September 12, 2026, 3:00 am
শিরোনামঃ
জাতিসংঘের ঘোষিত ছয় অগ্রাধিকার ও বিশ্ব বাস্তবতা মতলব উত্তরে মেঘনায় আবারও অবৈধ বালু উত্তোলন, হুমকিতে বেড়িবাঁধ ও ইকোনমিক জোন সুন্দরবনে বনরক্ষীদের অভিযানে হরিণ শিকারের বিশাল ফাঁদ ও ট্রলার জব্দ সুন্দরবনের আতঙ্ক ‘নানা ভাই’ বাহিনীর প্রধানসহ ১২ জনের আত্মসমর্পণ, জমা পড়ল বিপুল অস্ত্র সাউথ আফ্রিকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে মতলব উত্তরের প্রবাসী নিহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল করিম শিকদারকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় হরিনা কবরস্থানে দাফন বাগেরহাটে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ২৭টি পরিবার পেল ১ কোটি ৩১ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা বাগেরহাটে জলাতঙ্কের ঝুঁকি রোধে বেওয়ারিশ ও গৃহপালিত কুকুরকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু মোংলা-ঢাকা রুটে নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত: উপকূলীয় যাতায়াত ব্যবস্থার নতুন দিগন্ত বাগেরহাটে প্রসূতির জরায়ু-মূত্রথলি কাটার অভিযোগে মানববন্ধন

সুন্দরবনের আতঙ্ক ‘নানা ভাই’ বাহিনীর প্রধানসহ ১২ জনের আত্মসমর্পণ, জমা পড়ল বিপুল অস্ত্র

‎ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট :

কোস্ট গার্ডের বিশেষ অভিযানে সুন্দরবনের কুখ্যাত ‘নানা ভাই’ বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর মোড়লসহ ১২ জন সক্রিয় বনদস্যু অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেছেন।

‎মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাগেরহাটের মোংলা থানাধীন সুন্দরবনের ধানসিদ্ধির চর এলাকায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন কুখ্যাত ‘নানা ভাই’ বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর মোড়লসহ মোট বারোজন সক্রিয় ডাকাত সদস্য। বর্তমান সরকারের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের অংশ হিসেবে কোস্ট গার্ডের পরিচালিত ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ অভিযানের ধারাবাহিকতায় এই বড় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে সুন্দরবনের গহীনে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা এই বাহিনী শেষ পর্যন্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর চাপ এবং সুচারু কৌশলের মুখে টিকতে না পেরে অস্ত্র সমর্পণের পথ বেছে নেয়। গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সন্ধ্যার দিকে সংঘটিত এই আত্মসমর্পণের সময় দস্যুরা তাদের আস্তানায় লুকিয়ে রাখা বিভিন্ন ধরনের অবৈধ অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ কোস্ট গার্ডের জিম্মায় তুলে দেয়, যা সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতিতে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে এইট শুটার, সিক্স শুটার, ফোর শুটার, সাইড হেমার, বোল্ট অ্যাকশন পিস্তল, এমথ্রি গ্যাস গান, ৭.৬৫ মিমি পিস্তল, ওয়ান শুটার, এয়ার গানসহ দুই শতাধিক তাজা কার্তুজ, ফাঁকা কার্তুজ, পিস্তল বল, এয়ারগান গোলা, পিস্তল ও এয়ারগানের ম্যাগাজিন এবং ওয়াকিটকি, যা প্রমাণ করে যে এই বাহিনীটি দীর্ঘদিন ধরে কতটা শক্তিশালী ও সুসংগঠিতভাবে অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।

‎আত্মসমর্পণকারী ডাকাত দলের সদস্যরা মূলত খুলনা, সাতক্ষীরা এবং বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। এদের মধ্যে বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর মোড়ল ওরফে রহমত ছাড়াও সাইফুল্লাহ মোড়ল, এখলাছুর রহমান, রবিউল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম, আজিম উদ্দিন গাজী, আব্দুর রহমান শেখ, শফিকুল ইসলাম, মিন্টু গাজি, আজিজুল গাজী, শাহজাহান মালী এবং আজিজুর রহমানের মতো সক্রিয় অপরাধীরা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের সাধারণ জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নিত এবং মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করত। স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও পেশাজীবীরা প্রতিদিনের জীবিকা নির্বাহের তাগিদে সুন্দরবনে প্রবেশ করলেই এই বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হতেন, যার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের জনজীবন সবসময় এক ধরনের চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটত। জিম্মি করে নির্যাতন চালানো এবং পরিবারের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করাই ছিল এই বাহিনীর প্রধান আয়ের উৎস, যা উপকূলীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের মানসিক স্থৈর্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, ছোট সুমন বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী এবং ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর অন্যান্য সদস্যরাও অতীতে কোস্ট গার্ডের অভিযانের মুখে পড়ে একইভাবে কোণঠাসা হয়ে অস্ত্র জমা দিয়েছিল এবং তারই ধারাবাহিকতায় এবার ‘নানা ভাই’ বাহিনীও আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো, যা জলদস্যুদের সিন্ডিকেটগুলোকে ভেতরে ভেতরে সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছে।

‎এই সফল আত্মসমর্পণের নেপথ্য প্রেক্ষাপট তুলে ধরে কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান যে, সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সুন্দরবনকে অপরাধমুক্ত করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কঠোরভাবে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এর আগে কোস্ট গার্ডের বিশেষ অভিযানে ২৯ জন বনদস্যুকে আটক করার পাশাপাশি দস্যুদের হাত থেকে জিম্মি থাকা ৪২ জন সাধারণ মানুষকে জীবিত উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিবারের কাছে নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে জলদস্যু দমনে রাষ্ট্র কতটা আপসহীন ও তৎপর। বর্তমান পরিস্থিতিতে যারা এখনও মূল ধারার বাইরে থেকে অপরাধ চালিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছে, তাদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানানো হয়েছে যে অপরাধ অব্যাহত রাখলে কঠোরতম আইনি পরিণতি ভোগ করতে হবে। একই সাথে যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় পুনর্বাসনের সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে তারা অপরাধের পথ চিরতরে ত্যাগ করে সমাজের উৎপাদনশীল অংশে পরিণত হতে পারে। আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর এই আত্মসমর্পণকারী ডাকাতদের ও তাদের জমা দেওয়া অস্ত্রশস্ত্র সংশ্লিষ্ট আদালতের মাধ্যমে পরবর্তী ব্যবস্থার জন্য হস্তান্তর করা হবে এবং তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও আইনানুগ উপায়ে তদারকি করা হবে।

‎এই ধরনের বড় আকারের আত্মসমর্পণ সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অতীতে জলদস্যুদের দৌরাত্ম্যের কারণে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে ও বনজীবীরা সবসময় চরম ঝুঁকিতে থাকতেন এবং অর্থনীতির চাকাও বারবার হোঁচট খেত, যা এখন কোস্ট গার্ডের নিয়মিত ও জোরালো অভিযানের ফলে ক্রমান্বয়ে বদলে যাচ্ছে। এই অঞ্চলে দস্যুমুক্ত পরিবেশ বজায় থাকলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়া তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে, অন্যদিকে তেমনি দেশের অন্যতম এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সংরক্ষিত বনাঞ্চল পর্যটনসহ অন্যান্য খাতের প্রসারে আরও বেশি উপযোগী হয়ে উঠবে। অপরাধীদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ এবং একই সাথে কঠোর আইন প্রয়োগের এই যৌথ নীতি সুন্দরবনের বুকে চিরতরে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ডের এই ধরনের বিশেষ অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা, যা অপরাধের শেকড় পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে সাহায্য করবে।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা