October 30, 2026, 10:54 pm
শিরোনামঃ
সামাজিক কাজে রাজনীতির বিভাজন নয়, চাই সম্প্রীতি ও অংশগ্রহণ জিনা, ব্যভিচার ও সমকামিতা সম্পর্কে পবিত্র কোরআন কী বলে? আজম-মামুন-সুজন : এক বাল্য বন্ধনের গল্প প্রথম টেস্টে মুশফিকুর রহিমকে ছাড়াই ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে লাঞ্চে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৯৬/২ চট্টগ্রামে বাসে তল্লাশি, বিপুল ইয়াবাসহ একজন গ্রেপ্তার চাঁদপুরে নৌ পুলিশের অভিযানে ৪০ জেলে আটক, ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা ঘূর্ণিঝড় ‘আর্নব’ ভারতের অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম, বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত ইন্দোনেশিয়ায় বনাঞ্চলের আগুন নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ইরানের কাছে যুদ্ধ অবসানের নতুন প্রস্তাব, তেহরানের বক্তব্য—ধারণাগুলো গ্রহণযোগ্য নয়

জিনা, ব্যভিচার ও সমকামিতা সম্পর্কে পবিত্র কোরআন কী বলে?

Reporter Name

মানবজীবনের পবিত্রতা, ব্যক্তিগত চরিত্র, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং নৈতিক দায়িত্ব সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মানুষের যৌনজীবনও এই নৈতিক ও ধর্মীয় নির্দেশনার বাইরে নয়। ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে না; বরং প্রবৃত্তিকে বৈধ, দায়িত্বশীল ও মর্যাদাপূর্ণ পথে পরিচালিত করার শিক্ষা দেয়। বিবাহের মাধ্যমে নারী-পুরুষের সম্পর্ককে দায়িত্ব, পারস্পরিক অধিকার, বিশ্বস্ততা ও পারিবারিক জীবনের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। একই সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত যৌনসম্পর্ক, ব্যভিচার, অশ্লীলতা, মিথ্যা অপবাদ এবং যৌনতার নামে সীমালঙ্ঘন সম্পর্কে পবিত্র কোরআন সতর্ক করেছে। হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ঘটনা বর্ণনা করে কোরআন এমন যৌনাচরণেরও নিন্দা করেছে, যা প্রচলিত ইসলামী তাফসির ও ফিকহে সমকামী যৌনাচরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুরুতেই কয়েকটি পরিভাষার পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন। আরবি ‘জিনা’ শব্দটি সাধারণভাবে অবৈধ যৌনসম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বাংলায় ‘ব্যভিচার’ শব্দটি অনেক সময় বিবাহবহির্ভূত যৌনসম্পর্কের অর্থে ব্যবহৃত হয়; আবার কোনো কোনো প্রসঙ্গে এটি বিবাহিত ব্যক্তির পরকীয়াসহ অবৈধ যৌনসম্পর্ককে বিশেষভাবে বোঝায়। ফলে জিনা ও ব্যভিচার শব্দ দুটি সব আলোচনায় একেবারে পৃথক দুটি অপরাধ বোঝায় না। পবিত্র কোরআনের ১৭ নম্বর সূরা আল-ইসরা-এর ৩২ নম্বর আয়াতে জিনা থেকে শুধু বিরত থাকতে নয়, বরং তার কাছাকাছি নিয়ে যায় এমন পথ থেকেও দূরে থাকতে বলা হয়েছে। ২৪ নম্বর সূরা আন-নূরের ২ নম্বর আয়াতে জিনা সম্পর্কে নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, ৭, ১১, ১৫, ২৬, ২৭ ও ২৯ নম্বর সূরাসহ বিভিন্ন স্থানে হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ঘটনা বর্ণনা করে পুরুষদের প্রতি যৌন আকর্ষণ ও যৌনাচরণ সম্পর্কে বক্তব্য এসেছে। আধুনিক আলোচনায় যাকে ‘সমকামিতা’ বলা হয়, তার সঙ্গে এই আয়াতগুলোর সম্পর্ক বুঝতে হলে আয়াতের ভাষা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং ইসলামী ব্যাখ্যার পরিসর বিবেচনা করা জরুরি।

এখানে আরও একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ভাষায় ‘সমকামিতা’ বলতে কখনো একই লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ, কখনো ব্যক্তিগত যৌন পরিচয়, আবার কখনো সমলিঙ্গের মধ্যে যৌন আচরণ বোঝানো হয়। পবিত্র কোরআন আধুনিক মনোবিজ্ঞান বা সামাজিক পরিচয়ের এই পরিভাষাগুলো ব্যবহার করেনি। কোরআনে হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায় সম্পর্কে যে বক্তব্য এসেছে, তা মূলত তাদের আচরণ, যৌন আকাঙ্ক্ষা, সীমালঙ্ঘন এবং তাদের ওপর সংঘটিত শাস্তির বিবরণকে কেন্দ্র করে। প্রচলিত ইসলামী তাফসিরে এসব আয়াতকে সমলিঙ্গের যৌনাচরণের নিষেধাজ্ঞার অন্যতম প্রধান দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে কোনো ব্যক্তির অনিচ্ছাকৃত অনুভূতি, তার ব্যক্তিগত পরিচয়, তার আচরণ এবং তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ—এগুলোকে এক করে দেখা উচিত নয়। কোরআনের কোনো আয়াত উদ্ধৃত করার সময় তার বক্তব্যের সীমা অতিক্রম না করাই জ্ঞান ও ধর্মীয় দায়িত্বের দাবি।

পবিত্র কোরআনের অন্যতম মৌলিক নির্দেশনা হলো, মানুষ যেন অশ্লীলতা ও নৈতিক অধঃপতনের পথ পরিহার করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীল কাজের নিকটবর্তী হয়ো না।” এই বক্তব্যের মর্ম পাওয়া যায় সূরা আল-আনআমের ১৫১ নম্বর আয়াতে। একই নির্দেশনা সূরা আল-আ’রাফের ৩৩ নম্বর আয়াতেও রয়েছে, যেখানে প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, পাপ, অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞতাপূর্ণ কথা বলাকে নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতগুলো শুধু একটি নির্দিষ্ট যৌন অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নৈতিক সীমারেখা রক্ষার বৃহত্তর নির্দেশনা দেয়।

সূরা আল-আ’রাফের ৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “বলুন, আমার প্রতিপালক তো কেবল অশ্লীল কাজসমূহ নিষিদ্ধ করেছেন—তার প্রকাশ্য ও গোপন রূপ, পাপ, অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন, আল্লাহর সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করা, যার কোনো প্রমাণ তিনি নাজিল করেননি, এবং আল্লাহ সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা তোমরা জানো না।” এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামি নৈতিকতার আলোচনায় অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘনের পাশাপাশি জ্ঞান ছাড়া ধর্মীয় দাবি করার বিরুদ্ধেও সতর্কতা রয়েছে। ফলে জিনা, ব্যভিচার কিংবা সমকামী যৌনাচরণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে যেমন কোরআনের নির্দেশনা উপেক্ষা করা যাবে না, তেমনি কোনো বক্তব্যকে কোরআনের বিধান বলে প্রচার করার আগে তার যথার্থ ভিত্তিও নিশ্চিত করতে হবে।

জিনা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সবচেয়ে সুস্পষ্ট ও বহুল আলোচিত আয়াত হলো সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩২। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তোমরা জিনার কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।” আয়াতটির আরবি অংশ হলো: وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا। এখানে শুধু জিনা সংঘটিত না করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি; বলা হয়েছে, তার কাছেও যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ এমন পথ, আচরণ ও পরিস্থিতি থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যা মানুষকে অবৈধ যৌনসম্পর্কের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তবে আয়াতটি প্রতিটি সামাজিক যোগাযোগ, কথোপকথন কিংবা নারী-পুরুষের সব ধরনের সাক্ষাৎকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জিনা বলে ঘোষণা করে না। এর মূল শিক্ষা হলো, যৌননৈতিকতার সীমা অতিক্রমকারী কাজ এবং সেই অপরাধের দিকে নিয়ে যায় এমন আচরণ সম্পর্কে সচেতন থাকা। এই আয়াতের গুরুত্ব এখানেই যে, ইসলাম কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু তার পরিণতি নিয়ে আলোচনা করে না; অপরাধের দিকে নিয়ে যেতে পারে এমন প্রবণতা থেকেও আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়। মানুষের চোখ, চিন্তা, আকর্ষণ, আবেগ এবং সিদ্ধান্তের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত কামনা, গোপন সম্পর্কের নামে প্রতারণা, অন্যের দাম্পত্যজীবনে হস্তক্ষেপ, যৌনতার নামে চাপ প্রয়োগ এবং দায়িত্বহীন সম্পর্ক অনেক সময় মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে ক্ষতি ডেকে আনে। সূরা আল-ইসরা ১৭:৩২-এর নির্দেশনা মানুষকে এই ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে। এর উদ্দেশ্য মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতিকে অস্বীকার করা নয়; বরং সেই অনুভূতিকে এমন পথে পরিচালিত করা, যাতে অন্যের অধিকার, নিজের নৈতিক দায়িত্ব এবং সামাজিক বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

সূরা আল-ফুরকানের ৬৮ নম্বর আয়াতে জিনা এমন গুরুতর অপরাধগুলোর সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো থেকে আল্লাহর অনুগত বান্দারা নিজেদের রক্ষা করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকে না, আল্লাহ যে প্রাণকে সম্মানিত করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না এবং জিনা করে না। আর যে ব্যক্তি এসব করবে, সে শাস্তির সম্মুখীন হবে।” আয়াতটি দেখায়, তাওহিদ, মানুষের জীবনের মর্যাদা এবং যৌননৈতিকতা—এসবকে কোরআন নৈতিক দায়িত্বের বৃহত্তর পরিসরে স্থান দিয়েছে। একজন মুমিনের চরিত্র শুধু ইবাদতের বাহ্যিক রূপ দিয়ে পরিমাপ করা হয় না; তার বিশ্বাস, আচরণ, অন্যের অধিকার এবং নৈতিক সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ।

সূরা আল-ফুরকানের ৬৮ নম্বর আয়াতের পরের আয়াত, অর্থাৎ ২৫:৬৯-এ অপরাধীর শাস্তি সম্পর্কে সতর্কতা এসেছে। এরপর ২৫:৭০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের মন্দ কাজগুলোকে ভালো কাজে পরিবর্তন করে দিতে পারেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ২৫:৭১ নম্বর আয়াতে আরও বলা হয়েছে, যে তওবা করে এবং সৎকর্ম করে, সে যথার্থভাবেই আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। এই ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন জিনাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করলেও পাপী মানুষের জন্য প্রত্যাবর্তনের দরজা বন্ধ করে দেয় না। অপরাধের ভয়াবহতা তুলে ধরার পাশাপাশি আন্তরিক তওবা, ঈমান ও সংশোধনের সম্ভাবনাও স্পষ্ট করে।

সূরা আল-মুমিনুনের ৫ থেকে ৭ নম্বর আয়াতে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে যৌনসংযমের কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মুমিনরা নিজেদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে; তবে নিজেদের স্ত্রী অথবা তাদের অধিকারভুক্ত নারীদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধানের বাইরে নয়। এরপর বলা হয়েছে, যারা এর বাইরে অন্য কিছু কামনা করে, তারাই সীমালঙ্ঘনকারী। একই ধরনের বক্তব্য সূরা আল-মা’আরিজের ২৯ থেকে ৩১ নম্বর আয়াতেও এসেছে। এসব আয়াত ঐতিহ্যগত ইসলামী ব্যাখ্যায় বৈধ যৌনসম্পর্কের সীমা এবং অবৈধ যৌনাচরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত। বর্তমান সামাজিক ও আইনগত বাস্তবতায় এসব আয়াত ব্যাখ্যা করার সময় সংশ্লিষ্ট যুগের আইন, দাসপ্রথা-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বিধান এবং ইসলামী ফিকহের আলোচনাও বিবেচনা করা প্রয়োজন; কারণ আধুনিক সমাজের আইনগত কাঠামো ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এক নয়।

পবিত্র কোরআন যৌনসংযমকে শুধু অপরাধ না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং শালীনতা, দৃষ্টি সংযত রাখা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার নির্দেশও দিয়েছে। সূরা আন-নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করতে বলা হয়েছে। ৩১ নম্বর আয়াতে মুমিন নারীদেরও দৃষ্টি সংযত রাখা, লজ্জাস্থান হেফাজত করা এবং সৌন্দর্য প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শালীনতা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ আয়াতগুলো নারী ও পুরুষ উভয়ের নৈতিক দায়িত্বকে গুরুত্ব দেয়। যৌননৈতিকতার দায় একতরফাভাবে নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া কিংবা পুরুষের আচরণকে উপেক্ষা করা কোরআনের এই দ্বিপক্ষীয় নির্দেশনার পূর্ণ প্রতিফলন নয়।

সূরা আন-নূরের ৩০-৩১ নম্বর আয়াত থেকে আরও বোঝা যায়, ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত আচরণ, দৃষ্টি, আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক মেলামেশায় সংযমের শিক্ষা দেয়। তবে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশকে ব্যবহার করে নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা, সামাজিক অংশগ্রহণ কিংবা প্রয়োজনীয় যোগাযোগকে অযৌক্তিকভাবে বাধাগ্রস্ত করা এই আয়াতের সরল বক্তব্য নয়। ইসলামি নৈতিকতার মূল লক্ষ্য হলো শালীনতা ও দায়িত্বশীলতা; মানুষের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করা বা তাদের অধিকার অস্বীকার করা নয়। একইভাবে কোনো ব্যক্তি অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেই তাকে দোষী ধরে নেওয়া যাবে না। কোরআন প্রমাণ, সাক্ষ্য ও ন্যায়বিচারের বিষয়েও নির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছে।

সূরা আন-নূরের ২ নম্বর আয়াতে জিনার জন্য শাস্তির বিধান উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াতটির বক্তব্যের সারমর্ম হলো, জিনাকারী নারী ও পুরুষের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করতে হবে এবং আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনুচিত দুর্বলতা দেখানো যাবে না; মুমিনদের একটি দল যেন শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। এই আয়াত ইসলামী অপরাধবিধির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই বিধান উদ্ধৃত করার সময় কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার। কোরআনের শাস্তিবিধান ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, জনতার হাতে শাস্তি কিংবা প্রমাণ ছাড়া কাউকে আঘাত করার অনুমতি নয়। অপরাধের সংজ্ঞা, প্রমাণের শর্ত, বিচারিক কর্তৃত্ব, সংশ্লিষ্ট হাদিস এবং ইসলামী ফিকহের বিধান বিবেচনা ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেরাই শাস্তি প্রয়োগ করতে পারে—এমন সিদ্ধান্ত এই আয়াত থেকে টানা যায় না। রাষ্ট্রীয় আইন, আদালত এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে এই আয়াতকে ব্যক্তিগত সহিংসতার অজুহাত বানানো বিপজ্জনক ও অনুচিত।

সূরা আন-নূরের ৩ নম্বর আয়াতে জিনাকারী পুরুষ ও নারীর বিবাহসংক্রান্ত একটি বক্তব্য এসেছে। আয়াতটির অনুবাদ ও ব্যাখ্যা নিয়ে ইসলামী তাফসির ও ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ আয়াতটিকে জিনায় লিপ্ত ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহের বিধিনিষেধ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন; অন্য ব্যাখ্যায় আয়াতটির প্রেক্ষাপট, তওবা, ব্যক্তি বিশেষের অবস্থা এবং এখানে ব্যবহৃত শব্দের অর্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই এই আয়াতের ভিত্তিতে কারও বিবাহ সম্পর্কে এক বাক্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি অতীতে পাপ করেছেন, কিন্তু পরে আন্তরিক তওবা করে জীবন সংশোধন করেছেন—এমন পরিস্থিতিতে কোরআনের ক্ষমা ও সংশোধনসংক্রান্ত আয়াতগুলোও বিবেচনা করতে হবে।

ব্যভিচারের অভিযোগ ও সামাজিক অপবাদের বিষয়ে পবিত্র কোরআন অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা দিয়েছে। সূরা আন-নূরের ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যারা সতী-সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনে, কিন্তু চারজন সাক্ষী হাজির করতে পারে না, তাদের আশি বেত্রাঘাত করতে হবে এবং তাদের সাক্ষ্য আর গ্রহণ করা যাবে না; তারা ফাসিক। আয়াতের সরাসরি বক্তব্যে নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের উল্লেখ থাকলেও ইসলামী আইনশাস্ত্রে পবিত্রতা ও যৌন অপরাধ সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগের বিধান আরও বিস্তৃতভাবে আলোচিত হয়েছে। এখানে মূল শিক্ষা হলো, যৌন অপরাধের অভিযোগ কোনো তুচ্ছ কথা নয়। কারও সম্মান, পরিবার, বিবাহ, সামাজিক অবস্থান এবং মানসিক জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। এই নির্দেশনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন সমাজে, যেখানে গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া এবং যাচাইবিহীন অভিযোগের মাধ্যমে মানুষের সম্মান নষ্ট করা হয়। কারও ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া আর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। কারও আচরণ অপছন্দ করা, কারও সঙ্গে বিরোধ থাকা কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে তাকে ব্যভিচারী বলা ইসলামী ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সূরা আন-নূরের ৪ নম্বর আয়াত মানুষের সম্মান রক্ষার জন্য প্রমাণের গুরুত্ব তুলে ধরে। অভিযোগকারীরও দায়িত্ব রয়েছে—সত্য ও প্রমাণ ছাড়া অন্যের চরিত্র নিয়ে অপবাদ না দেওয়া।

সূরা আন-নূরের ৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যারা এ ধরনের অভিযোগ করার পর তওবা করে এবং নিজেদের সংশোধন করে, আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। এর অর্থ হলো, মিথ্যা অভিযোগের মতো গুরুতর অন্যায়ের ক্ষেত্রেও আন্তরিক তওবা ও সংশোধনের গুরুত্ব রয়েছে। তবে তওবার অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার অস্বীকার করা নয়। কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে তার সম্মানহানি করা হলে নিজের ভুল স্বীকার করা, অভিযোগ প্রত্যাহার করা, যেখানে অপবাদ ছড়ানো হয়েছে সেখানে সত্য প্রকাশ করা এবং ক্ষতি পূরণের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া নৈতিক সংশোধনের অংশ হতে পারে।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ব্যভিচারের অভিযোগের ক্ষেত্রে সূরা আন-নূরের ৬ থেকে ৯ নম্বর আয়াতে বিশেষ বিধান উল্লেখ রয়েছে, যা ইসলামী আইনশাস্ত্রে ‘লিআন’ নামে পরিচিত। যদি কোনো স্বামী নিজের স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন এবং নিজের ছাড়া অন্য কোনো সাক্ষী না থাকে, তবে আয়াতে নির্দিষ্ট শপথের পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। স্বামী আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবেন যে তিনি সত্যবাদী; পঞ্চমবার বলবেন, তিনি মিথ্যাবাদী হলে তাঁর ওপর আল্লাহর অভিশাপ। স্ত্রীও নিজের ওপর শাস্তি প্রতিহত করার জন্য চারবার আল্লাহর নামে সাক্ষ্য দিতে পারেন যে স্বামী মিথ্যাবাদী; পঞ্চমবার তিনি স্বামী সত্যবাদী হলে নিজের ওপর আল্লাহর ক্রোধের কথা উল্লেখ করবেন। এ বিধান দেখায়, পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে গুরুতর অভিযোগ উঠলেও কোরআন বিষয়টিকে ব্যক্তিগত সহিংসতা বা একতরফা সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেয়নি; বরং একটি নির্দিষ্ট বিচারিক পদ্ধতির কথা বলেছে।

সূরা আন-নূরের ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহর অনুগ্রহ, রহমত এবং তাঁর তওবা কবুল করার গুণের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই আয়াত আগের বিধানগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। যৌননৈতিকতা ও অভিযোগসংক্রান্ত বিধান কোরআনে কঠোর হলেও আল্লাহর রহমতের কথা ভুলে গেলে চলবে না। ন্যায়বিচার ও দয়া পরস্পরের বিরোধী নয়। অপরাধকে অপরাধ বলা, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে তওবা ও সংশোধনের পথ খোলা রাখা—এগুলো কোরআনের আলোচনায় পাশাপাশি উপস্থিত।

সূরা আন-নূরের ১১ থেকে ২৬ নম্বর আয়াতে ‘ইফক’-এর ঘটনা এবং পবিত্র চরিত্রের মানুষের বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ানোর নিন্দা করা হয়েছে। ঐতিহাসিক তাফসিরে এই আয়াতগুলোর সঙ্গে হযরত আয়িশা (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে ছড়ানো অপবাদের ঘটনার সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়। ২৪:১১-এ অপবাদ রটনাকারীদের মধ্যে যারা এতে অংশ নিয়েছিল, তাদের প্রত্যেকের জন্য তাদের অর্জিত পাপের কথা বলা হয়েছে; আর যে ব্যক্তি অপবাদের বড় অংশের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তার জন্য গুরুতর শাস্তির কথা উল্লেখ রয়েছে। ২৪:১২-১৩ নম্বর আয়াতে মুমিনদের শেখানো হয়েছে, এমন অভিযোগ শুনলে নিজেদের সম্পর্কে ভালো ধারণা করা এবং স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া তা গ্রহণ না করা উচিত। চারজন সাক্ষী হাজির করার প্রশ্নটিও সেখানে এসেছে। ২৪:১৫-১৬ নম্বর আয়াতে জিহ্বায় জিহ্বায় কথা চালানো, অজানা বিষয় মুখে বলা এবং সেটিকে তুচ্ছ মনে করার বিপদ তুলে ধরা হয়েছে।

সূরা আন-নূরের ১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রচার ছড়িয়ে পড়ুক—এমনটি পছন্দ করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। আয়াতটি অশ্লীলতার প্রচার, যৌন কেলেঙ্কারি ছড়ানো এবং অন্যের গোপন বিষয়কে বিনোদনে পরিণত করার বিরুদ্ধে সতর্কতা হিসেবে আলোচিত হয়। তবে এই আয়াতের অর্থ এমন নয় যে অপরাধের সংবাদ প্রকাশ, নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির ন্যায়বিচার চাওয়া বা সামাজিক ক্ষতি প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় আলোচনা নিষিদ্ধ। এখানে অপপ্রচার, অশ্লীলতার বিস্তার এবং মানুষের সম্মান ধ্বংস করার উদ্দেশ্যকে সমর্থন করা হয়নি। জনস্বার্থে দায়িত্বশীল প্রতিবেদন ও যাচাইহীন কেলেঙ্কারি প্রচারের মধ্যে পার্থক্য আছে।

সূরা আন-নূরের ২১ নম্বর আয়াতে মুমিনদের শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, শয়তান তাকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়। এটি যৌননৈতিকতার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। অনিয়ন্ত্রিত কামনা, প্রতারণা, গোপন সম্পর্ক, অন্যের অধিকার লঙ্ঘন এবং অপরাধকে স্বাভাবিক করে দেখার প্রবণতা মানুষকে ধাপে ধাপে নৈতিক সীমা অতিক্রমের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তবে এখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে শয়তানের অনুসারী বলে অপমান করা নয়; বরং নিজের আচরণ পর্যালোচনা করা, পাপের পথ থেকে ফিরে আসা এবং সৎকর্মের পথে অগ্রসর হওয়ার শিক্ষা রয়েছে।

সূরা আন-নূরের ২৬ নম্বর আয়াতে অপবিত্র নারীদের অপবিত্র পুরুষদের এবং অপবিত্র পুরুষদের অপবিত্র নারীদের সঙ্গে সম্পর্কিত করে একটি বক্তব্য এসেছে; একই আয়াতে পবিত্র নারী-পুরুষের প্রসঙ্গও রয়েছে। এই আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে তাফসিরে আলোচনা আছে। অনেক ব্যাখ্যায় অপবিত্র কথা ও অপবিত্র ব্যক্তির, আর পবিত্র কথা ও পবিত্র ব্যক্তির উপযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়; অন্য ব্যাখ্যায় চরিত্র ও বৈবাহিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ আলোচিত হয়। তাই এই আয়াতকে এমন কোনো সর্বজনীন সামাজিক নিয়ম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে অতীতের কোনো অভিযোগ বা অপবাদের কারণে নির্দোষ ব্যক্তিকে চিরস্থায়ীভাবে কলঙ্কিত করা হয়। কোরআনের অন্য আয়াতগুলো তওবা, সংশোধন এবং আল্লাহর ক্ষমার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে।

বিবাহের গুরুত্ব বোঝাতে সূরা আন-নূরের ৩২ নম্বর আয়াতে অবিবাহিত নারী-পুরুষ এবং সৎকর্মপরায়ণ দাস-দাসীদের বিবাহের ব্যবস্থা করার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। আয়াতের ঐতিহাসিক ভাষায় দাসপ্রথা-সংক্রান্ত প্রসঙ্গ রয়েছে, যা তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতার অংশ ছিল। আয়াতটির বৃহত্তর শিক্ষা হলো, বিবাহকে সামাজিকভাবে সহজ করা এবং মানুষকে বৈধ পারিবারিক জীবনে সহায়তা করা। তবে বিবাহের নামে জোরপূর্বক সম্পর্ক, অসম্মতিতে বিয়ে কিংবা কোনো ব্যক্তির অধিকার অস্বীকার করা এই আয়াতের উদ্দেশ্য হিসেবে দেখানো যায় না। বিবাহের ক্ষেত্রে সম্মতি, দায়িত্ব, ন্যায় এবং পারস্পরিক অধিকার গুরুত্বপূর্ণ।

সূরা আন-নূরের ৩৩ নম্বর আয়াতে যারা বিবাহের সামর্থ্য পায় না, তাদের সংযম অবলম্বন করতে বলা হয়েছে, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করেন। একই আয়াতে দাসীদের ব্যভিচারে বাধ্য করার বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা এসেছে, যদি তারা পবিত্রতা বজায় রাখতে চায়; আর কেউ তাদের বাধ্য করলে, বাধ্য হওয়ার পর তাদের জন্য আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। এই বক্তব্য যৌননৈতিকতা নিয়ে আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যৌনতার নামে জবরদস্তি, শোষণ, মানবপাচার কিংবা কাউকে অনিচ্ছুক যৌনসম্পর্কে বাধ্য করা কোরআনের নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যৌন অপরাধের আলোচনা করতে গিয়ে সম্মতি ও জবরদস্তির পার্থক্যকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। কোনো ব্যক্তিকে জোর করে অপরাধে ঠেলে দিয়ে পরে তাকেই একমাত্র দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

সূরা আন-নিসার ১৫ নম্বর আয়াতে নারীদের মধ্যে অশ্লীল কাজ সংঘটিত হলে চারজন সাক্ষী হাজির করার কথা বলা হয়েছে; সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের ঘরে আবদ্ধ রাখার একটি বিধানও এসেছে, যতক্ষণ না মৃত্যু ঘটে বা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোনো পথ নির্ধারণ করেন। ১৬ নম্বর আয়াতে দুজনের মধ্যে এ ধরনের কাজের প্রসঙ্গ এবং তারা তওবা ও সংশোধন করলে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই আয়াতগুলো ইসলামী আইন ও তাফসিরের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। অনেক প্রাচীন ব্যাখ্যায় এগুলোকে জিনাসংক্রান্ত প্রাথমিক বিধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যা পরে সূরা আন-নূরের বিধান দ্বারা পরিবর্তিত বা পরিপূরক হয়েছে। ৪:১৬-এর ‘দুজন’ বলতে কোন ধরনের অপরাধী বোঝানো হয়েছে, তা নিয়ে ব্যাখ্যাগত মতভেদও রয়েছে। তাই আয়াত দুটিকে আধুনিক অপরাধবিধির পূর্ণাঙ্গ, স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধান হিসেবে সরলভাবে উপস্থাপন করা যথার্থ নয়; বরং কোরআনের সামগ্রিক বিধান এবং ইসলামী আইনশাস্ত্রের ব্যাখ্যার ধারাবাহিকতায় বুঝতে হবে।

সূরা আন-নিসার ২৪ নম্বর আয়াতে বিবাহসংক্রান্ত বিধান ও বৈধ সম্পর্কের সীমা আলোচনা করা হয়েছে। ২৫ নম্বর আয়াতে ঐতিহাসিক দাসপ্রথার প্রেক্ষাপটে বিবাহের কিছু বিধান এসেছে, যেখানে সংযম, পবিত্রতা এবং প্রকাশ্য বা গোপন ব্যভিচার থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে। এই আয়াতগুলো পাঠ করার সময় কোরআনের ঐতিহাসিক সমাজ-বাস্তবতা এবং পরবর্তী ফিকহি ব্যাখ্যার পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন। কোরআনের যৌননৈতিকতার মূল নীতিগুলোর মধ্যে পবিত্রতা, দায়িত্বশীল সম্পর্ক, বৈধ বিবাহ এবং ব্যভিচার থেকে বিরত থাকা অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ঐতিহাসিক দাসপ্রথার উল্লেখকে আধুনিক সময়ে মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদা অস্বীকারের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

সূরা আল-মায়িদার ৫ নম্বর আয়াতে আহলে কিতাবের পবিত্র নারীদের সঙ্গে বিবাহের প্রসঙ্গসহ বিবাহের শর্ত ও পবিত্রতার কথা এসেছে। সেখানে বিবাহকে বৈধভাবে সম্পন্ন করা, মোহর প্রদান এবং প্রকাশ্য বা গোপন অবৈধ সম্পর্ক থেকে বিরত থাকার নির্দেশনার সঙ্গে সম্পর্কিত বক্তব্য রয়েছে। এই আয়াতও দেখায় যে, ইসলামে যৌনসম্পর্ককে দায়িত্বহীন গোপন সম্পর্কের পরিবর্তে বৈধ ও দায়িত্বপূর্ণ পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এই আয়াতের বিধানগুলো ব্যাখ্যা করতে গেলে বিবাহের যোগ্যতা, ধর্মীয় পরিচয়, সংশ্লিষ্ট আইন এবং ইসলামী ফিকহের বিস্তারিত আলোচনা বিবেচনা করতে হয়।

সূরা আল-আনআমের ১৫১ নম্বর আয়াতে অশ্লীল কাজের কাছে না যাওয়া, প্রকাশ্য হোক বা গোপন—এই নির্দেশনার পাশাপাশি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা না করা, পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ এবং সন্তান হত্যা থেকে বিরত থাকার নির্দেশও রয়েছে। এই আয়াতগুলো মানুষের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নৈতিকতার পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরে। যৌননৈতিকতা আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এটি ন্যায়, দয়া, পরিবার, জীবনের মর্যাদা এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে যুক্ত। একইভাবে সূরা আল-আ’রাফের ৩৩ নম্বর আয়াতে প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা নিষিদ্ধ করার বক্তব্য জিনাসংক্রান্ত আলোচনার বৃহত্তর নৈতিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ঘটনা কোরআনে একাধিকবার বর্ণিত হয়েছে। এ ঘটনা সমকামী যৌনাচরণ সম্পর্কে ইসলামী ব্যাখ্যার কেন্দ্রীয় দলিলগুলোর একটি। সূরা আল-আ’রাফের ৮০-৮৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, হযরত লূত (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে প্রশ্ন করেছিলেন, তারা এমন অশ্লীল কাজ করে কি না, যা তাদের আগে পৃথিবীর কেউ করেনি। পরের আয়াতে বলা হয়েছে, তারা নারীদের বাদ দিয়ে কামনার বশে পুরুষদের কাছে যায়; বরং তারা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়। সম্প্রদায়ের জবাব ছিল, লূত ও তাঁর অনুসারীদের জনপদ থেকে বের করে দেওয়া হোক, কারণ তারা নিজেদের পবিত্র রাখতে চায়। এরপর আল্লাহ হযরত লূত (আঃ) ও তাঁর পরিবারকে রক্ষা করেন, তাঁর স্ত্রী ব্যতীত; আর অপরাধী সম্প্রদায়ের ওপর শাস্তি নেমে আসে। এই আয়াতগুলোতে যৌনাচরণের নিন্দার পাশাপাশি নবীর বিরোধিতা, পবিত্রতার প্রতি বিদ্বেষ এবং সীমালঙ্ঘনের বিষয়ও রয়েছে।

সূরা আল-আ’রাফ ৭:৮০-৮৪-এর বক্তব্যের সারমর্ম হলো, হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের আচরণকে কোরআন নৈতিক সীমালঙ্ঘন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ৭:৮১-এ পুরুষদের প্রতি কামনা এবং নারীদের বাদ দেওয়ার বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। ঐতিহ্যগত ইসলামী তাফসিরে এই আয়াতকে পুরুষ-পুরুষ যৌনাচরণের নিষেধাজ্ঞার অন্যতম স্পষ্ট দলিল হিসেবে ধরা হয়। তবে এই আয়াতের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংসতা, অপমান, হয়রানি বা ব্যক্তিগতভাবে শাস্তি প্রয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়নি। কোরআনের অপরাধবিধি, ন্যায়বিচার ও মানবিক আচরণসংক্রান্ত সামগ্রিক নির্দেশনা বিবেচনা না করে কেবল একটি আয়াতকে ব্যবহার করে কাউকে আক্রমণ করা ধর্মীয় দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সূরা হূদের ৭৭-৮৩ নম্বর আয়াতে হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ঘটনা আরও বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে। ফেরেশতারা অতিথিরূপে তাঁর কাছে এলে তিনি তাদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, কারণ তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা অতিথিদের কাছে আসতে থাকে। হযরত লূত (আঃ) তাদের উদ্দেশে বলেন, তাঁর কন্যারা তাদের জন্য অধিক পবিত্র—এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা তাফসিরে আলোচিত হয়েছে এবং এর মাধ্যমে বৈধ বিবাহের পথের দিকে আহ্বান বোঝানো হয়। সম্প্রদায়ের লোকেরা উত্তর দেয় যে, তাদের নারীদের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই এবং তারা কী চায়, তা লূত জানেন। এরপর ফেরেশতারা তাঁকে জানান যে তারা আল্লাহর প্রেরিত দূত এবং তাঁর সম্প্রদায় তাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে না। ভোরের আগে পরিবারকে নিয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, আর অপরাধী জনপদের ওপর শাস্তি আসে। এই বর্ণনায় যৌনাচরণের প্রসঙ্গের পাশাপাশি অতিথিদের প্রতি হুমকি, নবীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ এবং আক্রমণাত্মক আচরণও গুরুত্বপূর্ণ।

সূরা আল-হিজরের ৫৮-৭৭ নম্বর আয়াতে একই ঘটনার আরেকটি বিবরণ এসেছে। ফেরেশতারা হযরত ইবরাহিম (আঃ)-এর কাছে সুসংবাদ ও একটি দায়িত্বের কথা জানান; পরে তাঁরা হযরত লূত (আঃ)-এর কাছে পৌঁছান। তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা অতিথিদের খবর পেয়ে ছুটে আসে এবং হযরত লূত (আঃ) তাদের অপমানজনক ও অন্যায় আচরণ থেকে বিরত থাকতে বলেন। আয়াতগুলোতে তাঁর সম্প্রদায়ের নৈতিক অবক্ষয়, অতিথিদের প্রতি আগ্রাসী আচরণ এবং আল্লাহর শাস্তির বিবরণ রয়েছে। সূরা আল-হিজরের ৭৪-৭৭ নম্বর আয়াতে জনপদ উল্টে দেওয়া এবং পাথর বর্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ বর্ণনা কোরআনের অন্যান্য স্থানে হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের পরিণতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সূরা আশ-শু’আরার ১৬০-১৭৫ নম্বর আয়াতে হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের কথা এসেছে। ১৬৫ নম্বর আয়াতে প্রশ্ন করা হয়েছে, “সৃষ্টিজগতের মধ্যে তোমরাই কি পুরুষদের কাছে গমন কর?” ১৬৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ যেসব স্ত্রীকে তাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তাদের ছেড়ে তারা এ কাজ করছে; বরং তারা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়। এরপর তারা সতর্কবাণী অস্বীকার করে এবং হযরত লূত (আঃ) ও তাঁর অনুসারীদের রক্ষা করা হয়, তাঁর স্ত্রী ব্যতীত। বাকি সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা হয়। এই আয়াতগুলো ঐতিহ্যগত ইসলামী ব্যাখ্যায় সমলিঙ্গের যৌনাচরণের নিন্দা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এখানে কোরআনের বক্তব্যের পাশাপাশি একটি ব্যাখ্যাগত বিষয় মনে রাখা দরকার: আয়াতগুলোতে ‘সমকামী’ নামে আধুনিক কোনো ব্যক্তিগত পরিচয়ের সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি; বরং একটি সম্প্রদায়ের আচরণ ও সীমালঙ্ঘন নিয়ে বক্তব্য এসেছে।

সূরা আন-নামলের ৫৪-৫৮ নম্বর আয়াতেও হযরত লূত (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে প্রশ্ন করেন, তারা জেনেশুনে অশ্লীল কাজ করছে কি না। ৫৫ নম্বর আয়াতে পুরুষদের প্রতি কামনা নিয়ে নারীদের বাদ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ৫৬ নম্বর আয়াতে সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া বর্ণিত হয়েছে: তারা বলে, লূত ও তাঁর পরিবারকে জনপদ থেকে বের করে দিতে হবে, কারণ তারা নিজেদের পবিত্র রাখতে চায়। পরবর্তী আয়াতে হযরত লূত (আঃ) ও তাঁর পরিবারকে রক্ষা করার এবং তাঁর স্ত্রীর পরিণতির কথা বলা হয়েছে। ৫৮ নম্বর আয়াতে অপরাধীদের ওপর শাস্তির বিবরণ এসেছে। এই বর্ণনা সূরা আল-আ’রাফের ঘটনার সঙ্গে বিষয়গতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই আচরণকে বারবার উল্লেখ করার মাধ্যমে কোরআন এ ঘটনার নৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে।

সূরা আল-আনকাবূতের ২৮-৩৫ নম্বর আয়াতে হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের আরও কিছু আচরণ উল্লেখ করা হয়েছে। ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, লূত তাঁর সম্প্রদায়কে বলেন, তারা এমন অশ্লীল কাজ করছে, যা তাদের আগে পৃথিবীর কেউ করেনি। ২৯ নম্বর আয়াতে পুরুষদের কাছে গমন করার পাশাপাশি পথরোধ করা এবং নিজেদের সভা-সমাবেশে মন্দ কাজ করার কথা উল্লেখ রয়েছে। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরকাররা বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ ও প্রকাশ্য অনৈতিক আচরণের প্রসঙ্গ আলোচনা করেছেন। সম্প্রদায়ের লোকেরা হযরত লূত (আঃ)-কে চ্যালেঞ্জ করে বলে, তিনি সত্যবাদী হলে তাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নিয়ে আসুন। এরপর হযরত লূত (আঃ) আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। আল্লাহর দূতেরা তাঁর কাছে এসে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে রক্ষা করার কথা জানান, তবে তাঁর স্ত্রীকে ব্যতিক্রম করা হয়। এই আয়াতগুলোতে যৌনাচরণের নিন্দা ছাড়াও পথরোধ, সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং নবীর প্রতি অবাধ্যতার প্রসঙ্গ রয়েছে।

সূরা আল-আম্বিয়ার ৭৪-৭৫ নম্বর আয়াতে হযরত লূত (আঃ)-এর কথা সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাঁকে বিচারবুদ্ধি ও জ্ঞান দান করেছিলেন এবং এমন জনপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন, যার অধিবাসীরা নিকৃষ্ট কাজ করত। আয়াতে তাদেরকে মন্দ ও অবাধ্য সম্প্রদায় বলা হয়েছে। এই সংক্ষিপ্ত বর্ণনা হযরত লূত (আঃ)-এর কাহিনিকে কোরআনের নবীদের ইতিহাসের বৃহত্তর ধারার মধ্যে স্থাপন করে। সূরা আস-সাফফাতের ১৩৩-১৩৮ নম্বর আয়াতেও হযরত লূত (আঃ)-এর উল্লেখ আছে। সেখানে তাঁকে রাসুলদের একজন বলা হয়েছে, তাঁর পরিবারকে উদ্ধার করার কথা বলা হয়েছে এবং তাঁর স্ত্রীর পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরে বলা হয়েছে, মানুষ সকালে ও রাতে সেই জনপদের ধ্বংসাবশেষের পাশ দিয়ে যায়। এসব আয়াতের মাধ্যমে কোরআন অতীতের ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানায়।

সূরা আল-কামারের ৩৩-৪০ নম্বর আয়াতে লূতের সম্প্রদায়ের ঘটনা সংক্ষেপে এসেছে। ৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, লূতের সম্প্রদায় সতর্কবাণীকে অস্বীকার করেছিল। পরবর্তী আয়াতগুলোতে তাদের ওপর পাথরের ঝড় পাঠানোর কথা বলা হয়েছে, তবে লূতের পরিবারকে ভোরের আগে রক্ষা করা হয়। ৩৬ নম্বর আয়াতে লূত (আঃ) তাদেরকে আল্লাহর পাকড়াও সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন, কিন্তু তারা সতর্কবাণী নিয়ে সন্দেহ করেছিল। ৩৭ নম্বর আয়াতে তাঁর অতিথিদের ব্যাপারে তাদের অন্যায় উদ্দেশ্যের প্রসঙ্গ এসেছে। এরপর আল্লাহর শাস্তি ও পরিণতির বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এই বর্ণনা কোরআনের অন্যান্য স্থানের মতোই অপরাধ, সতর্কবাণী অস্বীকার এবং শাস্তির ধারাবাহিকতা তুলে ধরে।

সূরা আয-যারিয়াতের ৩১-৩৭ নম্বর আয়াতে হযরত ইবরাহিম (আঃ)-এর কাছে আসা ফেরেশতাদের সঙ্গে হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ঘটনার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে অপরাধী সম্প্রদায়ের ওপর কাদামাটির পাথর বর্ষণের কথা বলা হয়েছে এবং মুমিনদের জন্য একটি নিদর্শন রেখে দেওয়ার উল্লেখ আছে। সূরা আল-হিজরের ৭৪-৭৭ এবং সূরা হূদের ৮২-৮৩ নম্বর আয়াতের সঙ্গে এই বর্ণনার বিষয়গত সম্পর্ক রয়েছে। এভাবে কোরআনের একাধিক স্থানে একই ঘটনার উল্লেখ মানুষের সামনে নৈতিক শিক্ষা, আল্লাহর সতর্কবাণী এবং অপরাধের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

সূরা আল-আনকাবূতের ২৬ নম্বর আয়াতে হযরত লূত (আঃ)-এর প্রসঙ্গের পাশাপাশি হযরত ইবরাহিম (আঃ)-এর প্রতি বিশ্বাসের উল্লেখ রয়েছে। ২৯:২৮-৩৫-এ লূতের সম্প্রদায়ের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। সূরা আল-হিজরের ৫৮-৭৭, সূরা হূদের ৭৭-৮৩, সূরা আল-আ’রাফের ৮০-৮৪, সূরা আশ-শু’আরার ১৬০-১৭৫, সূরা আন-নামলের ৫৪-৫৮, সূরা আল-আম্বিয়ার ৭৪-৭৫, সূরা আস-সাফফাতের ১৩৩-১৩৮, সূরা আয-যারিয়াতের ৩১-৩৭ এবং সূরা আল-কামারের ৩৩-৪০—এসব আয়াত একত্রে পড়লে কোরআনের বর্ণনার বিস্তৃতি বোঝা যায়। এগুলো সব একই ধরনের বিশদ বর্ণনা নয়; কোথাও ঘটনার পূর্ণ বিবরণ, কোথাও সংক্ষিপ্ত স্মরণ, কোথাও শাস্তির প্রসঙ্গ এবং কোথাও নবীদের ইতিহাসের অংশ হিসেবে উল্লেখ এসেছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে: হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ওপর শাস্তি কি কেবল তাদের যৌনাচরণের কারণে এসেছিল, নাকি তাদের অন্যান্য অপরাধও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল? কোরআনের বিভিন্ন বর্ণনা একত্রে পড়লে দেখা যায়, তাদের আচরণের মধ্যে পুরুষদের প্রতি কামনামূলক যৌনাচরণ, অশ্লীলতা, অতিথিদের প্রতি আগ্রাসন, পথরোধ, সামাজিক মন্দ কাজ এবং নবীর সতর্কবাণী অস্বীকারের বিষয়গুলো এসেছে। প্রচলিত ইসলামী তাফসিরে সমলিঙ্গের যৌনাচরণকে তাদের অপরাধের প্রধান অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে কোরআনের বর্ণনায় অন্যান্য সীমালঙ্ঘনও রয়েছে। তাই কোরআনের পাঠকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে হলে শুধু একটি বাক্য বিচ্ছিন্নভাবে উদ্ধৃত না করে সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সমকামী যৌনাচরণ সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আধুনিক পরিভাষার সঙ্গে প্রাচীন ধর্মীয় ভাষার পার্থক্যও বুঝতে হবে। ‘সমকামিতা’ শব্দটি আজ কখনো একই লিঙ্গের প্রতি স্থায়ী আকর্ষণ, কখনো যৌন পরিচয়, কখনো নির্দিষ্ট যৌন আচরণ বোঝায়। কোরআনের লূত-সম্পর্কিত আয়াতগুলোতে পুরুষদের প্রতি কামনা, নারীদের বাদ দেওয়া, অশ্লীলতা এবং সীমালঙ্ঘনের কথা বলা হয়েছে। ঐতিহ্যগত ইসলামী ফিকহে পুরুষের সঙ্গে পুরুষের যৌনাচরণ নিষিদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে কোরআনের আয়াতগুলোকে আধুনিক যৌন পরিচয়ের সব দিকের সরাসরি সংজ্ঞা হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়। কোনো ব্যক্তির মনে অনিচ্ছাকৃতভাবে আকর্ষণ অনুভব করা, কোনো পরিচয় ধারণ করা, যৌন আচরণ করা এবং অন্যের ওপর জবরদস্তি চালানো আলাদা বিষয়। নৈতিক ও আইনগত আলোচনায় এই পার্থক্য অস্বীকার করলে কোরআনের বক্তব্যের চেয়ে বেশি কিছু তার নামে আরোপিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ইসলামী নৈতিকতার আলোচনায় জবরদস্তি, নির্যাতন এবং সম্মতির বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের অতিথিদের প্রতি আগ্রাসী আচরণের বিবরণ বিশেষভাবে সূরা হূদের ৭৭-৮০ এবং সূরা আল-হিজরের ৬৭-৭১ নম্বর আয়াতে পাওয়া যায়। এই বর্ণনাগুলোতে অতিথিদের নিরাপত্তা, তাদের ওপর আক্রমণের আশঙ্কা এবং হযরত লূত (আঃ)-এর উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। সুতরাং কোরআনের কাহিনিকে শুধু যৌনতার একটি সাধারণ আলোচনায় সীমিত না করে অতিথির অধিকার, নিরাপত্তা এবং অন্যের ওপর জবরদস্তি না করার নৈতিক দিকটিও বিবেচনা করা উচিত। কোনো যৌন আচরণে জোরজবরদস্তি বা নির্যাতন থাকলে সেটি আলাদা গুরুতর অন্যায়; আর কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনলে প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের নিয়ম মানা আবশ্যক।

পবিত্র কোরআন মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সম্মান রক্ষার ক্ষেত্রেও নির্দেশনা দিয়েছে। সূরা আল-হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে অতিরিক্ত সন্দেহ, গুপ্তচরবৃত্তি এবং পরনিন্দা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই আয়াত সরাসরি জিনা বা সমকামিতার শাস্তি নিয়ে নয়; কিন্তু যৌননৈতিকতা নিয়ে সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারও ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে ভিত্তিহীন সন্দেহ করা, গোপনে তার দুর্বলতা খোঁজা, ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা তাকে অপমান করা ইসলামের নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কেউ কোনো পাপ করেছে বলে সন্দেহ হলেই তাকে প্রকাশ্যে অপমান করা কিংবা তার ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষে টেনে আনা কোরআনের ন্যায়বিচার ও শালীনতার নীতির সঙ্গে যায় না।

একইভাবে সূরা আন-নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে ন্যায়বিচারে দৃঢ় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এমনকি তা নিজের, পিতা-মাতা বা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও গেলে। সূরা আল-মায়িদার ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন মানুষকে ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে; ন্যায়বিচার করাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। এসব আয়াত যৌননৈতিকতা নিয়ে আলোচনা করার সময়ও প্রাসঙ্গিক। কারও আচরণকে ধর্মীয়ভাবে ভুল মনে করা মানেই তার প্রতি অন্যায় করার অনুমতি পাওয়া নয়। ব্যক্তিগত বিরোধ, সামাজিক বিদ্বেষ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যৌন অপরাধের অভিযোগ ব্যবহার করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। ইসলামের নৈতিকতা অপরাধের নিন্দা করার পাশাপাশি ন্যায়বিচার বজায় রাখারও নির্দেশ দেয়।

পবিত্র কোরআনের ১৭:৩২ আয়াতে জিনার কাছাকাছি না যাওয়ার নির্দেশ, ২৪:২ আয়াতে জিনার শাস্তির বিধান, ২৪:৪-৯ আয়াতে অভিযোগ ও সাক্ষ্যপ্রমাণের বিধান, ২৪:৩০-৩৩ আয়াতে দৃষ্টি সংযম, শালীনতা, বিবাহ ও সংযমের নির্দেশ, ২৫:৬৮-৭১ আয়াতে জিনা থেকে বিরত থাকা ও তওবার কথা এবং ৭:৮০-৮৪, ১১:৭৭-৮৩, ২৬:১৬০-১৭৫, ২৭:৫৪-৫৮ ও ২৯:২৮-৩৫-এ হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের বর্ণনা—সব মিলিয়ে একটি বিস্তৃত নৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে। এই কাঠামোতে ব্যক্তির চরিত্র, যৌনসংযম, বৈধ সম্পর্ক, অন্যের সম্মান, প্রমাণের গুরুত্ব, ন্যায়বিচার এবং তওবা—সবই গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনের একটি আয়াতকে বিচ্ছিন্ন করে অন্য আয়াতের নির্দেশনা উপেক্ষা করলে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না।

পবিত্র কোরআন জিনার মতো গুরুতর পাপের ক্ষেত্রে তওবার পথও স্পষ্ট রেখেছে। সূরা আল-ফুরকানের ৭০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের মন্দ কাজগুলোকে ভালো কাজে পরিবর্তন করে দিতে পারেন। এই আয়াতের অর্থ হলো, অতীতের পাপ একজন মানুষের জীবনের চূড়ান্ত পরিচয় হয়ে থাকতে বাধ্য নয়। কেউ ভুল করেছেন, পরে অনুতপ্ত হয়েছেন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং জীবন সংশোধনের চেষ্টা করছেন—তাঁর জন্য আল্লাহর রহমতের আশা রয়েছে। একইভাবে যৌননৈতিকতার বিষয়ে ভুল বিশ্বাস বা আচরণ থেকে কেউ ফিরে আসতে চাইলে তাকে অপমান ও হতাশার মধ্যে ঠেলে না দিয়ে সঠিক জ্ঞান, আন্তরিক উপদেশ এবং সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত।

তওবা শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়ার নাম নয়; এর সঙ্গে আন্তরিক অনুশোচনা, অন্যায় কাজ থেকে বিরত হওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই পাপে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প জড়িত। কারও অধিকার নষ্ট করা হলে তা যথাসম্ভব ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষতি সংশোধনের দায়িত্বও থাকতে পারে। জিনা বা ব্যভিচারের মতো পাপের সঙ্গে যদি প্রতারণা, জবরদস্তি, শোষণ, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বা অন্যের পারিবারিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় থাকে, তাহলে শুধু নিজের ব্যক্তিগত অনুশোচনা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার সম্পর্কেও দায়িত্বশীল হতে হবে। একইভাবে মিথ্যা অপবাদ ছড়ালে তা প্রত্যাহার করা ও সত্য প্রকাশ করা সংশোধনের অংশ। কোরআনের নৈতিকতা ব্যক্তিগত ঈমান ও সামাজিক দায়িত্বকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে না।

আল্লাহ তাআলা সূরা আয-যুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে বলেন, “হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করেন। তিনি তো পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” এই আয়াত আল্লাহর ক্ষমা ও রহমতের ব্যাপকতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে এই আয়াতকে পাপকে তুচ্ছ করার অনুমতি হিসেবে বোঝা ঠিক নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন পাপের পর হতাশ হয়ে না পড়ে, বরং আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। যৌননৈতিকতার আলোচনায় শুধু শাস্তির ভয় তুলে ধরে তওবা ও সংশোধনের সম্ভাবনা উপেক্ষা করা কোরআনের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাকে তুলে ধরে না।

একই সঙ্গে কোরআন মানুষকে পাপের ব্যাপারে উদাসীন হতে শেখায় না। সূরা আন-নিসার ১৭-১৮ নম্বর আয়াতে তওবার গুরুত্ব ও সময়সীমা নিয়ে বক্তব্য এসেছে; সেখানে এমন তওবার কথা বলা হয়েছে, যা মানুষ পাপ করার পর দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসার মাধ্যমে করে, আর মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার পর তওবার দাবি করা অন্য বিষয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, তওবা বিলম্বিত করার বিষয় নয়। কেউ যদি জিনা, ব্যভিচার কিংবা অন্য কোনো নিষিদ্ধ আচরণে লিপ্ত হন, তাঁর জন্য উচিত হলো পাপকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা না করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, নিজের আচরণ সংশোধন করা এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করা। একই সঙ্গে সমাজের দায়িত্ব হলো মানুষকে সংশোধনের পথ থেকে বঞ্চিত না করা। এখানে আরও একটি বিষয় স্মরণযোগ্য: কোরআনের শাস্তির আয়াতগুলো উদ্ধৃত করে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে শাস্তি দেওয়া বা জনসমক্ষে অপমান করা বৈধ হয়ে যায় না। অপরাধের বিচার, প্রমাণ গ্রহণ, সাক্ষ্য যাচাই এবং শাস্তি প্রয়োগের বিষয়গুলো ইসলামী আইনশাস্ত্র ও বিচারিক কর্তৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। সূরা আন-নূরের ৪ নম্বর আয়াতে মিথ্যা অভিযোগের জন্য শাস্তি এবং ৬-৯ নম্বর আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর অভিযোগের বিশেষ পদ্ধতি বর্ণিত হওয়া থেকেই বোঝা যায়, যৌন অপরাধের অভিযোগকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুজবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া, তাকে আক্রমণ করা কিংবা তার ওপর সহিংসতা চালানো কোরআনের ন্যায়বিচারের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কোরআনের আলোকে জিনা ও ব্যভিচারের নিন্দা করার অর্থ যৌন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিকে দোষারোপ করা নয়। কেউ জোরপূর্বক যৌন নির্যাতনের শিকার হলে তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। সূরা আন-নূরের ৩৩ নম্বর আয়াতে কাউকে জোর করে ব্যভিচারে বাধ্য করার প্রসঙ্গ এসেছে, যা এই আলোচনায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অপরাধের ক্ষেত্রে কে জবরদস্তি করেছে, কে শিকার, কার সম্মতি ছিল বা ছিল না, এবং কী প্রমাণ আছে—এসব বিষয় বিচারিকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যৌননৈতিকতার বিধানকে ব্যবহার করে নির্যাতিত ব্যক্তির ওপর সামাজিক লজ্জা চাপিয়ে দেওয়া বা তাকে সাহায্য থেকে বঞ্চিত করা কোরআনের ন্যায় ও দয়ার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সমকামী যৌনাচরণ সম্পর্কে প্রচলিত ইসলামী ব্যাখ্যা তুলে ধরার সময়ও একই নৈতিক দায়িত্ব প্রযোজ্য। ঐতিহ্যগত ইসলামী ফিকহে পুরুষ-পুরুষ যৌনাচরণ নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত; এর প্রধান কোরআনিক ভিত্তি হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়সংক্রান্ত আয়াতসমূহ। কিন্তু এই ধর্মীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করার অর্থ এই নয় যে কোনো ব্যক্তিকে গালি দেওয়া, নির্যাতন করা, তার ওপর আক্রমণ চালানো বা তার বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অপরাধের অভিযোগ আনা যাবে। ধর্মীয় নীতির আলোচনা, ব্যক্তির অন্তর্গত অনুভূতি, আচরণ, আইনগত দায় এবং অন্যের প্রতি সামাজিক আচরণ—এসব আলাদা করে বুঝতে হবে। কাউকে অপমান বা সহিংসতার শিকার করা কোনো আয়াতের যথার্থ ব্যাখ্যা নয়।

কোরআনের আলোকে কোনো পাপের নিন্দা করা এবং পাপের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। সূরা আল-ইসরা ১৭:৭০-এ আদমসন্তানকে মর্যাদা দেওয়ার কথা এসেছে। সূরা আল-মায়িদা ৫:৮-এ বিদ্বেষের কারণে ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করতে নিষেধ করা হয়েছে। সূরা আন-নিসা ৪:১৩৫-এ ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় থাকার নির্দেশ রয়েছে। এই আয়াতগুলো যৌননৈতিকতা সম্পর্কে আলোচনা করার সময়ও প্রাসঙ্গিক। কোনো আচরণকে ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ মনে করলেও অন্যায়, মিথ্যা, নির্যাতন কিংবা বিচারবহির্ভূত শাস্তির পথ গ্রহণ করা যায় না। ধর্মীয় নৈতিকতা মানুষের আচরণকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য; বিদ্বেষকে বৈধতা দেওয়ার জন্য নয়।

জিনা, ব্যভিচার ও সমকামী যৌনাচরণ সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্য বুঝতে হলে আয়াতগুলোর ভাষা ও প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য তাফসির ও ইসলামী আইনশাস্ত্রের আলোচনাও দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে সূরা আন-নিসা ৪:১৫-১৬-এর মতো আয়াতের ব্যাখ্যা, সূরা আন-নূরের ২৪:২-৯-এর বিচারিক বিধান এবং লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের কাহিনির ব্যাখ্যা দীর্ঘকাল ধরে ইসলামী জ্ঞানচর্চার বিষয়। কোরআনের সরাসরি বক্তব্য, হাদিসের ব্যাখ্যা এবং ফিকহি সিদ্ধান্ত—এই তিন স্তরকে এক করে দেখলে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে। কোনো মতকে কোরআনের সরাসরি শব্দ বলে উপস্থাপন করার আগে তা সত্যিই আয়াতে আছে কি না, নাকি সেটি কোনো তাফসির বা ফিকহি সিদ্ধান্ত—তা স্পষ্ট করা উচিত।

প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কোরআনিক আয়াতগুলো একত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন, যাতে পাঠক নিজে মূল পাঠ ও অনুবাদ যাচাই করতে পারেন। জিনা ও যৌননৈতিকতার বিষয়ে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক আয়াত হলো: সূরা আল-ইসরা ১৭:৩২; সূরা আল-ফুরকান ২৫:৬৮-৭১; সূরা আল-মুমিনুন ২৩:৫-৭; সূরা আল-মা’আরিজ ৭০:২৯-৩১; সূরা আন-নূর ২৪:২-৫, ২৪:৬-১০, ২৪:১১-২৬, ২৪:৩০-৩৩; সূরা আন-নিসা ৪:১৫-১৬, ৪:২৪-২৫; সূরা আল-মায়িদা ৫:৫; সূরা আল-আনআম ৬:১৫১; সূরা আল-আ’রাফ ৭:৩৩; এবং সূরা আল-আ’রাফ ৭:৮০-৮৪। এসব আয়াতের বিষয়বস্তু এক নয়; কিছুতে সরাসরি জিনার নিষেধাজ্ঞা, কিছুতে শাস্তি, কিছুতে অভিযোগ ও সাক্ষ্যপ্রমাণ, কিছুতে দৃষ্টি সংযম ও বিবাহ, আর কিছুতে অশ্লীলতা ও নৈতিক সীমা সম্পর্কে সাধারণ নির্দেশনা রয়েছে।

হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ঘটনা সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক আয়াতগুলো হলো: সূরা আল-আ’রাফ ৭:৮০-৮৪; সূরা হূদ ১১:৭৭-৮৩; সূরা আল-হিজর ১৫:৫৮-৭৭; সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৭৪-৭৫; সূরা আশ-শু’আরা ২৬:১৬০-১৭৫; সূরা আন-নামল ২৭:৫৪-৫৮; সূরা আল-আনকাবূত ২৯:২৮-৩৫; সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১৩৩-১৩৮; সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৩১-৩৭; এবং সূরা আল-কামার ৫৪:৩৩-৪০। এর সঙ্গে সূরা আল-আনকাবূত ২৯:২৬-এ লূত (আঃ)-এর উল্লেখও রয়েছে। এসব আয়াতের মধ্যে কিছুতে যৌনাচরণের নিন্দা সরাসরি এসেছে, কিছুতে সম্প্রদায়ের আগ্রাসী আচরণ ও সীমালঙ্ঘনের বিবরণ রয়েছে, আর কিছুতে তাদের ওপর আল্লাহর শাস্তির কথা সংক্ষেপে বলা হয়েছে। পাঠককে মূল বক্তব্য বুঝতে হলে এই আয়াতগুলোকে তাদের নিজ নিজ প্রেক্ষাপটে পড়া উচিত।

এ ছাড়া নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও অপবাদসংক্রান্ত আলোচনায় সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:৬ এবং ৪৯:১২, সূরা আন-নিসা ৪:১৩৫, সূরা আল-মায়িদা ৫:৮, সূরা আল-ইসরা ১৭:৭০ এবং সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ৪৯:৬ সংবাদ যাচাই করতে শেখায়; ৪৯:১২ অযথা সন্দেহ, গুপ্তচরবৃত্তি ও পরনিন্দা থেকে বিরত থাকতে বলে; ৪:১৩৫ ও ৫:৮ ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্ব দেয়; ১৭:৭০ মানুষের মর্যাদার কথা স্মরণ করায়; আর ৩৯:৫৩ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়ার শিক্ষা দেয়। এই আয়াতগুলো জিনা বা সমকামী যৌনাচরণের নির্দিষ্ট বিধান নয়, কিন্তু এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ভিত্তি প্রদান করে।

সবশেষে বলা যায়, পবিত্র কোরআন জিনাকে নিষিদ্ধ করেছে, একে অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ বলে অভিহিত করেছে এবং সূরা আন-নূরে এর জন্য শাস্তির বিধান উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে কোরআন মিথ্যা যৌন অপবাদ, প্রমাণহীন অভিযোগ ও অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কতা দিয়েছে। কোরআন বৈধ বিবাহ, দৃষ্টি সংযম, পবিত্রতা, সংযম এবং যৌনতার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণকে গুরুত্ব দিয়েছে। হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ঘটনা কোরআনে একাধিকবার এসেছে; প্রচলিত ইসলামী তাফসিরে এসব আয়াতকে সমলিঙ্গের যৌনাচরণের নিষেধাজ্ঞার প্রধান দলিল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে আধুনিক ‘সমকামিতা’ শব্দের সব অর্থকে কোরআনের সরাসরি পরিভাষা বলে দেখানো উচিত নয়; কোরআনের আয়াতগুলো মূলত নির্দিষ্ট আচরণ ও সীমালঙ্ঘনের প্রসঙ্গে কথা বলে।

এই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কোরআনের বিধানকে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে হলে নিষেধাজ্ঞা, ন্যায়বিচার, প্রমাণ, মানবিক মর্যাদা এবং তওবার নির্দেশনা একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কোনো পাপকে পাপ বলা যেমন ধর্মীয় দায়িত্বের অংশ, তেমনি কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ না করা, নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিকে দোষারোপ না করা, বিচারবহির্ভূত শাস্তি থেকে বিরত থাকা এবং আন্তরিক তওবার পথকে স্বীকার করাও জরুরি। কোরআনের শিক্ষা মানুষকে নৈতিক সীমার মধ্যে জীবনযাপন করতে আহ্বান জানায়; একই সঙ্গে ন্যায়, দায়িত্ব, সংযম ও আল্লাহর রহমতের প্রতি আশা রাখতে শেখায়। তাই জিনা, ব্যভিচার ও সমকামী যৌনাচরণ সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্য তুলে ধরার সময় আয়াতের যথার্থ অর্থ, নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা এবং মানবিক ন্যায়বোধ—সবকিছুর প্রতি দায়িত্বশীল থাকা প্রয়োজন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের পবিত্র কোরআনের শিক্ষা সঠিকভাবে বোঝার, নিজের জীবনকে সংশোধন করার, অন্যের সম্মান রক্ষা করার, অন্যায় ও অপবাদ থেকে বেঁচে থাকার এবং ন্যায় ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সত্য কথা বলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

লেখক:

আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা