June 6, 2026, 7:22 pm
শিরোনামঃ
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় পাইকুরাটিতে কৃষকদের বিক্ষোভ ; তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফেরা সুন্দরবনের সেই বাঘিনী জুনের শেষেই ফিরছে আপন আবাসে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচে হট্টগোল ; খেলা অমীমাংসিত জিয়াউর রহমান জিয়াসহ মতলবের ৪ নেতার কেন্দ্রীয় যুবদলে স্থান পাওয়ায় আনন্দ মিছিল একটি অসমাপ্ত চাঁদাবাজির গল্প! বিষ, প্লাস্টিক ও শিল্পবর্জ্যের আগ্রাসনে অস্তিত্ব সংকটে সুন্দরবন ; বিপন্ন জীববৈচিত্র্য মতলব উত্তরে শিবু মিয়াজীর ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন ; অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় কৃষি কার্ডে অনিয়মের অভিযোগে বিক্ষোভ মিছিল সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের সফল অভিযান, অস্ত্র-গুলিসহ বনদস্যু বাহিনীর সদস্য আটক মতলব উত্তরে বৃদ্ধাকে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ ; থানায় লিখিত অভিযোগ

হাইব্রিড ও চাটুকারিতা: রাজনীতি ধ্বংসের অপর নাম!

Reporter Name

রাজনীতি একটি সমাজের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। একটি দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, নীতি, উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে সেই দেশের রাজনীতির চরিত্রের ওপর। যখন রাজনীতি আদর্শ, নৈতিকতা ও জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তখন রাষ্ট্র এগিয়ে যায়। কিন্তু যখন রাজনীতির ভেতরে হাইব্রিড চরিত্র এবং চাটুকারিতার সংস্কৃতি ঢুকে পড়ে, তখন সেই রাজনীতি ধীরে ধীরে তার প্রকৃত শক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলাফল হিসেবে দেখা দেয় বিভ্রান্তি, দুর্নীতি, অযোগ্য নেতৃত্ব এবং সংগঠনের ভেতরে গভীর সংকট। এই কারণেই বলা হয়—হাইব্রিড ও চাটুকারিতা রাজনীতি ধ্বংসের অপর নাম।

রাজনীতির মূল শক্তি হলো আদর্শ। একটি রাজনৈতিক সংগঠন তখনই শক্তিশালী হয় যখন তার সদস্যরা সেই আদর্শে বিশ্বাস করে এবং সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতে কাজ করে। কিন্তু যখন কোনো সংগঠনে হাইব্রিড রাজনীতির প্রবেশ ঘটে, তখন সেই আদর্শের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। “হাইব্রিড রাজনীতি” বলতে সাধারণত এমন মানুষদের বোঝানো হয় যারা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের আদর্শিক ভিত্তি থেকে উঠে আসে না, বরং সুবিধা বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য হঠাৎ করে সেই সংগঠনের ভেতরে প্রবেশ করে। তারা সংগঠনের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, ত্যাগ ও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত না থেকেও ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করার চেষ্টা করে। এই ধরনের মানুষরা সাধারণত রাজনীতিকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখে, আদর্শ হিসেবে নয়। তাদের কাছে রাজনীতি হলো ব্যক্তিগত উন্নতির একটি মাধ্যম। ফলে তারা সংগঠনের নীতি ও লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেয় না। তারা যে সংগঠনে থাকে, সেই সংগঠনের প্রতি তাদের প্রকৃত আনুগত্য থাকে না; বরং তাদের আনুগত্য থাকে ক্ষমতার প্রতি। ক্ষমতা যেখানে থাকে, তারা সেখানেই নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চেষ্টা করে। এই প্রবণতা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

হাইব্রিড রাজনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হলো এটি সংগঠনের ভেতরে বিভাজন সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন ধরে যারা সংগঠনের জন্য কাজ করে, ত্যাগ স্বীকার করে এবং কঠিন সময়ে সংগঠনের পাশে থাকে, তারা যখন দেখে হঠাৎ করে নতুন কিছু মানুষ এসে তাদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। এতে সংগঠনের ভেতরের ঐক্য নষ্ট হয় এবং কর্মীদের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি সংগঠনের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থা। হাইব্রিড রাজনীতির সঙ্গে চাটুকারিতার একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। চাটুকারিতা হলো এমন একটি মানসিকতা যেখানে কেউ ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা নেতাকে খুশি করার জন্য অতিরিক্ত প্রশংসা করে, তোষামোদ করে এবং প্রয়োজনে সত্যকে আড়াল করে। এই ধরনের মানুষরা সাধারণত কোনো আদর্শ বা নৈতিকতার ভিত্তিতে কাজ করে না; বরং তারা নিজের স্বার্থকে সামনে রেখে আচরণ করে।

রাজনীতিতে চাটুকারিতার সংস্কৃতি তৈরি হলে নেতৃত্ব ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কারণ চাটুকাররা কখনো নেতাকে সত্য কথা বলে না। তারা সব সময় নেতার ভুল সিদ্ধান্তকেও সঠিক বলে তুলে ধরার চেষ্টা করে। ফলে নেতা তার চারপাশে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা পান না। তিনি মনে করেন সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, অথচ বাস্তবে সংগঠনের ভেতরে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। চাটুকারদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তারা কখনোই বিপদের সময় পাশে থাকে না। যখন ক্ষমতা থাকে, তখন তারা সবচেয়ে কাছের মানুষ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করে। তারা সভা-সমাবেশে নেতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকে, নেতাকে নিয়ে বড় বড় কথা বলে এবং নিজেদেরকে সবচেয়ে বিশ্বস্ত হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু যখন কোনো সংকট দেখা দেয় বা ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে, তখন এই চাটুকাররাই সবার আগে সরে যায়। তারা অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে নিজেদের নতুন সম্পর্ক তৈরি করে। এই বাস্তবতা ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে। অনেক রাজনৈতিক নেতা তাদের চারপাশে এমন এক পরিবেশ তৈরি করেন যেখানে কেবল প্রশংসা শোনা যায়, সমালোচনা নয়। ফলে তারা ধীরে ধীরে এমন এক মানসিক অবস্থায় পৌঁছে যান যেখানে তারা মনে করেন তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সত্য। এই ধরনের পরিবেশ একটি সংগঠনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

হাইব্রিড ও চাটুকার রাজনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় কর্মীবাহিনীর ওপর। একটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রকৃত শক্তি হলো তার কর্মীরা। কর্মীরাই মানুষের কাছে যায়, সংগঠনের বার্তা পৌঁছে দেয় এবং সংগঠনের আদর্শকে বাস্তবতায় রূপ দেয়। কিন্তু যখন সংগঠনে হাইব্রিড ও চাটুকার শ্রেণীর প্রভাব বেড়ে যায়, তখন এই কর্মীরাই অবহেলিত হয়ে পড়ে। কর্মীরা তখন মনে করতে শুরু করে যে তাদের ত্যাগ ও শ্রমের কোনো মূল্য নেই। তারা দেখতে পায় যে যারা সংগঠনের জন্য দীর্ঘদিন কাজ করেছে তাদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এমন মানুষরা যারা কেবল তোষামোদ করতে পারে। এতে কর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয় এবং তারা ধীরে ধীরে সংগঠন থেকে দূরে সরে যায়।

রাজনীতিতে হাইব্রিড সংস্কৃতি আরেকটি বড় সমস্যার জন্ম দেয়—এটি সংগঠনের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে। যখন মানুষ দেখে যে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তখন তারা সংগঠনের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করে। এর ফলে জনগণের মধ্যেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। একটি রাজনৈতিক সংগঠন তখনই শক্তিশালী হয় যখন তার ভেতরে আদর্শিক শৃঙ্খলা থাকে। সেখানে নেতৃত্বের প্রতি সম্মান থাকে, কিন্তু সেই সম্মান অন্ধ আনুগত্য নয়; বরং এটি পারস্পরিক আস্থা ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। কিন্তু চাটুকারিতার সংস্কৃতি এই ভারসাম্যকে নষ্ট করে দেয়। চাটুকাররা সাধারণত নেতৃত্বের আশেপাশে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে প্রকৃত কর্মীরা সহজে পৌঁছাতে পারে না। তারা নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার জন্য অন্যদের দূরে সরিয়ে রাখে। এতে করে নেতৃত্ব ও কর্মীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্ব একটি সংগঠনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

হাইব্রিড রাজনীতির আরেকটি দিক হলো এটি সংগঠনের আদর্শিক ধারাবাহিকতাকে ভেঙে দেয়। একটি সংগঠন যখন দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সেই আদর্শ তার পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু হাইব্রিড রাজনীতির কারণে যখন বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সেই সংগঠনে প্রবেশ করে, তখন সেই আদর্শিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে যায়।

রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে সংগঠনকে অবশ্যই তার আদর্শিক ভিত্তি শক্ত রাখতে হবে। নেতৃত্বকে বুঝতে হবে যে চাটুকারদের প্রশংসা সাময়িক আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু তা কখনো স্থায়ী শক্তি তৈরি করতে পারে না। প্রকৃত শক্তি আসে কর্মীদের আস্থা থেকে এবং জনগণের সমর্থন থেকে। একজন দূরদর্শী নেতা কখনো চাটুকারদের ওপর নির্ভর করেন না। তিনি সব সময় এমন পরিবেশ তৈরি করেন যেখানে সত্য কথা বলা যায়, সমালোচনা করা যায় এবং ভুল সংশোধন করা যায়। এই ধরনের পরিবেশ একটি সংগঠনকে সুস্থ রাখে এবং তাকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখে।

রাজনীতির ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—যে সংগঠন আদর্শকে গুরুত্ব দেয় এবং কর্মীদের সম্মান করে, সেই সংগঠন দীর্ঘদিন টিকে থাকে। আর যে সংগঠন হাইব্রিড ও চাটুকার সংস্কৃতির মধ্যে ডুবে যায়, সে সংগঠন ধীরে ধীরে তার শক্তি হারিয়ে ফেলে। সমাজের জন্যও এটি একটি বড় শিক্ষা। জনগণকে বুঝতে হবে যে রাজনীতিতে কেবল বাহ্যিক স্লোগান বা বড় বড় প্রতিশ্রুতি নয়, বরং সংগঠনের চরিত্রই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি সেই চরিত্রের ভেতরে নৈতিকতা, আদর্শ এবং সততা না থাকে, তাহলে সেই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জনগণের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।

সবশেষে বলা যায়, রাজনীতির প্রকৃত শক্তি কোনো ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেই শক্তি গড়ে ওঠে আদর্শ, সংগঠন এবং কর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে। যখন এই কাঠামোর ভেতরে হাইব্রিড চরিত্র এবং চাটুকারিতার সংস্কৃতি প্রবেশ করে, তখন সেই শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যায়। এই কারণেই বলা হয়—হাইব্রিড ও চাটুকারিতা রাজনীতি ধ্বংসের অপর নাম। যদি একটি সংগঠন তার ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই এই দুই বিপজ্জনক প্রবণতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে এবং আদর্শভিত্তিক রাজনীতির পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে হবে।

 

লেখক :

আজম পাটোয়ারী

প্রকাশক

আরডিএম মিডিয়া এন্ড প্রকাশনী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা