মতলবের সাংবাদিক, সাংবাদিকতা ও প্রেসক্লাব সমাচার!
আমি কোনো না কোনোভাবে একটি মিডিয়াপ্রিয় ও সাংবাদিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি। ছোটবেলা থেকেই সংবাদপত্র, সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকতা আমার চারপাশের এক পরিচিত বাস্তবতা ছিল। আমার বাবা ছিলেন একজন পত্রিকাপ্রেমী মানুষ। তাঁকে দেখেছি প্রতিদিন নিয়ম করে জাতীয় দৈনিক পড়তে। বিশেষ করে দৈনিক ইত্তেফাক এবং দৈনিক ইনকিলাব ছিল তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। ভোরবেলা চায়ের কাপ হাতে সংবাদপত্র পড়ার যে অভ্যাস, সেটি আমার শৈশব স্মৃতির একটি বড় অংশ। বাবাকে দেখেই হয়তো অজান্তে আমার মাঝেও সংবাদমাধ্যমের প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা জন্ম নেয়। তখন বুঝতাম না সাংবাদিকতা কী, সংবাদ কী, কিংবা একটি খবর সমাজে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু অনুভব করতাম—পত্রিকার পাতায় যেন সমাজের আয়না লুকিয়ে আছে।
এরপর আসে আমার মেঝ কাকার কথা। অবিভক্ত মতলব অঞ্চলে মফস্বল সাংবাদিকতার যে প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, সেখানে তাঁর নামটি উচ্চারণ না করা অন্যায় হবে। তিনি ছিলেন সেই সময়ের একজন পরিচিত ও নিবেদিত সাংবাদিক। তখন সাংবাদিকতা মানে ছিল না ক্ষমতার দাপট, না ছিল কার্ড ঝুলিয়ে মানুষের উপর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। তখন সাংবাদিকতা ছিল দায়িত্ব, সাহস এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি অংশ। আমার মেঝ কাকা সেই ধারার মানুষ ছিলেন। আজ হয়তো কিছু অকৃতজ্ঞ মানুষ নিজেদের প্রচারের আলো বাড়াতে গিয়ে তাঁর নাম উচ্চারণ করতে চায় না, কিংবা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—সময় সাক্ষ্য দেয়, অবিভক্ত মতলবে মফস্বল সাংবাদিকতার পথিকৃৎদের একজন ছিলেন তিনি। ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না।
তবে আমার এই লেখার মূল বিষয় অতীতের স্মৃতিচারণ নয়। বরং বর্তমান সময়ের মতলবের সাংবাদিকতা, সাংবাদিক সমাজ এবং প্রেসক্লাব সংস্কৃতি নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি। কারণ আজকাল মতলবে সাংবাদিকের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তা দেখে অনেক সময় মনে হয়—এটি কি উপজেলা, নাকি সংবাদমাধ্যমের পরীক্ষাগার? প্রতিদিন নতুন নতুন সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রেসক্লাব, সংগঠন, ব্যানার, কমিটি এবং পদ-পদবির দৌড়।
আজকাল এমন অবস্থা হয়েছে—একটি উপজেলায় যত মানুষ আছে, তার তুলনায় সাংবাদিকের সংখ্যাও যেন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। শুধু সাংবাদিক নয়, “সভাপতি”, “সাধারণ সম্পাদক”, “সাংগঠনিক সম্পাদক”, “যুগ্ম সম্পাদক” ইত্যাদি পদবিরও অভাব নেই। একজন মানুষ হয়তো কোনো জাতীয় বা আঞ্চলিক পত্রিকায় বছরে একটি খবরও লেখেন না, কিন্তু তাঁর পরিচয়ের আগে বড় করে লেখা থাকে—“সাংবাদিক”। আর সেই পরিচয়কে কেন্দ্র করে তৈরি হয় এক ধরনের অদৃশ্য ক্ষমতা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই পেশা নিয়ে সমালোচনা করারও যেন সুযোগ নেই। আপনি যদি কোনো সাংবাদিকের শিক্ষাগত যোগ্যতা, চারিত্রিক আচরণ কিংবা পেশাগত দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাহলে ধরে নিতে হবে আপনি বিপদ ডেকে এনেছেন। তখন শুরু হবে আপনার বিরুদ্ধে লাগাতার লেখা, অপপ্রচার, সামাজিক অপমান এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ। আপনি যা করেছেন, তা তো লিখবেই; এমনকি আপনার চৌদ্দ গোষ্ঠীতে কেউ যা কখনো করেনি, সেটাও আপনার নামে চালিয়ে দেওয়া হবে। এই প্রবণতা শুধু মতলব নয়; বাংলাদেশের অনেক জায়গাতেই এখন দেখা যায়। কিন্তু মফস্বল অঞ্চলে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। কারণ এখানে মানুষ একে অপরকে ব্যক্তিগতভাবে চেনে। ফলে সংবাদ এবং ব্যক্তিগত প্রতিশোধের সীমারেখা অনেক সময় মুছে যায়। তখন সাংবাদিকতা আর সমাজসেবার জায়গায় থাকে না; বরং ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার, ভয় দেখানো কিংবা সুবিধা আদায়ের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
আমি যতটা জানি, মতলবের অনেক সাংবাদিকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ডিগ্রি পাসেরও নিচে। যদিও সাংবাদিকতার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশার জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং ভাষাজ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়—এখানে সেই বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত। কারণ এখন সাংবাদিকতা অনেকের কাছে আর জ্ঞানভিত্তিক পেশা নয়; বরং পরিচয়ভিত্তিক একটি সামাজিক শক্তি।
একজন প্রকৃত সাংবাদিক হওয়ার জন্য কেবল একটি আইডি কার্ড যথেষ্ট নয়। একজন সাংবাদিকের প্রয়োজন সত্য যাচাই করার দক্ষতা, নৈতিকতা, ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার, আইনের জ্ঞান, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং সর্বোপরি মানবিকতা। সাংবাদিকতা কখনোই শুধু খবর ছাপানোর কাজ নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। একজন সাংবাদিকের একটি ভুল খবর একটি পরিবার ধ্বংস করে দিতে পারে, একটি সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, এমনকি একটি রাষ্ট্রেও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—সাংবাদিকতার সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া সংস্কৃতির মিশ্রণ। এখন অনেকেই মনে করেন, ফেসবুকে কয়েকটি পোস্ট লিখলেই তিনি সাংবাদিক হয়ে গেলেন। কেউ একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলে, কেউ একটি অনলাইন পোর্টাল তৈরি করে নিজেকে “সম্পাদক” পরিচয় দেন। অথচ সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, নৈতিকতা কিংবা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিগুলো সম্পর্কে তাদের ন্যূনতম ধারণাও থাকে না।
এক সময় সাংবাদিকদের সমাজে আলাদা সম্মান ছিল। কারণ মানুষ জানত—এই মানুষগুলো সত্য তুলে ধরার জন্য কাজ করেন। তাঁরা ক্ষমতার অন্যায়কে প্রকাশ করেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখেন এবং সাধারণ মানুষের কথা বলেন। কিন্তু আজ অনেক ক্ষেত্রে সেই সম্মান প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে কিছু অসাধু ব্যক্তির কারণে। যারা সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেয়, ভয় দেখায় কিংবা সামাজিক প্রভাব বিস্তার করে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা দরকার—সব সাংবাদিক খারাপ নন। এখনও মতলবসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনেক সৎ, সাহসী এবং পেশাদার সাংবাদিক আছেন। যারা অল্প সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও সত্য প্রকাশের জন্য কাজ করছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কিছু অসাধু ব্যক্তির আচরণ পুরো পেশাটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
প্রেসক্লাব সংস্কৃতিও এখন অনেক জায়গায় বিভক্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় প্রেসক্লাব ছিল সাংবাদিকদের পেশাগত আলোচনা, প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক সংহতির জায়গা। এখন অনেক ক্ষেত্রে সেটি হয়ে গেছে গ্রুপিং, রাজনীতি এবং পদ-পদবির কেন্দ্র। একেকটি উপজেলায় একাধিক প্রেসক্লাব, একাধিক কমিটি এবং একাধিক বিভাজন দেখা যায়। ফলে সাংবাদিকদের ঐক্য ও পেশাগত মান উন্নয়নের পরিবর্তে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব।
একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা। মানুষ যদি বিশ্বাস করে—এই ব্যক্তি সত্য বলেন, তাহলে তাঁর লেখা সমাজে প্রভাব ফেলবে। কিন্তু যখন সাংবাদিকতার নামে মিথ্যা, অতিরঞ্জন, ব্ল্যাকমেইল কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ শুরু হয়, তখন মানুষ পুরো পেশার উপর আস্থা হারাতে শুরু করে।
সাংবাদিকতা কোনো ব্যবসা নয়, কোনো ভয় দেখানোর লাইসেন্স নয়, কোনো রাজনৈতিক অস্ত্রও নয়। এটি একটি দায়িত্বশীল পেশা। পৃথিবীর অনেক দেশে সাংবাদিকরা জীবন ঝুঁকি নিয়ে সত্য প্রকাশ করেন। কেউ কারাগারে যান, কেউ নির্যাতনের শিকার হন, আবার কেউ প্রাণও হারান। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন—সত্য মানুষের জানার অধিকার।
আমাদের সমাজে সাংবাদিকদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে—তরুণ প্রজন্মকে সঠিক তথ্য দেওয়া। কারণ এখন তথ্যযুদ্ধের যুগ। মিথ্যা খবর, গুজব এবং বিভ্রান্তি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক সমাজকে সঠিক পথে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—আজ অনেক জায়গায় সাংবাদিকতা হয়ে গেছে “কার্ডনির্ভর ক্ষমতা”। গলায় একটি আইডি কার্ড ঝুললেই যেন সবকিছু বলা, করা এবং প্রভাব খাটানোর অধিকার পাওয়া যায়। অথচ প্রকৃত সাংবাদিকতার শক্তি কার্ডে নয়; কলমে, জ্ঞানে এবং সততায়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সাংবাদিকদের জন্য প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। শুধু সংবাদ লেখা নয়, নৈতিকতা, আইন, মানবাধিকার, তথ্য যাচাই এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়েও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কারণ অজ্ঞতা কখনো ভালো সাংবাদিক তৈরি করতে পারে না। একজন সাংবাদিকের ভাষা হওয়া উচিত শালীন। সমালোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত অপমান, বিদ্বেষ কিংবা চরিত্রহনন সাংবাদিকতার অংশ হতে পারে না। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে এই নয় যে, যা খুশি তাই বলা যাবে। স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত।
আজকাল অনেকেই সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করছেন রাজনৈতিক পরিচয় শক্তিশালী করার জন্য। কেউ কোনো দলের ছত্রছায়ায় থেকে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেন, কেউ আবার স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদ নিয়ে চলেন। ফলে নিরপেক্ষতা হারিয়ে যায়। অথচ সাংবাদিকতার মূল শক্তিই হলো নিরপেক্ষতা। একজন প্রকৃত সাংবাদিক কখনো ক্ষমতার দালাল হতে পারেন না। তিনি জনগণের প্রতিনিধি। তাঁর কাজ সত্য বলা, সত্য খোঁজা এবং সত্য প্রকাশ করা।
মতলবের সাংবাদিক সমাজেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। মানুষ কেন সাংবাদিকদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে? কেন সংবাদমাধ্যমের উপর মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে? কেন সাংবাদিকতার নামে বিভাজন বাড়ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। সাংবাদিকতা যদি সত্যিই সমাজের আয়না হয়, তাহলে সেই আয়নাটি পরিষ্কার রাখা জরুরি। কারণ আয়না ময়লা হলে মানুষ নিজের মুখও সঠিকভাবে দেখতে পারে না।
আমার এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয়। বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাকে নিয়ে কিছু বাস্তবতা তুলে ধরা। কারণ সাংবাদিকতা বাঁচলে সমাজ উপকৃত হবে। আর সাংবাদিকতা যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ, ভয় দেখানো এবং অযোগ্যতার চাপে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে ক্ষতি হবে পুরো সমাজের। আজ প্রয়োজন যোগ্য, শিক্ষিত, নৈতিক এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিক। প্রয়োজন সত্যিকারের প্রেসক্লাব সংস্কৃতি, যেখানে পেশাগত উন্নয়ন হবে, বিভাজন নয়। প্রয়োজন এমন সাংবাদিক, যারা সমাজকে ভয় দেখাবেন না; বরং সমাজের পাশে দাঁড়াবেন।
সবশেষে বলতে চাই—সাংবাদিকতা কোনো খেলা নয়, এটি একটি আমানত। এই আমানত যারা সৎভাবে বহন করবেন, ইতিহাস তাঁদের মনে রাখবে। আর যারা সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে সমাজে বিভ্রান্তি, ভয় কিংবা ব্যক্তিগত আধিপত্য তৈরি করবেন, সময় একদিন তাঁদেরও বিচার করবে।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।