চলতি মৌসুমে সুন্দরবন থেকে মাত্র ১ হাজার ৭৩৮ কুইন্টাল মধু সংগৃহীত হয়েছে, যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং বিগত বছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ কম। বনদস্যুদের আতঙ্ক ও প্রতিকূল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মৌয়ালদের আয় সংকটে
চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দুই মাসব্যাপী মধু আহরণ মৌসুমে সুন্দরবন থেকে মাত্র এক হাজার ৭৩৮ কুইন্টাল মধু সংগৃহীত হয়েছে, যা গত ছয় বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সর্বনিম্ন। বন বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছর একই সময়ে দুই হাজার ৭৬ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়েছিল, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে ৩৩৮ কুইন্টাল। বন বিভাগের চারটি রেঞ্জ—সাতক্ষীরা, খুলনা, চাঁদপাই ও শরণখোলা—জুড়ে এই উৎপাদন হ্রাসের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মধু আহরণের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকায় চলতি মৌসুমে সরকারের রাজস্ব আয়ও নেমে এসেছে ৩৯ লাখ ৩১ হাজার ২৭০ টাকায়। এই নিম্নমুখী প্রবণতা শুধুমাত্র সরকারি কোষাগারের ক্ষতি করছে না, বরং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবিকার পথকেও সংকুচিত করে তুলছে।
মধু আহরণ হ্রাসের পেছনে মৌয়ালের সংখ্যা কমে যাওয়াকে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রায় আট হাজার মৌয়াল সুন্দরবনে প্রবেশ করলেও চলতি বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র তিন হাজার ৪৭৯ জনে, যা গত দুই বছরের ব্যবধানে অর্ধেকেরও বেশি। মৌয়ালদের ভাষ্যমতে, বাঘের আক্রমণের চেয়েও বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে সুন্দরবনের নতুন করে সক্রিয় হওয়া বনদস্যু গোষ্ঠী। জীবন ও নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে বনের গভীরে যেতে অনিচ্ছুক হওয়ায় অধিকাংশ পেশাদার মৌয়াল এবার বনে প্রবেশ করেননি। শরণখোলা ও খুলনা রেঞ্জের ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাথাপিছু মধু আহরণের হার স্থিতিশীল থাকলেও মোট উৎপাদন কমেছে মূলত জনবল সংকটের কারণে। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারে, যেখানে খলিশা ও গরান ফুলের মধুর দাম গত বছরের তুলনায় প্রতি মণে প্রায় সাত হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
পরিবেশগত ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে এই সংকটের অন্যতম কারিগরি কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে গাছে ফুলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং জলবায়ুর অস্থিতিশীলতায় ফুল দ্রুত ঝরে পড়ায় মৌমাছিরা পর্যাপ্ত মধু সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছে না। বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, মৌয়ালের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, বনদস্যু দমনের বিষয়ে পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জানিয়েছেন যে, র্যাব, কোস্টগার্ড ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চলমান রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, কেবল অভিযানেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, বরং বনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সুন্দরবনের মধু জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান উৎপাদন সংকট সেই সম্ভাবনাকে ম্লান করে দিচ্ছে। সুন্দরবন ও উপকূল সংরক্ষণ আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ সতর্ক করেছেন যে, যদি দস্যু আতঙ্ক ও পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্যবাহী পেশাটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বননির্ভর মানুষের জীবনযাত্রা ও সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তা জোরদার এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব প্রশমনে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, বিশ্বখ্যাত এই ম্যানগ্রোভ বনের অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক গুরুত্ব ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকবে, যার প্রভাব পড়বে পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির ওপর।