সাংবাদিকতা করলেই—নামের সাথে “Press” ব্যবহার করতে হবে কেন?
সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা—এ কথা বহুবার বলা হয়েছে, এবং সত্যিকার অর্থে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবসভ্যতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তি। একটি রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন এবং রাজনীতির পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমকেও গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, সাংবাদিকরা সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন, জনগণের ভাষাকে রাষ্ট্রের সামনে উপস্থাপন করেন এবং সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সাংবাদিকতার মতো দায়িত্বশীল পেশাটিও বহু জায়গায় বাহ্যিক চাকচিক্য, পরিচয় প্রদর্শন এবং প্রভাব বিস্তারের প্রতীকে পরিণত হতে শুরু করেছে। আজকাল সমাজে এমন এক প্রবণতা দেখা যায়, যেখানে কেউ সাংবাদিকতার সাথে সামান্যভাবে যুক্ত হলেই নিজের নামের সাথে বড় করে “Press” লিখে গাড়ি, মোটরসাইকেল, অফিস কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় প্রদর্শনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রশ্ন হলো—সাংবাদিকতা কি সত্যিই এমন একটি পেশা, যেখানে “Press” শব্দটি ব্যবহার করলেই মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো মানসিকতা কাজ করছে?
মূলত “Press” শব্দটির উৎপত্তি সংবাদপত্র ছাপানোর যন্ত্র বা প্রিন্টিং প্রেস থেকে। অতীতে সংবাদমাধ্যমের প্রধান মাধ্যম ছিল ছাপাখানা। সেই সূত্র ধরেই সংবাদমাধ্যমের সাথে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে “Press” বলা হতো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাংবাদিকতার ধরনও বদলে গেছে। এখন অনলাইন মিডিয়া, টেলিভিশন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউবভিত্তিক সংবাদমাধ্যম, ব্লগিংসহ নানা মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। ফলে “Press” শব্দটি এখন একটি প্রতীকী পরিচয় হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই প্রতীক যখন দায়িত্বের চেয়ে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সমস্যা তৈরি হয়।
আজকাল সমাজে এমন অনেক মানুষ দেখা যায়, যারা সাংবাদিকতার প্রকৃত নীতি, নৈতিকতা কিংবা দায়িত্ব সম্পর্কে খুব বেশি জ্ঞান না রেখেও নামের পাশে “Press” ব্যবহার করে নিজেকে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। অনেকেই গাড়ির সামনে বড় অক্ষরে “PRESS” লিখে রাস্তায় চলাফেরা করেন, যেন এটি কোনো বিশেষ অনুমতিপত্র। কেউ কেউ মনে করেন, এই শব্দটি ব্যবহার করলে প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়া যাবে, সামাজিক প্রভাব বাড়বে কিংবা সাধারণ মানুষ ভয় পাবে। বাস্তবতা হলো—এ ধরনের মানসিকতা সাংবাদিকতার মর্যাদা বাড়ায় না; বরং প্রশ্নবিদ্ধ করে।
একজন প্রকৃত সাংবাদিকের পরিচয় তাঁর লেখনী, অনুসন্ধানী দক্ষতা, সত্য প্রকাশের সাহস এবং নৈতিকতার মাধ্যমে প্রকাশ পায়; গাড়ির সামনে “PRESS” লিখে নয়। ইতিহাসের বড় বড় সাংবাদিকদের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁরা নিজেদের পরিচয় প্রমাণ করেছেন কাজের মাধ্যমে। তাঁদের কলম ছিল শক্তি, তথ্য ছিল অস্ত্র এবং জনগণের আস্থা ছিল তাঁদের মর্যাদা। তারা কখনো বাহ্যিক পরিচয়ের উপর নির্ভর করেননি।
বর্তমানে অনেক জায়গায় “Press” শব্দটির অপব্যবহারও দেখা যায়। কেউ সাংবাদিকতার সাথে সরাসরি যুক্ত না থেকেও কোনো অনলাইন পোর্টালের নাম ব্যবহার করে প্রেস কার্ড বানিয়ে ফেলছেন। আবার কেউ ছোটখাটো ফেসবুক পেজ খুলে নিজেকে সাংবাদিক দাবি করছেন। এরপর নামের সাথে “Press” যোগ করে বিভিন্ন জায়গায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। এতে প্রকৃত সাংবাদিকরাই বিব্রত হন। কারণ সমাজ তখন সবাইকে একই চোখে দেখতে শুরু করে।
সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। এখানে তথ্য যাচাই, নৈতিকতা, নিরপেক্ষতা এবং জনস্বার্থ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু যখন কেউ সাংবাদিকতাকে শুধু পরিচয় বা ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন পেশাটির মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন চিকিৎসক যদি শুধুমাত্র সাদা অ্যাপ্রন পরে নিজেকে বড় প্রমাণ করতে চান কিন্তু চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞান না থাকে, তাহলে কি তিনি প্রকৃত চিকিৎসক হতে পারবেন? একইভাবে, শুধু “Press” লিখলেই কেউ প্রকৃত সাংবাদিক হয়ে যান না।
বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে দেখা যায়, কিছু মানুষ সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন। কোথাও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি, কোথাও ব্যবসায়িক সুবিধা, কোথাও সামাজিক প্রভাব—এসব কারণে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করা হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সাংবাদিকতা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। অথচ প্রকৃত সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য প্রকাশ করেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়েন এবং জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সাংবাদিকতা কোনো লাইসেন্সধারী ক্ষমতার পেশা নয়; এটি জনসেবামূলক দায়িত্ব। সাংবাদিকের কাজ মানুষকে ভয় দেখানো নয়, বরং তথ্য দিয়ে সচেতন করা। কিন্তু যখন “Press” শব্দটি ক্ষমতার প্রতীকে পরিণত হয়, তখন সাংবাদিকতার মূল দর্শন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অনেকেই খুব দ্রুত পরিচিতি পেতে চান। ফলে সাংবাদিকতা অনেকের কাছে সহজে “পরিচয় তৈরির মাধ্যম” হয়ে উঠেছে। কেউ হয়তো একটি অনলাইন পোর্টালে নাম লিখিয়েই ফেসবুকে নিজের নামের পাশে “Journalist” লিখছেন, গাড়িতে “Press” লাগাচ্ছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির মতো আচরণ করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সাংবাদিকতা কি সত্যিই এত সহজ?
সাংবাদিকতা মানে শুধু সংবাদ প্রকাশ নয়; এটি গবেষণা, বিশ্লেষণ, দায়িত্ববোধ এবং সত্য অনুসন্ধানের দীর্ঘ পথ। একজন প্রকৃত সাংবাদিক কখনো নিজের পরিচয় নিয়ে অতিরিক্ত প্রচারণায় ব্যস্ত থাকেন না। কারণ তাঁর কাজই তাঁকে পরিচিত করে তোলে।
পবিত্র কোরআনেও সত্য কথা বলার গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন—“হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সত্য সাক্ষ্য দাও।”…(সূরা আন-নিসা ৪:১৩৫)
এই আয়াত সাংবাদিকতার মূল নৈতিকতার সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সত্য বলা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং পক্ষপাতহীন থাকা—এসবই একজন দায়িত্বশীল সংবাদকর্মীর গুণ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন—“সত্য মুক্তির পথ দেখায়, আর মিথ্যা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।”…(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
একজন সাংবাদিক যদি সত্যের পথে না থাকেন, তাহলে শুধু “Press” ব্যবহার করে তাঁর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় না। বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—সাংবাদিকতা ও সাংবাদিক পরিচয়ের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়ে গেছে। অনেকেই সাংবাদিকতার চেয়ে সাংবাদিক পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে সমাজে একধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে—কার গাড়িতে বড় “PRESS” লেখা আছে, কার কার্ড বেশি চকচকে, কে প্রশাসনের সাথে বেশি ছবি তুলতে পারে। অথচ প্রকৃত সাংবাদিকতার সাথে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই।
একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তাঁর সততা। তিনি কতটা নির্ভীকভাবে সত্য বলতে পারেন, কতটা তথ্যনির্ভরভাবে কাজ করেন, কতটা জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেন—এসবই তাঁর প্রকৃত পরিচয়। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। “Press” শব্দটি ব্যবহার করা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ না হলেও, এর অপব্যবহার সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। কারণ সাধারণ মানুষ তখন বুঝতে পারে না কে প্রকৃত সাংবাদিক আর কে শুধুমাত্র পরিচয় ব্যবহারকারী।
অনেক সময় দেখা যায়, কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। কারো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অফিস কিংবা ব্যক্তিগত বিষয়ে অযথা চাপ সৃষ্টি করেন। এর ফলে সমাজে সাংবাদিকতার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। মানুষ তখন প্রকৃত সাংবাদিকদের প্রতিও সন্দেহের চোখে তাকাতে শুরু করে।
সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে বিনয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন সাংবাদিকের কাজ হলো সমাজের সব স্তরের মানুষের কথা শোনা। তিনি যদি নিজেকে অতিরিক্ত ক্ষমতাবান মনে করেন, তাহলে নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলবেন।
আজকের বিশ্বে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো তথ্যের অপব্যবহার। ভুয়া সংবাদ, অপপ্রচার, ব্যক্তিগত স্বার্থে তথ্য ব্যবহার—এসবের কারণে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু যদি তারা বাহ্যিক পরিচয় প্রদর্শনেই বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েন, তাহলে প্রকৃত সাংবাদিকতা আরও দুর্বল হবে। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের দরকার জ্ঞান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, ভাষা দক্ষতা এবং নৈতিক সাহস। শুধু “Press” লিখে এসব অর্জন করা যায় না। বরং দায়িত্বশীল কাজের মাধ্যমেই মানুষের আস্থা অর্জন করতে হয়।
সমাজে আজ এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেকেই সাংবাদিকতাকে পেশার চেয়ে প্রভাবের মাধ্যম হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। এর ফলে প্রকৃত সাংবাদিকরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি সাধারণ মানুষও বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
সবশেষে বলা যায়, সাংবাদিকতা একটি সম্মানজনক দায়িত্ব, কিন্তু “Press” শব্দটি সেই দায়িত্বের বিকল্প নয়। একজন সাংবাদিকের মর্যাদা তাঁর নামের পাশে লেখা কোনো শব্দে নয়; বরং তাঁর সততা, দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা এবং সত্য প্রকাশের সাহসের মধ্যেই নিহিত। সত্যিকারের সাংবাদিকরা ইতিহাসে স্মরণীয় হন তাঁদের কাজের জন্য, গাড়ির স্টিকারের জন্য নয়। সমাজের দরকার প্রকৃত সংবাদকর্মী—যারা সত্যের পক্ষে দাঁড়াবে, মানুষের কথা বলবে এবং পেশাটিকে ব্যক্তিগত প্রভাবের মাধ্যম নয়, জনসেবার দায়িত্ব হিসেবে দেখবে।
লেখক :
আজম পাটোয়ারী
প্রকাশক
আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।