বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূরাজনীতির জটিল সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে এমন কিছু ভৌগোলিক বিন্দু রয়েছে, যেগুলোকে বলা হয় “চোকপয়েন্ট”—অর্থাৎ এমন সংকীর্ণ পথ, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য প্রবাহিত হয় এবং যেগুলো কোনো কারণে ব্যাহত হলে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এই চোকপয়েন্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত একটি হলো হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথটি শুধু একটি ভৌগোলিক অবস্থান নয়; এটি আন্তর্জাতিক তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এক অনন্য অর্থনৈতিক ট্রাম্পকার্ড হিসেবে বিবেচিত।
হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক অবস্থানই এর গুরুত্ব নির্ধারণ করে। এটি একদিকে সংযুক্ত করেছে পারস্য উপসাগর এবং অন্যদিকে ওমান উপসাগর হয়ে আরব সাগর-এর সঙ্গে। এই পথ দিয়েই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর উৎপাদিত জ্বালানি আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। বিশেষ করে সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের মতো দেশগুলোর তেল রপ্তানির প্রধান সমুদ্রপথ এটি।
বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের একটি বিশাল অংশ—প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা তারও বেশি—এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন পরিবাহিত হয়। অর্থাৎ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বা কোনোভাবে বিঘ্নিত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে তাত্ক্ষণিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে। আর তেলের বাজারে এমন একটি সংকটের অর্থ হলো—মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন, এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা। এই প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই পথটি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা যাদের হাতে থাকে, তারা পরোক্ষভাবে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এই কারণে হরমুজ প্রণালীকে অনেক সময় “গ্লোবাল এনার্জি গেটওয়ে” বা বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবেশদ্বার বলা হয়। এই প্রেক্ষাপটে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রণালীর উত্তরের উপকূলজুড়ে ইরানের অবস্থান হওয়ায়, এই দেশটি বহুবার এই জলপথকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, তখন ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দিয়ে থাকে। এই ধরনের হুমকি সরাসরি তেলের বাজারে প্রভাব ফেলে। কারণ বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়, ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। এমনকি বাস্তবে প্রণালী বন্ধ না হলেও, শুধু উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হলেই বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। অন্যদিকে, সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোও এই প্রণালীর ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। যদিও তারা বিকল্প পাইপলাইন বা রুট তৈরির চেষ্টা করেছে, তবুও হরমুজ প্রণালীর বিকল্প সম্পূর্ণভাবে তৈরি করা এখনো সম্ভব হয়নি। এই নির্ভরশীলতা হরমুজ প্রণালীকে একটি “ট্রাম্পকার্ড”-এ পরিণত করেছে। কারণ এটি এমন একটি কৌশলগত সম্পদ, যা প্রয়োজনে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর দৃষ্টিতেও এই প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে নৌবাহিনীর উপস্থিতি বজায় রেখেছে, যাতে এই জলপথ নিরাপদ থাকে এবং তেল পরিবহন নির্বিঘ্নে চলতে পারে। একইভাবে চীন, জাপান এবং ভারত-এর মতো জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোও এই প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কারণ এই দেশগুলোর শিল্প, পরিবহন এবং সামগ্রিক অর্থনীতি তেলের ওপর নির্ভরশীল। যদি হরমুজ প্রণালীতে কোনো সমস্যা সৃষ্টি হয়, তাহলে তাদের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। এই প্রণালীর গুরুত্ব বোঝার জন্য ইতিহাসের দিকে তাকানো প্রয়োজন। বিভিন্ন সময় মধ্যপ্রাচ্যে সংঘটিত যুদ্ধ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় হরমুজ প্রণালী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে। বিশেষ করে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় “ট্যাংকার ওয়ার” নামে পরিচিত সংঘর্ষে তেলবাহী জাহাজগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্থির হয়ে ওঠে। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও এই অঞ্চলে বিভিন্ন হামলা, জাহাজ জব্দ এবং সামরিক মহড়া আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, হরমুজ প্রণালী কেবল একটি বাণিজ্যপথ নয়; এটি একটি ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব আরও গভীর। বিশ্ববাজারে তেলের দাম নির্ধারণে সরবরাহ এবং চাহিদার ভারসাম্য একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে। এই সরবরাহের একটি বড় অংশ যদি একটি নির্দিষ্ট সংকীর্ণ পথের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সেই পথের যেকোনো অনিশ্চয়তা বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এই কারণেই হরমুজ প্রণালীকে একটি “স্ট্র্যাটেজিক চোকপয়েন্ট” বলা হয়। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে সামান্য পরিবর্তনও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। অনেক দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকলেও তেলের ওপর নির্ভরতা এখনো অনেক বেশি। এই বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব কমার কোনো লক্ষণ নেই। বরং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গে এই প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ যতদিন তেলের ওপর নির্ভরতা থাকবে, ততদিন এই ধরনের চোকপয়েন্টগুলোর গুরুত্ব অটুট থাকবে। তবে ভবিষ্যতে এই নির্ভরতা কমানোর জন্য বিভিন্ন দেশ বিকল্প জ্বালানি, পাইপলাইন এবং রুট তৈরির চেষ্টা করছে। উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কিছু বিকল্প পাইপলাইন তৈরি করেছে, যা হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ দেয়। কিন্তু এই বিকল্পগুলো এখনো পুরোপুরি কার্যকর বা পর্যাপ্ত নয়। এই বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে একটি “ট্রাম্পকার্ড” হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। এই প্রণালীকে ঘিরে যে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে, তা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। কারণ এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি একটি কৌশলগত হাতিয়ার।
সবশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালী একটি ছোট ভৌগোলিক এলাকা হলেও এর প্রভাব বৈশ্বিক। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সামরিক শক্তি একত্রিত হয়েছে। এই প্রণালী নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি তাই শুধু আঞ্চলিক নয়; এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
বিশ্ব যতদিন জ্বালানি হিসেবে তেলের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, ততদিন হরমুজ প্রণালী তার গুরুত্ব ধরে রাখবে—একটি অর্থনৈতিক ট্রাম্পকার্ড হিসেবে, যা প্রয়োজনে বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।