September 7, 2026, 3:11 pm
শিরোনামঃ
মতলব উত্তরে পৃথক ঘটনায় কিশোরীসহ দুজনের আত্মহত্যা মোংলা-ঘাষিয়াখালী চ্যানেলের আগ্রাসন ; মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে রামপালের জনপদ বিনয়বাঁশী শিল্পীগোষ্ঠীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রানু মজুমদার মতলব উত্তরে ৫৩তম গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ মায়ের হাত ধরে হাঁটছিল শিশু ফারিয়া, বেপরোয়া ট্রলির ধাক্কায় কেড়ে নিল প্রাণ মতলব দক্ষিণে ৪৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৮৩২ শিক্ষার্থী পেলে ফুটবল বুট বাগেরহাটে একই পরিবারের তিন সদস্য হত্যা : পরকীয়ার বলি হয়ে ঝরল তিন প্রাণ, গ্রেপ্তার ৩ নবাবনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নবনির্বাচিত কমিটির পরিচিতি সভা : বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা বাগেরহাটে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পুনঃনিয়োগে উত্তাল গুলিশাখালী ফাজিল মাদরাসা বিশ্ব মানচিত্রের বিকৃতি সংশোধনে জাতিসংঘে প্রস্তাব ; ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রস্তাবের পক্ষে ১৬৪ দেশ, বিপক্ষে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র

মোংলা-ঘাষিয়াখালী চ্যানেলের আগ্রাসন ; মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে রামপালের জনপদ

‎ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট :

মোংলা-ঘাষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেলের অপরিকল্পিত খনন ও তীব্র নদীভাঙনে বাগেরহাটের রামপালে শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে, যা জনপদকে অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

‎বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে মোংলা-ঘাষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেলের প্রভাবে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে, যা গত কয়েক বছরে শতাধিক পরিবারের বসতভিটা গ্রাস করেছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে মোংলা বন্দর সচল রাখা ও পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্য নিয়ে চ্যানেলটি খনন করা হলেও, বর্তমানে সেই চ্যানেলই রামপালবাসীর জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোমজাইপুর, সিংগড়বুনিয়া, ওড়াবুনিয়া ও হুড়কা ইউনিয়নের গোলারডাঙ্গি এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটার পাকা সড়ক এবং বহু ফসলি জমি, গাছপালা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এরই মধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। কেবল বসতভিটাই নয়, রামপাল উপজেলা কৃষি অফিস, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস এবং স্থানীয় এলজিইডি কর্তৃক নির্মিত ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬২০ মিটার দীর্ঘ বক্স কালভার্টটিও নদীগর্ভে চলে গেছে। এই ভাঙনের ফলে হাজারো মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ অসম্ভব হয়ে উঠেছে। জোয়ারের পানির চাপে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় নৌকাই এখন স্থানীয়দের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে, যা তাদের জীবনযাত্রার মানকে চরম সংকটাপন্ন করে তুলেছে।

‎ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নদীভাঙন এখন কেবল ঘরবাড়ি হারানোর সংকট নয়, এটি তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষি অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। রোমজাইপুর এলাকায় ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবার এবং ওড়াবুনিয়া এলাকায় আরও ৪০টি পরিবার গৃহহীন হয়ে সরকারি রাস্তার পাশে বা অন্যের আশ্রয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ঝুঁকিতে থাকা আরও দেড় শতাধিক পরিবার প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের মতে, অপরিকল্পিত খননের ফলেই নদীর স্রোতধারা বাধাগ্রস্ত হয়ে এই বিধ্বংসী ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসন থেকে মাঝেমধ্যে সামান্য ত্রাণ বা ঢেউটিন সহায়তা দেওয়া হলেও তা পুনর্বাসনের জন্য কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়। দীর্ঘদিনের এই সংকটে তাদের একমাত্র দাবি হলো অবিলম্বে স্থায়ী সমাধান। তারা মনে করছেন, জিও ব্যাগ বা দায়সারা পাইলিং দিয়ে এই আগ্রাসন ঠেকানো সম্ভব নয়, বরং নদীর বাঁক সোজা করা এবং পরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনাই পারে তাদের ভিটেমাটি রক্ষা করতে।

‎সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, এই ভাঙনের পেছনে একদিকে যেমন নদীর স্বাভাবিক স্রোতধারা ও জোয়ার-ভাটার প্রভাব দায়ী, তেমনি চ্যানেলে চলাচলকারী বড় বড় নৌযানের ঢেউও ভাঙন ত্বরান্বিত করছে। রামপাল উপজেলা উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি এবং মোংলা-ঘাষিয়াখালী চ্যানেল রক্ষা সংগ্রাম কমিটির দাবি, ডিপিপির নকশা অনুযায়ী ৮৩টি খাল ও নদী খনন না করায় এই বিপর্যয় নেমে এসেছে। পরিবেশ ও নদীবিজ্ঞান গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএস-এর তৎকালীন রিপোর্ট নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনটি পয়েন্টে ভাঙন রোধে কাজ চলছে এবং বড় ভাঙন স্থানগুলোতে নতুন টেকসই প্রকল্পের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনের পর দ্রুত পাইলিং বাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে স্থানীয়রা বলছে, ড্রেজিংয়ের নামে অপরিকল্পিত কর্মযজ্ঞ বন্ধ না করলে এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না করলে কেবল পাইলিং দিয়ে ভাঙন রোধ করা অসম্ভব।

‎রামপালের এই মানবিক বিপর্যয় কেবল স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের উপকূলীয় অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার বড় একটি ব্যর্থতার চিত্র। যদি দ্রুত ৩৪/২ নম্বর ফোল্ডার ওয়াপদা বেড়িবাঁধ বাস্তবায়ন এবং নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে মানচিত্র থেকে রামপালের অনেক গ্রাম চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদীভাঙন কবলিত মানুষের আর্তনাদ এবং ক্রমবর্ধমান কৃষি ও শিক্ষাগত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হলে সরকারিভাবে দীর্ঘমেয়াদী এবং বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি মুহূর্তের বিলম্ব হাজারো মানুষের স্বপ্নকে নদীর অতল গহ্বরে বিলীন করে দিচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও জননিরাপত্তার জন্য একটি বড় অশনিসংকেত হিসেবে দাঁড়িয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা