May 13, 2026, 11:13 am
শিরোনামঃ
ইসলামের হেফাজতকারী কে—মানুষ নয়, বরং মহান আল্লাহ? জেনারেল (অব.) ড. আজিজ আহমেদের সেনাজীবনে শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় ও কর্তব্যবোধের দীপ্ত সূচনা! অঙ্গীকার বন্ধু সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ অনুমোদন ; সভাপতি সরকার তৌহিদ, সম্পাদক শামীম, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈকত চিরকুট লিখে নিখোঁজ নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী লিখন মজুমদার পবন, উৎকণ্ঠায় পরিবার সুন্দরবনে অস্ত্রসহ দস্যু সর্দার মেজো জাহাঙ্গীর গ্রেপ্তার জনপ্রতিনিধি হিসাবে মানুষ কেন আপনাকে নির্বাচিত করবেন? একাধিক বিয়ে ও নির্যাতনের অভিযোগ, আদালতের পরোয়ানার পর মতলব উত্তরে আটক মতলব উত্তরে চাঁদা দাবিতে হামলার অভিযোগে আদালতে মামলা খাদ্য, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার অবস্থা ভালো নেই, আমার এলাকার মানুষ খুবই অবহেলিত : এমপি কামরুল

ইসলামের হেফাজতকারী কে—মানুষ নয়, বরং মহান আল্লাহ?

Reporter Name

পৃথিবীতে ইসলাম ধর্মকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত, বিতর্কিত এবং আবেগনির্ভর যে বিষয়গুলোর একটি বারবার সামনে আসে, তার মধ্যে অন্যতম হলো—“ইসলামের হেফাজত” বা রক্ষা করার প্রশ্ন। আমাদের সমাজে প্রায়ই শোনা যায়, “ইসলাম রক্ষার জন্য মাঠে নামতে হবে”, “ইসলাম বিপদের মুখে”, “ইসলামকে বাঁচাতে হবে”, “আমরাই ইসলামের সৈনিক”, কিংবা “ইসলাম রক্ষায় জীবন দিতে হবে।” এসব কথার কিছু অংশ আবেগপ্রসূত, কিছু অংশ ধর্মীয় দায়িত্ববোধ থেকে বলা, আবার কিছু অংশ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো—ইসলামের প্রকৃত হেফাজতকারী কে? মানুষ নয়, বরং স্বয়ং মহান আল্লাহ?

পবিত্র কোরআনের আলোকে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়—আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করেছেন। মানুষ ইসলামের অনুসারী, প্রচারক, দাওয়াতদাতা ও আমলকারী হতে পারে; কিন্তু ইসলামের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আল্লাহ মানুষের উপর নির্ভরশীল নন। কারণ ইসলাম কোনো মানুষের তৈরি মতবাদ নয়; এটি মহান আল্লাহর প্রেরিত পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন—“নিশ্চয় আমিই এ উপদেশ (কোরআন) নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।”— সূরা আল-হিজর, ১৫:৯

এই আয়াতটি ইসলামের হেফাজত প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি। এখানে আল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, কোরআনের সংরক্ষণ ও হেফাজতের দায়িত্ব তিনি নিজেই নিয়েছেন। অর্থাৎ ইসলামকে টিকিয়ে রাখার জন্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল বা বিশেষ শ্রেণি অপরিহার্য নয়। আল্লাহ চাইলে তাঁর দ্বীনকে যেকোনো পরিস্থিতিতে সংরক্ষণ করতে সক্ষম।

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালেও এই বাস্তবতা স্পষ্ট দেখা যায়। নবী-রাসূলদের বিরোধিতা করা হয়েছে, মুসলমানদের নির্যাতন করা হয়েছে, যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, ইসলামকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে—তবুও ইসলাম টিকে আছে। বরং অনেক সময় নির্যাতনের পরই ইসলাম আরও বেশি বিস্তার লাভ করেছে। মক্কার কাফিররা ভেবেছিল ইসলামকে দমন করা যাবে, কিন্তু সেই ইসলামই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আল্লাহ মানুষকে ইসলামের দাওয়াত ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর দায়িত্ব দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেটাকে “আল্লাহর ধর্মকে বাঁচানো” হিসেবে উপস্থাপন করা সবসময় সঠিক নয়। কারণ এতে অনেক সময় এমন ধারণা তৈরি হয় যেন ইসলাম মানুষের দয়ার উপর নির্ভরশীল। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। মানুষ ইসলামকে রক্ষা করে না; বরং ইসলামই মানুষকে পথভ্রষ্টতা, অন্যায় ও ধ্বংস থেকে রক্ষা করে।

আমাদের দেশের কিছু আলেম, বক্তা বা ধর্মীয় সংগঠন প্রায়ই এমনভাবে বক্তব্য দেন যেন ইসলাম এখন পুরোপুরি মানুষের হাতে জিম্মি। তারা এমন ভাষা ব্যবহার করেন, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়, উত্তেজনা ও আবেগ সৃষ্টি করে। কেউ কেউ দাবি করেন, “আমরা না থাকলে ইসলাম শেষ হয়ে যাবে”, “আমাদের আন্দোলন ছাড়া ইসলাম টিকবে না”, বা “অমুক দলই ইসলামের একমাত্র রক্ষাকবচ।” এই ধরনের বক্তব্য কোরআনের মূল শিক্ষার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি গভীরভাবে ভাবার বিষয়।

ইসলাম কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ইসলাম আল্লাহর দ্বীন। কেউ ইসলামের সেবা করতে পারে, দাওয়াত দিতে পারে, মানুষকে সৎপথে আহ্বান করতে পারে—এটি অবশ্যই মহৎ কাজ। কিন্তু নিজেকে “ইসলামের একমাত্র রক্ষক” হিসেবে উপস্থাপন করা অহংকার ও আত্মপ্রচারেও রূপ নিতে পারে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ আরও বলেন—“তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে নিয়ে আসবেন; তারপর তারা তোমাদের মতো হবে না।”— সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:৩৮

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উপর নির্ভরশীল নয়। মানুষ দায়িত্ব পালন না করলে আল্লাহ অন্য মানুষকে দায়িত্ব দেবেন। অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীন চলমান থাকবে, মানুষ বদলাবে।

আজকের বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক সময় ইসলামের নামে এমন আচরণ করা হয় যা ইসলামের সৌন্দর্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। কেউ কেউ ইসলাম রক্ষার নামে সহিংসতা, গালাগালি, বিভক্তি, অপবাদ, এমনকি হত্যা পর্যন্ত সমর্থন করার চেষ্টা করে। অথচ ইসলাম শান্তি, ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞার ধর্ম। ইসলাম মানুষকে যুক্তি ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে দাওয়াত দিতে শিখিয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে—“তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে।”— সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৫

এখানে কোথাও বলা হয়নি যে ইসলাম রক্ষার জন্য মানুষকে ঘৃণা করতে হবে, বিভেদ ছড়াতে হবে বা সহিংস হতে হবে। বরং ইসলাম মানুষকে জ্ঞান, ধৈর্য ও নৈতিকতার মাধ্যমে সত্য প্রচার করতে বলেছে।

অনেক সময় দেখা যায়, কেউ কোনো আলেম বা ধর্মীয় ব্যক্তির সমালোচনা করলেই সেটিকে “ইসলামের বিরুদ্ধে আক্রমণ” বলা হয়। অথচ ব্যক্তি আর ধর্ম এক জিনিস নয়। কোনো ব্যক্তির ভুল, অপরাধ বা সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা মানেই ইসলামবিরোধিতা নয়। কিন্তু আমাদের সমাজে কিছু মানুষ ব্যক্তি ও ধর্মকে এমনভাবে এক করে ফেলেন, যাতে কোনো ব্যক্তির সমালোচনাও ধর্মবিদ্বেষ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এই প্রবণতা ইসলামের জন্যও ক্ষতিকর। কারণ এতে মানুষ মনে করতে শুরু করে, ইসলাম মানেই কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী। অথচ ইসলাম তার চেয়েও অনেক বড় এবং অনেক পবিত্র। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে আরও বলেছেন—“সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই।”— সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮১

এই আয়াত ইসলামের শক্তির একটি মৌলিক সত্য প্রকাশ করে। সত্যকে টিকিয়ে রাখতে শেষ পর্যন্ত আল্লাহরই সাহায্য যথেষ্ট। মানুষ সাময়িকভাবে সত্যকে আড়াল করতে পারে, কিন্তু সত্যকে চিরতরে ধ্বংস করতে পারে না। ইসলামের ইতিহাসে বহু বড় বড় সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়েছে, বহু শাসক হারিয়ে গেছে, বহু রাজনৈতিক দল বিলীন হয়েছে—কিন্তু ইসলাম রয়ে গেছে। কারণ ইসলামের ভিত্তি মানুষের ক্ষমতা নয়, আল্লাহর ইচ্ছা।

আমাদের সমাজে কখনও কখনও ইসলামের হেফাজতের নামে এমন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করা হয়, যেখানে ইসলামকে একটি দলের সঙ্গে একীভূত করে ফেলা হয়। ফলে মানুষ ভাবতে শুরু করে, অমুক দল ক্ষমতায় না থাকলে ইসলাম থাকবে না। অথচ ইসলামের অস্তিত্ব কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল নয়। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনের দিকেও তাকালে দেখা যায়, তিনি কখনও নিজের ব্যক্তিগত শক্তিকে ইসলামের মূল ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তিনি সবসময় আল্লাহর উপর ভরসা করেছেন। বদরের যুদ্ধে মুসলমানরা সংখ্যায় কম ছিল, অস্ত্রে দুর্বল ছিল; তবুও বিজয় এসেছে আল্লাহর সাহায্যে। কোরআনে বলা হয়েছে—“আর বিজয় তো একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।”— সূরা আল-আনফাল, ৮:১০

এই আয়াত মুসলমানদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত শক্তি ও হেফাজত আল্লাহর হাতে।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ইসলাম নিয়ে বিভ্রান্তি, বিতর্ক ও আক্রমণ বাড়ছে। কেউ ইসলামকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছে, কেউ বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, কেউ আবার ইসলামকে ব্যবহার করছে ব্যক্তিগত স্বার্থে। এই বাস্তবতায় মুসলমানদের দায়িত্ব অবশ্যই রয়েছে—সত্য প্রচার করা, জ্ঞানচর্চা করা, নৈতিকতা বজায় রাখা এবং ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা। কিন্তু এই দায়িত্ব পালন আর “আমরাই ইসলামের মালিক” ধরনের মনোভাব এক জিনিস নয়।

একজন প্রকৃত আলেম বা জ্ঞানী মানুষ কখনও নিজেকে ইসলামের একমাত্র রক্ষক হিসেবে দাবি করবেন না। বরং তিনি মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করবেন, নিজের দিকে নয়। কারণ ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু আল্লাহ, কোনো ব্যক্তি নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন—“ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।”— সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৬

এই আয়াত ইসলামের একটি গভীর নীতিকে প্রকাশ করে। ইসলাম মানুষের বিবেক, চিন্তা ও উপলব্ধিকে গুরুত্ব দেয়। তাই ইসলামের দাওয়াত হতে হবে যুক্তিনির্ভর ও মানবিক।

আজ আমাদের সমাজে ইসলামের সবচেয়ে বড় সংকট বাইরের আক্রমণ নয়; বরং অনেক সময় ভেতরের বিভক্তি, অহংকার ও অজ্ঞতা। একদল আরেক দলকে কাফির বলছে, কেউ নিজেকে একমাত্র সঠিক দাবি করছে, কেউ ইসলামের নামে ব্যক্তিপূজা করছে। অথচ কোরআন মুসলমানদের ঐক্যের শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন, “তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না।”— সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৩

ইসলামের প্রকৃত শক্তি ঐক্য, জ্ঞান ও নৈতিকতায়। চিৎকার, হুমকি বা সহিংসতায় নয়।

আল্লাহ চাইলে মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে বদলে দিতে পারেন। ইতিহাসে বহু ইসলামবিদ্বেষী পরবর্তীতে ইসলামের অনুসারী হয়েছেন। আবার বহু মুসলমান পথভ্রষ্টও হয়েছেন। তাই কারও ঈমান বা ইসলামের ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার মানুষের নেই। একজন মুসলমানের কাজ হলো নিজের ঈমান ঠিক রাখা, সত্য প্রচার করা এবং সুন্দর চরিত্রের মাধ্যমে ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করা। ইসলামের হেফাজতের চূড়ান্ত দায়িত্ব আল্লাহর।

সবশেষে বলা যায়, ইসলামকে রক্ষা করার প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহ। মানুষ ইসলামের দাওয়াতদাতা ও অনুসারী হতে পারে, কিন্তু ইসলামের অস্তিত্ব মানুষের হাতে নির্ভরশীল নয়। পবিত্র কোরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, আল্লাহ নিজেই তাঁর দ্বীন ও কোরআনের সংরক্ষক। তাই ইসলামের নামে অহংকার, বিভক্তি বা ক্ষমতার রাজনীতি না করে মুসলমানদের উচিত জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা। কারণ ইসলাম কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়—এটি মহান আল্লাহর প্রেরিত চিরন্তন সত্যের পথ।

 

লেখক :

আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা