবস্থা কেমন, কার পরিণতি জান্নাত বা জাহান্নাম হবে—তাহলে সে সিদ্ধান্তের মালিক আল্লাহ। কিন্তু বিচার বলতে যদি বোঝানো হয়—সমাজে সংঘটিত অপরাধের সত্যতা যাচাই, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার রক্ষা, অপরাধের প্রমাণ পরীক্ষা এবং ন্যায়সংগত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ—তাহলে মানুষ ও সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। এই দুই বিষয়কে এক করে ফেললে কখনো মানুষ অন্যের ওপর অযাচিত ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, আবার কখনো অপরাধের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণকেও ভুলভাবে নিষিদ্ধ মনে করে।

পবিত্র কোরআন মানুষকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে। সূরা আন-নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে আমানত তার হকদারের কাছে ফিরিয়ে দিতে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচার করতে বলা হয়েছে। এই নির্দেশ থেকে স্পষ্ট যে মানুষের সমাজে বিচারব্যবস্থা ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের প্রয়োজন রয়েছে। কোনো অপরাধ ঘটলে তার তদন্ত, প্রমাণ যাচাই, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তের ব্যবস্থা করা মানুষের দায়িত্বের অংশ। তবে এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, পক্ষপাত, প্রতিশোধ কিংবা অনুমানকে প্রমাণের জায়গায় বসানো যাবে না।

সূরা আন-নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে মুমিনদের ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকতে এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দিতে বলা হয়েছে—যদিও সেই সাক্ষ্য নিজের, নিজের মা-বাবা কিংবা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে যায়। ধনী বা দরিদ্র—কোনো পরিচয় যেন ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না করে, সে নির্দেশও আয়াতটিতে রয়েছে। এ আয়াতের শিক্ষা হলো, সত্যের প্রশ্নে আত্মীয়তা, দলীয় পরিচয়, অর্থ, ক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিগত আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। নিজের ঘনিষ্ঠ কেউ অন্যায় করলে তার অন্যায়কে ঢেকে দেওয়া যেমন ন্যায়বিচারের পরিপন্থী, তেমনি শত্রু বলে কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করাও অন্যায়।

সূরা আল-মায়িদার ৮ নম্বর আয়াতে কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন মানুষকে ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করতে প্ররোচিত না করে, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। অর্থাৎ, কারও প্রতি ঘৃণা থাকলেও তার সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করতে হবে। এই নির্দেশ ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক মতভেদ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক সংঘাত—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কাউকে অপছন্দ করি বলে তার প্রতিটি কাজকে পাপ হিসেবে দেখব, তার ভালো কাজ অস্বীকার করব কিংবা তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়াব—এমন মনোভাব কোরআনের ন্যায়নীতির সঙ্গে যায় না। মানুষ যখন আইনগত বা সামাজিক বিচার করে, তখন তাকে প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হতে পারে; কিন্তু তদন্তের আগে কাউকে নিশ্চিত অপরাধী ঘোষণা করা ন্যায়সংগত নয়। আবার প্রমাণিত অন্যায়কে ক্ষমতার প্রভাব, অর্থ বা পরিচয়ের কারণে আড়াল করাও ন্যায়বিচার নয়। কোরআনের শিক্ষা মানুষকে এই দুই ধরনের অন্যায় থেকে দূরে থাকতে বলে—একদিকে নিরপরাধকে দোষী সাব্যস্ত করা, অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীর দায় এড়িয়ে যেতে সাহায্য করা। সুতরাং মানুষ অপরাধের বিচার করতে পারে, কিন্তু আল্লাহর মতো সর্বজ্ঞ চূড়ান্ত বিচারক হতে পারে না। মানুষের বিচার সীমিত তথ্য ও প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত; আল্লাহর বিচার পূর্ণ জ্ঞান ও নিখুঁত ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মানুষের দায়িত্ব হলো নিজের ক্ষমতার সীমা মেনে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, আর আল্লাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকে নিজের ব্যক্তিগত ঘোষণার মধ্যে বন্দি না করা।

 

# কাউকে পাপী বলা আর তার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করা এক নয়

সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, একজন মানুষ কোনো ভুল করলে তার একটি কাজের সমালোচনা না করে পুরো মানুষটিকেই ঘৃণার পাত্র বানানো হয়। কেউ কারও একটি ভুলের কথা শুনে তার জীবনের সব ভালো কাজ অস্বীকার করে বসে। কেউ আবার নিজের পছন্দের ব্যক্তির অন্যায়কে তুচ্ছ করে দেখে, অথচ অপছন্দের ব্যক্তির সামান্য ভুলকেও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করে। এই ধরনের আচরণ ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ব্যক্তিগত পক্ষপাতকে প্রাধান্য দেয়।

পবিত্র আল-কোরআন মানুষকে এমন অন্যায় মনোভাব থেকে বিরত থাকতে শিক্ষা দেয়। সূরা আল-হুজুরাতের ১১ নম্বর আয়াতে একে অন্যকে উপহাস করা, পরস্পরকে অপমান করা এবং মন্দ উপনামে ডাকার ব্যাপারে নিষেধ করা হয়েছে। একই সূরার ১২ নম্বর আয়াতে অমূলক ধারণা থেকে বেঁচে থাকতে, গুপ্তচরবৃত্তি না করতে এবং পরনিন্দা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশের আলোকে বোঝা যায়, অন্যের ভুল নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রেও নৈতিক সীমা রয়েছে। সত্য প্রকাশ ও অন্যায় প্রতিরোধের নামে কাউকে অপমান করা, তার ব্যক্তিগত মর্যাদা ধ্বংস করা কিংবা ভিত্তিহীন সন্দেহকে সত্য হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো ব্যক্তির একটি কাজ অন্যায় হতে পারে। সেই কাজের সমালোচনা করা, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পক্ষে দাঁড়ানো এবং অন্যায় বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই কাজের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অন্তরের প্রতিটি অবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া আলাদা বিষয়। মানুষ কোনো কাজের বাহ্যিক দিক বিচার করতে পারে; কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অন্তরের পূর্ণ অবস্থা, তার অনুশোচনা এবং আল্লাহর কাছে তার চূড়ান্ত মর্যাদা সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান মানুষের নেই। এখানে ভুলকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কেউ অন্যায় করলে শুধু সে অনুতপ্ত হয়েছে বলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার অগ্রাহ্য করা যায় না। আবার কেউ একসময় ভুল করেছে বলে তার সংশোধনের সম্ভাবনাও চিরতরে অস্বীকার করা যায় না। ন্যায়বিচারের জন্য যেমন অপরাধের দায় স্বীকার করা জরুরি, তেমনি অনুশোচনা, সংশোধন এবং মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনের দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদা রক্ষা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ—দুটিই বিবেচ্য। তাই কাউকে পাপী বলার আগে নিজের জ্ঞান ও প্রমাণের সীমা বুঝতে হবে। আর কাউকে আল্লাহর কাছে ক্ষমার অযোগ্য বলে ঘোষণা করার আগে মনে রাখতে হবে, আল্লাহর রহমত সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার মানুষের নেই।

 

# গুনাহের হিসাব একদিন অবশ্যই দিতে হবে

আল্লাহ মানুষের পাপের বিচার করবেন—এই বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মানুষের কোনো কাজই চূড়ান্তভাবে অর্থহীন হয়ে হারিয়ে যায় না। পৃথিবীতে অনেক কাজের সাক্ষী থাকে না, অনেক অন্যায় গোপনে সংঘটিত হয়, আবার অনেক অপরাধের বিচার সামাজিক বা আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে সম্পূর্ণ হয় না। কিন্তু কোরআন জানায়, আল্লাহর কাছে মানুষের কর্মের হিসাব সংরক্ষিত রয়েছে।

সূরা আয-যিলযালের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কেউ অণু পরিমাণ ভালো কাজ করলে তা দেখতে পাবে, আর কেউ অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করলে তাও দেখতে পাবে। এই আয়াত মানুষের জবাবদিহির একটি গভীর নীতি তুলে ধরে। মানুষের দৃষ্টিতে কোনো কাজ ছোট হতে পারে, কিন্তু তার নৈতিক তাৎপর্য সব সময় ছোট নয়। একটি মিথ্যা কথা কারও সম্মান নষ্ট করতে পারে, একটি অন্যায় সিদ্ধান্ত একটি পরিবারকে বিপদে ফেলতে পারে, একটি প্রতারণা মানুষের জীবনযাত্রা ধ্বংস করতে পারে। আবার সামান্য সদাচরণ, বিপদে সাহায্য, সত্য সাক্ষ্য কিংবা কারও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াও বড় কল্যাণের কারণ হতে পারে।

সূরা আল-কাহফের ৪৯ নম্বর আয়াতে কিয়ামতের দিন আমলনামা সামনে উপস্থিত করার কথা বলা হয়েছে। অপরাধীরা তাদের কৃতকর্ম দেখে বিস্মিত হবে এবং বলবে, এই কিতাবের কী হলো যে ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি! এই আয়াতের শিক্ষা হলো, মানুষ নিজের সুবিধামতো কিছু কাজ মনে রাখে, কিছু ভুলে যায়, কিছু আড়াল করতে চায়। কিন্তু আল্লাহর কাছে হিসাব মানুষের স্মৃতি কিংবা আত্মপক্ষসমর্থনের ওপর নির্ভরশীল নয়।

সূরা আল-ইনফিতারের ১০ থেকে ১২ নম্বর আয়াতে মানুষের কাজ লিপিবদ্ধকারী সম্মানিত লেখকদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা মানুষের কাজ জানেন। সূরা কাফের ১৬ থেকে ১৮ নম্বর আয়াতে মানুষের অন্তরের কথার কাছাকাছি আল্লাহর জ্ঞানের কথা এবং মানুষের কথা উচ্চারণের সময় পর্যবেক্ষকের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। এসব আয়াত মানুষের দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে। অন্যায় করার আগে মানুষ যদি মনে রাখে যে মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও আল্লাহর জ্ঞান থেকে কোনো কিছু আড়াল করা যায় না, তবে তার মধ্যে আত্মসংযম ও জবাবদিহির অনুভূতি শক্তিশালী হতে পারে। তবে এই বিশ্বাসের উদ্দেশ্য কেবল মানুষকে ভয় দেখানো নয়। এর উদ্দেশ্য হলো তাকে সৎ জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করা, অন্যের অধিকার রক্ষা করতে শেখানো এবং ভুল করলে সংশোধনের পথে ফিরিয়ে আনা। আল্লাহর বিচার সম্পর্কে সচেতন মানুষ বুঝতে পারে, দুনিয়ার সাময়িক সাফল্য নৈতিক দায় থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা নয়। অন্যায় করে সম্পদ অর্জন করা, মিথ্যা বলে সম্মান লাভ করা কিংবা অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ক্ষমতার আসনে বসা—এসবের বাহ্যিক ফলাফল যা-ই হোক, মানুষের কর্মের হিসাবের প্রশ্নটি থেকেই যায়।

 

# আল্লাহর বিচার ন্যায়ভিত্তিক, মানুষের বিচার সীমাবদ্ধ

মানুষের বিচারব্যবস্থা যত উন্নতই হোক, সেখানে ভুলের সম্ভাবনা থাকে। সাক্ষী মিথ্যা বলতে পারে, প্রমাণ অসম্পূর্ণ হতে পারে, তদন্তকারী ভুল করতে পারেন, বিচারক ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারেন। এ কারণেই মানুষের বিচারব্যবস্থায় ন্যায়নীতি, স্বচ্ছতা, প্রমাণ, আত্মপক্ষসমর্থনের সুযোগ এবং জবাবদিহি প্রয়োজন।

আল্লাহর বিচার সম্পর্কে কোরআনের শিক্ষা ভিন্ন। সূরা আন-নিসার ৪০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সৎকাজের প্রতিদান বৃদ্ধি করেন এবং নিজের পক্ষ থেকে মহাপুরস্কার দান করেন। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর বিচার মানুষের অন্যায়, পক্ষপাত কিংবা ভুলের মতো নয়। তিনি কারও প্রতি অবিচার করেন না এবং কোনো কাজের প্রকৃত অবস্থা তাঁর অজানা থাকে না।

সূরা ইউনুসের ৪৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষের প্রতি কোনো জুলুম করেন না; বরং মানুষ নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে। এই বক্তব্য মানুষের দায়িত্বের ওপর জোর দেয়। মানুষ যখন সত্য জেনেও মিথ্যা গ্রহণ করে, অন্যের অধিকার নষ্ট করে, নিজের লোভের কাছে আত্মসমর্পণ করে কিংবা অন্যায়কে সমর্থন করে, তখন তার কাজের দায় তাকে বহন করতে হয়। আল্লাহর বিচার মানুষের ওপর অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং মানুষের প্রকৃত কাজ ও তার দায়ের যথার্থ মূল্যায়ন।

সূরা আল-আম্বিয়ার ৪৭ নম্বর আয়াতের ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সূরা আয-যিলযালের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতের শিক্ষা মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, কোরআন কোনো কাজকে অবহেলা করতে শেখায় না। একই সঙ্গে মানুষকে অন্যের ওপর নিজের ইচ্ছামতো শাস্তি আরোপ করার অনুমতিও দেয় না। ন্যায়বিচারের জন্য জ্ঞান, নীতি, প্রমাণ ও যথাযথ কর্তৃত্ব দরকার। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের আদালত কোনো মামলায় রায় দিলেও সেই রায় মানুষের জ্ঞানের সীমার মধ্যে দেওয়া হয়। আইনগত রায় সমাজে অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে; কিন্তু তা কারও অন্তরের অবস্থা বা আল্লাহর কাছে তার চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে সর্বজ্ঞ সিদ্ধান্ত নয়। তেমনি কোনো ব্যক্তি আদালতে খালাস পেলেই তার প্রতিটি কাজ নৈতিকভাবে সঠিক হয়ে যায় না, আবার মানুষের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেই সে আল্লাহর কাছে অপরাধী প্রমাণিত হয়ে যায় না। পার্থিব বিচার ও আল্লাহর চূড়ান্ত বিচারকে পৃথকভাবে বুঝতে হবে। এই পার্থক্য মানুষকে দায়িত্বহীন করে না; বরং দায়িত্বশীল করে। কারণ মানুষ জানে, তাকে তার জ্ঞান ও কর্তৃত্বের মধ্যে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে, আর নিজের সীমা অতিক্রম করে আল্লাহর জায়গায় বসার চেষ্টা করা যাবে না।

 

# তওবা: পাপ থেকে ফিরে আসার দরজা

আল্লাহ পাপের বিচারক—এই সত্যের সঙ্গে তাঁর ক্ষমা ও রহমতের বিষয়টিও গভীরভাবে সম্পর্কিত। কেউ যদি শুধু শাস্তির আয়াতগুলো দেখে এবং ক্ষমার আয়াতগুলো উপেক্ষা করে, তবে কোরআনের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা উপলব্ধি করতে পারবে না। আল্লাহ অন্যায় সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, আবার পাপ থেকে ফিরে আসার পথও দেখিয়েছেন। তিনি মানুষকে ভুলের পর ভুল করতে উৎসাহ দেননি; বরং ভুল উপলব্ধি করে তাঁর দিকে ফিরে আসতে আহ্বান জানিয়েছেন।

সূরা আয-যুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উদ্দেশে বলেছেন, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছে, তারা যেন আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করেন; তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আয়াতটির শিক্ষা হলো, পাপ যত বড়ই মনে হোক, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। তবে এই আয়াতকে অন্যায় চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি হিসেবে বোঝা যাবে না। বরং এটি পাপ থেকে ফিরে আসা, অনুশোচনা করা এবং আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনার জন্য আশার দরজা খুলে দেয়।

সূরা আন-নিসার ১১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কেউ মন্দ কাজ করলে অথবা নিজের প্রতি জুলুম করলে পরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু পাবে। এ আয়াত মানুষের জীবনে আত্মসংশোধনের গুরুত্ব তুলে ধরে। মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু ভুলের পর তার প্রতিক্রিয়া কী—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কেউ ভুল স্বীকার করে সংশোধনের পথে ফিরতে পারে, আবার কেউ অহংকার করে ভুলকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করতে পারে। কোরআনের শিক্ষা প্রথম পথটিকে উৎসাহিত করে।

সূরা আল-বাকারার ২২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তওবা শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়ার নাম নয়; এর সঙ্গে নিজের ভুল উপলব্ধি, অনুশোচনা, অন্যায় থেকে ফিরে আসা এবং সংশোধনের আন্তরিক প্রচেষ্টা যুক্ত। কেউ যদি মুখে ক্ষমা চায় কিন্তু সচেতনভাবে অন্যায় চালিয়ে যায়, অন্যের অধিকার হরণ করে এবং নিজের কাজকে ন্যায়সংগত বলে প্রচার করে, তবে তার তওবার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

অন্যদিকে, কোনো মানুষ যদি অতীতে গুরুতর ভুল করে থাকেন, পরে সত্যিকার অর্থে অনুতপ্ত হন এবং নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁর জন্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা অস্বীকার করা উচিত নয়। মানুষকে অতীতের ভুলের মধ্যে বন্দি করে রাখলে সংশোধনের পথ সংকুচিত হয়। অবশ্যই অপরাধের কারণে অন্যের যে ক্ষতি হয়েছে, তা যথাসম্ভব পূরণ করতে হবে; কিন্তু সংশোধনের প্রচেষ্টাকে চিরতরে অস্বীকার করাও ন্যায়সংগত নয়। এখানে আল্লাহর ক্ষমা ও মানুষের অধিকার—দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা দরকার। কেউ আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারে; কিন্তু মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করলে সেই সম্পদ ফেরত দেওয়ার দায়িত্বও রয়েছে। কারও সম্মান নষ্ট করলে ভুল স্বীকার ও ক্ষতি পূরণের প্রয়োজন হতে পারে। কারও প্রতি জুলুম করলে শুধু ব্যক্তিগতভাবে অনুশোচনা করাই সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। অন্যায়ের প্রকৃতি অনুযায়ী মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং ক্ষতি সংশোধনের চেষ্টা করা জরুরি। তওবা মানুষকে দায়িত্ব থেকে পালাতে শেখায় না; বরং দায়িত্ব স্বীকার করতে শেখায়।

 

# অন্যের পাপ নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার আগে নিজের হিসাব

মানুষের একটি সাধারণ দুর্বলতা হলো, সে অন্যের ভুল সহজে দেখতে পায়, কিন্তু নিজের ভুলের মুখোমুখি হতে চায় না। অন্যের ছোট অপরাধ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করে, অথচ নিজের বড় অন্যায়কে নানা যুক্তিতে ঢেকে রাখে। কারও আচরণে ভুল দেখলে দ্রুত সমালোচনা করে, কিন্তু নিজের আচরণে একই ধরনের ভুল থাকলে সেটিকে পরিস্থিতির ফল বলে ব্যাখ্যা করে। এই দ্বৈত মানসিকতা ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা।

সূরা আল-হাশরের ১৮ নম্বর আয়াতে মুমিনদের আল্লাহকে ভয় করতে এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে ভেবে দেখতে বলা হয়েছে, সে আগামী দিনের জন্য কী পাঠিয়েছে। আয়াতটি মানুষকে আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যৎ জবাবদিহির দিকে মনোযোগী করে। অন্যের পাপ নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে নিজের কাজের হিসাব নেওয়া উচিত। আমি কি সত্য বলছি? আমি কি কারও অধিকার নষ্ট করেছি? আমি কি গুজব ছড়িয়েছি? আমার সিদ্ধান্তে কারও ক্ষতি হয়েছে কি? আমি কি নিজের ভুল স্বীকার করতে প্রস্তুত? এসব প্রশ্ন আত্মসংশোধনের জন্য জরুরি।

সূরা আল-বাকারার ৪৪ নম্বর আয়াতে অন্যদের সৎকাজের নির্দেশ দিয়ে নিজেদের ভুলে যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আয়াতটি এমন দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে সতর্ক করে, যেখানে মানুষ অন্যকে নৈতিক উপদেশ দেয়, কিন্তু নিজের আচরণে সেই নীতি প্রয়োগ করে না। ধর্মীয় শিক্ষা কেবল অন্যকে বিচার করার হাতিয়ার নয়; এটি নিজের জীবনকে সংশোধনেরও পথনির্দেশ। যে ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখে, তার মধ্যে অন্যের প্রতি বিনয় তৈরি হয়। সে বুঝতে পারে, মানুষ হিসেবে তার নিজেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই সে অন্যায়কে সমর্থন না করেও অপমানজনক আচরণ থেকে বিরত থাকতে পারে; সত্যকে গোপন না করেও অযথা কুৎসা রটনা থেকে দূরে থাকতে পারে; অপরাধের বিচার চাইতে গিয়েও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আত্মসমালোচনা মানে নিজের অপরাধকে আড়াল করা নয়। বরং নিজের ভুলের দায় স্বীকার করা এবং অন্যের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা। নিজের জন্য যে ন্যায়বিচার চাই, অন্যের জন্যও সেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নিজের ভুলের ক্ষেত্রে ক্ষমা ও সংশোধনের সুযোগ প্রত্যাশা করলে অন্যের ক্ষেত্রেও সেই সুযোগের মূল্য বুঝতে হবে—যদিও এর অর্থ এই নয় যে অন্যের ক্ষতি বা অপরাধকে উপেক্ষা করা হবে।

 

# ধর্মের নামে অন্যকে অভিশাপ দেওয়া ও চূড়ান্ত রায় দেওয়ার বিপদ

ধর্মীয় ভাষা মানুষের হৃদয়কে নৈতিকতার দিকে ফিরিয়ে আনতে পারে। আবার সেই ভাষাই কখনো ভুলভাবে ব্যবহৃত হলে মানুষের মধ্যে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও বিভাজন বাড়াতে পারে। কেউ নিজের মতের বিরোধী ব্যক্তিকে পাপী, অভিশপ্ত কিংবা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত বলে ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার আগে ভাবতে হবে, সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে তার যথাযথ জ্ঞান ও কর্তৃত্ব আছে কি না।

পবিত্র আল-কোরআন আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কথা বলার ব্যাপারে সতর্ক করেছে। সূরা আল-আ’রাফের ৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সম্পর্কে এমন কথা বলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার জ্ঞান মানুষের নেই। এর তাৎপর্য হলো, আল্লাহ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কোন ব্যক্তি তাঁর কাছে কী মর্যাদা লাভ করবেন কিংবা কার জন্য চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে—এসব বিষয়ে ভিত্তিহীন দাবি করা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। ধর্মীয় বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে তাই সতর্কতা, জ্ঞান এবং বিনয় প্রয়োজন। কোনো কাজকে কোরআনের নির্দেশের আলোকে অন্যায় বলা আর নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির চূড়ান্ত পরিণতি ঘোষণা করা এক নয়। যেমন, মিথ্যা বলা, জুলুম করা কিংবা অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করার নৈতিক অবস্থান কোরআনের আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু নির্দিষ্ট একজন মানুষ তার জীবনের সব কাজ, তার অন্তরের অবস্থা, অনুশোচনা এবং আল্লাহর কাছে তার চূড়ান্ত পরিণতির বিচারে কোথায় অবস্থান করবেন—এ বিষয়ে মানুষের জ্ঞান সীমিত। এই সীমা অতিক্রম করে বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে, কাউকে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অপমান করা কিংবা তার বিরুদ্ধে প্রমাণহীন অভিযোগ ছড়ানোও ন্যায়সংগত নয়। সত্যের পক্ষে কথা বলতে হলে সত্যেরই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। মিথ্যা ব্যবহার করে সত্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না, অপবাদ দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না এবং অন্যকে অপমান করে নিজের ধর্মপরায়ণতা প্রমাণ করা যায় না। মানুষের উচিত ধর্মীয় বিধান নিয়ে আলোচনা করার সময় কাজের প্রকৃতি, প্রমাণ, প্রাসঙ্গিকতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার বিবেচনা করা। জটিল ধর্মীয় প্রশ্নে জ্ঞানী ও দায়িত্বশীল আলেমদের ব্যাখ্যা গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তির বক্তব্যকে আল্লাহর চূড়ান্ত রায়ের সমতুল্য মনে করা ঠিক নয়। আল্লাহর বিধান সম্পর্কে আলোচনা করা এবং আল্লাহর হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা এক বিষয় নয়।

 

# পাপের বিচার ও ক্ষমার মধ্যে ভারসাম্য

ন্যায়বিচার এবং ক্ষমা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বিষয়। শুধু ক্ষমার কথা বলে অপরাধের দায় অস্বীকার করলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার নষ্ট হতে পারে। আবার শুধু শাস্তির কথা বলে সংশোধনের সুযোগ অস্বীকার করলে মানুষের অনুশোচনা ও পরিবর্তনের সম্ভাবনা উপেক্ষিত হয়। কোরআনের শিক্ষা মানুষকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে বলে, একই সঙ্গে আল্লাহর ক্ষমা ও রহমতের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।

সূরা আশ-শুরার ৪০ নম্বর আয়াতে মন্দ কাজের প্রতিদান অনুরূপ মন্দ কাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে; তবে যে ক্ষমা করে এবং সংশোধনের পথ গ্রহণ করে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে রয়েছে। আয়াতটি ন্যায়সংগত প্রতিক্রিয়া, ক্ষমা এবং সংশোধনের সম্পর্ক বোঝায়। এর অর্থ এই নয় যে যেকোনো অপরাধকে বিনা বিচারে উপেক্ষা করতে হবে। বরং যেখানে ক্ষমা করা কল্যাণকর এবং সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে, সেখানে ক্ষমার মূল্য রয়েছে। একই সঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনও অস্বীকার করা হয়নি।

সূরা আলে ইমরানের ১৩৪ নম্বর আয়াতে সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা উভয় অবস্থায় ব্যয় করা, রাগ সংবরণ করা এবং মানুষকে ক্ষমা করার গুণের কথা বলা হয়েছে। এ আয়াত মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে আত্মসংযম ও ক্ষমার গুরুত্ব তুলে ধরে। রাগের মুহূর্তে মানুষ অনেক সময় এমন কথা বলে ফেলে, যা পরে অনুশোচনার কারণ হয়। কারও ভুলের কারণে ক্ষুব্ধ হওয়া স্বাভাবিক হতে পারে; কিন্তু সেই রাগের বশে মিথ্যা অভিযোগ, অপমান কিংবা সীমালঙ্ঘন করা ন্যায়সংগত নয়। ক্ষমা সব ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ করতে হবে—এমন নয়। কোনো ব্যক্তিগত ভুল ক্ষমা করে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা সম্ভব হতে পারে। আবার গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তদন্ত করা এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি হতে পারে। ক্ষমা মানে অপরাধীকে অন্যায় চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া নয়। ক্ষমা যদি সংশোধনের পথ তৈরি করে, তবে তা কল্যাণকর; কিন্তু ক্ষমার নামে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হলে তা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি অবিচার হতে পারে। আল্লাহর ক্ষমা সম্পর্কে কোরআনের শিক্ষা মানুষকে আশাবাদী করে, আর তাঁর ন্যায়বিচারের শিক্ষা দায়িত্বশীল করে। এই দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য থাকলে মানুষ একদিকে পাপকে হালকা করে দেখবে না, অন্যদিকে নিজের বা অন্যের সংশোধনের সম্ভাবনাও অস্বীকার করবে না।

 

# শেষ বিচারের দিন: মানুষের মুখোশ খুলে যাবে

পৃথিবীতে মানুষ নিজের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য নানা চেষ্টা করে। কেউ নিজের ভালো কাজ প্রচার করে, কেউ ভুল গোপন করে, কেউ নিজের অন্যায়কে যুক্তির মাধ্যমে বৈধ প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু কোরআন জানায়, পরকালের বিচারে বাহ্যিক প্রচার কিংবা আত্মপক্ষসমর্থনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে না। মানুষের প্রকৃত কাজ ও তার দায় সামনে আসবে।

সূরা ইয়াসিনের ৬৫ নম্বর আয়াতে সেই দিনের কথা বলা হয়েছে, যখন মানুষের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং তাদের হাত কথা বলবে, পা সাক্ষ্য দেবে তাদের অর্জিত কাজ সম্পর্কে। সূরা ফুসসিলাতের ২০ থেকে ২২ নম্বর আয়াতে মানুষের শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও ত্বকের সাক্ষ্য দেওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে। এসব আয়াতের শিক্ষা হলো, মানুষের কাজের সত্যতা আড়াল করার ক্ষমতা তার নিজের হাতে নেই। যে ব্যক্তি পৃথিবীতে নিজের অপরাধ অস্বীকার করেছে, তার অস্বীকারই শেষ কথা হবে না।

সূরা আল-কাহফের ৪৯ নম্বর আয়াতও স্মরণ করিয়ে দেয়, আমলনামায় ছোট-বড় কোনো কাজ বাদ থাকবে না। মানুষ নিজের সুবিধার জন্য কোনো কাজকে গুরুত্বহীন ভাবতে পারে; কিন্তু তার প্রকৃত তাৎপর্য আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। এই বিশ্বাস মানুষের মধ্যে সততা ও দায়িত্ববোধ তৈরি করতে পারে। সে বুঝতে পারে, গোপনে অন্যায় করা নিরাপদ পথ নয়, কারণ মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া আর আল্লাহর হিসাব থেকে মুক্ত থাকা এক বিষয় নয়।

শেষ বিচারের দিনের এই শিক্ষা মানুষের জীবনে গভীর নৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। একজন বিচারক যখন রায় দেবেন, তখন তাঁর মনে থাকা উচিত—তাঁকেও তাঁর সিদ্ধান্তের জবাবদিহি করতে হবে। একজন সাক্ষী যখন বক্তব্য দেবেন, তখন তাঁর মনে রাখা উচিত—মিথ্যা সাক্ষ্যের দায় আছে। একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি যখন সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন তাঁর মনে রাখা উচিত—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। একজন সাধারণ মানুষ যখন অন্যের অধিকার নষ্ট করার প্রলোভনে পড়বেন, তখন তাঁর মনে রাখা উচিত—মানুষের কাছ থেকে আড়াল করা গেলেও আল্লাহর কাছে কিছুই গোপন নয়। তবে এই জবাবদিহির বিশ্বাস মানুষকে হতাশ করার জন্য নয়। বরং অন্যায় থেকে বিরত থাকা, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো এবং ভুল হলে সংশোধনের পথ বেছে নেওয়ার জন্য। যে মানুষ আল্লাহর বিচারে বিশ্বাস করে, সে নিজের কাজকে গুরুত্ব দেয় এবং অন্যের অধিকারকে অবহেলা করতে ভয় পায়।

 

# উপসংহার: পাপের চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর, মানুষের দায়িত্ব ন্যায় প্রতিষ্ঠা

আল-কোরআনের আলোকে প্রশ্নটির উত্তর সুস্পষ্ট: পাপের চূড়ান্ত বিচার করার মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। তিনি মানুষের সৃষ্টিকর্তা, সর্বজ্ঞ এবং ন্যায়বিচারের অধিকারী। মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন কাজ, তার উদ্দেশ্য, তার ভুল, তার অনুশোচনা এবং তার সংশোধনের প্রচেষ্টা—সবকিছুই তাঁর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীর কোনো ক্ষমতা, অর্থ, পরিচয় কিংবা সামাজিক মর্যাদা আল্লাহর বিচারকে প্রভাবিত করতে পারে না। সূরা আল-আনআমের ৫৭ নম্বর আয়াত, সূরা আল-আম্বিয়ার ৪৭ নম্বর আয়াত, সূরা আন-নিসার ৪০ নম্বর আয়াত এবং সূরা আয-যিলযালের ৭–৮ নম্বর আয়াত এই সত্যের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরে। কিন্তু আল্লাহই চূড়ান্ত বিচারক—এই বিশ্বাসের অর্থ মানুষের সব ধরনের বিচার ও দায়িত্ব অস্বীকার করা নয়। মানুষের সমাজে অন্যায় ঘটলে তার সত্যতা যাচাই করতে হবে, অপরাধের প্রমাণ পরীক্ষা করতে হবে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হবে এবং ন্যায়সংগত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সূরা আন-নিসার ৫৮ ও ১৩৫ নম্বর আয়াত এবং সূরা আল-মায়িদার ৮ নম্বর আয়াত মানুষকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দেয়। সুতরাং অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া যেমন কোরআনের শিক্ষা নয়, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী ঘোষণা করাও ন্যায়বিচারের শিক্ষা নয়।

কোরআন মানুষকে নিজের জ্ঞানের সীমা বুঝতে শেখায়। সূরা আল-ইসরার ৩৬ নম্বর আয়াত অনুসারে যে বিষয়ে নিশ্চিত জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করা উচিত নয়। তাই গুজবের ভিত্তিতে কারও চরিত্র নষ্ট করা, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে ধর্মীয় রায় দেওয়া কিংবা কাউকে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত বলে ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। কোনো কাজের নৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহর সর্বজ্ঞ বিচারক্ষমতার জায়গায় নিজেকে বসানো যায় না। পাশাপাশি, পাপের আলোচনা মানুষকে তওবার পথ থেকেও দূরে সরিয়ে দিতে পারে না। সূরা আয-যুমারের ৫৩ নম্বর আয়াত আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়ার শিক্ষা দেয়। সূরা আন-নিসার ১১০ নম্বর আয়াত ক্ষমা প্রার্থনার গুরুত্ব তুলে ধরে। কেউ ভুল করলে তার উচিত অনুশোচনা করা, অন্যায় থেকে ফিরে আসা এবং প্রয়োজন হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। আর সমাজের উচিত অন্যায়কে আড়াল না করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং সংশোধনের আন্তরিক প্রচেষ্টাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা।

অতএব, অন্যের পাপ নিয়ে কথা বলার আগে নিজের কাজের হিসাব নেওয়া জরুরি। সত্যকে সত্য বলা, অন্যায়কে অন্যায় বলা, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করা, ব্যক্তিগত পক্ষপাত থেকে দূরে থাকা এবং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা—এসবই কোরআনের ন্যায়নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আল্লাহর বিচার সম্পর্কে বিশ্বাসী মানুষ জানেন, কোনো ভালো কাজই তাঁর কাছে হারিয়ে যায় না, কোনো অন্যায়ই তাঁর অজানা নয় এবং আন্তরিক তওবার দরজাও তাঁর রহমতে উন্মুক্ত। শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো—নিজের পাপের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগতভাবে দাঁড়ানো, প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে রায় না দেওয়া এবং আল্লাহর ক্ষমা ও ন্যায়বিচার—উভয়টির ওপর বিশ্বাস রাখা। কারণ মানুষ সত্য অনুসন্ধান করতে পারে, ন্যায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে এবং অন্যায় থেকে ফিরে আসতে পারে; কিন্তু সবকিছুর চূড়ান্ত জ্ঞান ও বিচার মহান আল্লাহরই।

 

তথ্যসূত্র : পবিত্র আল-কোরআন

– সূরা আল-আনআম, আয়াত ৫৭

– সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত ৩৩

– সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৮, ২২২, ২৮৪

– সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪

– সূরা আন-নিসা, আয়াত ৪০, ৫৮, ১১০, ১৩৫

– সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৮

– সূরা আল-আনআম, আয়াত ১৬০

– সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩৬

– সূরা আল-কাহফ, আয়াত ৪৯

– সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৪৭

– সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত ৬২

– সূরা আন-নাহল, আয়াত ৯০

– সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১১–১২

– সূরা আল-হাশর, আয়াত ১৮

– সূরা ইউনুস, আয়াত ৪৪

– সূরা আল-জাসিয়া, আয়াত ২১–২২

– সূরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩

– সূরা আশ-শুরা, আয়াত ৪০

– সূরা আয-যিলযাল, আয়াত ৭–৮

– সূরা আল-ইনফিতার, আয়াত ১০–১২

– সূরা কাফ, আয়াত ১৬–১৮

– সূরা ইয়াসিন, আয়াত ৬৫

– সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ২০–২২

বিশেষ দ্রষ্টব্য: আয়াতগুলোর বক্তব্য এখানে ভাবানুবাদ ও ব্যাখ্যামূলকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে; শব্দে-শব্দে অনুবাদ হিসেবে নয়।

 

লেখক :

মোঃ আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা