আমাদের দেশে ইদানিংকালে কেন জানি হঠাৎ করেই একদল অতি ইসলাম বিদ্বেষী মানুষ গড়ে উঠতেছে। এর সঠিক ও যোগ্য কারণ যদি আমার জানা নেই। তবে, এই ইসলাম বিদ্বেষী হয়ে তারা নিজেরা যতটা না সুখকর মনে করছে তারচেয়ে অধিক পরিবার, সমাজ রাষ্ট্র তথা বিশ্ব মানচিত্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। তারা নিজেকে অধিক বেশি পণ্ডিত হিসাবে উপস্থাপন করতে গিয়ে যখন-তখন মুখে যা আসে তাই বরে ফেলে। আর এর জন্য আমি প্রথমে যে বিষয়টিকে দায়ী করবো, সেটা হচ্ছে- ইসলাম পন্থী দাবিদার কিছু মানুষের খামখেয়ালীপনা আচরণ ও অতিরঞ্জিত কথা। যার ধরুন, পরিবার থেকে রাষ্ট্র সব জায়গায় তৈরি হচ্ছে একটি ইসলাম বিরোধী মনোভাবে প্রজন্ম। আমি আমাদের দেশের আমলদার ও সঠিক ইসলাম চর্চা এবং সাধনাকারী জ্ঞানীদের কাছে সবিনয় অনুরোধ করবো, এখনও সময় আছে আপনারা এসব বিষয়ে হাল ধরুন এবং এই দুই শ্রেণির অতিপাণ্ডিত্যের মুখে লাগাম পড়ান। আর না হলে সেদিন হয়ত বেশি দূরে নয়, যেদিন এই দুটি শ্রেণির কারণ সর্বক্ষেত্রে মহাবিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।
আমাদের ইসলামী জ্ঞানীদের উচিত যারা ইসলাম বিদ্বেষী আচরণ ও কথাবার্তা বলে তাদের প্রতি আক্রমণাত্মক ও আক্রোশ মূলক বিষবান না ছুড়ে বরং তাদের সাথে খোলা মনে বসে আলাপ-আলোচনা এবং উন্মুক্ত কাউন্সিলিং করা। তাদের সামনে ইসলামের সঠিক ও তথ্যবহুল মানব উপকারী বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা এবং খোলা মনে তাদের কথা শোনা। এতে করে, ঐসব লোকদের মন থেকে পুরোপুরি না হোক কিছুটা হলেও ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব দূর হবে বলে আমি দৃঢ় বিশ্বাস রাখি। তবে, সাবধান এই কাজে কোন বিতর্কিত ও স্বল্প জ্ঞানের ইসলামী নামে চলা ব্যক্তিকে রাখা যাবে না। এই কথাগুলোর মধ্যেই সমস্যার মূল দিকগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠে—একদিকে অতিরঞ্জিত ধর্মীয় উপস্থাপন, অন্যদিকে প্রতিক্রিয়াশীল বিদ্বেষ। এই দুইয়ের সংঘাতে মাঝখানে পড়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম। তারা একদিকে ধর্মের সৌন্দর্য খুঁজতে গিয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছে, অন্যদিকে কিছু আচরণ দেখে ধর্ম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে। ফলে একটি অস্বাভাবিক দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে—যেখানে ধর্মের নামে একদল মানুষ কঠোরতা দেখাচ্ছে, আরেকদল সেই কঠোরতার প্রতিক্রিয়ায় ধর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—মানুষের মনস্তত্ত্ব। কোনো মানুষকে আপনি জোর করে কোনো বিশ্বাসে ধরে রাখতে পারবেন না। আবার আক্রমণ করে তাকে সত্যের পথে আনা সম্ভব নয়। বরং এতে সে আরও দূরে সরে যায়। তাই ইসলাম বিদ্বেষী বলে যাদের আমরা চিহ্নিত করছি, তাদের অনেকেই আসলে কোনো না কোনো অভিজ্ঞতা, আঘাত বা বিভ্রান্তির ফলেই এই অবস্থানে এসেছে। এই জায়গাটি বোঝা খুব জরুরি।
আমাদের সমাজে এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে, যেখানে একজন মানুষ ছোটবেলা থেকে ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে উঠেছে, কিন্তু পরবর্তীতে কিছু আচরণ বা বক্তব্য দেখে তার মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সেই প্রশ্নের উত্তর সে পায়নি, বরং তাকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। একসময় সেই প্রশ্নগুলোই তার মনে বিদ্বেষের রূপ নিয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা শুরু হয়েছে প্রশ্নকে দমন করার মাধ্যমে, সমাধান না দেওয়ার কারণে। এই জায়গায় এসে উন্মুক্ত কাউন্সিলিংয়ের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কাউন্সিলিং মানে শুধু উপদেশ দেওয়া নয়; বরং শোনা, বোঝা এবং যুক্তি দিয়ে পথ দেখানো। একজন ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিকে যদি আপনি বসিয়ে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেন, তাহলে দেখবেন তার ভেতরে অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়েছে। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি শান্তভাবে, প্রমাণসহ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেওয়া যায়, তাহলে তার মনোভাব পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় যা ঘটে, তা হলো—কেউ প্রশ্ন করলেই তাকে আক্রমণ করা হয়, তাকে “নাস্তিক”, “বিধর্মী” বা আরও নানা বিশেষণে চিহ্নিত করা হয়। এতে করে সে ব্যক্তি নিজেকে আরও বিচ্ছিন্ন মনে করে এবং তার অবস্থান আরও কঠোর হয়ে যায়। ফলে যে সমস্যাটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত, তা সংঘাতে রূপ নেয়।
ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কখনো মানুষের প্রশ্নকে ভয় পাননি। বরং তিনি প্রশ্নকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি মানুষের সঙ্গে বসে কথা বলেছেন, তাদের যুক্তি শুনেছেন এবং ধৈর্যের সঙ্গে উত্তর দিয়েছেন। তাঁর এই পদ্ধতিই আজকের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
উন্মুক্ত কাউন্সিলিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিশ্বাসযোগ্যতা। যারা এই কাজ করবেন, তাদের মধ্যে জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং আচরণের ভারসাম্য থাকতে হবে। কারণ যদি একজন অজ্ঞ বা আবেগপ্রবণ ব্যক্তি এই দায়িত্ব নেয়, তাহলে সে পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে।
আমাদের দেশে অনেক সময় দেখা যায়, ধর্মীয় পরিচয়ে কিছু মানুষ নিজেদেরকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করেন, কিন্তু তাদের বক্তব্যে গভীরতা বা প্রমাণ থাকে না। তারা আবেগ দিয়ে কথা বলেন, কিন্তু যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারেন না। এই ধরনের মানুষদের মাধ্যমে কাউন্সিলিং করলে তা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। বরং প্রয়োজন এমন ব্যক্তিদের, যারা ধর্ম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন, একই সঙ্গে আধুনিক বাস্তবতাও বোঝেন। যারা জানেন কীভাবে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, কীভাবে একজন বিভ্রান্ত মানুষকে বোঝাতে হয় এবং কীভাবে একটি সংলাপকে ইতিবাচক দিকে নিয়ে যেতে হয়।
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—সম্মান। আপনি যার সঙ্গে কথা বলছেন, সে আপনার সঙ্গে একমত না-ই হতে পারে। কিন্তু তাকে সম্মান না দিলে সে আপনার কথা গ্রহণ করবে না। সম্মান একটি সংলাপের ভিত্তি। এটি না থাকলে কোনো আলোচনা ফলপ্রসূ হয় না।
উন্মুক্ত কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে আমরা একটি নতুন সংস্কৃতি তৈরি করতে পারি—সংলাপের সংস্কৃতি। যেখানে মানুষ প্রশ্ন করতে পারবে, মত প্রকাশ করতে পারবে এবং যুক্তি দিয়ে আলোচনা করতে পারবে। এই সংস্কৃতি তৈরি হলে সমাজে বিদ্বেষ কমবে, বোঝাপড়া বাড়বে। এখানে রাষ্ট্র এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই ধরনের কাউন্সিলিংকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়, তাহলে তা আরও কার্যকর হতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই উদ্যোগে অংশ নিতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো—আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা যদি মনে করি, কেউ প্রশ্ন করলেই সে শত্রু, তাহলে আমরা কখনোই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে পারবো না। বরং আমাদের ভাবতে হবে—প্রশ্ন করা মানে জানার চেষ্টা করা। আর জানার চেষ্টা থাকলেই সংশোধনের সুযোগ থাকে। ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব কোনো একদিনে তৈরি হয়নি, তাই এটি একদিনে দূরও হবে না। কিন্তু সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনা সম্ভব। সেই পদ্ধতির অন্যতম হলো—উন্মুক্ত, সম্মানজনক এবং যুক্তিনির্ভর কাউন্সিলিং।
সবশেষে আবারও বলা যায়, সমস্যার সমাধান আক্রমণে নয়, আলোচনায়। যারা বিভ্রান্ত, তাদের দূরে ঠেলে না দিয়ে কাছে টেনে নেওয়াই হবে প্রকৃত দায়িত্ব। ইসলামের সৌন্দর্য, মানবিকতা এবং যুক্তিনির্ভর দিকগুলো যদি সঠিকভাবে উপস্থাপন করা যায়, তাহলে অনেক ভুল ধারণা নিজে থেকেই দূর হয়ে যাবে। এই দায়িত্ব আজ আমাদের সকলের—বিশেষ করে যারা জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত, যারা ধর্মীয় বিষয়ে নেতৃত্ব দেন। সময় এখনো আছে, প্রয়োজন শুধু সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্তরিক উদ্যোগ।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।