গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো বাক-স্বাধীনতা। মানুষের চিন্তা, মতামত ও বিশ্বাস প্রকাশের অধিকার একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মৌলিক পরিচয়ের অংশ। যখন কোনো সমাজে মানুষ ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য কথা বলতে পারে, অন্যায়ের সমালোচনা করতে পারে এবং রাষ্ট্রের নীতি বা ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে—তখনই সেই সমাজকে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক বলা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক সময়ই এই মৌলিক অধিকারটি নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়ে যায়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে অনেকের কাছেই মনে হতে পারে যে বাক-স্বাধীনতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে যেন অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। সংবিধানের আলোকে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রয়েছে তার মতামত প্রকাশ করার, সমালোচনা করার এবং ভিন্নমত পোষণ করার। কিন্তু সংবিধানের এই অধিকার বাস্তবে কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্নটি আজ নানা মহলে আলোচিত। অনেকেই মনে করেন, বাস্তব রাজনৈতিক পরিবেশ, প্রশাসনিক চাপ এবং সামাজিক বিভাজনের কারণে মানুষ অনেক সময় নিজেদের মত প্রকাশ করতে ভয় পায়। সমসাময়িক বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মত প্রকাশের একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। আগে যেখানে সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের মতো সীমিত প্ল্যাটফর্ম ছিল, এখন সেখানে সাধারণ মানুষও সহজেই নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এই ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরনের চাপ ও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, কেউ সামাজিক মাধ্যমে কোনো সমালোচনামূলক মন্তব্য করলে তাকে আইনি জটিলতা, সামাজিক আক্রমণ বা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। ফলে অনেকেই নিজেদের মতামত প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে কিছু আইনি কাঠামোর কারণে। উদাহরণস্বরূপ, Digital Security Act এবং পরবর্তীতে Cyber Security Act নিয়ে অনেক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই ধরনের আইনের কিছু ধারা এমনভাবে প্রয়োগ করা হয় যে তা কখনো কখনো মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। অন্যদিকে সরকারপক্ষের যুক্তি হলো, এসব আইন মূলত সাইবার অপরাধ, গুজব ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয়। এই বিতর্কের মাঝখানে সাধারণ নাগরিক অনেক সময় দ্বিধায় পড়ে যায়। একদিকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে, অন্যদিকে মানুষের মত প্রকাশের অধিকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যম সমাজের নানা সমস্যা তুলে ধরে, ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনে এবং জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অনেক সময় সাংবাদিকদেরও নানা চাপের মুখে পড়তে হয়। কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো অর্থনৈতিক প্রভাব, আবার কখনো আইনি জটিলতা—এসব কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রকাশ পায় না বা আংশিকভাবে প্রকাশ পায়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে গেলে পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ তখন সত্য তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছায় না এবং জনমত গঠনের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। একটি সুস্থ সমাজে সরকার, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম—সবাই মিলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক বিরোধ অনেক সময় অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে এবং প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে মতের ভিন্নতা অনেক সময় সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করা হয় না। কেউ যদি ভিন্নমত প্রকাশ করে, তাকে কখনো কখনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আক্রমণ করা হয়। এই পরিস্থিতি সমাজে এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘self-censorship’ তৈরি করে। মানুষ মনে করে, কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলা নিরাপদ নয়। ফলে তারা নিজেরাই অনেক কথা বলা থেকে বিরত থাকে। এটি গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় সমস্যা, কারণ গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হলো মুক্ত আলোচনা ও সমালোচনা। শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও মত প্রকাশের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হওয়া উচিত মুক্ত চিন্তার কেন্দ্র, যেখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে পারে, মতামত প্রকাশ করতে পারে এবং নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা করতে পারে। কিন্তু যদি সেখানে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, তাহলে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের অনেক উদাহরণ রয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম—সব ক্ষেত্রেই মানুষ তাদের অধিকার রক্ষার জন্য কথা বলেছে, প্রতিবাদ করেছে। সেই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাক-স্বাধীনতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার। বর্তমান বিশ্বেও বাক-স্বাধীনতা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। অনেক দেশেই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা বা সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে মত প্রকাশের ওপর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। কিন্তু একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার জন্য নাগরিকদের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি মানুষ মনে করে যে তারা নিরাপদভাবে কথা বলতে পারছে না, তাহলে সমাজে অসন্তোষ জমে ওঠে এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আইনের প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আইন যেন কখনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়—সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতা বাড়াতে হবে যাতে ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। নাগরিক সমাজের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, মানবাধিকার সংস্থা এবং বুদ্ধিজীবীদের উচিত মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং প্রয়োজন হলে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সাধারণ মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন। আমরা যদি নিজেদের মধ্যে সহনশীলতা ও ভিন্নমতকে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে পারি, তাহলে সমাজে একটি সুস্থ আলোচনার পরিবেশ তৈরি হবে। মতের পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু সেই পার্থক্য যেন ঘৃণা বা দমন-পীড়নের কারণ না হয়। শেষ পর্যন্ত বলতে হয়, বাক-স্বাধীনতা কোনো একদিনের অর্জন নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। একটি সমাজ যত বেশি পরিণত হয়, তত বেশি এই স্বাধীনতা শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই পথচলা এখনো চলমান।
“বাক-স্বাধীনতা আজ অন্ধকারে”—এই শিরোনামটি হয়তো অনেকের অনুভূতির প্রতিফলন। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি সতর্কবার্তাও। যদি আমরা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হবে। কারণ আলো ছাড়া যেমন অন্ধকার দূর হয় না, তেমনি মুক্ত চিন্তা ও মুক্ত বক্তব্য ছাড়া কোনো সমাজ সত্যিকারের উন্নতির পথে এগোতে পারে না।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।
তারিখ : ৯/০৩/২৬ ইং