সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণার কয়েক বছর না পেরোতেই আবারও উদ্বেগজনকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বনদস্যুতা। ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা অনেক সাবেক দস্যু বর্তমানে মামলা নিষ্পত্তির জটিলতা ও পুনর্বাসনের অভাবে চরম সংকটে পড়েছেন। ফলে তাদের একটি অংশ বাধ্য হয়ে আবারও পুরোনো পথে ফিরে যাচ্ছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ সদস্য অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অঙ্গীকার করেন। সে সময় সরকার তাদের পুনর্বাসন ও দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির আশ্বাস দেয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন—এমন অভিযোগ আত্মসমর্পণকারীদের।
রামপাল উপজেলার সাবেক দস্যুদের কয়েকজন জানান, আত্মসমর্পণের পর নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখলেও তা ধীরে ধীরে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিন মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির প্রতিশ্রুতি থাকলেও বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে। মামলার খরচ বহন করতে গিয়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন।
একজন আত্মসমর্পণকারী বলেন, “মামলার খরচ চালাতে গিয়ে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি। অনেকেই এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আবার সুন্দরবনে ফিরে গেছে।”
আরেকজনের ভাষায়, “পুনর্বাসনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা পর্যাপ্ত নয়। আয়-রোজগার কম, কিন্তু মামলার খরচ বেশি—এভাবে টিকে থাকা সম্ভব না।”
তাদের দাবি, অনেকের একাধিক মামলা এখনো চলমান। প্রতিটি হাজিরায় খরচ বহন করতে গিয়ে তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়ছেন। কেউ কেউ জমিজমা বিক্রি করেও মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে পরিবারগুলোও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে সুন্দরবনে পরিচালিত অভিযানে বিভিন্ন বাহিনীর ৬১ জন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এ সময় ৮০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৯৯ রাউন্ড তাজা গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয় এবং ৭৮ জন জেলে ও ৩ জন পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় বনদস্যুদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে অভিযান চলছে। সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত না করা পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে এই সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। আত্মসমর্পণকারীদের টেকসই পুনর্বাসন ও দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি নিশ্চিত না করলে তারা পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
পরিবেশ ও বন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, “আত্মসমর্পণকারীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। নইলে দস্যুতা দমন দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।”
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, “আত্মসমর্পণকারী প্রত্যেককে এককালীন আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। তারা যদি পুনর্বাসন সংক্রান্ত কোনো আবেদন করে, তাহলে তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।”
অন্যদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “অপরাধ করে বারবার সুযোগ দেওয়া সঠিক নয়। বনদস্যুদের হয় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হবে, না হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, সুন্দরবনকে স্থায়ীভাবে দস্যুমুক্ত রাখতে হলে শক্ত হাতে দমন অভিযানের পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সমস্যার সমাধান জরুরি। মামলা নিষ্পত্তি ও কার্যকর পুনর্বাসনের মাধ্যমে আত্মসমর্পণকারীদের স্বাভাবিক জীবনে টিকিয়ে রাখতে না পারলে, এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।