জ্বালানি তেলের সংকটে মোংলা বন্দরে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না পাওয়ায় অধিকাংশ লাইটার জাহাজ বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে আনলোড করতে পারছে না। এতে বন্দরের কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে তেল-গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে দেশের বাজারেও জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের কার্যক্রমে। জ্বালানি সংকটের কারণে বহির্নোঙরে অবস্থানরত বড় জাহাজ বা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করতে পারছে না অনেক লাইটার জাহাজ। তেলের সংকট দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।
মোংলা বন্দরের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদেশ থেকে আসা বড় জাহাজগুলো ড্রাফটজনিত কারণে বন্দরের জেটি বা পশুর চ্যানেলে সরাসরি ভিড়তে পারে না। ফলে বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে তা জেটি ও দেশের বিভিন্ন নদীবন্দরে পাঠানো হয়। মোংলা বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে প্রায় এক হাজার লাইটার জাহাজের ওপর নির্ভরশীল দেশের একটি বড় অংশের পণ্য পরিবহন নেটওয়ার্ক।
কিন্তু সম্প্রতি জ্বালানি সংকটের কারণে এসব লাইটার জাহাজ বিপাকে পড়েছে। তেল বিপণন কোম্পানিগুলো রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি সরবরাহ করায় অনেক জাহাজ প্রয়োজনীয় ডিজেল পাচ্ছে না। ফলে শতাধিক লাইটার জাহাজ অলস বসে আছে বলে জানিয়েছেন মালিকরা।
লাইটার জাহাজ মালিকদের অভিযোগ, আগের মতো ডিপো থেকে পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় জাহাজগুলো চলাচল করতে পারছে না। এক মালিক বলেন, “বন্দরের ফেয়ারওয়ে এলাকায় অবস্থানরত বিদেশি জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের জন্য আমাদের লাইটার জাহাজ ভাড়া চাওয়া হয়। মোংলা থেকে ফেয়ারওয়ে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে। সেখানে যাওয়া-আসার জন্য প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডিপো থেকে সেই তেল না পাওয়ায় জাহাজ পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।”
তিনি আরও জানান, বর্তমানে শতাধিক লাইটার জাহাজ জ্বালানি সংকটে পড়ে আছে। ফলে বহির্নোঙরে থাকা অনেক বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক লাইটার জাহাজ পণ্য নিয়ে গন্তব্যে যেতে পারছে না। কিছু জাহাজ বহির্নোঙরে অবস্থান করছে, আবার কিছু জাহাজ পণ্য বোঝাই অবস্থায় আটকে আছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে।
মোংলা বন্দরের ব্যবহারকারীরা বলেন, “তেল সংকটের কারণে লাইটার জাহাজের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বহির্নোঙরে থাকা একটি বড় জাহাজ থেকে কয়লা খালাস করা যাচ্ছে না। এতে আমরা ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছি।”
বন্দর সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, বহির্নোঙরে পণ্য খালাসে বিলম্ব হলে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত জাহাজ ভাড়া গুনতে হবে। এতে পণ্যের আমদানি খরচ বাড়বে এবং এর প্রভাব পড়বে বাজারমূল্যের ওপর। ফলে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন এবং বাজার সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে লাইটার জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনা সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি)-এর আহ্বায়ক সফিক আহমেদ গত ৯ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক লাইটার জাহাজ কর্ণফুলী নদীতে পণ্য নিয়ে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে এবং গন্তব্যে যেতে পারছে না।
চিঠিতে দেশের বন্দরগুলো থেকে নদীপথে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে মোংলা বন্দরের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।