বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবদান আজ আর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নয়; এটি এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা, সক্ষমতা ও পেশাদারিত্বের প্রতীক। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ শুধু দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেনি, বরং বিশ্বের বহু সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি, মানবতা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূখণ্ড—বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা নিজেদের সাহস, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে বারবার প্রমাণ করেছেন যে, বাংলাদেশ কেবল উন্নয়নশীল একটি দেশ নয়; বরং বৈশ্বিক শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রেও একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র। এই দীর্ঘ পথচলায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সেনাপ্রধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তবে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের দায়িত্ব পালনকালকে অনেকেই বিশেষভাবে স্মরণ করেন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলার জন্য। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবারও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সেনা মোতায়েনের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থান অর্জন করে—যা নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ও সামরিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের ইতিহাস প্রায় তিন দশকেরও বেশি পুরোনো। ১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেয় বাংলাদেশ। সেই ছোট সূচনা পরবর্তীতে পরিণত হয় এক বিশাল গৌরবগাথায়। আজ পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ৪০টিরও বেশি দেশে ৫০টির বেশি মিশনে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা। এক লাখেরও বেশি সেনাসদস্য, নৌসদস্য ও বিমানসেনা বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করেছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে। এই দীর্ঘ সময়ে বহু বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী আত্মত্যাগও করেছেন বিশ্ব শান্তির জন্য। তাঁদের সেই আত্মত্যাগ বাংলাদেশের জাতীয় গৌরবের অংশ হয়ে আছে।
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে তাঁদের পেশাদারিত্ব ও মানবিক আচরণ। আফ্রিকার বহু দেশে বাংলাদেশি সেনারা কেবল অস্ত্র হাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেননি; বরং স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন তাঁদের আচরণ, সহযোগিতা ও মানবিক সহমর্মিতার মাধ্যমে। কোথাও রাস্তা নির্মাণ করেছেন, কোথাও স্কুল তৈরি করেছেন, কোথাও চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন, আবার কোথাও যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছেন। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে। এই পটভূমিতে জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের গুরুত্ব অনুধাবন করে এ খাতে বিশেষ মনোযোগ দেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন শুধু আন্তর্জাতিক দায়িত্ব নয়; এটি বাংলাদেশের সামরিক কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ, শান্তিরক্ষা মিশনে সফল অংশগ্রহণের মাধ্যমে যেমন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, তেমনি সেনাবাহিনীর পেশাগত দক্ষতা ও সক্ষমতারও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তৈরি হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ বিভিন্ন মিশন এলাকা সফর করেন। তিনি সরাসরি মিশনে কর্মরত সেনা সদস্য ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁদের সমস্যা, সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করেন। অনেকেই মনে করেন, এই মাঠপর্যায়ের যোগাযোগ তাঁর নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল। কারণ, দূর থেকে প্রশাসনিক নির্দেশনা দেওয়ার চেয়ে সরাসরি বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া অধিক কার্যকর হয়।
মিশন এলাকা সফরের সময় তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং জাতিসংঘের মানদণ্ড বজায় রাখার ওপর। কারণ, একটি দেশের কয়েকজন সদস্যের আচরণ পুরো দেশের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অর্জিত সুনাম ধরে রাখতে হলে তাঁদের আচরণ, দক্ষতা ও নৈতিক অবস্থানকে সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন রাখতে হবে—এমন বিশ্বাস থেকেই তিনি কঠোর পেশাদার মানদণ্ডের ওপর জোর দিয়েছিলেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল মনে করে। মিশন এলাকা পরিদর্শনের পর জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ জাতিসংঘ সদর দপ্তর সফর করেন। সেখানে তিনি ডিপার্টমেন্ট অব পিস অপারেশনসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকগুলোকে অনেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে একটি দেশের ভূমিকা শুধু সৈন্যসংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; বরং জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সঙ্গে সেই দেশের কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়, তাঁর এই সফরের পর বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তাদের নিয়োগ বৃদ্ধি পায়। শান্তিরক্ষা মিশনে অতিরিক্ত দায়িত্ব ও নতুন ইউনিট মোতায়েনের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যায়।
বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ অর্জন ছিল জাতিসংঘ সদর দপ্তরের অফিস অব মিলিটারি অ্যাফেয়ার্স, ডিপার্টমেন্ট অব পিস অপারেশনসের চিফ অব স্টাফ পদে প্রথমবারের মতো একজন বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তার নিয়োগ। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হকের এই নিয়োগকে অনেকেই ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে দেখেন। কারণ, এটি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি জাতিসংঘের আস্থার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও বিবেচিত হয়। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সক্রিয় কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক এই সাফল্যের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল। তিনি তাঁর সফরের সময় বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি সেনা কর্মকর্তা ও কন্টিনজেন্ট নেওয়ার বিষয়ে অনুরোধ জানান। একইসঙ্গে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের নিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান জানান। পরবর্তীতে এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যায়। শুধু সদর দপ্তরের পদ নয়, মাঠপর্যায়ের দায়িত্বেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ে। মালি মিশনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পর্যায়ের কর্মকর্তা সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ পান। এছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বাংলাদেশি অফিসারদের অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়। এগুলোকে অনেকেই বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা ও নেতৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখেন।
শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সাফল্যের আরেকটি বড় দিক ছিল বিশেষায়িত ইউনিট মোতায়েন। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সময় বাংলাদেশ কুইক রিঅ্যাকশন ফোর্স, এভিয়েশন ইউনিট, স্পেশাল ফোর্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেয়। কারণ আধুনিক শান্তিরক্ষা মিশন কেবল প্রচলিত নিরাপত্তা দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং দ্রুত প্রতিক্রিয়া, আকাশপথে সহায়তা, সন্ত্রাস দমন ও মানবিক সহায়তার মতো জটিল দায়িত্বও পালন করতে হয়। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই বাংলাদেশ আর্মি এভিয়েশন গ্রুপের সক্ষমতা উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে নাইট ফ্লাইং সক্ষমতা অর্জনের বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অনেক শান্তিরক্ষা মিশনে রাতের বেলায় উদ্ধার অভিযান, চিকিৎসাসহায়তা ও নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশের হেলিকপ্টার জাতিসংঘ মিশনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়, যা ছিল একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং হাসপাতাল উন্নীতকরণের উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। একটি লেভেল-১ হাসপাতালকে লেভেল-২ হাসপাতালে উন্নীত করা মানে উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া। এটি শুধু বাংলাদেশি সদস্যদের জন্য নয়; বরং মিশনের অন্যান্য সদস্য ও স্থানীয় জনগণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অবদান। মাইন অপসারণ, সড়ক নির্মাণ, সেতু নির্মাণ এবং মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা অর্জন করেন। বিশেষ করে আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে বাংলাদেশি প্রকৌশল ইউনিটগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে। এসব কার্যক্রম স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়ক হয় এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখে। শান্তিরক্ষীদের জন্য জাতিসংঘ থেকে যে রিইমবার্সমেন্ট প্রদান করা হয়, তা দেশের জন্য একটি বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হিসেবেও কাজ করে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ জাতিসংঘের কাছে দীর্ঘদিনের বকেয়া রিইমবার্সমেন্ট আদায়ে উদ্যোগ নেন। তাঁর আলোচনার ফলেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। এছাড়াও মালি মিশনে বাংলাদেশের কয়েকটি কন্টিনজেন্টের জন্য রিস্ক প্রিমিয়াম নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, মালি জাতিসংঘের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ মিশন হিসেবে পরিচিত। সেখানে দায়িত্ব পালনকারী শান্তিরক্ষীদের অতিরিক্ত ঝুঁকি বিবেচনায় বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হয়। বাংলাদেশি সদস্যদের জন্য সেই সুবিধা নিশ্চিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অর্জন। করোনা মহামারির সময় বিশ্বব্যাপী যখন অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক বিরাজ করছিল, তখনও বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যায়। সেই সময় শান্তিরক্ষীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়, বাংলাদেশ প্রথম দেশ হিসেবে শান্তিরক্ষীদের মিশনে পাঠানোর আগেই করোনা টিকা নিশ্চিত করেছিল। এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়। কারণ, এতে শুধু বাংলাদেশি সদস্যদের নিরাপত্তাই নিশ্চিত হয়নি; বরং পুরো মিশনের কার্যক্রম সচল রাখতেও সহায়তা করেছে।
বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের আরেকটি বড় শক্তি হলো তাঁদের সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা ও মানবিক আচরণ। অনেক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে স্থানীয় জনগণ বিদেশি সেনাদের সহজভাবে গ্রহণ করে না। কিন্তু বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁরা স্থানীয় শিশুদের শিক্ষা সহায়তা দিয়েছেন, চিকিৎসা শিবির পরিচালনা করেছেন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। এই মানবিক ভাবমূর্তি গড়ে ওঠার পেছনে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সময় শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, তা আন্তর্জাতিক মিশনগুলোতেও প্রতিফলিত হয়েছে বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে শীর্ষস্থান অর্জন শুধু সংখ্যার বিষয় নয়; বরং এটি আস্থা ও দক্ষতার প্রতীক। জাতিসংঘ কোনো দেশকে শুধু জনবল বেশি বলে দায়িত্ব দেয় না; বরং সেই দেশের বাহিনীর দক্ষতা, আচরণ, নেতৃত্ব ও সক্ষমতা বিবেচনা করে। বাংলাদেশ বারবার শীর্ষস্থান অর্জন করতে পেরেছে কারণ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা নিজেদের পেশাদার ও নির্ভরযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন।
জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সমর্থকরা মনে করেন, তাঁর নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর কূটনৈতিক যোগাযোগ, পেশাগত প্রস্তুতি এবং জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয় আরও কার্যকর হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে সেনাবাহিনীর অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। অবশ্য সমালোচনাও ছিল। যে কোনো উচ্চপদস্থ সামরিক নেতার মতো তাঁর সময়কাল নিয়েও বিভিন্ন বিতর্ক ও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সমর্থকদের মতে, শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেনাবাহিনীর মর্যাদা বৃদ্ধি এবং নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা তাঁর সময়কার গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের মধ্যে অন্যতম।
বাংলাদেশের জন্য শান্তিরক্ষা মিশন কেবল একটি সামরিক দায়িত্ব নয়; এটি দেশের বৈদেশিক নীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। যখন একটি দেশের সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে, তখন সেই দেশের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশও এই ক্ষেত্র থেকে ব্যাপক কূটনৈতিক সুবিধা অর্জন করেছে। আজ বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা একটি আলাদা পরিচিতি বহন করেন। তাঁরা শুধু সৈনিক নন; বরং শান্তির দূত হিসেবেও পরিচিত। তাঁদের পেশাদারিত্ব, মানবিকতা ও আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সময়কালকে অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখেন।
সবশেষে বলা যায়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সাফল্য কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, পেশাদারিত্ব, আত্মত্যাগ এবং নেতৃত্বের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের দায়িত্ব পালনকাল সেই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে—এমনটাই মনে করেন তাঁর সমর্থক ও ঘনিষ্ঠ মহল। কারণ তাঁর সময়েই বাংলাদেশ আবারও শান্তিরক্ষা মিশনে সেনা মোতায়েনের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থান অর্জন করে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ও মর্যাদা লাভ করে। বিশ্ব শান্তির পথে বাংলাদেশের এই গৌরবোজ্জ্বল অগ্রযাত্রা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে—এটাই দেশের মানুষের প্রত্যাশা।
তথ্যসূত্রঃ
১. আইএসপিআর (Inter Services Public Relations) প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।
২. জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বিষয়ক অফিসিয়াল তথ্য (United Nations Peacekeeping Operations)।
৩. বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসিয়াল প্রকাশনা ও বার্ষিক প্রতিবেদন।
৪. বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন।
৫. শান্তিরক্ষা মিশন সংশ্লিষ্ট সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।
৬. জাতিসংঘের Department of Peace Operations (DPO) সংক্রান্ত তথ্য ও উপাত্ত।
৭. সংশ্লিষ্ট সামরিক পর্যবেক্ষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতামত।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।