জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার: মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধাবস্থায় বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান ও ইরান-প্রশ্নের বিশ্লেষণ
মধ্যপ্রাচ্য বহু দশক ধরে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। জ্বালানি নিরাপত্তা, সামরিক জোট, ধর্মীয়-রাজনৈতিক বিভাজন, আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রতিযোগিতা এবং পরাশক্তির সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে এই অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে অস্থির ভূখণ্ডগুলোর একটি। যখন এই অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হয়, তখন তার প্রভাব সরাসরি কেবল সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা বিশ্ব অর্থনীতি, কূটনীতি, নিরাপত্তা ও শ্রমবাজারে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল, রেমিটেন্সনির্ভর এবং বৈদেশিক শ্রমবাজারকেন্দ্রিক দেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন অনেক সময় আলোচনায় আসে—যদি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান কী হওয়া উচিত? কিছু বিশ্লেষক যুক্তি দেন যে বাংলাদেশের উচিত ইরানের বিরোধিতামূলক অবস্থান নেওয়া, কারণ উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত আছেন এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব। এই প্রবন্ধে সেই যুক্তির ভিত্তি, সীমাবদ্ধতা এবং বৃহত্তর কৌশলগত বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা হবে।
প্রথমেই অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশে প্রবাসী আয় জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। প্রতিবছর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো—বিশেষত সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন—থেকে বিপুল রেমিটেন্স আসে। লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি নির্মাণ, সেবা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও শিল্পখাতে কর্মরত। তাঁদের উপার্জন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, উন্নয়ন প্রকল্প এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। যদি আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং এই দেশগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে যায়, তাহলে প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়তে পারে। এখানেই ইরান-প্রশ্নটি সামনে আসে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ। সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করে এবং বিদেশি শ্রমিকদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে। ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়—কীভাবে প্রবাসী নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান রক্ষা করা যাবে।
কিছু কৌশলবিদ মনে করেন, যদি বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতি সমর্থন জানায় এবং ইরানের আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, তাহলে সেই দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। এর ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের অবস্থান নিরাপদ হতে পারে এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার সম্প্রসারণে সুবিধা মিলতে পারে। এই যুক্তির মূলভিত্তি হলো—রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি সর্বাগ্রে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে। তবে এই প্রশ্নের আরেকটি দিকও রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতি হলো—ভারসাম্য ও কৌশলগত স্বার্থরক্ষা। সরাসরি কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি; জ্বালানি বাজার, সামুদ্রিক রুট ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় তার প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি অনুসরণ করেছে। সেই নীতির আলোকে সরাসরি বিরোধিতার পরিবর্তে “নীতিগত উদ্বেগ” প্রকাশ ও “আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার আহ্বান” অনেক সময় অধিক কার্যকর কৌশল হতে পারে। তবে যারা সরাসরি বিরোধিতার পক্ষে যুক্তি দেন, তাঁদের মতে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা কৌশলগতভাবে অপরিহার্য। কারণ শ্রমবাজার ছাড়াও জ্বালানি আমদানি, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহায়তার ক্ষেত্রেও এসব দেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধাবস্থায় যদি বাংলাদেশ নিরপেক্ষতার নামে নীরব থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তা “কৌশলগত অনীহা” হিসেবে দেখতে পারে—এমন আশঙ্কাও অনেকে প্রকাশ করেন। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে “জাতীয় স্বার্থ”। জাতীয় স্বার্থ কখনও স্থির নয়; সময়, পরিস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তা রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের প্রধান উপাদানগুলো হলো—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবাসী নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক ভারসাম্য।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ঝুঁকি মূল্যায়ন। কোন দেশে কতজন নাগরিক আছেন, সম্ভাব্য সংঘাতের বিস্তার কতটা, বিকল্প শ্রমবাজারের সুযোগ কী—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। কেবল আবেগ বা রাজনৈতিক চাপের ভিত্তিতে অবস্থান নেওয়া রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। সরাসরি বিরোধিতার পরিবর্তে “আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ”, “আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা”, “নৌপথের নিরাপত্তা”, “নাগরিক সুরক্ষা”—এই ধরনের নীতিগত শব্দচয়ন ব্যবহার করে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা যেতে পারে। এতে একদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগের প্রতি সমর্থন জানানো যায়, অন্যদিকে সরাসরি বৈরিতা সৃষ্টি হয় না।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্য হলো—“সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।” এই নীতির আলোকে যে কোনো বিরোধিতাও হতে হবে নীতিনির্ভর, ব্যক্তিনির্ভর বা শত্রুতামূলক নয়। যদি কোনো রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে—তাহলে সেই কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু সেটি যেন কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট না করে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে। তেলের দাম বৃদ্ধি, শিপিং রুটে ঝুঁকি, বীমা খরচ বৃদ্ধি—এসব বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়াতে পারে। ফলে কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণের সময় জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—প্রবাসী নাগরিকদের জীবন। রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যদি কোনো কৌশলগত অবস্থান তাঁদের ঝুঁকি বাড়ায়, তবে সেটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। আবার যদি দৃশ্যমান সমর্থন তাঁদের অবস্থান শক্তিশালী করে, তবে সেটিও বিবেচ্য।
পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধাবস্থায় বাংলাদেশের কৌশল নির্ধারণে আবেগ নয়, প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সরাসরি ইরানবিরোধী অবস্থান নেওয়ার পক্ষে যে যুক্তি উঠে আসে, তা মূলত অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারকেন্দ্রিক। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে হবে সমন্বিত—যেখানে অর্থনীতি, কূটনীতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আইন—সব দিক বিবেচনায় থাকবে।
একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কখনও একমাত্রিক হয় না। তা হয় বাস্তববাদী, হিসাবনির্ভর ও নাগরিককেন্দ্রিক। বাংলাদেশেরও উচিত মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় এমন একটি অবস্থান গ্রহণ করা, যা দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করে। জাতীয় স্বার্থই হবে চূড়ান্ত নির্দেশক—এবং সেই স্বার্থের কেন্দ্রে থাকবে দেশের মানুষ।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।