মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সমাজে মানুষ যেমন নৈতিকতা, আদর্শ, জ্ঞান ও মানবিকতার পরিচয় দেয়, তেমনি কখনও কখনও লোভ, হিংসা, কামনা, ক্রোধ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং চারিত্রিক দুর্বলতার কারণেও ভয়াবহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসের প্রতিটি যুগেই এমন মানুষ ছিল, যারা নিজেদের ব্যক্তিগত লালসা, হিংস্রতা কিংবা স্বার্থপরতার কারণে অপরাধ করেছে। কিন্তু একটি বিষয় গভীরভাবে লক্ষণীয়—কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলেই সমাজের একাংশ সেই অপরাধের দায় পুরো ধর্ম, মতবাদ কিংবা বিশ্বাস ব্যবস্থার উপর চাপিয়ে দিতে শুরু করে। বিশেষ করে মুসলমান সমাজের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা অনেক বেশি দৃশ্যমান। কোনো ব্যক্তি যদি ইসলামের পোশাক পরে অপরাধ করে, কিংবা কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তখন অনেকে সরাসরি ইসলাম, মাদ্রাসা, আলেম সমাজ কিংবা পুরো ধর্মীয় কাঠামোকেই দায়ী করতে শুরু করে। প্রশ্ন হলো—এটি কতটা ন্যায়সঙ্গত? কোনো ব্যক্তির চারিত্রিক অপরাধের দায় কি একটি ধর্ম বহন করবে? পবিত্র কোরআন ও সহীহ হাদিস এই বিষয়ে কী শিক্ষা দেয়?
ইসলামের মূল শিক্ষা হলো ন্যায়বিচার, ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা এবং সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা। ইসলাম কখনো অন্যায়ের দায় নিরপরাধের উপর চাপিয়ে দিতে সমর্থন করে না। বরং কোরআন বারবার ঘোষণা করেছে, প্রত্যেক মানুষ তার নিজের কর্মের জন্য দায়ী। মহান আল্লাহ বলেন—“কোনো বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।”—(সূরা আন‘আম : ১৬৪)
এই আয়াত ইসলামী ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে। অর্থাৎ একজন মানুষের অপরাধের দায় আরেকজনের উপর চাপানো যাবে না। কেউ যদি চুরি করে, ব্যভিচার করে, হত্যা করে কিংবা প্রতারণা করে—সেটি তার ব্যক্তিগত অপরাধ। এজন্য পুরো ধর্ম, গোত্র, পরিবার বা জাতিকে দায়ী করা ইসলামের ন্যায়নীতির পরিপন্থী।
আজকের পৃথিবীতে একটি অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যায়। কোনো মুসলমান অপরাধ করলে বলা হয়—“ইসলামই এমন শিক্ষা দেয়।” কিন্তু অন্য ধর্মের অনুসারী কেউ একই অপরাধ করলে সেটিকে ব্যক্তিগত অপরাধ বলা হয়। এই দ্বৈত মানদণ্ড শুধু অন্যায় নয়, বরং এটি বিদ্বেষ ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি কৌশল। কারণ কোনো ধর্মকে বিচার করতে হলে সেই ধর্মের মূলগ্রন্থ, নৈতিক শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠাতার জীবন দেখতে হয়; অনুসারীদের সব কাজকে নয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মানুষকে চরিত্রবান হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলাম কখনো অশ্লীলতা, জুলুম, ধর্ষণ, দুর্নীতি বা প্রতারণাকে সমর্থন করে না। বরং কঠোর ভাষায় এসব থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন—“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সদাচারের নির্দেশ দেন।”—(সূরা নাহল : ৯০)
আরও বলেছেন— “তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীলতা ও নিকৃষ্ট পথ।”—(সূরা বনী ইসরাঈল : ৩২)
এখানে ইসলাম শুধু অপরাধ নিষিদ্ধ করেনি, বরং অপরাধের কাছেও যেতে নিষেধ করেছে। কারণ ইসলাম মানুষের অন্তর, চিন্তা ও আচরণকে পবিত্র রাখতে চায়। তাহলে কোনো মুসলমান যদি এই শিক্ষার বিপরীতে গিয়ে অপরাধ করে, সেটি ইসলামের শিক্ষা নয়; বরং ইসলামের অবাধ্যতা। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মানুষের চরিত্রকে ঈমানের অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন—“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যার চরিত্র সর্বোত্তম।”—(সহীহ বুখারী)
এই হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, ইসলাম চরিত্র গঠনের ধর্ম। একজন মুসলমানের পরিচয় শুধু নাম, পোশাক বা বাহ্যিকতা নয়; বরং তার আচরণ, সততা, মানবিকতা ও নৈতিকতার মধ্যে ইসলামের প্রতিফলন ঘটতে হবে।
বর্তমানে সমাজে দেখা যায়, কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা কোনো আলেম অপরাধে জড়িত হলে অনেকেই পুরো ইসলামকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। অথচ ইসলাম তো সেই অপরাধকে সমর্থন করে না। বরং ইসলাম এমন ব্যক্তির বিচার ও শাস্তির কথা বলে। ইসলামে কেউ ধর্মীয় পোশাক পরলেই নিষ্পাপ হয়ে যায় না। আল্লাহ মানুষের অন্তর ও কর্ম দেখেন। তাই একজন আলেম বা ধর্মীয় ব্যক্তির অপরাধ আরও ভয়াবহ, কারণ সে ধর্মের সম্মান ক্ষুণ্ন করে।
পবিত্র কোরআনে মুনাফিকদের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা এসেছে। কারণ তারা বাহ্যিকভাবে ধর্মের কথা বললেও অন্তরে অসৎ ছিল। আল্লাহ বলেন—“নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে।”—(সূরা নিসা : ১৪৫)
অর্থাৎ ইসলাম কখনো ভণ্ডামিকে প্রশ্রয় দেয় না। কেউ যদি ধর্মের নাম ব্যবহার করে অপরাধ করে, তবে সে ইসলামের প্রতিনিধি নয়; বরং ইসলামের অপব্যবহারকারী। সমস্যা হলো, সমাজের অনেক মানুষ ব্যক্তি ও ধর্মের পার্থক্য বোঝে না। একজন ডাক্তার অপরাধ করলে আমরা পুরো চিকিৎসাব্যবস্থাকে বাতিল করি না। একজন শিক্ষক অপরাধ করলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের দাবি তুলি না। একজন পুলিশ দুর্নীতি করলে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা অস্বীকার করি না। তাহলে ধর্মের ক্ষেত্রে এই অযৌক্তিক আচরণ কেন? এর পেছনে অনেক সময় বিদ্বেষ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা ধর্মবিরোধী প্রচারণা কাজ করে। কিছু মিডিয়া ও গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে এমনভাবে সংবাদ উপস্থাপন করে, যাতে মানুষ ধর্মের প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করে। বিশেষ করে ইসলামকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী দীর্ঘদিন ধরে একটি নেতিবাচক বয়ান তৈরি করার চেষ্টা চলছে। ফলে কোনো মুসলমানের ব্যক্তিগত অপরাধকেও ইসলামের সমস্যা হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু সত্য হলো—ইসলাম মানুষের আত্মশুদ্ধি, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তিনি ছিলেন দয়ালু, ন্যায়পরায়ণ ও ক্ষমাশীল। এমনকি শত্রুর প্রতিও তিনি অন্যায় করেননি। যুদ্ধক্ষেত্রেও নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন—“মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।”—(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
আরেক হাদিসে এসেছে—“যে ব্যক্তি আমাদের প্রতি প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”—(সহীহ মুসলিম)
এখানে বোঝা যায়, প্রতারণা, জুলুম ও অপরাধ ইসলামের পরিপন্থী। তাই কোনো মুসলমান এসব করলে সে ইসলামের আদর্শ লঙ্ঘন করছে।
সমাজে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো—ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা। কেউ যদি ধর্মীয় পোশাক পরে অপরাধ করে, তখন কিছু মানুষ বলে—“ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।” অথচ প্রকৃত ইসলাম কখনো অপরাধীকে আড়াল করতে শেখায় না। বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে বলে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন— “তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছিল এ কারণে যে, তাদের মধ্যে কোনো সম্মানিত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল কেউ চুরি করলে শাস্তি দিত।” —(সহীহ বুখারী)
অর্থাৎ ইসলামে বিচার সবার জন্য সমান। কেউ আলেম, নেতা বা ক্ষমতাবান হলেই অপরাধ থেকে রেহাই পাবে না।
আজ আমাদের প্রয়োজন আবেগ নয়, ন্যায়ভিত্তিক চিন্তা। ব্যক্তি অপরাধ করলে তার বিচার হবে। কিন্তু সেই অপরাধকে কেন্দ্র করে পুরো ধর্মকে আক্রমণ করা অন্যায়। কারণ ধর্ম একটি আদর্শ; আর মানুষ সেই আদর্শ অনুসরণে সফলও হতে পারে, ব্যর্থও হতে পারে। পৃথিবীর সব ধর্মেই ভালো মানুষের পাশাপাশি খারাপ মানুষ আছে। কারণ মানুষ ভুল করে, লোভে পড়ে, পাপ করে। কিন্তু কোনো ধর্মের মূল শিক্ষা যদি ন্যায়, মানবিকতা ও কল্যাণের দিকে আহ্বান করে, তাহলে অনুসারীর অপরাধ দিয়ে সেই ধর্মকে বিচার করা সঠিক নয়।
ইসলামে আত্মসমালোচনার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। একজন মুসলমানের উচিত নিজের ভুল সংশোধন করা এবং অপরাধ দেখলে তা প্রতিরোধ করা। কোরআনে বলা হয়েছে— “তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় সহযোগিতা করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।” —(সূরা মায়িদা : ২)
এই আয়াত সমাজকে একটি দায়িত্বশীল অবস্থানে দাঁড় করায়। অর্থাৎ অপরাধকে আড়াল নয়, বরং প্রতিরোধ করতে হবে।
ধর্মকে দোষারোপ করার আগে আমাদের বোঝা উচিত—ধর্ম কী শিক্ষা দেয়, আর মানুষ কী করছে। যদি কোনো ব্যক্তি ধর্মের বিপরীত কাজ করে, তাহলে দায় তার; ধর্মের নয়। যেমন একজন ডাক্তার রোগী হত্যা করলে চিকিৎসাবিজ্ঞান দায়ী হয় না, তেমনি একজন মুসলমান অপরাধ করলে ইসলাম দায়ী হয় না। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের আবেগকে দ্রুত উত্তেজিত করে। কোনো একটি ঘটনা ঘটলেই পুরো ধর্ম, জাতি বা গোষ্ঠীকে দোষারোপ করা হয়। এটি একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। কারণ এতে ঘৃণা বাড়ে, বিভাজন তৈরি হয় এবং সত্য আড়ালে চলে যায়। ইসলাম মানুষকে যুক্তিবোধ ও ন্যায়পরায়ণতার শিক্ষা দেয়। কোরআনে আল্লাহ বলেন—“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো।” —(সূরা নিসা : ১৩৫)
এই আয়াত মুসলমানকে আবেগ নয়, ন্যায়ের ভিত্তিতে বিচার করতে শেখায়।
সবশেষে বলা যায়, ব্যক্তি অপরাধ আর ধর্ম এক বিষয় নয়। ধর্ম মানুষকে নৈতিকতা শেখায়; অপরাধ শেখায় না। কেউ যদি ধর্মের শিক্ষা অমান্য করে অন্যায় করে, তবে দায় তার ব্যক্তিগত। পবিত্র কোরআন ও সহীহ হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—ইসলাম ন্যায়, মানবিকতা, সততা ও চরিত্র গঠনের ধর্ম। তাই কোনো ব্যক্তির চারিত্রিক অপরাধের দায় পুরো ধর্মের উপর চাপানো সত্য, ন্যায় ও বিবেক—সবকিছুর বিরোধী।
আজ আমাদের প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তা, সত্য অনুসন্ধান এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন। ব্যক্তি অপরাধ করলে তার বিচার হোক, কিন্তু ধর্মকে ঘৃণার লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নতুন বিভাজন সৃষ্টি করা বন্ধ হোক। কারণ ধর্মের অপব্যবহার যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ব্যক্তি অপরাধকে কেন্দ্র করে পুরো ধর্মকে দোষারোপ করাও আরেক ধরনের অন্যায় ও ফ্যাসাদ।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।