June 17, 2026, 6:26 pm
শিরোনামঃ
মোংলা ইপিজেডে শ্রমিকের হাত বিচ্ছিন্ন ; নিরাপত্তা ত্রুটি ও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ক্ষোভ দেশীয় প্রযুক্তিতে কোস্টগার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধি ; ডকইয়ার্ডে ৫টি রিভারাইন পেট্রোল ভেসেলের নির্মাণকাজ শুরু তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী বাংলা পড়তে পারে না : ইউএনও মাহমুদা কুলসুম মনি মতলব দক্ষিণে ১০ মামলার আসামিসহ গ্রেপ্তার ২ ; ইয়াবা-গাঁজা উদ্ধার কওমে লুতের পরিণতি ও সমকামিতার ভয়াবহতা! সেফটি ট্যাংকে প্রলেপ দিয়েই লাখ টাকার বিল উত্তোলনের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মতলব উত্তরে উপজেলা প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ ও ভূমি অফিস পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের ১২তম সভা অনুষ্ঠিত বন্ধুদের সঙ্গে গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যু দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান : বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে চালু হলো ১০ শয্যার আইসিইউ সেবা

কওমে লুতের পরিণতি ও সমকামিতার ভয়াবহতা!

Reporter Name

পবিত্র আল কোরআনে মানবজাতির জন্য বহু জাতির ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে, যাতে মানুষ অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং স্রষ্টার অবাধ্যতার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। সেইসব জাতির মধ্যে কওমে লুতের ঘটনা অন্যতম। কোরআন মাজিদে একাধিক স্থানে হযরত লুত (আঃ)-এর জাতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের অপরাধ ছিল শুধু সাধারণ পাপাচার নয়; বরং তারা এমন এক অশ্লীলতা ও বিকৃত আচারে লিপ্ত হয়েছিল, যা তাদের পূর্বে পৃথিবীর আর কোনো জাতি প্রকাশ্যে করেনি। আল্লাহ তাআলা সেই অপরাধকে এতটাই গুরুতর হিসেবে বর্ণনা করেছেন যে, তাদের ওপর এমন শাস্তি নাযিল হয়েছিল, যার নজির মানব ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়।

আজকের পৃথিবীতে সমকামিতা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। কেউ এটিকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বলে দাবি করে, কেউ মানবাধিকারের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু একজন মুসলমানের জন্য সর্বপ্রথম বিবেচ্য বিষয় হলো আল্লাহর নির্দেশ এবং আল কোরআনের শিক্ষা। কারণ মুসলমান বিশ্বাস করে, মানুষের জ্ঞান সীমিত হলেও আল্লাহর জ্ঞান সর্বব্যাপী ও সর্বাঙ্গীন। তাই কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সত্য জানতে হলে কোরআনের দিকে ফিরে যেতে হয়।

আল্লাহ তাআলা হযরত লুত (আঃ)-কে একটি বিশেষ জাতির কাছে নবী হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি তাদেরকে তাওহিদের দাওয়াত দেন, নৈতিকতার শিক্ষা দেন এবং অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। কিন্তু সেই জাতি তাঁর কথা অমান্য করে এবং ক্রমাগত সীমালঙ্ঘন করতে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন—“আর লুতকে আমি প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করেছিলাম এবং তাকে ওই জনপদ থেকে উদ্ধার করেছিলাম, যারা অশ্লীল কাজে লিপ্ত ছিল। তারা ছিল মন্দ ও পাপাচারী।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৭৪)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কওমে লুতের প্রধান পরিচয় ছিল তাদের অশ্লীলতা ও পাপাচার। তারা শুধু গোপনে কোনো অন্যায় করত না; বরং সেটিকে সামাজিক আচরণে পরিণত করেছিল। যখন কোনো সমাজে পাপ স্বাভাবিক এবং নৈতিকতা অস্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন সেই সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।

হযরত লুত (আঃ) তাদেরকে বহুবার সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তোমরা এমন কাজ করছ যা তোমাদের আগে পৃথিবীর আর কোনো জাতি করেনি। কিন্তু তারা নবীর আহ্বান গ্রহণ করার পরিবর্তে তাঁকেই উপহাস করেছিল। এমনকি যারা পবিত্র ও নৈতিক জীবনযাপন করতে চাইত, তাদেরকেও সমাজ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এখানেই কওমে লুতের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ছিল। তারা শুধু নিজেরা পাপ করছিল না, বরং পাপকে সামাজিকভাবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো জাতি যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লজ্জাবোধ হারিয়ে ফেলে এবং পাপকে গৌরবের বিষয় মনে করতে শুরু করে, তখন তাদের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সতর্ক করার জন্য বহু সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা নিজেদের অবস্থান থেকে ফিরে আসেনি। অবশেষে আল্লাহর ফয়সালা এসে যায়। আল্লাহ বলেন— “আর আমি তাদের ওপর বর্ষণ করেছিলাম বৃষ্টির (পাথরের)। সুতরাং দেখুন, অপরাধীদের পরিণতি কেমন ছিল!” (সূরা আল-আরাফ ৭:৮৪)

এটি সাধারণ বৃষ্টি ছিল না। এটি ছিল আসমানি শাস্তি। পাথরের বৃষ্টি দ্বারা তাদের ধ্বংস করা হয়েছিল। কোরআনের ভাষায় এই শাস্তি ছিল এমন এক সতর্কবার্তা, যা শুধু সেই জাতির জন্য নয়; বরং পরবর্তী সকল মানুষের জন্য শিক্ষণীয়। আরেক স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন— “অতঃপর যখন আমার আদেশ এসে পৌঁছাল, তখন আমি ওই জনপদকে উল্টে দিলাম এবং তাদের ওপর অনবরত বর্ষণ করলাম পোঁড়া মাটির পাথর।” (সূরা হুদ ১১:৮২)

এই আয়াতের ভাষা অত্যন্ত ভয়াবহ। পুরো জনপদকে উল্টে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ শুধু মানুষ নয়, তাদের সভ্যতা, তাদের গর্ব, তাদের স্থাপনা—সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহর শাস্তি যখন আসে, তখন কোনো শক্তি, সম্পদ কিংবা সামাজিক প্রভাব কাউকে রক্ষা করতে পারে না।

কওমে লুত নিজেদেরকে হয়তো শক্তিশালী মনে করত। তারা হয়তো ভাবত, তাদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারবে না। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল যে, সমস্ত ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ। মানুষ যখন সীমালঙ্ঘন করে এবং স্রষ্টার নির্দেশকে উপহাস করে, তখন তার সমস্ত অহংকার মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। আল্লাহ আরও বলেন— “অতঃপর সূর্যোদয়ের সময় এক ভয়াবহ বিকট শব্দ তাদেরকে পাকড়াও করল।” (সূরা আল-হিজর ১৫:৭৩)

এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শাস্তি আসার জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয় না। যে জাতি বছরের পর বছর পাপাচারে লিপ্ত ছিল, তাদের ধ্বংসের জন্য একটি মুহূর্তই যথেষ্ট হয়েছিল। সূর্যোদয়ের সময় তারা হয়তো নতুন দিনের পরিকল্পনা করছিল, কিন্তু সেই দিনই তাদের জীবনের শেষ দিন হয়ে দাঁড়ায়।

আজকের পৃথিবীতে কওমে লুতের কাহিনী শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; বরং এটি একটি নৈতিক সতর্কবার্তা। একজন মুসলমান যখন এই ঘটনাগুলো পড়ে, তখন তার উপলব্ধি করা উচিত যে, আল্লাহ তাআলা কোনো বিষয়কে কেবল মতামত হিসেবে নয়, বরং নৈতিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের জীবনকে কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত করা এবং সমাজে নৈতিকতা, শালীনতা ও আল্লাহভীতির পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করা। কওমে লুতের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, সভ্যতার প্রকৃত শক্তি প্রযুক্তি, অর্থ বা বাহ্যিক উন্নয়নে নয়; বরং নৈতিক ভিত্তিতে। যখন সেই ভিত্তি ধ্বংস হয়ে যায়, তখন বাহ্যিক জৌলুস কোনো জাতিকে রক্ষা করতে পারে না।

কওমে লুতের ঘটনাকে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট অপরাধের শাস্তি হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা পুরোপুরি উপলব্ধি করা যায় না। কোরআনের আলোকে দেখা যায়, তাদের অপরাধ ছিল বহুমাত্রিক। তারা শুধু সমকামিতার মতো একটি গুরুতর অশ্লীলতায় লিপ্ত ছিল না, বরং তারা আল্লাহর নবীর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছিল, পাপকে সামাজিক স্বীকৃতি দিয়েছিল, নৈতিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল এবং সত্যের আহ্বানকে উপহাসে পরিণত করেছিল। এই কারণেই কওমে লুতের ঘটনা কোরআনে বারবার ফিরে এসেছে। আল্লাহ তাআলা মানুষের সামনে এই কাহিনী তুলে ধরেছেন যেন মানুষ বুঝতে পারে, কোনো সমাজ যখন নৈতিক অবক্ষয়কে উন্নতির নাম দেয়, যখন অশ্লীলতাকে স্বাধীনতা বলে প্রচার করে এবং যখন সত্যকে বিদ্রূপ করে, তখন সেই সমাজ ধীরে ধীরে নিজের ধ্বংসের পথ নিজেই তৈরি করে।

হযরত লুত (আঃ)-এর দাওয়াতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি মানুষকে শুধু একটি নির্দিষ্ট গুনাহ থেকে বিরত থাকতে বলেননি; তিনি তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্য, পবিত্র জীবনযাপন এবং মানবিক মূল্যবোধের দিকে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তার জাতি সেই আহ্বান গ্রহণ করেনি। বরং তারা বলেছিল, যদি তুমি সত্যবাদী হও, তাহলে আমাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নিয়ে এসো। এই বক্তব্য তাদের অহংকার, আত্মপ্রবঞ্চনা এবং সত্যকে অস্বীকার করার মানসিকতার পরিচয় বহন করে।

ইতিহাসে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল—তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানাত। কওমে লুতও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তারা নিজেদের আচরণকে অপরাধ হিসেবে দেখেনি। বরং তারা মনে করত, তারা যা করছে সেটাই স্বাভাবিক। এই আত্মপ্রবঞ্চনাই তাদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

আজকের পৃথিবীতেও মানুষকে সবচেয়ে বেশি বিপদে ফেলে এমন বিষয়গুলোর একটি হলো নিজের ভুলকে ভুল মনে না করা। যখন কোনো ব্যক্তি বা সমাজ গুনাহকে গুনাহ বলে স্বীকার করে, তখন তার জন্য তওবার দরজা খোলা থাকে। কিন্তু যখন সে গুনাহকে অধিকার, স্বাধীনতা কিংবা অগ্রগতি বলে প্রচার করতে শুরু করে, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

কোরআনের ভাষায় কওমে লুতের অপরাধ ছিল “ফাহিশাহ” বা চরম অশ্লীলতা। এই শব্দটি শুধু একটি ব্যক্তিগত আচরণকে বোঝায় না; বরং এমন একটি নৈতিক বিচ্যুতিকে বোঝায় যা সমাজের সামগ্রিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পরিবারব্যবস্থা, সামাজিক ভারসাম্য এবং মানবজাতির স্বাভাবিক বিকাশের সঙ্গে যার সংঘাত রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা মানুষকে নারী ও পুরুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। কোরআনে বিবাহকে শান্তি, ভালোবাসা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মানবজাতির ধারাবাহিকতা, পরিবার গঠন এবং সমাজের স্থিতিশীলতা এই ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কওমে লুতের আচরণ এই স্বাভাবিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। তাই কোরআন এটিকে শুধু একটি ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে নয়, বরং সীমালঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসলাম কোনো ব্যক্তিকে ঘৃণা করতে শিক্ষা দেয় না। ইসলাম পাপকে পাপ বলে, কিন্তু মানুষকে তওবার সুযোগ দেয়। কওমে লুতের ঘটনাও এই শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর রহমতের দরজা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খোলা ছিল। কিন্তু তারা সেই সুযোগ গ্রহণ করেনি। তারা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে রাজি হয়নি। ফলে তাদের জন্য শাস্তি অবধারিত হয়ে যায়। বর্তমান যুগে যখন বিভিন্ন মাধ্যমে সমকামিতাকে স্বাভাবিক এবং নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন একজন মুসলমানের জন্য কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি জানা গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানের বিশ্বাসের ভিত্তি হলো ওহি। সমাজের পরিবর্তনশীল মতামত নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশই তার জন্য চূড়ান্ত মানদণ্ড। তাই কোনো বিষয় জনপ্রিয় হলেই তা সত্য হয়ে যায় না, আবার কোনো বিষয় সমালোচিত হলেই তা মিথ্যা হয়ে যায় না। সত্য ও মিথ্যার মাপকাঠি হলো আল্লাহর নির্দেশনা।

কওমে লুতের কাহিনী আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়—আল্লাহর শাস্তি সবসময় তাৎক্ষণিকভাবে আসে না। অনেক সময় মানুষ মনে করে, সে পাপ করছে অথচ কোনো শাস্তি আসছে না, তাই হয়তো তার কাজ সঠিক। কিন্তু কোরআন বারবার বলেছে, আল্লাহ মানুষকে সময় দেন, সুযোগ দেন, সতর্ক করেন। এরপরও যদি তারা ফিরে না আসে, তখন শাস্তি আসে। এই শিক্ষা ব্যক্তি জীবনেও প্রযোজ্য, সমাজ জীবনেও প্রযোজ্য। কোনো সমাজে যখন অশ্লীলতা বৃদ্ধি পায়, পরিবার ভেঙে যেতে শুরু করে, নৈতিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর বিধানকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করা হয়, তখন সেই সমাজ ধীরে ধীরে সংকটের দিকে এগোয়। সেই সংকট সবসময় আসমানি পাথরের বৃষ্টি আকারে নাও আসতে পারে; কখনো তা আসে সামাজিক অস্থিরতা হিসেবে, কখনো মানসিক বিপর্যয় হিসেবে, কখনো পারিবারিক ভাঙন হিসেবে, আবার কখনো সভ্যতার পতন হিসেবে।

হযরত লুত (আঃ)-এর জীবন থেকেও অনেক শিক্ষা পাওয়া যায়। তিনি সংখ্যায় একা ছিলেন, কিন্তু সত্যের ওপর অটল ছিলেন। তিনি সমাজের চাপে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেননি। তিনি জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেননি। তিনি মানুষের মন জয় করার জন্য আল্লাহর নির্দেশ পরিবর্তন করেননি। বরং তিনি সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলেই ঘোষণা করেছিলেন।

আজকের পৃথিবীতে এই সাহসের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ সত্য কথা বলা অনেক সময় সহজ নয়। অনেক সময় মানুষ জনপ্রিয়তার জন্য নীতি পরিবর্তন করে, সমালোচনা এড়ানোর জন্য সত্য গোপন করে, কিংবা মানুষের সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর নির্দেশকে উপেক্ষা করে। কিন্তু নবীদের পথ ছিল ভিন্ন। তারা মানুষের সন্তুষ্টির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কওমে লুতের ঘটনা শুধু অতীতের একটি কাহিনী নয়; এটি প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য একটি আয়না। এই আয়নায় মানুষ নিজের সমাজকে দেখতে পারে, নিজের অবস্থানকে মূল্যায়ন করতে পারে এবং বুঝতে পারে সে কোন পথে চলছে। একজন মুমিন যখন এই আয়াতগুলো পড়ে, তখন তার মনে ভয়ও সৃষ্টি হয়, আবার আশা-ও সৃষ্টি হয়। ভয় সৃষ্টি হয় এই কারণে যে, আল্লাহর অবাধ্যতার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। আর আশা সৃষ্টি হয় এই কারণে যে, আল্লাহ তওবাকারীদের ক্ষমা করেন, ফিরে আসা মানুষকে গ্রহণ করেন এবং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ দেন। তাই কওমে লুতের কাহিনীর মূল শিক্ষা কেবল শাস্তির বিবরণ নয়; বরং নৈতিকতার গুরুত্ব, আল্লাহর আনুগত্য, সত্যের প্রতি অটল থাকা এবং পাপকে স্বাভাবিকীকরণের বিপদ সম্পর্কে সতর্কতা। একজন মুসলমানের জন্য এই শিক্ষা যতটা ব্যক্তিগত, ততটাই সামাজিক।

আজও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ কোরআনের এই শিক্ষাকে গ্রহণ করছে, আবার কেউ কেউ তা প্রত্যাখ্যান করছে। কিন্তু কোরআনের বার্তা অপরিবর্তিত রয়েছে। আল্লাহর নির্দেশ কাল, স্থান এবং যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় না। মানুষের মতামত বদলাতে পারে, সামাজিক ধারা পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু সত্য তার জায়গায় অটল থাকে। এই কারণেই কওমে লুতের কাহিনী কোরআনে সংরক্ষিত রয়েছে—যেন মানুষ যুগে যুগে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, নিজের ভুল সংশোধন করতে পারে এবং বুঝতে পারে যে আল্লাহর নির্দেশনা শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়; বরং মানুষের কল্যাণ, নৈতিকতা এবং সঠিক জীবনপথের দিকনির্দেশনা।

 

লেখক :

আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা