June 24, 2026, 9:37 pm
শিরোনামঃ
সুন্দরবনে সক্রিয় ১৫০ বন্যপ্রাণী শিকারি; গোয়েন্দা নজরদারিতে অপরাধী চক্র যুবসমাজ যত বেশি মাঠমুখী হবে, ততই তারা মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধ থেকে দূরে থাকবে : আলমগীর সরকার সময়ের আলোকে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ : এক পুনর্মূল্যায়নের আলোচনা নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে ইমামপুর ক্রীড়া চক্রকে হারিয়ে ফাইনালে কেশাইরকান্দি ইয়ং স্পোর্টিং ক্লাব মতলব-গজারিয়া সেতুর অর্থায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে, জমি অধিগ্রহণে ১২ কোটি টাকা অনুমোদন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে চাঁদপুর-২ আসনের উন্নয়ন সম্ভাবনা তুলে ধরলেন এমপি ড. জালাল উদ্দিন সাংগঠনিক সপ্তাহ উপলক্ষে মতলব উত্তরে যুবদলের প্রতিবাদ মিছিল সুন্দরবনে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির চক্রে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকি কোটচাঁদপুরে মানবপাচার রোধে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সমন্বয় সভা মতলব উত্তরে পরকীয়ার সন্দেহে শুরু বিরোধ, শ্বশুর-স্ত্রীর বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ স্বামীর

জিকির ও ফিকির : সূফীবাদের আত্মিক অনুশীলন

Reporter Name

মানবজীবনের গভীরে এমন এক অদৃশ্য জগত রয়েছে, যেখানে শব্দ নেই, কিন্তু অনুভূতি আছে; যেখানে দৃষ্টি নেই, কিন্তু উপলব্ধি আছে। এই অন্তর্জগতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার জন্যই মানুষ আধ্যাত্মিকতার পথে যাত্রা করে। ইসলামের আধ্যাত্মিক ধারায়, বিশেষত সূফীবাদে, এই অন্তর্জগতকে জাগ্রত করার দুটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন হলো—জিকির ও ফিকির। এই দুইটি শব্দের মধ্যে রয়েছে গভীর তাৎপর্য, যা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, তাকে স্রষ্টার নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায় এবং তার জীবনকে অর্থবহ করে তোলে।

জিকির শব্দের অর্থ স্মরণ করা, আর ফিকির শব্দের অর্থ চিন্তা করা বা গভীরভাবে ভাবা। এই দুটি অনুশীলন পরস্পরের পরিপূরক। জিকির মানুষকে স্রষ্টার স্মরণে রাখে, আর ফিকির তাকে স্রষ্টার সৃষ্টি ও জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে চিন্তা করতে শেখায়। এই দুইয়ের সমন্বয়েই একজন মানুষ তার অন্তরের গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং আধ্যাত্মিক উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারে।

জিকিরের মাধ্যমে মানুষ তার হৃদয়কে জাগ্রত করে। এটি কেবল মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণ করা নয়; বরং এটি একটি অন্তর্গত অবস্থান, যেখানে মানুষ সর্বক্ষণ স্রষ্টার উপস্থিতি অনুভব করার চেষ্টা করে। যখন একজন মানুষ নিয়মিত জিকির করে, তখন তার অন্তরের অস্থিরতা ধীরে ধীরে কমে আসে। তার মন শান্ত হয়, তার চিন্তা পরিষ্কার হয় এবং সে জীবনের প্রতি একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করে।

পবিত্র কুরআনে জিকিরের গুরুত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে—“জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” (সূরা রাদ ১৩:২৮)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের প্রকৃত শান্তি বাহ্যিক কোনো উপাদানে নয়; বরং স্রষ্টার স্মরণেই নিহিত। আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে—“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর।” (সূরা আহযাব ৩৩:৪১)

এই নির্দেশনা জিকিরের ধারাবাহিকতা ও গুরুত্বকে তুলে ধরে।

হাদীস শরীফেও জিকিরের ফজিলত সম্পর্কে অনেক কথা বলা হয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন—“আমি কি তোমাদের এমন একটি আমলের কথা বলব না, যা তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, তোমাদের প্রভুর কাছে সবচেয়ে পবিত্র, মর্যাদায় সর্বোচ্চ এবং তোমাদের জন্য স্বর্ণ-রৌপ্য দান করার চেয়েও উত্তম?” সাহাবারা বললেন, অবশ্যই। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর জিকির।’ (তিরমিজি)

জিকির মানুষের অন্তরের পরিশুদ্ধির একটি প্রধান মাধ্যম। মানুষের হৃদয় অনেক সময় দুনিয়ার ব্যস্ততা, দুশ্চিন্তা ও পাপের কারণে কঠিন হয়ে যায়। জিকির সেই হৃদয়কে নরম করে, তাকে জীবন্ত করে তোলে। এটি এমন একটি আলোক, যা অন্তরের অন্ধকার দূর করে। অন্যদিকে, ফিকির হলো চিন্তা, ধ্যান ও আত্মজিজ্ঞাসার একটি প্রক্রিয়া। এটি মানুষকে তার অস্তিত্ব, জীবন, মৃত্যু এবং স্রষ্টার সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে ভাবতে শেখায়। ফিকির মানুষকে গভীরভাবে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে—আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি, আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী?

পবিত্র কুরআনে বারবার মানুষকে চিন্তা করতে বলা হয়েছে—“তারা কি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে না?” (সূরা আলে ইমরান ৩:১৯১)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, চিন্তা করা বা ফিকির করা একটি ইবাদতের অংশ।

আরও বলা হয়েছে—“তোমরা কি চিন্তা করো না?” (সূরা বাকারা ২:৪৪)

এই ধরনের প্রশ্ন মানুষের মধ্যে আত্মজিজ্ঞাসা জাগিয়ে তোলে।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনে ফিকিরের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো হেরা গুহায় তাঁর নির্জন অবস্থান। নবুওয়ত প্রাপ্তির পূর্বে তিনি সেখানে নির্জনে সময় কাটাতেন, গভীর চিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন। এটি প্রমাণ করে যে, চিন্তা ও ধ্যান মানুষের আত্মিক প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জিকির ও ফিকির একসঙ্গে কাজ করে মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে। জিকির অন্তরকে স্রষ্টার সঙ্গে সংযুক্ত করে, আর ফিকির সেই সংযোগকে গভীর করে। জিকির মানুষকে স্মরণ করায়, আর ফিকির তাকে বুঝতে সাহায্য করে। এই দুইয়ের সমন্বয়ে একজন মানুষ তার আত্মিক যাত্রায় এগিয়ে যায়। এই অনুশীলনের ফলে মানুষের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। তার মধ্যে ধৈর্য বৃদ্ধি পায়, সে সহজে রাগান্বিত হয় না, তার মধ্যে সহনশীলতা ও ক্ষমাশীলতা তৈরি হয়। সে অন্যদের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। তার জীবনে এক ধরনের ভারসাম্য আসে, যা তাকে দুশ্চিন্তা ও হতাশা থেকে রক্ষা করে।

বর্তমান যুগে মানুষ নানা ধরনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি তার মানসিক জগতকে জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে জিকির ও ফিকির একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। এটি মানুষকে তার অন্তরের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় এবং তাকে প্রকৃত শান্তির সন্ধান দেয়। তবে এই অনুশীলন কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে করলেই হবে না; এর জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা ও ধারাবাহিকতা। একজন মানুষ যদি নিয়মিতভাবে জিকির ও ফিকির চর্চা করে, তাহলে সে ধীরে ধীরে তার জীবনে পরিবর্তন দেখতে পাবে।

সবশেষে বলা যায়, জিকির ও ফিকির সূফীবাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, যা মানুষের আত্মিক উন্নয়নের পথকে সুগম করে। এটি মানুষকে তার প্রকৃত সত্তার সঙ্গে পরিচিত করে এবং তাকে স্রষ্টার নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায়। এই পথ সহজ নয়, কিন্তু এটি অত্যন্ত অর্থবহ। কারণ এই পথেই মানুষ তার অন্তরের অন্ধকার দূর করে আলোর দিকে এগিয়ে যেতে পারে। আর সেই আলোই তাকে একটি শান্ত, পরিশুদ্ধ ও অর্থবহ জীবনের দিকে পরিচালিত করে।

 

লেখক :

আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা