বাংলা ভাষায় একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে—“ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।” এই প্রবাদটির গভীরে লুকিয়ে আছে সময়ের এক অনিবার্য সত্য। মানুষ, ঘটনা, সিদ্ধান্ত কিংবা নেতৃত্ব—সবকিছুর প্রকৃত মূল্যায়ন সবসময় তাৎক্ষণিকভাবে হয় না। অনেক সময় যে মানুষকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রেক্ষাপটে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়, কালের প্রবাহে তাকেই নতুনভাবে আবিষ্কার করে সমাজ। আবার যাদের একসময় অপরিহার্য মনে হয়েছিল, সময়ের পরীক্ষায় তাদের অনেকেই গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেন। ইতিহাসের এই নির্মোহ বাস্তবতা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে জনমত পরিবর্তনশীল, কিন্তু সময়ের বিচার অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক আড্ডা এবং বিভিন্ন জনপরিসরে একটি বিষয় ক্রমশ আলোচনায় আসছে। সেটি হলো সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদকে ঘিরে নতুন করে শুরু হওয়া ইতিবাচক মূল্যায়ন। কয়েক বছর আগেও যাঁকে নিয়ে তীব্র বিতর্ক, সমালোচনা এবং নানা ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল, আজ তাঁর নাম উচ্চারিত হচ্ছে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। অনেকে তাঁর দায়িত্ব পালনকালীন সময়কে স্মরণ করছেন, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন নিয়ে কথা বলছেন, তাঁর নেতৃত্বের দৃঢ়তা নিয়ে আলোচনা করছেন এবং কেউ কেউ বলছেন—সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভূমিকার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি একটি মন্তব্য অনেকের নজর কেড়েছে। সেখানে একজন লিখেছেন, “আপনি কতটা প্রাসঙ্গিক আর দেশপ্রেমিক ছিলেন তা বাঙালি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।” এই ধরনের বক্তব্যের সঙ্গে সবাই একমত হবেন এমন নয়। কিন্তু এটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই যে এমন মন্তব্যের উপস্থিতি প্রমাণ করে, সমাজের একটি অংশ অন্তত তাঁকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে। এই পুনর্মূল্যায়নের কারণ কী? কেন সময়ের ব্যবধানে একজন সাবেক সেনাপ্রধানকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই এই আলোচনার উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা জাতীয় জীবনে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাব ফেলেছেন। তাঁদের কেউ প্রশংসিত হয়েছেন, কেউ সমালোচিত হয়েছেন, আবার কেউ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুনভাবে মূল্যায়িত হয়েছেন। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদও সেই ধারারই একজন আলোচিত ব্যক্তিত্ব।
অনেক বিজ্ঞজনের মতে, তিনি এমন একজন কর্মকর্তা ছিলেন যিনি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছেন। তাঁরা মনে করেন, কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সক্ষমতা এবং দায়িত্বের প্রতি অঙ্গীকার তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তাঁদের ভাষায়, নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা হয় সংকটের সময়, আর সেই পরীক্ষায় তিনি নিজের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন।
তাঁর সমালোচকরাও বলেন যে, জনজীবনে কাজ করা মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তারা যখন দায়িত্বে থাকেন তখন তাদের কাজের মূল্যায়ন হয় রাজনৈতিক চশমা দিয়ে, কিন্তু দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর ইতিহাস তাদের নতুনভাবে বিচার করে। এই কারণেই হয়তো আজ অনেক মানুষ অতীতের ঘটনাগুলোকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছেন।
জেনারেল আজিজ আহমেদকে নিয়ে আলোচনায় বিজ্ঞজনরা প্রায়ই একটি বিষয় উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, তিনি দায়িত্ব পালনকালে কখনো সহজ পথ বেছে নেননি। বরং যেটিকে তিনি প্রয়োজনীয় মনে করেছেন, সেটিকেই বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। সমর্থকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন নেতার সবচেয়ে বড় গুণ হলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস, আর সেই সাহসই তাঁকে অনেকের কাছে স্মরণীয় করে রেখেছে।
অবশ্য বাস্তবতা হলো, জনজীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে নিয়ে একমুখী মূল্যায়ন কখনোই সম্ভব নয়। সমর্থন যেমন থাকবে, সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়—সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা যদি টিকে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে তিনি জনপরিসরে একটি ছাপ রেখে গেছেন। কারণ সাধারণত সময় অপ্রাসঙ্গিক মানুষকে ভুলে যায়, কিন্তু যাদের নিয়ে বিতর্ক, আলোচনা কিংবা মূল্যায়ন চলতে থাকে, তারা কোনো না কোনোভাবে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকেন।
রাজনৈতিক আড্ডাগুলোতে আজকাল প্রায়ই শোনা যায় যে দেশের বিভিন্ন সংকটময় মুহূর্তে দৃঢ় নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল এবং সেই প্রেক্ষাপটে অনেকেই অতীতের নেতৃত্বকে নতুনভাবে তুলনা করছেন। এই তুলনার ভেতরেই উঠে আসে জেনারেল আজিজ আহমেদের নাম। কেউ তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার কথা বলেন, কেউ তাঁর প্রশাসনিক দৃঢ়তার কথা বলেন, আবার কেউ তাঁর ব্যক্তিগত সাহসিকতার উদাহরণ তুলে ধরেন।
বিজ্ঞজনদের মতে, তাঁকে নিয়ে যেসব নেতিবাচক প্রচারণা হয়েছিল, তার অনেকগুলোর প্রভাব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে গেছে। তারা মনে করেন, জনমত সবসময় স্থির থাকে না। মানুষ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন তথ্য দেখে, নতুন বাস্তবতা উপলব্ধি করে এবং অতীতকে নতুনভাবে বিচার করে। এই কারণেই তারা মনে করেন, আজ যে পুনর্মূল্যায়নের আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটি কেবল কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং সময়ের পরিবর্তনেরও প্রতিফলন।
বাংলাদেশের সমাজে একটি বিষয় প্রায়ই দেখা যায়—যখন কোনো ব্যক্তি ক্ষমতায় থাকেন, তখন তাকে নিয়ে আবেগ বেশি থাকে। কিন্তু ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর তার প্রকৃত প্রভাব মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়। তখন মানুষ প্রশ্ন করে—তিনি কী রেখে গেছেন? তাঁর সিদ্ধান্তগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী ছিল? তিনি যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তা কতটা সঠিক ছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই অনেক সময় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।
জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদকে নিয়ে আজকের আলোচনার পেছনেও হয়তো এই বাস্তবতা কাজ করছে। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ শুধু ঘটনাকে দেখে না, ঘটনার ফলাফলও দেখতে শুরু করে। আর ফলাফল যখন সামনে আসে, তখন মূল্যায়নের ধরনও পরিবর্তিত হয়।
বিজ্ঞজনরা প্রায়ই বলেন, দেশের সংকটকালে মানুষ সাহসী নেতৃত্ব খোঁজে। তারা এমন মানুষকে স্মরণ করে, যিনি দায়িত্ব নিতে ভয় পান না, যিনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকেন এবং যিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন না। তাদের দৃষ্টিতে, জেনারেল আজিজ আহমেদ সেই ধরনের নেতৃত্বের প্রতীক।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তথ্য যেমন দ্রুত ছড়ায়, তেমনি অপপ্রচারও দ্রুত ছড়ায়। ফলে কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে জনমত গঠনের প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় কোনো ব্যক্তির প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে তাৎক্ষণিক আবেগের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। অনেকের মতে, জেনারেল আজিজ আহমেদকে নিয়ে আজ যে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে, সেটি সেই দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়নেরই অংশ।
মানুষের স্মৃতিতে টিকে থাকা সহজ নয়। প্রতিদিন অসংখ্য ঘটনা ঘটে, অসংখ্য ব্যক্তি আলোচনায় আসেন এবং হারিয়েও যান। কিন্তু কিছু মানুষকে সময় বারবার আলোচনায় ফিরিয়ে আনে। কারণ তারা কোনো না কোনোভাবে মানুষের মনে একটি স্থায়ী ছাপ রেখে যান। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদকে ঘিরে চলমান আলোচনা অন্তত এটুকু প্রমাণ করে যে তিনি এখনো জনআলোচনার একটি প্রাসঙ্গিক নাম।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের বিচার ইতিহাসই করবে। কে কতটা সঠিক ছিলেন, কে কতটা ভুল ছিলেন, কে কতটা প্রভাব ফেলেছেন—এসবের চূড়ান্ত উত্তর সময়ই দেয়। তবে এটুকু বলা যায়, কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে যখন বছর পেরিয়েও আলোচনা হয়, তখন তিনি নিছক একজন সাবেক কর্মকর্তা হয়ে থাকেন না; তিনি জনস্মৃতির অংশ হয়ে ওঠেন।
আজ যারা তাঁকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেন, তারা মনে করেন দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা, সাহস এবং দায়িত্ববোধের কারণে তিনি স্মরণীয়। আবার অন্যদের ভিন্ন মত থাকতে পারে। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য এখানেই যে, সেখানে মূল্যায়নের ভিন্নতা থাকে। সময়ের প্রবাহে সেই মূল্যায়ন আরও পরিপক্ব হয়।
সময়ের আলোকে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদকে ঘিরে যে পুনর্মূল্যায়ন শুরু হয়েছে, সেটি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ভবিষ্যৎই বলবে। তবে এটুকু নিশ্চিত যে সময়ের আদালত এখনো তার রায় লেখা শেষ করেনি। আর ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—তার শেষ অধ্যায় কখনোই আগেভাগে লেখা যায় না।
তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্পর্কিত প্রকাশিত সরকারি তথ্য ও জীবনীমূলক উপাত্ত।
২. বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সাক্ষাৎকার, প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণধর্মী লেখা।
৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত জনমত ও সমসাময়িক রাজনৈতিক আলোচনা।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।