এক সময় চাঁদপুরের মতলব উত্তরের গ্রামাঞ্চলে প্রতিটি বাড়ির রান্নাঘরে দেখা যেত মাটির তৈরি চুলা। ঘুটে, খড়কুটো আর শুকনো ডালপালার আগুনেই চলত নিত্যদিনের রান্নাবান্না। সময়ের পরিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই মাটির চুলা ছেড়ে অনেক পরিবার ঝুঁকেছিল এলপিজি গ্যাসের দিকে। তবে কয়েক ধাপে গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছানোয় আবারও নিভে যাচ্ছে গ্যাসের আগুন। বিকল্প হিসেবে গ্রামীণ জনপদের রান্নাঘরে ফিরেছে চিরচেনা লাকড়ির চুলা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আগে যেখানে একটি গ্যাস সিলিন্ডার ৭৫০ টাকায় পাওয়া যেত, বর্তমানে সেটির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য গ্যাসে রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই গৃহিণীরা ফিরে যাচ্ছেন আগের পদ্ধতিতে হাতে বানানো মাটির কিংবা সিমেন্টের তৈরি লাকড়ির চুলায়।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এখন বাড়ির উঠোনে দেখা যাচ্ছে নতুন করে বানানো চুলা। কেউ নিজের হাতে মাটি দিয়ে চুলা তৈরি করছেন, আবার অনেকে ঝামেলা এড়াতে বাজার থেকে কিনছেন সিমেন্ট-বালুর তৈরি চুলা কিংবা পরিবেশবান্ধব ‘বন্ধু চুলা’। হাট-বাজারেও এসব চুলার চাহিদা বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের লাকড়ির চুলা ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এলপিজির দাম বৃদ্ধির প্রভাব এখন শুধু রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বদলে দিচ্ছে পুরো গ্রামীণ জীবনের চিত্র। আধুনিকতার পথ ছেড়ে প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ ফিরছে পুরনো অভ্যাসে যেখানে ধোঁয়ার কষ্ট থাকলেও রয়েছে খরচ বাঁচানোর স্বস্তি।
উপজেলার বারোআনী গ্রামের গৃহিণী সুমি বেগম বলেন, এত দামের গ্যাস কিনে আমাদের পক্ষে সংসার চালানো সম্ভব না। তাই কষ্ট হলেও নিজ হাতে বানানো লাকড়ির চুলায় রান্না করছি। এতে লাকড়িও কম লাগে, খরচও গ্যাসের তুলনায় অনেক কম।
একই সুরে দেওয়ানজীকান্দি গ্রামের গৃহিণী রোকসানা জানান, বাপ-দাদার আমল থেকেই আমরা মাটির চুলায় রান্না করছি। তখন জ্বালানি ছিল ঘুটে, পাটখড়ি, বাঁশের কঞ্চি, শুকনো ডাল আর ঝরা পাতা। পরে গ্যাস এলো। কিন্তু এখন দাম এত বেশি যে আবার লাকড়ির চুলাতেই ফিরে যেতে হচ্ছে।
ছেংগারচর বাজারের সিমেন্টের চুলা বিক্রেতা কবির হোসেন বলেন, আগে সারাদিন হাট-বাজারে ঘুরে এক দুইটা চুলা বিক্রি করতে পারতাম। এখন প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫টা চুলা বিক্রি হচ্ছে। লেবেল চুলা ৪০০ টাকা, তলা চুলা ৬০০ টাকা আর জোড়া তলা চুলা ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করি। বছরে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার চুলা বিক্রি হয়।
এ বিষয়ে জীবগাঁও জেনারেল হক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আলী হোসেন বলেন, মতলব উত্তর উপজেলায় গ্যাসের কোনো পাইপলাইন নেই। মানুষ পুরোপুরি এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। সিলিন্ডারের দাম বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে মানুষ।