বাগেরহাটে সাদা মাছির (হোয়াইট ফ্লাই) ব্যাপক আক্রমণে নারিকেল উৎপাদন বিপর্যয়ের মুখে পড়ায় ধুঁকছে স্থানীয় বিসিক শিল্পনগরীর তেল কারখানাগুলো, যার ফলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শত শত কর্মসংস্থান।
বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীর একসময়ের প্রাণচাঞ্চল্যকর নারিকেল তেল শিল্প এখন চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। হোয়াইট ফ্লাই বা সাদা মাছির ভয়াবহ আক্রমণে জেলার নারিকেল উৎপাদন অস্বাভাবিক হারে হ্রাস পাওয়ায় এই শিল্প খাতের কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। গত এক দশকে এই পোকার উপদ্রব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, স্থানীয় কৃষকরা নারিকেল গাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বিসিক শিল্পনগরীর তেল কারখানাগুলোর ওপর, যেখানে কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়া প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন যে কারখানাগুলোতে কর্মমুখর পরিবেশ বিরাজ করত, এখন সেখানে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। নারিকেল সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে অনেক উদ্যোক্তাই তাদের দীর্ঘদিনের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক কাঠামোকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভুক্তভোগী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মতে, কাঁচামালের তীব্র সংকট শিল্পটিকে অচল করে দিয়েছে। বিসিক শিল্পনগরীর কোকোনাট ওয়েল মিলের স্বত্বাধিকারী চয়ন কুন্ডু জানান, আগে যেখানে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেখানে মাত্র একজন কর্মী দিয়ে দায়সারাভাবে মিল চালু রাখা হয়েছে। নারিকেল পাওয়া গেলে দুই-তিন মাস অন্তর মিল খোলা হয়, এরপর আবার দীর্ঘ সময়ের জন্য তা বন্ধ রাখতে হয়। একই চিত্র বিসিকের আরও ২০ থেকে ২৫টি কারখানায়। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাইরে থেকে নারিকেল সংগ্রহ করতে গিয়ে পরিবহন ও আনুষঙ্গিক ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা বাজারের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব করে তুলেছে। কৃষকরাও একই অভিযোগ করছেন; ডেমা গ্রামের গৃহস্থ তরফদার দেলোয়ার হোসেন ও কচুয়ার সোহান শেখের মতো শত শত কৃষক জানিয়েছেন, তাদের নারিকেল গাছগুলো হোয়াইট ফ্লাইয়ের আক্রমণে শুকিয়ে যাচ্ছে এবং ফলন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। একদিকে পোকার আক্রমণ, অন্যদিকে ইঁদুরের উপদ্রব—সব মিলিয়ে নারিকেল চাষ এখন আর লাভজনক পেশা হিসেবে টিকে নেই।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, নারিকেল গাছের পাতায় আশ্রয় নেওয়া হোয়াইট ফ্লাই গাছের রস শোষণ করে পাতার খাদ্য তৈরির ক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছে। আঠালো পদার্থের নিঃসরণের ফলে পাতায় কালো ছত্রাক জন্মাচ্ছে, যা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছে। বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. শরীফ সরদার স্বীকার করেছেন যে, স্থানীয় নারিকেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় কারখানাগুলো লোকসানের চাপে অন্য পেশায় ঝুঁকছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জরুরি ভিত্তিতে এই পোকা দমনে কার্যকর কীটনাশক প্রয়োগ এবং গবেষণাগার স্থাপন করা প্রয়োজন। উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে বাগেরহাটে একটি স্বতন্ত্র নারিকেল ও সুপারি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন, যাতে পোকা দমনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও রোগপ্রতিরোধী চারা উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান সরকারি উদ্যোগ বা কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই শিল্প সংকটের প্রভাব শুধু উদ্যোক্তাদের ওপর নয়, বরং সামগ্রিক কর্মসংস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শত শত শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ায় বাগেরহাটের অর্থনীতিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পোকার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তবে বাগেরহাটের নারিকেল তেল শিল্পের ঐতিহ্য ইতিহাস হয়ে যাবে। কাঁচামাল সংকট দূর করতে স্থানীয় পর্যায়ে নারিকেল গাছের রোগ নির্ণয় ও প্রতিকারে সরকারি প্রণোদনা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। নারিকেলভিত্তিক এই অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে কৃষি বিভাগ ও বিসিক কর্তৃপক্ষকে এখনই কার্যকর সমন্বয়মূলক ভূমিকা পালন করতে হবে, অন্যথায় এই অঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা আরও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে।