May 2, 2026, 12:44 pm
শিরোনামঃ
নদী ও লেখক আপন গতিতে ইতিহাস রচে ; কারো দানে নয়! এএসপি জাবীর হুসনাইন সানীবের নেতৃত্বে সফল অভিযান ; হজ ক্যাম্পের ২২ হাজার রিয়াল চুরির ঘটনায় গ্রেপ্তার ২, উদ্ধার ১৭,৫০০ রিয়াল ঝড়ের দাপটে বিদ্যুৎহীন পরীক্ষা কেন্দ্র, মতলবে মোমবাতি-চার্জার লাইটে এসএসসি পরীক্ষা মামলা নিষ্পত্তি ও পুনর্বাসনের অভাবে সুন্দরবনে দস্যুতায় ফিরছেন আত্মসমর্পণকারীরা ইসলাম বিদ্বেষী : ইসলামী জ্ঞানীদের উচিত উন্মুক্ত কাউন্সিলিং! হরমুজ প্রণালী : আন্তর্জাতিক তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে একটি অর্থনৈতিক ট্রাম্পকার্ড আমি কেন জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ-কে নিয়ে লিখি? মতলব উত্তরে ১ কেজি গাঁজাসহ নারী মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার চাঁদপুরে জালাল উদ্দিন এমপির মতবিনিময় সভা ও উন্নয়নমূলক কাজ পরিদর্শন

নদী ও লেখক আপন গতিতে ইতিহাস রচে ; কারো দানে নয়!

Reporter Name

মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে দুটি সত্তা নীরবে, অবিরাম এবং অবিচলভাবে নিজের কাজ করে গেছে—নদী এবং লেখক। এদের কারোরই পথচলা ধার করা নয়, কারো দানের ওপর নির্ভরশীল নয়, কারো অনুমতির অপেক্ষায় স্থির নয়। তারা চলে নিজের স্রোতে, নিজের শক্তিতে, নিজের অন্তর্গত প্রেরণায়। এই দুই সত্তার মধ্যে এক গভীর সাদৃশ্য রয়েছে—তারা সৃষ্টি করে, তারা পরিবর্তন আনে, তারা ইতিহাস গড়ে, এবং সবকিছুই করে আপন গতিতে। তাই বলা যায়—নদী ও লেখক আপন গতিতে ইতিহাস রচে; কারো দানে নয়।

নদীর দিকে তাকালে আমরা দেখি, তার জন্ম হয় অতি ক্ষুদ্র উৎস থেকে। পাহাড়ের কোনো গহীন চূড়া, বরফগলা জল, কিংবা কোনো অজানা ঝরনা—সেখান থেকেই তার যাত্রা শুরু। শুরুতে সে ক্ষীণ, অনুচ্চারিত, প্রায় অদৃশ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে গতি পায়, বিস্তার লাভ করে, শক্তি সঞ্চয় করে। পথে যত বাধাই আসুক—পাথর, পাহাড়, বন, জনপদ—সবকিছু অতিক্রম করে সে এগিয়ে চলে। কেউ তাকে পথ দেখায় না, কেউ তাকে অনুমতি দেয় না, তবুও সে থামে না। কারণ তার মধ্যে আছে এক অন্তর্গত প্রবাহ, এক অদম্য গতি।

লেখকের জীবনও অনেকটা এমনই। একজন লেখকও শুরু করেন একান্ত নিজের ভেতর থেকে। তার চিন্তা, তার অনুভব, তার অভিজ্ঞতা—এসবই তার সৃষ্টির উৎস। শুরুতে তার লেখা হয়তো খুব বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায় না, তার কণ্ঠস্বর হয়তো খুব জোরালো নয়, কিন্তু তবুও সে লিখে যায়। কারণ লেখার পেছনে যে তাগিদ, তা বাহ্যিক নয়—তা অন্তরের। এই অন্তর্গত শক্তিই তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।

নদী যেমন নিজের গতিতে পথ তৈরি করে, লেখকও তেমনি নিজের ভাষা, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তার মাধ্যমে একটি নতুন পথ তৈরি করে। কেউ তাকে সেই পথ তৈরি করে দেয় না। বরং সে নিজেই পথের স্রষ্টা। তার কলমই তার স্রোত, তার চিন্তাই তার গতি।

নদী কখনো থেমে থাকে না। বর্ষায় সে উচ্ছ্বসিত, শীতে সে শান্ত, কিন্তু তার প্রবাহ থামে না। একইভাবে একজন প্রকৃত লেখকও থেমে থাকেন না। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার লেখার ধরন বদলাতে পারে, তার ভাবনার দিক পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু তার সৃষ্টিশীলতা থামে না। কারণ এটি কোনো বাহ্যিক অনুপ্রেরণার ফল নয়; এটি তার অস্তিত্বের অংশ।

নদী তার পথ চলতে চলতে শুধু নিজে এগিয়ে যায় না; সে তার চারপাশের পরিবেশকে পরিবর্তন করে। সে মাটি উর্বর করে, জনপদ সৃষ্টি করে, জীবনধারার ভিত্তি তৈরি করে। অনেক সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীর তীরে। নদী শুধু জল বহন করে না; সে ইতিহাস বহন করে।

লেখকও তেমনি শুধু শব্দ লেখেন না; তিনি চিন্তার বীজ বপন করেন। তার লেখা সমাজকে প্রভাবিত করে, মানুষকে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। একজন লেখকের কলম অনেক সময় একটি যুগের চেহারা বদলে দিতে পারে। এই দুই সত্তার মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো—তারা কারো দানে বড় হয় না। নদীকে কেউ জল দিয়ে বড় করে না; বরং সে নিজেই উৎস থেকে শক্তি সঞ্চয় করে। লেখককেও কেউ চিন্তা দিয়ে তৈরি করে না; বরং তিনি নিজেই নিজের চিন্তার জগৎ নির্মাণ করেন।

আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রায়ই দেখি, অনেক কিছুই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বাহ্যিক স্বীকৃতি, প্রচার বা সমর্থনের ওপর। কিন্তু প্রকৃত সৃষ্টি কখনোই এইসব কিছুর ওপর নির্ভর করে না। একটি সত্যিকারের নদী যেমন নিজের গতিতে চলে, একটি সত্যিকারের লেখকও তেমনি নিজের সত্যের প্রতি অনুগত থাকে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—তাহলে কি কোনো লেখকের জন্য সমাজ, পাঠক বা পরিবেশের কোনো ভূমিকা নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই ভূমিকা সহায়ক, নির্ধারক নয়। একটি নদী যেমন বৃষ্টির জল পায়, তেমনি লেখকও পাঠকের ভালোবাসা পান। কিন্তু নদীর মূল শক্তি তার নিজস্ব উৎস, আর লেখকের মূল শক্তি তার নিজস্ব চিন্তা।

নদীর পথচলায় বাধা আসে। কোথাও বাঁধ, কোথাও পাথর, কোথাও দিক পরিবর্তন। তবুও নদী থামে না; সে নিজের পথ খুঁজে নেয়। কখনো সে ভেঙে যায়, কখনো সে নতুন পথ তৈরি করে, কিন্তু সে এগিয়ে চলে।

লেখকের জীবনেও বাধা আসে। সমালোচনা, অবহেলা, ভুল বোঝাবুঝি—সবকিছুই তার পথে আসে। কিন্তু একজন প্রকৃত লেখক এসবের কাছে থেমে যান না। বরং তিনি এগুলোকে শক্তিতে পরিণত করেন। তার কলম আরও তীক্ষ্ণ হয়, তার ভাষা আরও গভীর হয়।

নদী যেমন নিজের স্রোতে চলতে চলতে সমুদ্রে মিশে যায়, লেখকও তেমনি তার সৃষ্টির মাধ্যমে এক বৃহত্তর চেতনার সঙ্গে যুক্ত হন। তার লেখা ব্যক্তিগত সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক, জাতীয়, এমনকি বৈশ্বিক পরিসরে প্রভাব ফেলে।

নদীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো—সে কখনো নিজের জন্য কিছু চায় না। সে শুধু দেয়—জল দেয়, উর্বরতা দেয়, জীবন দেয়। লেখকও তেমনি তার সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজকে কিছু দিতে চান। তিনি তার চিন্তা, তার অভিজ্ঞতা, তার উপলব্ধি—সবকিছুই মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেন। এই দানের মধ্যে কোনো প্রদর্শন নেই, কোনো অহংকার নেই। এটি একটি স্বাভাবিক প্রবাহ। নদী যেমন স্বাভাবিকভাবে বয়ে চলে, লেখকও তেমনি স্বাভাবিকভাবে লিখে যান। কিন্তু একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে—সব নদী একরকম নয়, সব লেখকও একরকম নয়। কারো স্রোত শান্ত, কারো স্রোত প্রখর। কারো লেখা কোমল, কারো লেখা তীক্ষ্ণ। এই বৈচিত্র্যই তাদের সৌন্দর্য। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন আমরা এই স্বাভাবিক বৈচিত্র্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, একে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করতে চাই। তখন নদীর স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়, লেখকের চিন্তা সংকুচিত হয়।

একজন লেখকের জন্য সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হলো—নিজের মতো করে ভাবা এবং সেই ভাবনাকে প্রকাশ করা। এই স্বাধীনতা না থাকলে তার লেখা কখনোই প্রাণ পায় না। একইভাবে নদীর জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার অবাধ প্রবাহ। তাকে যদি আটকে রাখা হয়, তাহলে তার স্বাভাবিক গতি নষ্ট হয়ে যায়। আজকের সমাজে আমরা অনেক সময় লেখাকে একটি পেশা হিসেবে দেখি, যা আয়ের সঙ্গে যুক্ত। এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যখন লেখার মূল উদ্দেশ্য হয়ে যায় বাহ্যিক সাফল্য, তখন তার অন্তর্গত শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। একজন প্রকৃত লেখক কখনো শুধু জনপ্রিয়তার জন্য লেখেন না। তিনি লেখেন কারণ তার ভেতরে কিছু বলার আছে। তার লেখার পেছনে থাকে একটি দায়বদ্ধতা—নিজের প্রতি, সমাজের প্রতি, সত্যের প্রতি।

নদী যেমন নিজের স্রোত থামিয়ে জনপ্রিয় হতে চায় না, লেখকও তেমনি নিজের সত্যকে বদলে মানুষের মন জয়ের চেষ্টা করেন না। তিনি জানেন, সত্যের পথ সবসময় সহজ নয়, কিন্তু সেটিই স্থায়ী। এই প্রসঙ্গে বলা যায়, ইতিহাস কখনো ধার করা শক্তিতে তৈরি হয় না। ইতিহাস তৈরি হয় তাদের দ্বারা, যারা নিজের শক্তিতে দাঁড়াতে পারে, নিজের পথ তৈরি করতে পারে। নদী সেই ইতিহাস তৈরি করে তার প্রবাহ দিয়ে, লেখক তৈরি করে তার চিন্তা দিয়ে। অনেক সময় আমরা ভাবি, বড় কিছু করতে হলে বড় সমর্থন দরকার, বড় পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায়, প্রকৃত পরিবর্তন আসে ভেতর থেকে। একটি ছোট নদীও একদিন বিশাল রূপ ধারণ করতে পারে, একজন অজানা লেখকও একদিন একটি যুগের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারেন। এই বিশ্বাসই একজন লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি জানেন, তার লেখা হয়তো আজ খুব বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে না, কিন্তু যদি তা সত্য ও গভীর হয়, তাহলে একদিন তা অবশ্যই প্রভাব ফেলবে।

নদীর মতোই লেখকেরও একটি ধৈর্য প্রয়োজন। নদী একদিনে সমুদ্র পায় না; তাকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। লেখকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাকে সময় দিতে হয়, নিজেকে গড়ে তুলতে হয়, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হয়। এই প্রক্রিয়াটি সহজ নয়, কিন্তু এটি প্রয়োজনীয়। কারণ এই পথেই একজন লেখক পরিণত হন, তার লেখা গভীরতা পায়।

সবশেষে বলা যায়, নদী ও লেখক—এই দুই সত্তা আমাদের শেখায় স্বাধীনতার মূল্য, ধারাবাহিকতার শক্তি এবং আত্মবিশ্বাসের গুরুত্ব। তারা দেখায়, প্রকৃত সৃষ্টি কখনো ধার করা শক্তিতে হয় না; তা আসে নিজের ভেতর থেকে। তাই একজন লেখকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিজের প্রতি সৎ থাকা, নিজের চিন্তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকা এবং নিজের পথ ধরে এগিয়ে চলা। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তারাই রচনা করে, যারা নিজের স্রোতে চলতে পারে।

নদী ও লেখক—দু’জনই আমাদের সামনে একটি চিরন্তন সত্য তুলে ধরে—আপন গতিই সবচেয়ে শক্তিশালী গতি, আর নিজের শক্তিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শক্তি। তাই যে লেখক নিজের স্রোত হারায় না, সে একদিন না একদিন অবশ্যই ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।

 

লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা