বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জে হানা দিয়েছে বনদস্যু বাহিনী, জিম্মি করা হয়েছে ৫ জেলেকে।
গত ২২ আগস্ট শনিবার রাত আটটার দিকে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের শ্যালার চর ও নারকেলবাড়িয়া এলাকায় সশস্ত্র বনদস্যু বাহিনী বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী ভয়াবহ এক হামলা চালায়। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রাণ বাঁচাতে উপকূলের এসব চরে আশ্রয় নেওয়া জেলেদের ওপর অতর্কিত এই হামলা চালানো হয়।
দস্যুরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে শরণখোলা উপজেলার দক্ষিণ রাজাপুর ও উত্তর রাজাপুর গ্রামের পাঁচজন জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। অপহৃতদের মধ্যে জাহাঙ্গীর হাওলাদার, শিহাব হাওলাদার, সাব্বির হাওলাদার, রিপন হাওলাদার এবং জাকির হাওলাদার রয়েছেন। দস্যুরা কেবল জেলেদেরই অপহৃত করেনি, বরং তাদের ব্যবহৃত একটি ফিশিং ট্রলারও ছিনতাই করে নিয়ে গেছে, যা উপকূলীয় মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অপহৃত জেলেদের মহাজন বাবুল মাঝি জানিয়েছেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সমুদ্র উত্তাল থাকায় জেলেরা বাধ্য হয়ে সুন্দরবনের নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে শ্যালার চরের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। কিন্তু দস্যুরা আগে থেকেই সেখানে ওঁত পেতে ছিল।
মহাজনের ভাষ্যমতে, দস্যুরা কোনো প্রকার পূর্ব সংকেত ছাড়াই হামলা চালিয়ে তিনটি পৃথক ট্রলার থেকে পাঁচজন জেলেকে তুলে নিয়ে যায়। অপহরণের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও দস্যু বাহিনীর পক্ষ থেকে মুক্তিপণ বা অন্য কোনো বিষয়ে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা হয়নি, যা অপহৃত জেলেদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। সুন্দরবনের দুর্গম গহীনে তাদের কোথায় আটকে রাখা হয়েছে তা অজানা থাকায় স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের শ্যালার চর টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান।
তিনি জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দস্যুরা এই পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে।
এ বিষয়ে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. শরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং অপহৃতদের দ্রুত উদ্ধারের জন্য কোস্ট গার্ডের সাহায্য চাওয়া হয়েছে। স্থানীয় বন বিভাগের পক্ষ থেকে টহল জোরদার করার আশ্বাস দেওয়া হলেও, দস্যু বাহিনীর এমন দুঃসাহসিক তৎপরতা প্রশাসনিক নজরদারির সীমাবদ্ধতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। জেলেদের দাবি, সুন্দরবনের অভ্যন্তরে বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য বন্ধে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
সুন্দরবনের প্রাণকেন্দ্র থেকে জেলে অপহৃত হওয়ার এই ঘটনাটি উপকূলীয় মৎস্য আহরণ খাতের জন্য একটি অশনিসংকেত।
একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে বনদস্যুদের এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতা জেলেদের পেশাগত নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে অপহৃতদের উদ্ধার করা না যায় এবং বনদস্যু বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে সুন্দরবন সংলগ্ন হাজার হাজার জেলের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। বনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে এখন কঠোর অবস্থানে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই, অন্যথায় বনদস্যুরা পুনরায় সুন্দরবনের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হবে।