শীতের আগমনে অনেক পাখিই আমাদের দেশে দেখা যায়। পূন্ড্র নগরীর রাজধানী খ্যাত মহাস্থানগড় থেকে পশ্চিম ও উওরে কয়েক কিলোমিটার গেলেই বিহার হাট। বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার হাটে গেলেই দেখা যায় গাছে গাছে দুর্লভ প্রজাতির শামুকখোল পাখির অভয়ারণ্য।
গাছে গাছে এসব অতিথি পাখি দেখার জন্য স্থানীয়রা ও পাশ্ববর্তী এলাকার পাখি প্রেমী মানুষরা প্রতিনিয়িত ভির করছে। স্থানীয়রা জানায়, বিহার হাটের ৫/৭টি বৃক্ষের শাখায় জোড়ায় জোড়ায় এরা সংসার পেতেছে। ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাখির ডাকে মুখরিত করে তোলে বিহার হাট এলাকা।
বগুড়া সামাজিক বন বিভাগর কর্মকর্তাদর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, জেলার শিবগঞ্জ উপজলার বিহার এখন শামুকখাল পাখির অভয়ারণ্য। রয়েছে কয়েক কিলামিটারজুড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে এঁদের বিচরন। বাঁশবাগান ছাড়াও এলাকার বিভিন্ন গাছে এঁদের বাস । এসব গাছের চিকন ও মোটা ডালে আবাস গড়ে তুলছে দুর্লভ প্রজাতির পাখি ‘শামুকখোল’।
এ পাখিগুলা আবার চলেও যায়। কিছুদিন পর আবার ফিরে আসে। ধূসর রঙের পাখিগুলার ডানাও বেশ বড়। ঠোঁট লম্বা এবং মাঝখানে ফাঁকা। শামুকখোলের লেজ ও পাখার শষভাগ কালো রঙের। ঠোঁট বেশ খানিকটা বড়। শামুক এদের প্রিয় খাবার। শামুকের খোল ভাঙে ঠোঁট দিয়ে তারপর সেটা ওপরের দিক তুলে ধরে গিলে ফেলে। খাবার হিসেবে এরা শুধু শামুকই খায় না মাছ, কাঁকড়া, ,ব্যাঙ ও ছোট ছোট জলজ প্রাণি খেয়ে বেঁচে থাকে। অনকটা বকের মতোই দেখতে। একেকটা গাছে ২৫-৩০টি বাসা দেখা যায়। শুকনা ডাল, কঞ্চি ও লতাপাতা দিয়ে বাসা তৈরি করে শামুকখাল পাখি। স্ত্রী-পুরুষ পাখি মিলে ১০-১২ দিন তৈরি করে বাসা। পাঁচ ফুট পর্যন্ত বাসার দর্ঘ্য হয়। এঁরা সাধারণত ডিম দেয় জুলাই-আগস্ট মাসের দিকে। একটি স্ত্রী শামুকখাল তিন থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ পাখি মিলে ডিমে তা দেয়। ২৫ দিন লাগে ডিম ফুটিয়ে ছানা বের হতে। ৩০ থেকে ৩৫ দিন বয়স হলে ছানাগুলো উড়তে শিখে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শামুকখোল পাখির বাসা ছাড়া বের হয়ে উড়ে যায় আশপাশের বিলে মাঝে মধ্যে আধা শুকনো করতোয়া নদীতেও এদের বিচরণ দেখা যায়। এরা বিল থেকে ব্যাঙ, শামুক, মাছ, কাঁকড়া ও ছোট ছোট জলজ প্রাণী খেয়ে জীবনধারণ করে। প্রথম দিকে সংখ্যায় কম দেখা গেলেও কয়েক বছরে বংশবিস্তার এর ফলে এখন কয়ক হাজার পাখির আবাস এখন বিহার হাটে। বাঁশবাগান, শিমুল, কদম, পিটাহরি, পাকুড়, মেহগনিসহ বেশ কয়ক প্রজাতির গাছে এরা বাসা বেঁধেছে।
বিহার গ্রামর আইনুল ও হারুন বলন, বিহার হাট ও আশপাশের মানুষর সাথে মিতালি গড়ে উঠেছে এসব পাখিদের। শিকারী ও উৎপাতকারীদর হাত থেকে পাখিগুলোকে আগলে রেখেছে স্থানীয় জনগণ। কেউ পাখি শিকার করতে আসলে আমরা প্রতিবাদ করি । স্থানীয় শিক্ষক ও সাংবাদিক রবিউল ইসলাম রবি বলেন, সাধারণত এসব পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে দল বেঁধে উড়ে ও খাবার সংগ্রহ করে। বর্ষাকাল উত্তরের জেলাগুলোতে এদের বেশি দেখা মেলে। খাবার থাকলে পাখিগুলো দীর্ঘদিন থেকে যায় আর খাবার সংকট হলেই তারা স্থান পরিবর্তন করে আবার বাসা বাঁধে। ২০১১ সাল থেকে বিহার এলাকায় পাখিগুলোকে নিয়মিত দেখা যায়। বিহার গ্রামকে পাখির নিরাপদ রাজ্য গড়ে তুলতে ২০১৩ সালে তিরের আঞ্চলিক কমিটি করা হয়। ২০১৬ সালে শিবগঞ্জের বিহারহাটকে শামুকখাল পাখির রাজ্য ঘোষণা করা হয়। উপজলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাখিগুলার খোঁজ খবর রাখা হয় নিয়মিত।
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ ক্যাম্পাসভিত্তিক সংগঠন ‘তির’ (টিম ফর এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমটাল রিসার্চ)-এর কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাইকোনিডিয়া গ্রোত্রের কয়েক হাজার পাখি নিয়মিত আবাস হারিয়ে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বিপন্ন হওয়া ঝুঁকিতে থাকা এ প্রজাতির পাখি ঝাঁক বেঁধে বগুড়ার বিভিন্ন এলাকার বড় বড় বৃক্ষে আশ্রয় নিয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার বলেন, এসব পাখিগুলোর বিষয়ে প্রতিনিয়ত খাঁজখবর নেওয়া হয়। পাখি গুলো যেন নিরাপদে থাকে সে বিষয়ে আমরা লক্ষ রেখেছি।