May 15, 2026, 1:45 pm
শিরোনামঃ
শিয়া–সুন্নি বিভাজন : ইতিহাস, বাস্তবতা ও মুসলিম উম্মাহর সংকট সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলার প্রশ্নে সবসময় আপসহীন ছিলেন, জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মতলব উত্তর, ডিজিএমকে খোলা চিঠি প্রকৌশলীর মতলব উত্তরে মামলাবাজ বেদে পরিবারের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন ; মিথ্যা মামলা ও হয়রানিতে অতিষ্ঠ গ্রামবাসী মতলব উত্তরে বোরো ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু মোংলায় ট্রলার থেকে নদীতে পড়ে মাঝি নিখোঁজ মতলবে কৃষকদের নিয়ে পার্টনার ফিল্ড স্কুল কংগ্রেস অনুষ্ঠিত ; আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বারোপ চিরকুট লিখে বাড়ি থেকে নিখোঁজ স্কুলছাত্র একদিন পর ঢাকা থেকে উদ্ধার, পরিবারে স্বস্তি ইসলামের হেফাজতকারী কে—মানুষ নয়, বরং মহান আল্লাহ? জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সেনাজীবনে শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় ও কর্তব্যবোধের দীপ্ত সূচনা!

শিয়া–সুন্নি বিভাজন : ইতিহাস, বাস্তবতা ও মুসলিম উম্মাহর সংকট

Reporter Name

ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত, সবচেয়ে বিতর্কিত এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে ভুলভাবে উপস্থাপিত বিষয়গুলোর একটি হলো শিয়া–সুন্নি সম্পর্ক। পৃথিবীর বহু মুসলমান আজও এই বিষয়টি নিয়ে আবেগপ্রবণ, বিভ্রান্ত কিংবা একপাক্ষিক ধারণায় বিশ্বাসী। অনেকেই মনে করেন, শিয়া ও সুন্নি যেন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্ম, অথচ বাস্তবতা এতটা সরল নয়। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, আল্লাহর একত্ববাদ, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে শেষ নবী হিসেবে মানা, পবিত্র কোরআনের প্রতি বিশ্বাস, নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাতের মতো মৌলিক ইবাদতের ক্ষেত্রে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে মৌলিক ঐক্য বিদ্যমান। পার্থক্য রয়েছে মূলত ইতিহাস, নেতৃত্বের প্রশ্ন, কিছু আকিদাগত ব্যাখ্যা এবং ফিকাহভিত্তিক কিছু ধর্মীয় অনুশীলনে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাত, সাম্রাজ্যবাদী কৌশল, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অজ্ঞতাপূর্ণ প্রচারণা এই বিভাজনকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে অনেক মুসলমানই অন্য মুসলমানকে সহজে কাফির, বিদআতী বা পথভ্রষ্ট বলে দিতে দ্বিধা করেন না।

বাস্তবে ইসলামের ইতিহাসে মতপার্থক্য নতুন কিছু নয়। সুন্নি মুসলমানদের মধ্যেই হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি—এই চারটি প্রধান মাজহাব রয়েছে। চার মাজহাবের নামাজ, ওজু, ইমামতি, তাকবির, রুকু কিংবা সামাজিক ফিকাহর বিভিন্ন বিষয়ে কিছু পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু এই পার্থক্যের কারণে কেউ কাউকে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে বলে মনে করে না। কারণ সবাই জানে, এগুলো ফিকাহগত মতভেদ; আকিদার মৌলিক বিরোধ নয়। ঠিক একইভাবে শিয়া মুসলমানরাও ইসলামের মৌলিক ভিত্তিগুলো স্বীকার করে এবং তারা নিজেদের মুসলমান হিসেবেই পরিচয় দেয়। তাদের ধর্মীয় আইন বা ফিকাহর বড় অংশ গড়ে উঠেছে ইমাম জাফর সাদিক (রহ.)-এর ব্যাখ্যা ও শিক্ষার ভিত্তিতে, যাকে “জাফরি ফিকাহ” বলা হয়।

ইমাম জাফর সাদিক ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন জ্ঞানী ব্যক্তি। তিনি ছিলেন হযরত আলী (রাঃ)-এর বংশধর এবং কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর জীবিত থাকা ইমাম জয়নুল আবেদিনের নাতি। তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ইলমের খ্যাতি সুন্নি ও শিয়া উভয় ধারাতেই স্বীকৃত। ঐতিহাসিকভাবে বহু সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, সুন্নি মুসলমানদের প্রধান ইমামদের একজন ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। ইমাম মালেক (রহ.)-ও তাঁর ইলম ও মর্যাদার প্রশংসা করেছেন। ফলে ইসলামের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে শিয়া ও সুন্নির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল ও গভীর, যা আজকের রাজনৈতিক প্রচারণার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন।

প্রকৃতপক্ষে শিয়া–সুন্নি বিভাজনের সূচনা ধর্মীয় নয়; বরং রাজনৈতিক প্রশ্ন থেকে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব কে দেবেন—এই প্রশ্ন থেকেই মূল মতপার্থক্যের জন্ম। একদল মনে করতেন, পরামর্শ ও শুরার ভিত্তিতে খলিফা নির্বাচন হবে। অন্যদল মনে করতেন, হযরত আলী (রাঃ) এবং তাঁর বংশধরদের নেতৃত্বেই মুসলিম উম্মাহ পরিচালিত হওয়া উচিত। এখান থেকেই “খেলাফত” এবং “ইমামত” ধারণার পার্থক্য তৈরি হয়। কিন্তু সেই সময় এই মতভেদ রাজনৈতিক কাঠামো ও নেতৃত্বকেন্দ্রিক ছিল; ইসলামের মূল বিশ্বাস নিয়ে বিরোধ ছিল না।

পরবর্তীতে কারবালার ঘটনা মুসলিম ইতিহাসে গভীর আবেগ ও বিভেদের একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর শাহাদাত শুধু শিয়াদের জন্য নয়; বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্যই একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। এই ঘটনার পর আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা, ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের স্মৃতি শিয়া পরিচয়কে আরও সুসংগঠিত করে তোলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এই বিভাজন আরও শক্তিশালী হয়।

ইসলামের ইতিহাসে উমাইয়া, আব্বাসীয়, ফাতেমীয়, সাফাভি ও উসমানীয় সাম্রাজ্যের সময় শিয়া–সুন্নি সম্পর্ক নানা রূপ ধারণ করেছে। কোথাও সহাবস্থান ছিল, কোথাও সংঘাত ছিল, আবার কোথাও রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের সাফাভি সাম্রাজ্য শিয়া মতাদর্শকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে রূপ দেয় এবং অপরদিকে উসমানীয় খেলাফত সুন্নি নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। এখান থেকেই আরব–পারস্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধর্মীয় বিভাজনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়।

বর্তমান যুগে এসে এই বিভাজন আরও জটিল হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কারণে। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব ও ইরানের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় শিয়া–সুন্নি বিভাজনকে নতুন করে উস্কে দেয়। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও বহু সময় মুসলিম বিশ্বকে বিভক্ত রাখার কৌশল হিসেবে এই দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। কারণ ঐক্যবদ্ধ মুসলিম বিশ্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারে, যা অনেক বৈশ্বিক শক্তির জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।

ইরানকে ঘিরে যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়, তার বড় অংশই অনেক সময় “শিয়া রাষ্ট্র” পরিচয়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। ফলে সাধারণ মুসলমানের মনেও এমন ধারণা তৈরি করা হয় যেন শিয়া মানেই ভিন্ন কোনো ধর্মীয় সত্তা। অথচ বাস্তবে ইরানের সাধারণ মানুষও কোরআন মানে, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে শেষ নবী মানে, নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলো অনুসরণ করে। মতপার্থক্য রয়েছে ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও ঐতিহাসিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে।

অনেক আলেম ও গবেষক মনে করেন, মুসলিম বিশ্বে বিভাজনের সবচেয়ে বড় কারণ অজ্ঞতা এবং একপাক্ষিক প্রচারণা। সাধারণ মুসলমানের বড় একটি অংশ কখনো শিয়া মতবাদ সম্পর্কে নিরপেক্ষভাবে জানার সুযোগ পায় না। আবার শিয়া সমাজের ভেতরেও অনেক ক্ষেত্রে সুন্নিদের নিয়ে ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। এই পারস্পরিক অজ্ঞতা ও বিদ্বেষকে রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে।

ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞানচর্চা, দর্শন, বিজ্ঞান ও সভ্যতার বিকাশে শিয়া ও সুন্নি উভয় ধারার মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ইমাম গাজ্জালি, ইবনে রুশদ, ইবনে সিনা, আল-বিরুনি, নাসিরুদ্দিন তুসি, মোল্লা সাদরা—এদের কেউ সুন্নি, কেউ শিয়া, কিন্তু সবাই ইসলামী সভ্যতার সম্পদ। মুসলিম ইতিহাসের স্বর্ণযুগ কোনো একক মাজহাবের দ্বারা গড়ে ওঠেনি; বরং পারস্পরিক জ্ঞানচর্চা ও বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই তা বিকশিত হয়েছিল।

আজকের পৃথিবীতে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহনশীলতা। মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কারণ ইসলামের ইতিহাসেই মতভেদের বহু উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু মতভেদকে শত্রুতায় রূপ দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” মুসলিম উম্মাহর শক্তি ঐক্যে, বিভাজনে নয়।

এটিও সত্য যে, শিয়া ও সুন্নি উভয় ধারার মধ্যেই কিছু উগ্র গোষ্ঠী রয়েছে, যারা অন্যপক্ষকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে চায়। এই উগ্রতা ইসলামের সামগ্রিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কোনো গোষ্ঠীর চরমপন্থাকে পুরো সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে দেখাও অন্যায়। যেমন কিছু উগ্র সুন্নি গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড দিয়ে সব সুন্নিকে বিচার করা যায় না, তেমনি কিছু চরমপন্থী শিয়া গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড দিয়েও পুরো শিয়া সমাজকে মূল্যায়ন করা যায় না।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, মুসলমানরা যখন নিজেদের মধ্যে বিভক্ত থাকে, তখন বাইরের শক্তিগুলো সহজেই সেই দুর্বলতাকে ব্যবহার করতে পারে। ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে। উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো বহু সময় “বিভাজন করে শাসন” নীতি অনুসরণ করেছে। আধুনিক যুগেও মিডিয়া, রাজনীতি ও কূটনৈতিক প্রচারণার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের বিভাজনকে আরও গভীর করা হয়।

শিয়া–সুন্নি সম্পর্কের বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মতভেদ থাকা সত্ত্বেও উভয়পক্ষের মধ্যে ইসলামের মৌলিক ভিত্তির একটি বিশাল মিল রয়েছে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কেবল বিভাজনমূলক প্রচারণা চালানো মুসলিম উম্মাহর জন্য ক্ষতিকর। ইসলামের ইতিহাসের গভীরে গেলে দেখা যায়, বহু যুগ ধরে শিয়া ও সুন্নি একই সমাজে বসবাস করেছে, একই মসজিদে ইবাদত করেছে, একই রাষ্ট্রে কাজ করেছে এবং একই সভ্যতার অংশ হিসেবে অবদান রেখেছে।

বর্তমান যুগে মুসলিম বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস কমানো। জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা, ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠ এবং ইসলামের মৌলিক ঐক্যের বিষয়গুলো সামনে আনা জরুরি। কারণ মুসলমানদের বিভক্তি কেবল রাজনৈতিক দুর্বলতা নয়; বরং এটি ইসলামের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সবশেষে বলা যায়, শিয়া ও সুন্নি বিভাজনকে শুধুমাত্র ধর্মীয় বিদ্বেষের দৃষ্টিতে দেখলে বাস্তবতা বোঝা সম্ভব নয়। এর পেছনে রয়েছে ইতিহাস, রাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বহু শতাব্দীর সামাজিক পরিবর্তন। ইসলামের মূল শিক্ষা বিভাজন নয়; বরং ন্যায়, জ্ঞান, সহনশীলতা ও ঐক্যের শিক্ষা দেয়। মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতপার্থক্যকে ঘৃণা ও সংঘাতে রূপ দেওয়া মুসলিম উম্মাহর জন্য কখনো কল্যাণকর নয়। মুসলমানদের উচিত নিজেদের ইতিহাসকে আবেগ নয়, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোকে বোঝার চেষ্টা করা। কারণ ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা বিভেদ বাড়ায়, আর সঠিক উপলব্ধি ঐক্যের পথ খুলে দেয়।

 

লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা