May 6, 2026, 12:39 pm
শিরোনামঃ
মুসলমানদের অন্তঃকলহ ও ঐক্যহীনতা : ইসলাম বিদ্বেষী এবং অন্য ধর্মের আক্রমণের প্রধান কারণ! অঙ্গীকারের ১৩তম বর্ণ প্রতিযোগিতা: মতলব উত্তরে ফল প্রকাশ, মেধাতালিকায় ৫০ শিক্ষার্থী অবহেলায় ভাঙা সড়ক, নিজস্ব অর্থায়নে সংস্কারে স্বস্তি ফিরালেন যুবকরা রাজপথ কাঁপানো মুন্না-হাবিব এবার চাঁদপুর ছাত্রদলের নেতৃত্বে মতলব উত্তরে অবৈধ মজুদ: বিপুল ডিজেল- প্লাস্টিক দানা জব্দ, জরিমানা ১ লাখ ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলে মতলব উত্তরের জয়জয়কার, রাজপথের ত্যাগীদের মূল্যায়ন ব্যক্তি অপরাধ আর ধর্ম এক নয় : কোরআন ও হাদীসের আলোকে বিভ্রান্তি নিরসন! মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা আস্থা, দায়বদ্ধতা ও সত্যের মুখোমুখি! মতলব উত্তরে মৎস্য আহরণে বিরত থাকা জেলেদের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ ইজিপিপি কর্মসূচির আওতায় মতলব উত্তরে খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন

মুসলমানদের অন্তঃকলহ ও ঐক্যহীনতা : ইসলাম বিদ্বেষী এবং অন্য ধর্মের আক্রমণের প্রধান কারণ!

Reporter Name

মহান আল্লাহ পাক মানবজাতিকে হেদায়াত ও সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য যুগে যুগে বহু নবী-রাসূল, জ্ঞানী মানুষ, কিতাব ও হিকমাহ প্রেরণ করেছেন। মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি যুগেই আমরা দেখি—আলো ও অন্ধকারের এক অবিরাম দ্বন্দ্ব। সত্য ও মিথ্যার এই লড়াই কখনো থেমে থাকেনি। অনেক জাতি সত্য পেয়েও নিজেদের অহংকার, সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামির কারণে পথভ্রষ্ট হয়েছে। আবার প্রতিটি যুগেই এমন কিছু মানুষ ছিলেন, যারা প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্যকে ধারণ করেছেন এবং আলোর পথ থেকে বিচ্যুত হননি।

মানবজাতির জন্য সর্বশেষ নবী ও রাসূল হিসেবে আগমন করেছেন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ), এবং তাঁর উপর নাযিল হয়েছে পবিত্র কোরআন—যা একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এই কিতাব শুধু একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়; বরং এটি মানবজীবনের প্রতিটি দিকের জন্য দিকনির্দেশনা প্রদান করে। বিদায় হজ্জের ভাষণে ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। অর্থাৎ, মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ সম্পূর্ণ হয়ে গেছে, আর নতুন কোনো পথের প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের উপর অটল আছি? বাস্তবতা আমাদের সামনে ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরে। আমরা নিজেদের মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিই, কিন্তু আমাদের আচরণ, চিন্তা এবং পারস্পরিক সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামের শিক্ষা থেকে বিচ্যুত। আমরা যেন পথহারা একদল মানুষের মতো, যারা দিকনির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বিভ্রান্তির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আজ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় সংকট বাহ্যিক শত্রু নয়; বরং অভ্যন্তরীণ বিভাজন। আমরা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত—মত, পথ, গোষ্ঠী, পরিচয় এবং অহংকারের ভিত্তিতে। আমরা ব্যস্ত একে অপরকে ছোট করতে, তুচ্ছ করতে, এমনকি সহজেই অন্যকে ‘ভুল’ বা ‘ভ্রান্ত’ বলে চিহ্নিত করতে। এই প্রবণতা আমাদের শক্তিকে দুর্বলতায় পরিণত করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন—“তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না।” (সূরা আলে ইমরান ৩:১০৩)

এই আয়াত মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি মৌলিক নির্দেশনা। এখানে ঐক্যের কথা বলা হয়েছে, বিভক্তি থেকে দূরে থাকার কথা বলা হয়েছে। কারণ বিভক্তি শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি আধ্যাত্মিক দুর্বলতারও প্রতিফলন। আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে—“নিশ্চয় যারা তাদের দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং দলে দলে বিভক্ত হয়েছে—তাদের সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই।” (সূরা আল-আন‘আম ৬:১৫৯)

এই আয়াতের ভাষা অত্যন্ত কঠোর। এটি বোঝায় যে, দ্বীনের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করা কত বড় অপরাধ। অথচ আমরা আজ সেই পথেই হাঁটছি—নিজেদের নানা পরিচয়ে বিভক্ত করে ফেলছি এবং সেই বিভক্তিকে গর্বের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করছি।

মতপার্থক্য ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। বরং ফিকহ ও চিন্তার ক্ষেত্রে মতভেদ একটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সেই মতভেদ যখন বিরোধ, বিদ্বেষ এবং বিভাজনে রূপ নেয়, তখন তা ইসলামের মূল চেতনার বিরোধী হয়ে দাঁড়ায়। আমরা মতভেদকে সহনশীলতার মাধ্যমে গ্রহণ করার পরিবর্তে সংঘর্ষের কারণ হিসেবে ব্যবহার করছি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন—“মুমিনরা পরস্পরের জন্য একটি দেহের মতো; যখন একটি অঙ্গ ব্যথা পায়, তখন পুরো দেহ তা অনুভব করে।” (সহীহ মুসলিম)

এই হাদীস মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের এক অনন্য উদাহরণ। এখানে বোঝানো হয়েছে, একজন মুসলমানের কষ্ট অন্য মুসলমানের কষ্ট। কিন্তু বাস্তবতায় আমরা দেখি—একজনের সমস্যা অন্যজনের কাছে গুরুত্ব পায় না; বরং অনেক সময় সেটিকে উপহাস বা সমালোচনার বিষয় বানানো হয়।

আজকের মুসলিম সমাজে একটি বড় সমস্যা হলো অহংকার। আমরা নিজেদের জ্ঞান, মত বা অবস্থানকে এতটাই বড় করে দেখি যে, অন্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলি। অথচ ইসলাম অহংকারকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন—“যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহীহ মুসলিম)

অহংকার মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এটি মানুষকে অন্যকে ছোট করে দেখতে শেখায় এবং নিজের ভুল স্বীকার করার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। ফলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমাদের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো—আমরা নিজেদের সংশোধনের চেয়ে অন্যকে সমালোচনায় বেশি আগ্রহী। আমরা নিজের আমল, আখিরাত, দায়িত্বের দিকে তাকাই না; বরং অন্যের ভুল খুঁজে বেড়াই। এই মানসিকতা আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। কোরআনে বলা হয়েছে—“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেরাই নিজেদের সংশোধন করো।” (সূরা মায়িদা ৫:১০৫)

এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিজেকে সংশোধন করাই প্রথম দায়িত্ব। অন্যকে ঠিক করার আগে নিজের অবস্থান ঠিক করতে হবে। আজ আমরা নানা পরিচয়ে বিভক্ত—শিয়া, সুন্নি, বিভিন্ন মাজহাব, বিভিন্ন মতবাদ। এই বিভাজনগুলো কখনো কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানকে গ্রহণ করতে চায় না। অথচ ইসলামের মূল পরিচয় হলো—একটি উম্মাহ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে—“নিশ্চয় এই তোমাদের উম্মাহ একটি উম্মাহ, আর আমি তোমাদের রব।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৯২)

এই আয়াত আমাদের পরিচয়কে একত্রিত করে। এখানে কোনো বিভাজনের কথা বলা হয়নি; বরং ঐক্যের কথা বলা হয়েছে।

মুসলমানদের এই অন্তঃকলহ ও বিভক্তির সুযোগ নিচ্ছে বিভিন্ন ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠী এবং অন্য ধর্মের কিছু আক্রমণাত্মক চিন্তাধারার মানুষ। তারা আমাদের দুর্বলতাকে ব্যবহার করে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা ছড়ায় এবং বিশ্বমঞ্চে মুসলমানদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। বাস্তবতা হলো—যেখানে ঐক্য নেই, সেখানে শক্তি থাকে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলমানরা যখন ঐক্যবদ্ধ ছিল, তখন তারা জ্ঞান, সভ্যতা ও ন্যায়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আর যখন বিভক্ত হয়েছে, তখন তারা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদের শক্তিকে ভয় পায় না; তারা ভয় পায় মুসলমানদের ঐক্যকে। কারণ ঐক্যই শক্তির উৎস। আর বিভাজন সেই শক্তিকে ধ্বংস করে দেয়।

আজকের বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো খুব সহজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা হচ্ছে। অনেক সময় আমরা যাচাই না করেই এসব তথ্য গ্রহণ করি এবং নিজেরাও তা প্রচার করি। কোরআনে বলা হয়েছে—“যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করো।” (সূরা হুজুরাত ৪৯:৬)

এই আয়াত আমাদের তথ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা শেখায়। কিন্তু আমরা অনেক সময় এই নির্দেশনা ভুলে যাই এবং অজান্তেই বিভাজনের অংশ হয়ে যাই।

সমাধান কী?

প্রথমত, আমাদেরকে কোরআন ও সহীহ হাদীসের দিকে ফিরে যেতে হবে। কারণ এখানেই রয়েছে ঐক্যের মূল ভিত্তি।

দ্বিতীয়ত, আমাদেরকে সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানবোধ গড়ে তুলতে হবে। মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন বিরোধে রূপ না নেয়।

তৃতীয়ত, আমাদেরকে অহংকার ত্যাগ করতে হবে এবং নিজেদের ভুল স্বীকার করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

চতুর্থত, ইসলামী জ্ঞানীদের দায়িত্ব হলো—উম্মাহর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা, বিভাজন নয়। তাদের উচিত জ্ঞান, যুক্তি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা।

সবশেষে বলা যায়, মুসলমানদের অন্তঃকলহ ও ঐক্যহীনতা শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি একটি আধ্যাত্মিক সংকট। এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো—সত্যে ফিরে আসা, ঐক্যকে ধারণ করা এবং ইসলামের মূল চেতনাকে জীবনে বাস্তবায়ন করা। যদি আমরা নিজেদের সংশোধন করতে পারি, তাহলে কোনো বাহ্যিক শক্তি আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু যদি আমরা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত থাকি, তাহলে আমাদের পতন ঠেকানো কঠিন হয়ে যাবে।

 

লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা