May 1, 2026, 12:58 pm
শিরোনামঃ
ঝড়ের দাপটে বিদ্যুৎহীন পরীক্ষা কেন্দ্র, মতলবে মোমবাতি-চার্জার লাইটে এসএসসি পরীক্ষা মামলা নিষ্পত্তি ও পুনর্বাসনের অভাবে সুন্দরবনে দস্যুতায় ফিরছেন আত্মসমর্পণকারীরা ইসলাম বিদ্বেষী : ইসলামী জ্ঞানীদের উচিত উন্মুক্ত কাউন্সিলিং! হরমুজ প্রণালী : আন্তর্জাতিক তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে একটি অর্থনৈতিক ট্রাম্পকার্ড আমি কেন জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ-কে নিয়ে লিখি? মতলব উত্তরে ১ কেজি গাঁজাসহ নারী মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার চাঁদপুরে জালাল উদ্দিন এমপির মতবিনিময় সভা ও উন্নয়নমূলক কাজ পরিদর্শন ঈমান রক্ষার সতর্কবার্তা : কুফরীর ভয়াবহতা ও আত্মসচেতনতার প্রয়োজন! ময়নাতদন্ত শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন চিকিৎসক রাজিবের

Reporter Name

ইসলামে বিভক্তি : কোরআনের আলোকে ঐক্যের আহ্বান!

 

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যার মূল ভিত্তি একত্ব, শৃঙ্খলা এবং মানবিক ঐক্য। এই দ্বীন মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করার জন্য নয়; বরং বিচ্ছিন্ন মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করানোর জন্য। কিন্তু বাস্তবতার এক করুণ চিত্র আমরা প্রায়ই দেখি—মুসলিম সমাজ নানা মত, পথ ও দলে বিভক্ত। এই বিভক্তি শুধু সামাজিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে না; বরং দ্বীনের প্রকৃত সৌন্দর্য ও শক্তিকেও আঘাত করে। অথচ পবিত্র কোরআন বারবার অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় এই বিভক্তির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে এবং ঐক্যের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে বিভক্তির বিষয়ে যে সতর্কতা দেওয়া হয়েছে, তা শুধু একটি নৈতিক নির্দেশনা নয়; বরং এটি একটি মৌলিক নীতিগত অবস্থান। সূরা আল-আন‘আমে বলা হয়েছে—“নিশ্চয় যারা তাদের দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং দলে দলে বিভক্ত হয়েছে—তাদের সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই…” (৬:১৫৯)

এই আয়াতের ভাষা অত্যন্ত দৃঢ় এবং সতর্কতামূলক। এখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, যারা দ্বীনকে বিভক্ত করে, তারা প্রকৃত দ্বীনের অনুসারী নয়। অর্থাৎ বিভক্তি কোনো সাধারণ ভুল নয়; এটি দ্বীনের মূল উদ্দেশ্যের বিরোধিতা।

একইভাবে সূরা আর-রূমে বলা হয়েছে—“…মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না—যারা নিজেদের দীনে মতভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উৎফুল্ল।” (৩০:৩১-৩২)

এই আয়াত আমাদের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা তুলে ধরে। বিভক্তির একটি বড় সমস্যা হলো—প্রত্যেক দলই নিজেদের সঠিক মনে করে এবং অন্যদের ভুল মনে করে। ফলে সত্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে আত্মতুষ্টি জন্ম নেয়। এই আত্মতুষ্টিই বিভক্তিকে আরও গভীর করে।

সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেন—“তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না…” (৩:১০৩)

এখানে “আল্লাহর রজ্জু” বলতে বোঝানো হয়েছে কোরআন এবং সত্যের পথ। অর্থাৎ ঐক্যের ভিত্তি কোনো ব্যক্তি, দল বা মতবাদ নয়; বরং আল্লাহর কিতাব। যখন মানুষ এই মূল ভিত্তি থেকে সরে যায়, তখনই বিভক্তি সৃষ্টি হয়।

আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে—“তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শন আসার পর বিভক্ত হয়েছে এবং মতভেদ করেছে…” (৩:১০৫)

এই আয়াত আমাদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে বলে। পূর্ববর্তী জাতিগুলো জ্ঞান পাওয়ার পরও বিভক্ত হয়েছে, যার ফলে তারা ধ্বংসের দিকে গিয়েছে। এটি একটি সতর্কবার্তা—জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও যদি মানুষ অহংকার, বিদ্বেষ বা স্বার্থের কারণে বিভক্ত হয়, তাহলে তার পরিণতি ভালো হয় না।

সূরা আশ-শূরায় বলা হয়েছে—“…তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা কর এবং এতে বিভক্ত হয়ো না…” (৪২:১৩)

“তাদের কাছে জ্ঞান আসার পরও তারা পারস্পরিক বিদ্বেষের কারণে বিভক্ত হয়েছে…” (৪২:১৪)

এই আয়াতগুলো বিভক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরে—বিদ্বেষ। অনেক সময় মতভেদ স্বাভাবিক, কিন্তু যখন তা বিদ্বেষে রূপ নেয়, তখনই তা বিভাজনে পরিণত হয়।

এই আয়াতগুলো একত্রে বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে যায়—ইসলাম বিভক্তিকে সমর্থন করে না। বরং ঐক্যকে একটি মৌলিক শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। দ্বীন একটাই, কিতাব একটাই, রাসূল একটাই—তাহলে বিভক্তির ভিত্তি কোথায়? বাস্তবে বিভক্তির পেছনে কিছু মানবিক দুর্বলতা কাজ করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অহংকার। যখন কেউ মনে করে তার ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত, তখন সে অন্যের মতকে অগ্রাহ্য করে। আরেকটি কারণ হলো অজ্ঞতা। সঠিক জ্ঞান না থাকলে মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হয় এবং ছোটখাটো বিষয়ে বড় বিভাজন তৈরি করে।

রাজনৈতিক স্বার্থও অনেক সময় বিভক্তিকে উসকে দেয়। ইতিহাসে দেখা গেছে, ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য অনেকেই ধর্মীয় বিভাজনকে ব্যবহার করেছে। ফলে দ্বীনের নামে বিভক্তি তৈরি হয়েছে, যা মূলত দ্বীনের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা জরুরি—মতভেদ এবং বিভক্তি এক জিনিস নয়। মতভেদ একটি স্বাভাবিক বিষয়, যা জ্ঞানের বৈচিত্র্য থেকে আসে। কিন্তু বিভক্তি হলো সেই মতভেদের ওপর ভিত্তি করে আলাদা দল গঠন করা এবং একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। ইসলাম মতভেদকে সহনীয় মনে করে, কিন্তু বিভক্তিকে নিরুৎসাহিত করে। ঐক্য মানে এই নয় যে সবাই একইভাবে চিন্তা করবে। বরং ঐক্য মানে হলো—মৌলিক বিষয়ে এক থাকা এবং পার্থক্যকে সহনশীলভাবে গ্রহণ করা। যখন এই ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখনই সমস্যা তৈরি হয়।

বর্তমান বিশ্বে মুসলিম উম্মাহর দুর্বলতার একটি বড় কারণ এই বিভক্তি। যখন একটি জাতি নিজেদের মধ্যে বিভক্ত থাকে, তখন তারা বাইরের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে না। তাদের শক্তি ক্ষয় হয়ে যায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কোরআনের নির্দেশনাই যথেষ্ট। প্রথমত, আমাদের আল্লাহর কিতাবকে কেন্দ্র করে এক হতে হবে। দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে। তৃতীয়ত, বিদ্বেষ এবং অহংকার পরিহার করতে হবে। এছাড়া জ্ঞানচর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক জ্ঞান থাকলে মানুষ বিভ্রান্ত হয় না। বরং সে বুঝতে পারে কোন বিষয় মৌলিক আর কোন বিষয় গৌণ। এই বোধ তৈরি হলে বিভক্তি কমে আসে। সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা যদি ঐক্যের বার্তা দেন এবং বিভাজনমূলক বক্তব্য থেকে বিরত থাকেন, তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

পরিবার থেকেও এই শিক্ষা শুরু হতে পারে। ছোটবেলা থেকেই যদি শিশুদের সহনশীলতা, সম্মান এবং ঐক্যের শিক্ষা দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তারা বিভাজনের পথে যাবে না।

সবশেষে বলা যায়, ইসলামের মূল বার্তা স্পষ্ট—ঐক্য। বিভক্তি কোনো শক্তি নয়; এটি দুর্বলতা। যেখানে দল, সেখানে দ্বন্দ্বের সম্ভাবনা বেশি; আর যেখানে কোরআন, সেখানে ঐক্যের ভিত্তি দৃঢ়। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব হলো—নিজ নিজ অবস্থান থেকে ঐক্যের জন্য কাজ করা। বিভাজন নয়, সংযোগ তৈরি করা। কারণ একটি ঐক্যবদ্ধ উম্মাহই পারে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্যকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে।

 

লেখক :

আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা