ধর্ম ও জাতি—এই দুটি শব্দকে আমরা প্রায়ই একই অর্থে ব্যবহার করি। অথচ ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব এবং আসমানি কিতাবগুলোর আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, ধর্ম ও জাতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। এই পার্থক্যটি না বোঝার কারণেই আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জনপরিসর এমনকি শিক্ষিত সমাজেও বহু বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচারিত হয়। কেউ ইসলামকে একটি জাতি মনে করেন, কেউ আবার মুসলমানকে একটি জাতিগত পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করেন। আবার অনেকে মনে করেন, ইহুদি বলতে কেবল একটি ধর্মকে বোঝায়। বাস্তবতা হলো—বিষয়টি এত সরল নয়।
প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। ইসলাম একটি ধর্ম (দ্বীন); এটি কোনো জাতি নয়। “মুসলিম” বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ করে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি জাতি, ভাষা ও বর্ণের মানুষ মুসলিম হতে পারেন। একজন বাঙালি মুসলিম, একজন তুর্কি মুসলিম, একজন আরব মুসলিম, একজন আফ্রিকান মুসলিম কিংবা একজন ইউরোপীয় মুসলিম—সবাই একই ধর্মের অনুসারী হলেও তাঁরা একই জাতির মানুষ নন।
অন্যদিকে ইহুদি (Jew/Jewish) শব্দটির দুটি ব্যবহার রয়েছে। একদিকে এটি ইহুদি ধর্ম (Judaism)-এর অনুসারীকে বোঝায়, অন্যদিকে এটি একটি ঐতিহাসিক-জাতিগত পরিচয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ ইহুদি পরিচয়ের মধ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত—উভয় মাত্রা রয়েছে। এখানেই ইসলাম ও ইহুদি পরিচয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মানবজাতির পরিচয় সম্পর্কে ঘোষণা করেন—”হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।”—সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩
এই আয়াত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, জাতি ও গোত্র মানবসমাজের পরিচয়ের জন্য; কিন্তু মর্যাদার ভিত্তি নয়। মর্যাদার ভিত্তি হলো তাকওয়া। অর্থাৎ ইসলাম কোনো জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে সমর্থন করে না। এখন প্রশ্ন হলো, হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর অবস্থান কী?
কুরআন, তাওরাত, যাবূর এবং ইনজিল—চারটি আসমানি ঐতিহ্যেই হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে একটি কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে—”ইবরাহিম না ইহুদি ছিলেন, না খ্রিস্টান; বরং তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ আল্লাহমুখী (হানিফ) এবং মুসলিম; তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।”—সূরা আলে ইমরান, ৩:৬৭
এই আয়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কুরআন স্পষ্ট করেছে যে, হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে পরবর্তী কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যাবে না। তিনি ছিলেন আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা। তাওরাতের আদিপুস্তক (Genesis 17:4–5)-এ আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে বলেন—”আমি তোমাকে বহু জাতির পিতা করেছি।” (Father of many nations.)
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো—তাওরাত তাঁকে কেবল একটি জাতির নয়, বহু জাতির পিতা হিসেবে উল্লেখ করেছে। আদিপুস্তক ১৭:৭–৮-এ আল্লাহ তাঁর সঙ্গে অঙ্গীকারের কথাও উল্লেখ করেছেন। আবার Genesis 21:12-এ ইসহাক (আ.)-এর মাধ্যমে একটি বংশধারার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে Genesis 25:12–18-এ ইসমাঈল (আ.)-এর বংশধরদের বিবরণ রয়েছে। অর্থাৎ ইবরাহিম (আ.)-এর দুই পুত্র—ইসমাঈল (আ.) ও ইসহাক (আ.)—দুই শাখার মাধ্যমেই বহু জাতির বিস্তার ঘটে।
এরপর আসে ইয়াকুব (আ.)-এর প্রসঙ্গ। Genesis 32:28-এ ইয়াকুব (আ.)-এর নাম পরিবর্তন করে ইসরাঈল রাখা হয়। সেখান থেকেই বনি ইসরাঈল নামের উৎপত্তি। অর্থাৎ ঐতিহাসিকভাবে ইবরাহিম (আ.) মহান পিতৃপুরুষ হলেও বনি ইসরাঈলের প্রত্যক্ষ পূর্বপুরুষ হলেন ইয়াকুব (আ.)।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আজ আমরা যাদের “ইহুদি” বলি, সেই শব্দটি এসেছে ইয়াহূদা (Judah) গোত্র থেকে। পরে দক্ষিণাঞ্চলীয় Kingdom of Judah-এর জনগণকে Jewish বলা শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে শব্দটি পুরো ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ে পরিণত হয়। অর্থাৎ—
এই ধারাবাহিকতা না জানার কারণেই অনেক বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। এবার ইসলামের দিকে আসা যাক। রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন আরব। কিন্তু ইসলাম কখনো আরব জাতির ধর্ম ছিল না। কুরআনে আল্লাহ বলেন—”বলুন, হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল।”
—সূরা আল-আ’রাফ, ৭:১৫৮
আবার—”আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি।”—সূরা সাবা, ৩৪:২৮
অর্থাৎ ইসলামের দাওয়াত আরবদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না। রাসূল (সা.)-এর সাহাবিদের মধ্যেই আমরা দেখি—
তাঁরা সবাই মুসলিম ছিলেন, কিন্তু কেউই আরব ছিলেন না। বিদায় হজের ভাষণে রাসূল (সা.) ঘোষণা করেন—”কোনো আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের, শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ার মাধ্যমে।” (মুসনাদ আহমদ; অর্থগতভাবে সহিহ বর্ণনাসমূহে সমর্থিত)
এই ঘোষণাই ইসলামে জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের অবসান ঘটিয়েছে।
যাবূরের (গীতসংহিতা Psalms 105:8–10) মধ্যেও ইবরাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুবের সঙ্গে আল্লাহর অঙ্গীকারের কথা পুনরুল্লেখ করা হয়েছে। ইনজিলের মথি ১:১–২-এ ঈসা (আ.)-এর বংশধারা ইবরাহিম (আ.) পর্যন্ত তুলে ধরা হয়েছে। আবার রোমীয় ৪:১৬–১৭-এ ইবরাহিম (আ.)-কে বহু জাতির পিতা বলা হয়েছে। অর্থাৎ চারটি আসমানি ঐতিহ্যেই ইবরাহিম (আ.)-এর কেন্দ্রীয় অবস্থান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এখন সবচেয়ে বড় ভুলটি কোথায় হয়?
অনেকে বলেন—”মুসলিম জাতি।”
আবার অনেকে বলেন—”ইসলাম জাতি।”
এ দুটি পরিভাষাই ধর্মতাত্ত্বিক ও ভাষাগতভাবে সঠিক নয়।
সঠিক শব্দ হবে—
কিন্তু মুসলিম জাতি বলা হলে ভাষাগত বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে, কারণ মুসলিমদের মধ্যে শত শত জাতি রয়েছে।
বাংলাদেশি মুসলিম বাঙালি।
ইন্দোনেশীয় মুসলিম মালয়।
তুর্কি মুসলিম তুর্কি।
আরব মুসলিম আরব।
আফ্রিকান মুসলিম আফ্রিকান।
জাতি ভিন্ন, ধর্ম এক। এই পার্থক্যটি ইসলাম নিজেই শিক্ষা দিয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, ধর্ম মানুষের বিশ্বাসের পরিচয়, আর জাতি মানুষের বংশ, ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতির পরিচয়। একজন মানুষ তার জাতি পরিবর্তন না করেও ধর্ম পরিবর্তন করতে পারেন, আবার একই জাতির মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম অনুসরণ করতে পারেন। কুরআন, তাওরাত, যাবূর ও ইনজিল—সবগুলোতেই এই মৌলিক বাস্তবতার ভিত্তি পাওয়া যায়। তাই ধর্ম ও জাতিসত্তাকে এক করে দেখা শুধু ভাষাগত ভুল নয়, ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিতেও বিভ্রান্তিকর। গবেষণামূলক আলোচনায় এই পার্থক্য স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন, যাতে ধর্মীয় পরিচয়, জাতিগত পরিচয় এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতা সম্পর্কে মানুষ সঠিক ধারণা লাভ করতে পারে।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।