August 23, 2026, 10:20 pm
শিরোনামঃ
জেনারেল ড. আজিজ আহমেদ : বিজিবির আস্থা পুনর্নির্মাণের চার বছরের অভিযাত্রা মতলব উত্তরের গজরা ইউনিয়নে সাবিনা ইয়াছমিনের ছয় দফা কর্মসূচির লিফলেট বিতরণ বাগেরহাটের দিঘি থেকে কক্সবাজারের সাফারি পার্কে ; অনশনের পর নতুন ঠিকানায় ধলাপাহাড় মতলব উত্তরে ট্রান্সফরমার চুরির মালামাল উদ্ধার, ভাঙারি ব্যবসায়ী টানা আনোয়ার আটক মতলব উত্তরে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের বর্ণাঢ্য জশনে জুলুস মতলব উত্তরে মাদকবিরোধী অভিযানে আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী বিল্লালসহ গ্রেপ্তার ১০ শিশু নাঈমকে বাঁচাতে সহয়তার আকুতি মা-বাবার জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ : নেতৃত্ব, বিতর্ক ও আইনের শাসনের আলোকে একটি পর্যালোচনা সুন্দরবনের কেওড়া ফল ; উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা ট্রান্সফরমার চুরির চেষ্টায় খুঁটিতে যুবক, জনতার হাতে আটক হয়ে পুলিশের কাছে

জেনারেল ড. আজিজ আহমেদ : বিজিবির আস্থা পুনর্নির্মাণের চার বছরের অভিযাত্রা

Reporter Name

বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ইতিহাসে কিছু সময় আছে, যেগুলোকে কেবল একটি প্রশাসনিক মেয়াদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কোনো কোনো সময় একটি বাহিনীকে শুধু দায়িত্ব পালন করলেই হয় না; তাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়, তার সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে হয়, সদস্যদের মনোবল ফিরিয়ে আনতে হয়, জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করতে হয় এবং সবচেয়ে বড় কথা—একটি সংকটের পর প্রতিষ্ঠানটিকে আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে হয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ—বিজিবির ইতিহাসে ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডির পরবর্তী সময়টি ছিল তেমনই একটি কঠিন অধ্যায়। এই প্রেক্ষাপটে জেনারেল ড. আজিজ আহমেদের বিজিবির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকে মূল্যায়ন করতে গেলে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সামরিক ক্যারিয়ার নয়, বরং সেই সময়ের প্রাতিষ্ঠানিক সংকট, বাহিনীর পুনর্গঠন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সদস্যদের কল্যাণ, নতুন জনবল নিয়োগ, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং জনআস্থা পুনর্নির্মাণের বৃহত্তর প্রক্রিয়াটিও বিবেচনায় নিতে হয়। সরকারি বিজিবি নথি অনুযায়ী, মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ ৫ ডিসেম্বর ২০১২ থেকে ১৬ নভেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত বাহিনীটির মহাপরিচালক ছিলেন—অর্থাৎ প্রায় চার বছর। এই সময়কালটি ছিল বিজিবির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাত্র কয়েক বছর আগে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের পিলখানা সদর দপ্তরে ভয়াবহ বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। সেই ঘটনার অভিঘাত শুধু নিহত পরিবারগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি বাহিনীর সাংগঠনিক মনোবল, নেতৃত্বের কাঠামো এবং জনমনে বাহিনী সম্পর্কে ধারণার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাই ২০১২ সালে যখন আজিজ আহমেদ বিজিবির দায়িত্ব নেন, তখন তাঁর সামনে প্রচলিত অর্থে কেবল সীমান্ত পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল না। তাঁকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিতে হয়েছিল, যে প্রতিষ্ঠানটি একদিকে রাষ্ট্রের সীমান্ত নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, অন্যদিকে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়ার মধ্যেও ছিল। এই বাস্তবতাই তাঁর বিজিবি-পর্বকে মূল্যায়নের মূল চাবিকাঠি।

সংকটের পর একটি বাহিনীকে পুনর্গঠনের বাস্তবতা

২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। সেই ঘটনার পর তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের কাঠামো, নাম, পোশাক, আইন, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং নেতৃত্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়। বাংলাদেশ রাইফেলসের পরিবর্তে নতুন নাম হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। ২০১০ সালের বিজিবি আইন নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। ২০১৩ সালে দ্য ডেইলি স্টার-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন বিজিবি মহাপরিচালক আজিজ আহমেদ বলেন, বিদ্রোহ-পরবর্তী বিভিন্ন তদন্ত কমিটির সুপারিশ এবং ২০১০ সালের বিজিবি আইনের আলোকে বাহিনীতে একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল সাংগঠনিক সংস্কার, আইনগত কাঠামোর পরিবর্তন, সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং বাহিনীর পুনর্গঠন। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রতিষ্ঠানকে নতুন নাম দিলেই তার সংস্কার সম্পন্ন হয় না। নাম পরিবর্তন হচ্ছে দৃশ্যমান পরিবর্তন; কিন্তু প্রকৃত সংস্কার হচ্ছে মানুষের মানসিকতা, সাংগঠনিক সংস্কৃতি, নেতৃত্বের ধরণ, প্রশিক্ষণ, জবাবদিহিতা, সুযোগ-সুবিধা এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতায় পরিবর্তন আনা। বিজিবির ক্ষেত্রে এই পুনর্গঠন তাই ছিল বহুমাত্রিক। একদিকে বাহিনীকে সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য আরও কার্যকর করতে হয়েছে; অন্যদিকে বিদ্রোহ-পরবর্তী মানসিক ক্ষত কাটিয়ে সদস্যদের মধ্যে পেশাদারিত্ব ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন আইন ও সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে বাহিনীর কার্যক্রমকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হয়েছে। ড. আজিজ আহমেদের চার বছরের দায়িত্বকালকে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখলে বোঝা যায়, এটি ছিল মূলত একটি transition period—অর্থাৎ পুরোনো সংকট থেকে নতুন প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় উত্তরণের সময়।

আস্থার পুনর্নির্মাণ কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল

যে কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু অস্ত্র বা জনবল নয়; আস্থা। সদস্যদের নিজেদের নেতৃত্বের ওপর আস্থা থাকতে হয়, নেতৃত্বের বাহিনীর ওপর আস্থা থাকতে হয় এবং রাষ্ট্র ও জনগণের বাহিনীর ওপর আস্থা থাকতে হয়। বিজিবির ক্ষেত্রে ২০০৯ সালের ঘটনা এই আস্থার কাঠামোকে কঠিনভাবে নাড়া দিয়েছিল। ফলে পুনর্গঠনের সাফল্য পরিমাপ করতে গেলে শুধু কতটি নতুন ব্যাটালিয়ন হয়েছে বা কতজন সদস্য নিয়োগ পেয়েছেন—এগুলো যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, বাহিনীটি সাংগঠনিকভাবে কতটা স্থিতিশীল হয়েছে এবং দায়িত্ব পালনের জন্য কতটা প্রস্তুত হয়েছে। বাংলাদেশ আর্মি জার্নালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে আজিজ আহমেদের দীর্ঘ প্রায় চার বছরের বিজিবি মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করে তাঁকে বিজিবি পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। একই সূত্রে তাঁর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ে আগ্রহ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের কথাও উল্লেখ রয়েছে। অবশ্য কোনো মূল্যায়নেই প্রশংসামূলক বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। একটি গবেষণামূলক পর্যালোচনায় সমর্থক, সমালোচক, সরকারি নথি, সংবাদ প্রতিবেদন এবং প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য—সবকিছুকে পাশাপাশি রাখতে হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আজিজ আহমেদের বিজিবি-পর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—তাঁর দায়িত্বকালে বাহিনীর সম্প্রসারণ ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি দৃশ্যমান ছিল।

সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সম্প্রসারণের উদ্যোগ

বাংলাদেশের সীমান্ত একটি জটিল ভৌগোলিক বাস্তবতা। দেশের সীমান্ত ভারতের সঙ্গে বিস্তৃত এবং দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের সঙ্গে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকা। নদী, পাহাড়, বনাঞ্চল, চর, জনবসতি এবং দুর্গম ভূখণ্ড—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সহজ কোনো কাজ নয়। সীমান্ত পাহারা মানে শুধু সীমান্তরেখায় দাঁড়িয়ে থাকা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, মানবপাচার, চোরাচালান, সীমান্ত অপরাধ এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা। এই বাস্তবতায় বিজিবির সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য জনবল ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশিত সামরিক সূত্রে আজিজ আহমেদের দায়িত্বকালে চারটি আঞ্চলিক সদর দপ্তর, ১৫টি ব্যাটালিয়ন এবং ১০৮টি নতুন বর্ডার আউটপোস্ট প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সূত্রে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের প্রায় ৩১০ কিলোমিটার অপেক্ষাকৃত অরক্ষিত এলাকায় নতুন বিওপি স্থাপনের এবং সুন্দরবনে দুটি ভাসমান বিওপি প্রতিষ্ঠার কথাও বলা হয়েছে। এই তথ্যগুলোকে শুধু সংখ্যার হিসাব হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। একটি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জন্য একটি নতুন বিওপি মানে হলো নতুন একটি ভৌগোলিক এলাকায় রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা। দুর্গম সীমান্তে কোনো এলাকায় নিরাপত্তা পোস্ট স্থাপন করা মানে সেখানে যোগাযোগ, রসদ, জনবল, প্রশাসনিক সহায়তা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা। অর্থাৎ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অবকাঠামো সম্প্রসারণ রাষ্ট্রের territorial presence বা ভূখণ্ডগত উপস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করে।

জনবল বৃদ্ধি এবং নতুন প্রজন্মের বিজিবি

একটি নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা অনেকাংশে তার প্রশিক্ষিত জনবলের ওপর নির্ভরশীল। আজিজ আহমেদের দায়িত্বকালে বিজিবিতে ব্যাপক জনবল নিয়োগের তথ্য বিভিন্ন প্রকাশিত সূত্রে এসেছে। তাঁর মেয়াদে প্রায় ১৮ হাজার নতুন সদস্য নিয়োগ এবং প্রথমবারের মতো নারী সদস্য অন্তর্ভুক্তির তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। নারী সদস্য নিয়োগ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আধুনিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নারী সদস্যের ভূমিকা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নারী ও শিশুদের তল্লাশি, সীমান্তবর্তী নারী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ, মানবপাচার প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে নারী সদস্যরা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন। ফলে নারী সদস্য নিয়োগকে শুধু একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং বাহিনীর মানবসম্পদ কাঠামোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। তবে এখানেও গবেষণামূলক মূল্যায়নের প্রয়োজন আছে। নারী সদস্য নিয়োগের পাশাপাশি তাঁদের প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ, পদোন্নতির সুযোগ, নিরাপত্তা এবং নেতৃত্বে অংশগ্রহণ কতটা বিস্তৃত হয়েছিল—এসব প্রশ্নও ভবিষ্যৎ গবেষণার বিষয় হতে পারে।

বাহিনীর কল্যাণ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা

একটি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকেন। দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। কখনও পাহাড়ে, কখনও নদীতে, কখনও বনে বা সীমান্তের অত্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁদের অবস্থান করতে হয়। সুতরাং শুধু অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে বাহিনীকে শক্তিশালী করা যায় না। সদস্যদের কল্যাণ নিশ্চিত করাও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ড. আজিজ আহমেদের সময় বিজিবি সদস্যদের কল্যাণমূলক কার্যক্রম, অবসরপ্রাপ্ত সদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের জন্য কল্যাণ উদ্যোগ এবং ব্যাংকিং সুবিধা প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো বিভিন্ন প্রকাশিত সামরিক লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে বাহিনীর কল্যাণ ব্যবস্থার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে দেখা যায়। তবে এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা মূল্যায়নে ব্যাংকের আর্থিক ফলাফল, সদস্যদের ব্যবহার, ঋণসুবিধা এবং কল্যাণমূলক কার্যক্রমের বাস্তব প্রভাব নিয়ে পৃথক গবেষণা প্রয়োজন। এখানে মূল দর্শনটি গুরুত্বপূর্ণ—একজন সদস্য যদি মনে করেন প্রতিষ্ঠান তাঁর পাশে আছে, তাহলে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্য ও মনোবল শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

সীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় সাফল্য সীমাবদ্ধতা

আজিজ আহমেদের চার বছরের দায়িত্বকাল নিয়ে মূল্যায়ন করতে গেলে শুধু সাফল্যের কথা বললে গবেষণাটি অসম্পূর্ণ হবে। তাঁর নিজের বিদায়ী বক্তব্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৬ সালের নভেম্বরে দায়িত্ব ছাড়ার আগে তিনি সাংবাদিকদের কাছে বিজিবির কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, গবাদিপশু চোরাচালান বন্ধ, অস্ত্র-মাদক ও মানবপাচার প্রতিরোধ এবং সীমান্ত দিয়ে যাতায়াতকারীদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি। এ বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব না হওয়ায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি সীমান্ত হত্যাকে তাঁর মেয়াদের একটি অপূর্ণতা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং সীমান্তে চোরাচালান বন্ধের সঙ্গে এই সমস্যার সম্পর্কের কথাও বলেন। এখানেই একজন দায়িত্বশীল প্রশাসকের মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পাওয়া যায়। কোনো প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্ব দেওয়া মানে সব সমস্যার সমাধান করে ফেলা নয়। বরং কোন সমস্যাগুলো সমাধান হয়েছে, কোনগুলো হয়নি এবং কেন হয়নি—সেটিও প্রকাশ্যে স্বীকার করা নেতৃত্বের অংশ। সীমান্ত হত্যা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দীর্ঘদিনের একটি স্পর্শকাতর বিষয়। ফেলানী হত্যাকাণ্ড তার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি। আজিজ আহমেদ তাঁর মেয়াদে ফেলানী হত্যার বিচার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছিলেন এবং বিএসএফের তৎকালীন নেতৃত্বের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনার কথাও জানিয়েছিলেন। অতএব তাঁর মেয়াদকে শুধু সাফল্যের গল্প হিসেবে উপস্থাপন করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি শুধু ব্যর্থতার তালিকা হিসেবেও দেখা ঠিক হবে না। বাস্তবতা হলো—তিনি একটি কঠিন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কাঠামোর নেতৃত্ব দিয়েছেন, যেখানে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে এবং কিছু সমস্যা তাঁর মেয়াদেও রয়ে গেছে।

চোরাচালান প্রতিরোধে কার্যক্রম

সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব চোরাচালান প্রতিরোধ। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্তের কারণে এই সমস্যা দীর্ঘদিনের। ২০১৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আজিজ আহমেদের চার বছরের দায়িত্বকালে বিজিবি বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য ও মাদক জব্দ করে এবং চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তিকে আটক করে। দ্য ডেইলি স্টার একটি বিজিবি হ্যান্ডআউটের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছিল, ওই সময়ে জব্দ করা অবৈধ পণ্য ও মাদকের আনুমানিক মূল্য ৩,০১৫ কোটি টাকার বেশি ছিল এবং চোরাচালানের অভিযোগে ১,৫৭৭ জনকে আটক করা হয়েছিল। এই সংখ্যাগুলো অবশ্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ নির্দেশ করে; এগুলো দিয়ে চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। বরং এগুলো দেখায় যে সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে বাহিনীর অভিযান উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পরিচালিত হয়েছিল। একটি কার্যকর সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু জব্দ করা নয়; অপরাধের অর্থনৈতিক প্রণোদনা কমানো, স্থানীয় পর্যায়ে গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি, সীমান্তবর্তী মানুষের জীবিকা উন্নয়ন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমন্বয় এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও প্রয়োজন। এই দিক থেকে আজিজ আহমেদের মেয়াদকে একটি বৃহত্তর পরিবর্তনশীল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

মিয়ানমার সীমান্ত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা

বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের একটি বড় অংশ মিয়ানমারের সঙ্গে। এই সীমান্ত ভারতের তুলনায় ভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। পাহাড়ি ভূখণ্ড, সীমান্তবর্তী দুর্গম অঞ্চল, মাদকপাচার এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতা—সবকিছু মিলিয়ে এটি জটিল এলাকা। ড. আজিজ আহমেদ তাঁর বিদায়ী বক্তব্যে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, তিনি মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করেছেন এবং ভবিষ্যতে তা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মতো সহযোগিতামূলক পর্যায়ে পৌঁছানোর আশা করেছিলেন। এ বক্তব্য সীমান্ত নিরাপত্তার একটি মৌলিক বাস্তবতা তুলে ধরে—সীমান্ত শুধু অস্ত্র দিয়ে রক্ষা করা যায় না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ, সমন্বয় এবং আস্থাও প্রয়োজন। একটি সীমান্তরক্ষী বাহিনী যত শক্তিশালীই হোক, সীমান্তের অপর পাশে যদি একই ধরনের সহযোগিতা না থাকে, তাহলে অপরাধ দমন কঠিন হয়।

বিজিবির অভ্যন্তরীণ মনোবল নেতৃত্ব

২০০৯ সালের বিদ্রোহের পর বিজিবির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল অভ্যন্তরীণ আস্থা পুনর্গঠন। নেতৃত্বের প্রতি আস্থা, শৃঙ্খলা, কর্তব্যবোধ এবং বাহিনীর নিজস্ব পরিচয়—এসব পুনর্গঠন সময়সাপেক্ষ বিষয়। আজিজ আহমেদের দায়িত্বকাল ছিল সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। একজন সামরিক নেতৃত্বের সাফল্য শুধু আদেশ দেওয়ার ক্ষমতায় নয়; বরং কঠিন পরিস্থিতিতে অধীনস্থদের আস্থা অর্জন, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে সামনে রাখার ক্ষমতার মধ্যেও নিহিত। বাংলাদেশ আর্মি জার্নালের একটি প্রোফাইলে আজিজ আহমেদের দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিজিবিতে তাঁর প্রায় চার বছরের দায়িত্ব এবং বাহিনীর সংস্কার প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই মূল্যায়নকে একাডেমিকভাবে আরও শক্তিশালী করতে হলে বিজিবির সদস্যদের অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণের পরিবর্তন, কর্মপরিবেশ, পদোন্নতি, শৃঙ্খলাজনিত তথ্য এবং কল্যাণ ব্যবস্থার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

আস্থার প্রশ্নে জনগণ সীমান্তবাসী

বিজিবির আস্থা পুনর্নির্মাণের আরেকটি স্তর হলো সীমান্তবাসীর সঙ্গে সম্পর্ক। সীমান্তে বসবাসকারী মানুষ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সবচেয়ে কাছের নাগরিক। তারা প্রতিদিন সীমান্তের বাস্তবতা দেখেন। তাঁদের সঙ্গে বাহিনীর সম্পর্ক যদি সহযোগিতামূলক হয়, তাহলে সীমান্ত অপরাধ দমনে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া সহজ হয়। অন্যদিকে সীমান্তবাসী যদি বাহিনীকে ভয় বা অবিশ্বাসের চোখে দেখেন, তাহলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই আধুনিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় “border community engagement” বা সীমান্ত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ। আজিজ আহমেদের সময় বাহিনী সম্প্রসারণের পাশাপাশি সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন বিওপি ও আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে ওঠা রাষ্ট্রের মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণা করা প্রয়োজন।

বিজিবি থেকে সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে

আজিজ আহমেদের বিজিবি-পর্বের আরেকটি তাৎপর্য হলো, পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হন। বিজিবির মহাপরিচালক হিসেবে প্রায় চার বছরের অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী সামরিক নেতৃত্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত সম্পদ তৈরি করেছিল বলে বিশ্লেষণ করা যায়। কারণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শুধু একটি বাহিনীর প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনীতি, আঞ্চলিক রাজনীতি, অর্থনীতি, মাদক ও মানবপাচার প্রতিরোধ এবং আন্তঃবাহিনী সমন্বয় যুক্ত। একজন সেনা কর্মকর্তা যখন একই সঙ্গে সামরিক বাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তখন তাঁর নিরাপত্তা-চিন্তা স্বাভাবিকভাবেই বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। এই কারণেই আজিজ আহমেদের সামরিক ক্যারিয়ারে বিজিবির চার বছরের অধ্যায় আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

একটি মূল্যায়নে প্রশংসার পাশাপাশি প্রশ্নও থাকতে হবে

গবেষণামূলক লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এটি কোনো ব্যক্তিকে দেবতা বানায় না, আবার অকারণে খলনায়কও বানায় না। জেনারেল ড. আজিজ আহমেদের বিজিবি-পর্ব নিয়ে ইতিবাচক মূল্যায়নের যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। বাহিনীর পুনর্গঠন, নতুন অবকাঠামো, জনবল বৃদ্ধি, নারী সদস্য নিয়োগ, কল্যাণমূলক উদ্যোগ এবং সীমান্ত অপরাধ দমনের কার্যক্রম তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে না পারা, চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারা এবং ফেলানী হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে না পারার মতো সীমাবদ্ধতাও তিনি নিজেই তাঁর দায়িত্বের শেষ দিকে স্বীকার করেছিলেন। এই আত্মস্বীকৃত সীমাবদ্ধতাগুলো তাঁর মূল্যায়নকে বরং আরও বাস্তব করে তোলে। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্ব দেওয়া মানে সমস্যামুক্ত পৃথিবী তৈরি করা নয়। একজন নেতৃত্বের কাজ হলো সমস্যা শনাক্ত করা, সক্ষমতা বাড়ানো এবং সমাধানের পথ তৈরি করা।

চার বছরের অভিযাত্রার প্রকৃত তাৎপর্য

আজিজ আহমেদের বিজিবির দায়িত্বকালকে যদি এক বাক্যে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তাহলে বলা যায়—এটি ছিল সংকট-পরবর্তী পুনর্গঠন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। ২০০৯ সালের ভয়াবহ ঘটনার পর বিজিবিকে নতুন পরিচয়, নতুন আইন এবং নতুন সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে দাঁড় করানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। আজিজ আহমেদের চার বছরের মেয়াদ সেই পরিবর্তনকে বাস্তব সাংগঠনিক সক্ষমতায় রূপ দেওয়ার সময়ের সঙ্গে মিলে যায়। সরকারি নথি তাঁর দায়িত্বকালকে প্রায় চার বছর হিসেবে নিশ্চিত করে। সামরিক গবেষণামূলক প্রকাশনাগুলো তাঁর সময়ে বাহিনীর সম্প্রসারণ ও সংস্কারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে।  সংবাদ প্রতিবেদনগুলো তাঁর মেয়াদের অর্জন ও সীমাবদ্ধতা উভয়ই তুলে ধরেছে। এই তিন ধরনের উৎস একসঙ্গে পড়লে একটি তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়। তিনি এমন একটি সময়ে বিজিবির নেতৃত্ব দিয়েছেন যখন বাহিনীটি নিজস্ব পরিচয় ও সক্ষমতার পুনর্নির্মাণ করছিল। তাঁর সময়েই বাহিনীর সাংগঠনিক বিস্তার ঘটেছে, নতুন সদস্য যুক্ত হয়েছে, নারী সদস্যের প্রবেশ ঘটেছে, সীমান্ত অবকাঠামো বাড়ানো হয়েছে এবং সদস্যদের কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন—সব লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এই দুই বাস্তবতাকে পাশাপাশি রেখেই ইতিহাসে তাঁর বিজিবি-পর্বকে মূল্যায়ন করা উচিত।

আস্থা কি শুধু নেতৃত্বে তৈরি হয়?

আস্থা কোনো একক ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের আস্থা তৈরি হয় বহু মানুষের সম্মিলিত কর্মের মাধ্যমে। মহাপরিচালক নীতিনির্ধারণ করেন; কর্মকর্তা ও সদস্যরা তা বাস্তবায়ন করেন; রাষ্ট্র বাজেট ও নীতিগত সহায়তা দেয়; সীমান্তবাসী সহযোগিতা করেন; প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সমন্বয় করে; আর জনগণ পুরো প্রক্রিয়ার ফলাফল অনুভব করেন। তাই বিজিবির আস্থার পুনর্নির্মাণকে শুধু আজিজ আহমেদের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে দেখা যেমন অতিসরলীকরণ, তেমনি তাঁর নেতৃত্বের ভূমিকা অস্বীকার করাও বাস্তবসম্মত নয়। একজন মহাপরিচালক একটি প্রতিষ্ঠানের গতিপথে প্রভাব ফেলেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাকে তার কাঠামো, আইন, সংস্কৃতি এবং সদস্যদের ওপর। এই জায়গায় আজিজ আহমেদের চার বছরের মেয়াদকে একটি institution-building phase হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষাটি কোথায়

বিজিবির ইতিহাসের এই অধ্যায় থেকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার জন্য কয়েকটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত, বড় সংকটের পর কোনো প্রতিষ্ঠানকে শুধু শাস্তি বা প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে পুনর্গঠন করা যায় না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক সংস্কার। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি operational effectiveness-এর অংশ। তৃতীয়ত, সীমান্ত নিরাপত্তা শুধু সামরিক বিষয় নয়। এটি অর্থনীতি, কূটনীতি, অপরাধবিজ্ঞান, স্থানীয় উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির সঙ্গেও যুক্ত। চতুর্থত, সীমান্তে অপরাধ দমনের পাশাপাশি সীমান্তবাসীর আস্থা অর্জন করতে হয়। পঞ্চমত, কোনো বাহিনীর সাফল্য বিচার করতে হলে অর্জনের পাশাপাশি অপূর্ণতাও বিবেচনা করতে হবে। এবং ষষ্ঠত, একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস কোনো এক ব্যক্তির প্রশংসা বা নিন্দার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। প্রমাণ, নথি, পরিসংখ্যান এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলই হওয়া উচিত মূল্যায়নের ভিত্তি। জেনারেল ড. আজিজ আহমেদের বিজিবির চার বছরের দায়িত্বকাল তাই বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র। তাঁর নেতৃত্বের ইতিবাচক দিকগুলো যেমন বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন, তেমনি সেই সময়ের সীমাবদ্ধতা ও অসম্পূর্ণতাগুলোকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই—ইতিহাস কাউকে অন্ধভাবে প্রশংসা করে না, আবার কাউকে অকারণে নিন্দাও করে না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত জানতে চায়—কোন সময়ে কী দায়িত্ব ছিল, কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কী পরিবর্তন ঘটেছিল এবং তার দীর্ঘমেয়াদি ফল কী হয়েছিল।

বিজিবির ক্ষেত্রে ২০১২ থেকে ২০১৬—এই প্রায় চার বছর ছিল এমন একটি সময়, যখন একটি গভীর সংকটের অভিঘাত কাটিয়ে বাহিনীটি নতুন কাঠামো, নতুন পরিচয় এবং নতুন সক্ষমতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সরকারি নথিতে আজিজ আহমেদের দায়িত্বকাল নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদন এবং সামরিক প্রকাশনাতেও এই সময়ের সংস্কার ও সম্প্রসারণের নানা তথ্য পাওয়া যায়।

সুতরাং “বিজিবির আস্থার পুনর্নির্মাণ—চার বছরের অভিযাত্রা” বলতে যদি আমরা শুধু একজন জেনারেলের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব বুঝি, তাহলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বরং এটি ছিল একটি প্রতিষ্ঠানকে সংকটের পর পুনরায় দাঁড় করানোর সম্মিলিত প্রক্রিয়া—যেখানে নেতৃত্ব, আইন, জনবল, অবকাঠামো, কল্যাণ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সমন্বয় ঘটেছিল। আর সেই বৃহত্তর প্রক্রিয়ায় জেনারেল ড. আজিজ আহমেদের চার বছরের নেতৃত্ব একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে শেষ বিচারে তাঁর সেই অধ্যায়ের মূল্যায়ন হওয়া উচিত প্রশংসা কিংবা বিরোধিতার আবেগ দিয়ে নয়—নথি, পরিসংখ্যান, প্রত্যক্ষ প্রমাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফলের আলোকে। কারণ একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর ইতিহাস ব্যক্তির চেয়ে বড়। আর সেই ইতিহাসের প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই সম্ভব, যখন আমরা একই সঙ্গে সাফল্যকে স্বীকার করি, সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করি এবং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করি।

 

তথ্যসূত্র

১. Border Guard Bangladesh (BGB), “বিগত মহাপরিচালকগণ — সরকারি ওয়েবসাইট; আজিজ আহমেদের দায়িত্বকাল ৫ ডিসেম্বর ২০১২–১৬ নভেম্বর ২০১৬। (Bangladesh Bank)

২. The Daily Star, “Reforms on to streamline BGB”, ৫ নভেম্বর ২০১৩ — বিজিবির পুনর্গঠন, ২০১০ সালের আইন এবং বিদ্রোহ-পরবর্তী সংস্কার প্রসঙ্গে। (The Daily Star)

৩. The Daily Star, “Could not bring border killing to zero”, ৮ নভেম্বর ২০১৬ — আজিজ আহমেদের বিদায়ী বক্তব্য, সীমান্ত হত্যা, ফেলানী মামলা, নারী সদস্য নিয়োগ ও সীমান্ত অপরাধবিরোধী কার্যক্রম প্রসঙ্গে। (The Daily Star)

৪. Bangladesh Army Journal, 62nd Issue — আজিজ আহমেদের সামরিক ক্যারিয়ার, প্রায় চার বছরের বিজিবি নেতৃত্ব এবং বিজিবি সংস্কারে তাঁর ভূমিকা প্রসঙ্গে। (Bangladesh Army)

৫. The Independent Bangladesh, “Outgoing BGB DG highlights 6 challenges for border guards”, ৯ নভেম্বর ২০১৬ — সীমান্ত নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ, চোরাচালান, মানবপাচার, মাদক ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে। (The Independent BD)

 

লেখক :

মোঃ আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা