April 6, 2026, 8:48 pm

ক্ষুধাত্ব পেট নিয়ে সাংবাদিক হওয়া যায় না!

Reporter Name

সাংবাদিকতা একটি পেশা নয়, বরং একটি দায়িত্ব—এমন একটি দায়িত্ব যা সমাজের সত্যকে তুলে ধরে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকরা সমাজ পরিবর্তনের অগ্রভাগে থেকেছেন। তারা অন্যায়, দুর্নীতি, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। তাই সাংবাদিকতাকে অনেকেই “চতুর্থ স্তম্ভ” বলে অভিহিত করেন। কিন্তু এই মহান পেশার বাস্তব চিত্র সবসময় এতটা আদর্শিক নয়। বিশেষ করে আমাদের সমাজে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আর্থিক বাস্তবতা, নৈতিক সংকট এবং পেশাগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন।

“ক্ষুধাত্ব পেট নিয়ে সাংবাদিক হওয়া যায় না”—এই বক্তব্যটি প্রথম দৃষ্টিতে কঠোর বা বাস্তবতাবর্জিত মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরে গেলে এর ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য লুকিয়ে আছে। একজন মানুষ যখন তার মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন তার নৈতিক দৃঢ়তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং অনিশ্চয়তা মানুষের চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এমন অবস্থায় একজন সাংবাদিকের পক্ষে নিরপেক্ষতা, সততা এবং সাহসিকতা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো তার বিশ্বাসযোগ্যতা। একজন সাংবাদিকের লেখা বা প্রতিবেদন তখনই মূল্যবান হয়, যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে তা সত্য, নিরপেক্ষ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়। কিন্তু যদি সেই সাংবাদিক নিজেই আর্থিক সংকটে থাকেন, তাহলে তার ওপর বিভিন্ন প্রভাব কাজ করতে পারে। কেউ তাকে প্রলোভন দেখাতে পারে, কেউ চাপ সৃষ্টি করতে পারে, আবার কখনো কখনো সে নিজেই নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য আপস করতে বাধ্য হতে পারে। এই আপসই ধীরে ধীরে সাংবাদিকতার নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সাংবাদিকতা একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। এখানে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়, অনেক ঝুঁকি নিতে হয়, এবং অনেক সময় যথাযথ পারিশ্রমিকও পাওয়া যায় না। বিশেষ করে নতুন বা তরুণ সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট। তারা স্বপ্ন নিয়ে এই পেশায় আসে, কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ে। কেউ কেউ টিকে থাকার জন্য অন্য পথ খোঁজে, আবার কেউ কেউ আপসের পথে হাঁটে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—সাংবাদিকতায় প্রবেশের আগে কি আর্থিকভাবে স্থিতিশীল হওয়া জরুরি? অনেকের মতে, হ্যাঁ। কারণ একজন ব্যক্তি যদি তার জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তার পক্ষে নৈতিকভাবে দৃঢ় থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্য কোনো পেশা বা আয়ের উৎস থাকলে একজন সাংবাদিক তার কাজের ক্ষেত্রে আরও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সে প্রলোভন বা চাপের কাছে নতি স্বীকার না করেও সত্য প্রকাশ করতে পারে। তবে এই ধারণারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদি আমরা বলি যে, কেবল আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ব্যক্তিরাই সাংবাদিক হতে পারবে, তাহলে এটি একটি বৈষম্যমূলক অবস্থান তৈরি করে। কারণ সমাজের অনেক প্রতিভাবান ও সাহসী মানুষ কেবল আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে এই পেশা থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হবে। তাই সমস্যার সমাধান কেবল ব্যক্তিগত প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত বিষয়।

আমাদের দেশে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি বৈপরীত্যপূর্ণ চিত্র দেখা যায়। একদিকে এমন অনেক সাংবাদিক আছেন, যারা অত্যন্ত কষ্টে জীবনযাপন করেন, ন্যায্য পারিশ্রমিক পান না এবং নানা ধরনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। অন্যদিকে এমনও কিছু উদাহরণ দেখা যায়, যেখানে কেউ এই পেশায় প্রবেশ করার পর হঠাৎ করেই তার জীবনযাত্রার মান ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই বৈপরীত্য সমাজে প্রশ্নের জন্ম দেয় এবং পুরো পেশার ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করে—সাংবাদিকতা কি সত্যিই একটি সেবামূলক পেশা, নাকি এটি ব্যক্তিগত স্বার্থ অর্জনের একটি মাধ্যম? যদিও এই ধারণা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, তবুও কিছু উদাহরণ পুরো পেশার ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই এই সমস্যাগুলোকে অস্বীকার না করে বরং খোলামেলাভাবে আলোচনা করা জরুরি।

সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত নৈতিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন সাংবাদিকের কাজ কেবল তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করা নয়; বরং সেই তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা এবং সমাজের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করা। এই নৈতিকতা বজায় রাখতে হলে ব্যক্তিগত সততা যেমন জরুরি, তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাও প্রয়োজন। মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি তারা তাদের কর্মীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সাংবাদিকদের ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ কমে যায়। এতে করে তারা আরও স্বাধীনভাবে এবং নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রেরও একটি ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং পেশাগত মান উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত নীতি ও আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সাংবাদিকদের জন্য প্রশিক্ষণ, কল্যাণ তহবিল এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এই পেশার প্রতি মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে। তবে সবকিছুর পরেও ব্যক্তিগত দায়িত্বের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। একজন সাংবাদিককে তার পেশার মর্যাদা রক্ষা করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। তাকে বুঝতে হবে, এই পেশায় প্রবেশ মানে কেবল একটি চাকরি পাওয়া নয়; বরং একটি দায়িত্ব গ্রহণ করা। তাকে তার নৈতিকতা, সততা এবং সাহসিকতা বজায় রাখতে হবে, এমনকি প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও।

“ক্ষুধাত্ব পেট নিয়ে সাংবাদিক হওয়া যায় না”—এই কথাটি তাই এক ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এটি কাউকে নিরুৎসাহিত করার জন্য নয়; বরং বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন করার জন্য। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি মহান পেশার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে কেবল ইচ্ছা বা স্বপ্নই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রস্তুতি, স্থিতিশীলতা এবং দৃঢ় নৈতিকতা।

সবশেষে বলা যায়, সাংবাদিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পেশা, যা সমাজের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু এই পেশাকে সত্যিকার অর্থে মহান রাখতে হলে এর ভেতরের সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে হবে। ব্যক্তিগত সততা, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বয়েই কেবল এই পেশার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব। ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও যারা সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন, তারাই প্রকৃত সাংবাদিক। তবে তাদের এই সংগ্রামকে সহজ করতে হলে আমাদের সবাইকেই দায়িত্বশীল হতে হবে—সমাজ হিসেবে, রাষ্ট্র হিসেবে এবং ব্যক্তি হিসেবে।

 

লেখক :

আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা