সুন্দরবনের গহীনে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের বিশেষ অভিযানে কুখ্যাত দুলাভাই বাহিনীর প্রধানসহ তিন দস্যুকে আটক করা হয়েছে।
অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে বাহিনীর এক সদস্য নিহত হয়েছেন। এ সময় বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
সুন্দরবনের বনজীবী ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের চলমান‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’-এর অংশ হিসেবে গত ২৫ জুন থেকে দুই দিনব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খুলনার কয়রা উপজেলার বনপাড়া সংলগ্ন সুন্দরবনের গভীরে কুখ্যাত দুলাভাই বাহিনীর অবস্থান নিশ্চিত হয়ে কোস্ট গার্ড বেইস মোংলা, স্টেশন কয়রা ও স্টেশন নলিয়ান যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানের একপর্যায়ে দস্যুদের বহনকারী দুটি বোট শনাক্ত করে কোস্ট গার্ড সদস্যরা। আত্মসমর্পণের জন্য সংকেত দেওয়া হলে দস্যুরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে কোস্ট গার্ডও পাল্টা গুলি চালালে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। গোলাগুলির একপর্যায়ে দস্যুদের একটি বোট আগুনে পুড়ে যায় এবং অপরটি ডুবে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোস্ট গার্ড ২১৬ রাউন্ড তাজা গুলি ও এক রাউন্ড ব্ল্যাঙ্ক কার্টিজ ব্যবহার করে।
বন্দুকযুদ্ধ শেষে ঘটনাস্থল থেকে দুলাভাই বাহিনীর প্রধান রবিউল ইসলাম ও সদস্য শওকত সরদারকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শওকত সরদারকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত রবিউল ইসলামকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে অভিযানের ধারাবাহিকতায় মঠবাড়িয়া পুলিশ ফাঁড়ির সামনে স্থানীয়দের সহায়তায় বাহিনীর আরেক সদস্য ইসরাফিল হাওলাদারকে হাতের আঙুলে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক করা হয়।
স্থানীয় জেলে ও বনজীবীদের অভিযোগ, দুলাভাই বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে চাঁদাবাজি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং সশস্ত্র দস্যুতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছিল। তাদের দৌরাত্ম্যের কারণে বনজীবী ও মৎস্যজীবীরা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছিলেন।
অভিযান শেষে ঘটনাস্থল থেকে ৬টি একনলা বন্দুক, ৬৯ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ৩ রাউন্ড ব্ল্যাঙ্ক কার্টিজ, একটি দেশীয় অস্ত্রসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কয়রা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
কয়রা থানার তদন্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) শাহ আলম জানান, নিহত শওকত সরদারের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একই সঙ্গে পলাতক অন্যান্য দস্যুদের গ্রেপ্তারে সুন্দরবন ও আশপাশের এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই অভিযানকে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করার চলমান কার্যক্রমের একটি বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বনাঞ্চলে দস্যুতা, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র অপরাধ দমনে কোস্ট গার্ডের নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হবে এবং কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দুলাভাই বাহিনীর বিরুদ্ধে এই সফল অভিযান উপকূলীয় অঞ্চলের বনজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে। তবে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ ও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দস্যুদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা অব্যাহত রাখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।